সোমবার ২৪ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

যানজটে বিশ্বের শীর্ষ শহর ঢাকা

স্টাফ রিপোর্টার: বিশ্বের শীর্ষ যানজটের শহর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নামবিও’র প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স-২০১৯’তে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
গতকাল শনিবার নামবিওর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এ সূচকের তথ্যমতে, বিশ্বের সবচেয়ে যানজটপূর্ণ শহরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ঢাকা আর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের কলকাতা। এর আগে ২০১৮ এবং ২০১৭ সালে ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। তবে ২০১৬ সালে ঢাকার অবস্থান ছিল তৃতীয় এবং ২০১৫ সালে এ অবস্থান ছিল অষ্টম। বিভিন্ন দেশের রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ ২০৭ টি শহরকে বিবেচনায় নিয়ে এ তালিকা প্রণয়ন করেছে নামবিও। যানজটের জন্য ঢাকার স্কোর ২৯৭.৭৬। আর ২৮৩.৬৮ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কলকাতা। ২৭৭.৮১ স্কোর নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লী। তালিকায় চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি ও ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। যানজটপূর্ণ শহর দুটির স্কোর যথাক্রমে ২৭৭ দশমিক ৬৬ ও ২৭৪ দশমিক ৩৯। শীর্ষ যানজটপূর্ণ শহরের তালিকায় ষষ্ঠ থেকে দশম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো, ভারতের শহর মুম্বাই, ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের শহর শারজাহ ও ইরানের রাজধানী তেহরান।
এদিকে ২০১৯ সালেও বিশ্বের সবচেয়ে কম যানজটপূর্ণ শহরের মধ্যে গতবারের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা। এরপর রয়েছে চেক রিপাবলিকের শহর বিয়ারনো, ডেনমার্কের কোপেনহেগেন, সুইডেনের গোথেনবার্গ ও জার্মানীর ফ্রাঙ্কফুট।
এ সূচক প্রণয়নে কয়েকটি উপসূচক ব্যবহার করেছে নামবিও। এর মধ্যে রয়েছে- সময় সূচক, সময় অপচয় সূচক, অদক্ষতা সূচক ও কার্বন নিঃসরণ সূচক। এর মধ্যে সময় সূচক,সময় অপচয় সূচক ও অদক্ষতা সূচকে ঢাকার অবস্থান রয়েছে শীর্ষে। আর কার্বন নিঃসরণ সূচকে ঢাকার অবস্থান ১০৯ তম।  সময় সূচকের ক্ষেত্রে কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোকে বোঝানো হয়েছে। এক্ষেত্রে কর্মস্থল বা স্কুলে যাতায়াত সময়কে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। আর সময় অপচয় উপসূচকে অসন্তোষের বিষয়টি উঠে এসেছে। জনসংখ্যার আধিক্য ও ঘনবসতিও এক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়েছে। অদক্ষতার সূচক মূলত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা নির্দেশ করে। অর্থাৎ ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কী প্রভাব ফেলছে, তা বিবেচনা করা হয়েছে। আর যানজটে সময় অপচয়ের কারণে নিঃসরিত অতিরিক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা নির্দেশ করে কার্বন নিঃসরণ সূচক।
বিশ্বের বিভিন্ন শহরের নানা পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে অনলাইনে তা প্রকাশ করে নামবিও। এর মধ্যে রয়েছে- জীবনযাপনের ব্যয়, অপরাধের হার, স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান ও যানজটের অবস্থা। প্রতিষ্ঠানটি তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ফোর্বস, বিজনেস ইনসাইডার, টাইম, দ্য ইকোনমিস্ট, বিবিসি, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, চায়না ডেইলি, দ্য টেলিগ্রাফসহ বিশ্বের খ্যাতনামা বিভিন্ন সংবাদপত্র ব্যবহার করে।
জানা গেছে, গত বছর ঢাকায় দৈনিক গড়ে মোটরযান নেমেছে ৪৭০টি। এর মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল ৭০টি ও মোটরবাইক ২৮৬টি। যদিও এ শহরে পর্যাপ্ত সড়কের অভাব রয়েছে। আর অপর্যাপ্ত সড়কে অপরিকল্পিতভাবে ব্যক্তিগত গাড়িকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রভাবে এ শহরে বেড়েই চলেছে যানজটের প্রকোপ। আধা ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে কখনও দুই থেকে আড়াই ঘণ্টাও লেগে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি। এছাড়া যানজট কমাতে আধুনিক গণপরিবহন (মেট্রোরেল, বিআরটি) ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছিল কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি)। পরে সংশোধিত এসটিপিতে আধুনিক গণপরিবহন আরও বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়, যদিও এগুলো এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
প্রসঙ্গত, মেট্রোরেল ও বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণাধীন রয়েছে। এর সুফল পেতে কমপক্ষে দুই বছর লাগবে। অথচ ব্যক্তিগত গাড়ি উৎসাহী করতে বিভিন্ন ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে একের পর এক। এতে গত কয়েক বছরে যানজটের চিত্র খারাপ হয়েছে এ শহরে।
চারটি উপসূচকের মধ্যে সময় সূচক ও সময় অপচয় সূচকে ঢাকার অবস্থান প্রথম। তবে অদক্ষতা সূচকে ঢাকা শহর রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে, আর কার্বন নিঃসরণ সূচকে ঢাকা রয়েছে ৯৯তম অবস্থানে। অর্থাৎ কম কাবর্ন নিঃসরণের কারণে শুধু একটি সূচকে ঢাকা ভালো অবস্থানে রয়েছে।
এতে দেখা যায়, ঢাকা শহরে কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে ২৫ মিনিটের দূরত্ব অতিক্রম করতে গড়ে সময় লাগে ৬৩ মিনিট। ঢাকা শহরের যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি। প্রায় ২৬ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করে থাকে ব্যক্তিগত গাড়ি, যেগুলোয় গড়ে দেড়জন (এক দশমিক পাঁচ) করে যাতায়াত করে। আর ৪৯ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করে বাস, যেগুলোয় গড়ে ৫০ জন করে যাতায়াত করে।
নামবিওর তথ্যের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক। তিনি বলেন, ঢাকা শহরের যানজট ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নানামুখী পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তার কোনোটিই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। আর গণপরিবহন ব্যবস্থার বিকাশে কয়েক বছর ধরে আলোচনা হলেও কোনো কাজই হয়নি। বরং অপরিকল্পিতভাবে ফ্লাইওভার নির্মাণ করে যানজটকে স্থায়ী রূপ দেওয়া হয়েছে। তাই সময় এসেছে বিকল্প চিন্তা করার।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে ঢাকা নগরীর অভ্যন্তরে যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় মাত্র সাড়ে ছয় কিলোমিটার। রাস্তার স্বল্পতা, ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য ও যান চলাচলে বিশৃঙ্খলাই এর মূল কারণ। গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন না করলে ২০৩৫ সালে এ গতি চার কিলোমিটারে নেমে যাবে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ