রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মুখ থুবড়ে পড়েছে স্কুলের স্বপ্নের ‘সততা স্টোর’

খুলনা অফিস : সৎ মানুষ গড়ার লক্ষ্যে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সততার শিক্ষা দিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘সততা স্টোর’ খোলাসহ ১৭টি নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে সরকারের এই মহৎ উদ্যোগটি এখন পরিণত হয়েছে গরিবের স্টোরে। অপরদিকে কোথাও কোথাও সততা স্টোর থাকলেও সততা স্টোর দিয়ে রীতিমত ব্যবসা করছেন এক শ্রেণির লোভী শিক্ষক, আয়া, বুয়া।
সরেজমিনে, মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে স্বপ্নের সততা স্টোর দেখা না মিললেও অধিকাংশ প্রাইমারি স্কুলে রয়েছে শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের সততার স্টোর। অভিভাবকদের মতে শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের সততা স্টোর গরিবের স্টোরে পরিণত হয়েছে। কারণ কিছু প্রাইমারি স্কুল ছাড়া কোথাও দেখা মেলে না সততা স্টোরের।
সৎ মানুষ গড়ার লক্ষ্যে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘সততা স্টোর’ করার উদ্যোগ গ্রহণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। স্কুল ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠিত এই স্টোরে থাকবে খাতা, কলম, পেন্সিল, ই-রেজার, স্কেল, জ্যামিতি বক্স, রঙ পেন্সিলসহ শিক্ষা সামগ্রী এবং চিপস, বিস্কুটসহ বিভিন্ন খাবার। যার ক্রেতা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। থাকবেনা বিক্রেতা। এ ছাড়া দোকান পরিচালনা কমিটির অনুমোদনক্রমে অন্যান্য পণ্যও রাখা হবে। সব পণ্যের দাম হবে বাজার মূল্যের সমান। ক্রেতারা তাদের পছন্দমতো পণ্য নিয়ে নির্দিষ্ট বক্সে টাকা জমা দেবে। দোকানের পুঁজির ব্যবস্থা করবে পরিচালনা পর্ষদ।
তবে সরকারের নেওয়া এ মহৎ উদ্দেশটি এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে স্কুলগুলোর কিছু অসাধু শিক্ষক এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদারকির অভাবে।
সরেজমিনে খুলনা সরকারি করোনেশন বালিকা বিদ্যালয়, জিলা স্কুল, পাবলিক স্কুল, মডেল স্কুল, খুলনা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়সহ নগরীর বিভিন্ন মাধ্যমিক স্কুলে গিয়ে দেখা যায় এ সকল স্কুলে নেই সততা স্টোর। এমন কি এ সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই শিক্ষার্থীদের। খুলনা সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী চম্পা আক্তারের কাছে সততা স্টোর সম্পর্কে জানতে চাইলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এ শিক্ষার্থী বলে, আমাদের স্কুলে সততা স্টোর নেই, এজন্য সততা স্টোর সম্পর্কে আমি কিছু জানিনা।
খুলনা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দেবাশীষ সরকার বলেন, অন্যান্য স্কুলের সততা স্টোরের তিক্ত অভিজ্ঞতায় আমরা সততা স্টোর চালু করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। তার পরেও আমরা চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু শিক্ষার্থীরা এখান থেকে কিছুই কিনতে চায় না। তারা বাইরে থেকে কিনতে অধিক আগ্রহী। এখানে উচ্চ পরিবারের মেয়েরা লেখাপড়া করে এজন্য তাদের চিন্তা-চেতনাও ভিন্ন বলে মনে করেন এই শিক্ষক।
খুলনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, স্কুল বন্ধ এ ছাড়া বছরের শুরুতে বইয়ের অনেক চাপ থাকে এ জন্য সততা স্টোরে বই রেখেছিলাম। কিছুদিন পর এগুলো সরিয়ে নিব, আবার চালু করব বলে তিনি জানান।
অপরদিকে কিছু কিছু স্কুলে সততা স্টোর এখন শিক্ষকদের আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। বয়রা মাধ্যমিক স্কুলের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক দীলিপ কুমার পাল স্যারের একটি দোকান রয়েছে। এটাকে সততা স্টোর বলতে পারেন। প্রতিবছর দীলিপ স্যার এ স্টোরে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন। এ বিষয়ে স্কুলের দীলিপ স্যারের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যেহেতু বাইরে যেতে চায় না এ জন্য আমার নিজের অর্থায়নে এটি গড়ে তুলেছি, একে আপনি সততা স্টোরও বলতে পারেন।
বয়রা মোহাম্মদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গিয়ে দেখা যায় বুয়ার কাছে টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীদের সততা স্টোর থেকে বিভিন্ন পণ্য কিনতে। এক প্রশ্নের জবাবে স্কুলের বুয়া বলেন, বাচ্চারা বোঝেনা তো তাই আমি ওদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ওদেরকে পণ্য দিয়ে থাকি।
আফরোজা আক্তার নামে এক অভিভাবক বলেন, যদি শিক্ষক এবং বুয়ারা টাকা লেনদেন করেন এবং পণ্য দেন তাহলে আমাদের সন্তানরা সততা শিখলো কোথা থেকে। আর এ সকল নানা কারণে সততা স্টোরের আসল উদ্দেশটি যেন আড়াল হয়ে আছে।
খুলনা সিটি গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহ জিয়াউর রহমান স্বাধীন বলেন, তিনবার জিলা শিক্ষা অফিস থেকে খুলনার প্রতিটি স্কুলে সততার স্টোরসহ ১৭টি নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দিয়েছে। আমি এখনও শুরু করিনি, খুব শিগগিরই শুরু করবো।
খুলনা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের বিভাগীয় উপ-পরিচালক মেহেরুননেছা বলেন, প্রায় সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সততা স্টোর রয়েছে। তবে যে সকল স্কুলগুলোতে এখনো সততা স্টোর প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং এ নিয়ে ব্যবসা করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য যে, সততা স্টোরের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে পরামর্শ করে দোকানের জন্য প্রাথমিক পুঁজি সংগ্রহ করে বিনিয়োগ করবে। যে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদ নেই, সেখানে প্রধান শিক্ষক কর্তৃক মনোনীত তিনজন শিক্ষককে নিয়ে গঠিত কমিটি তা পরিচালনা করবে। এ কমিটি সততা স্টোরের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও তদারক করবে। ওই কমিটি মাসে অন্তত একবার বৈঠক করে হিসাব যাচাই ও ক্রয়যোগ্য সামগ্রীর তালিকা করে প্রয়োজনীয় অর্থ স্টোর পরিচালনা কমিটির কাছে দেবে। এই উদ্যোগকে কার্যকর করতে দুদক প্রতিটি উপজেলায় একটি বালক একটি বালিকা বিদ্যালয়ে আর্থিক সহায়তাও দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ