সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

১০ বছর পর শুরু হলেও এবারও শিক্ষার্থী ভর্তি অনিশ্চিত

খুলনা অফিস : ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় একসাথেই চারটি বিএসি নার্সিং কলেজের যাত্রা হয়েছিল ২০০৭ সালে। যথারীতি অন্য তিনটি কলেজের নির্মাণ কাজ শেষে শিক্ষার্থী ভর্তির পাশাপাশি শিক্ষা জীবনের প্রায় ১০ বছর পার করেছেন কর্মরত নার্সরা। অর্থাৎ পোষ্ট বেসিক বিএসসি নার্সিং কোর্স সম্পন্ন করে তাদের পেশাকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগা খুলনার নার্সিং কলেজটি অর্ধনির্মিত অবস্থায় পড়ে থাকার পর পুনরায় কাজ শুরু হলেও সীমানা প্রাচীর নির্মাণে বাঁধার মুখে পড়েছে। এ জটিলতা দূর না হলে আগামী সেশনেও শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশংকা সংশ্লিষ্টদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এইচইডি) আওতাধীন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ১২ একর জমিতে ২০০৭ সালে শুরু হয়েছিল খুলনা নার্সিং কলেজ ও ইনষ্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির নির্মাণ কাজ। যেটি মাত্র দু’বছরের মাথায় বন্ধ করে দিয়ে তৎকালীন ঠিকাদার আত্মগোপন করেন। এরপর থেকে নার্সিং কলেজ ও আইএইচটির নির্মাণ কাজ থমকে গেলেও সম্প্রতি আবারো শুধুমাত্র নার্সিং কলেজের অসমাপ্ত কাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র নির্মাণ শেষ হয়েছে। চলছে সীমানা প্রাচীরের নির্মাণ কাজ। আসবাবপত্রও ইতোমধ্যে সরবরাহ হয়েছে। সীমানা প্রাচীরের জন্য এক কোটি ৮৮ লাখ টাকার টেন্ডার দিয়ে গত বছর ৬ নবেম্বর চুক্তির মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করেছে মাহবুব ব্রাদার্স নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। যেটি এক বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে কাজটি বাঁধাহীনভাবে করা সম্ভব হলে আর মাত্র দুই মাসের মধ্যেই প্রাচীর নির্মাণ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি স্থানীয় একটি মহল কলেজের মেইন গেট এবং পেছনের সীমানা প্রাচীর নির্মাণে বাঁধা দিচ্ছে। নার্সিং কলেজের মেইন গেটের পার্শ্ববর্তী ব্যক্তি মালিকানাধীন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি কলেজের জমির মধ্যদিয়ে রাস্তা ঘুরিয়ে মেইন গেটের সাথে মিলিয়ে দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু এতে নার্সিং কলেজের নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সার্ভেয়ার সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে জমি চিহ্নিত করে দেয়ার পরই সেখানে সীমানা প্রাচীরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এর পরেও এখন বাঁধা দেয়ার বিষয়টি উন্নয়ন বাঁধাগ্রস্থ করার শামিল বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেন।

এ বিষয়টি জানিয়ে মঙ্গলবার নার্সিং কলেজের পক্ষ থেকে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ খালেদা বেগম। ওই অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিয়োগকৃত সার্ভেয়ার কর্তৃক নার্সিং কলেজের সীমানা নির্ধারণের পর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার গত ৪ ডিসেম্বর’১৮ হতে সীমানা প্রাচীর, বালু ভরাট, রাস্তা নির্মাণসহ মেইন গেট নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ইতোমধ্যে পশ্চিম পাশের সীমানা প্রাচীরের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের পথে। উত্তর পাশের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের সময় স্থানীয় কিছু ব্যক্তি উত্তর-পূর্ব পাশের মেইন গেটের সাথে নার্সিং কলেজের অধিগ্রহণকৃত জমির মধ্যদিয়ে একটি রাস্তা তৈরির প্রস্তাব দেন। তাছাড়া দক্ষিণ পাশের সীমানা প্রাচীর নির্মাণকালে দক্ষিণ-পূর্বকোণের জামির মালিকদের নার্সিং কলেজের অধিগ্রহণকৃত জমির মধ্য হতে পুরাতন স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার জন্য বলা হলেও তারা স্থাপনা সরিয়ে নিতে অস্বীকার করেন। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। এমতাবস্থায় নার্সিং কলেজের সীমানা প্রাচীরের নির্মাণ কাজ যাতে চলমান থাকে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানানো হয় ওই পত্রে।

যদিও স্থানীয় কেউ কেউ বলছেন, রাস্তাটি সেখান থেকে ঘুরিয়ে নেয়া হলে নিরাপত্তা বিঘিœত হবে না, বরং আরও ভাল হবে। কেননা, চলাচলের রাস্তা না থাকলে সেখানে মাদকাসক্তদের আড্ডা বসতে পারে। পক্ষান্তরে অপর একটি সূত্র বলছে, এক রাস্তা থেকে কেউ দুর্ঘটনা ঘটিয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে বলেই নার্সিং কলেজের গেটের সাথে মিলিয়ে অন্য কোন রাস্তার সংশ্লিষ্টতা থাকা উচিত নয়।

এ ব্যাপারে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। কিন্তু পরিকল্পনা মন্ত্রী বুধবার খুলনায় থাকায় তিনি সেখানে যেতে পারেননি। বৃহস্পতিবার তিনি সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি দেখেন।

নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ খালেদা বেগম বলেন, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ শেষ হলেই আগামী জুন মাসের পর থেকে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি শুরু করা যেতো। কিন্তু এটি না হলে আরও এক বছর পিছিয়ে পড়তে হবে। কলেজে বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে রয়েছেন। এছাড়া রয়েছেন ১২জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তবে চার জন প্রদর্শক এবং একজন প্রভাষক পদায়ন থাকলেও তাদেরকে অন্যত্র পেষনে ও সংযুক্তিতে রাখা হয়েছে। তবে শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেই শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে এর কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হবে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এইচইডি খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী শামসুল আলম বলেন, খুলনা নার্সিং কলেজের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার জন্য ইতোমধ্যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সাত কোটি টাকা প্রয়োজন বলে প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু ওই টাকায় এখন সংকুলান হবে না বলে আশংকা রয়েছে। এজন্য আপাতত সাত কোটি টাকা দিয়ে যে কাজ সম্পন্ন করা যায় সে চেষ্টা চলছে। 

শীঘ্রই এজন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলেও তিনি জানিয়ে বলেন, বাকী কাজের জন্য আবারো নতুন করে পরিকল্পনা নেয়া হবে। তবে আইএইচটি’র জন্য ২০ কোটি টাকার প্রস্তাব পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় থাকলেও সে ব্যাপারে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।

নার্সিং কলেজের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ সম্পর্কিত বাধার বিষয়ে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ মোশাররফ হোসেন বলেন, বিষয়টি উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত বিধায় এলাকাবাসী ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান সকলের সমন্বয়ে এগিয়ে যাওয়া উচিত। জমির মাপ অনুযায়ী এটির একটি সন্তোষজনক সমাধান দরকার বলেও তিনি মনে করেন।

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শেখ শামসুদ্দিন আহম্মেদ প্রিন্স বলেন, নার্সিং কলেজের জন্য নির্ধারিত ৫ একজন চিহ্নিত করেই সীমানা প্রাচীরের কাজ শুরু হয়। কিন্তু স্থানীয় কিছু লোক এতে বাধা দেয়ায় কার্যক্রম বিঘিœত হচ্ছে। এ ব্যাপারে খুলনার জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় হওয়ার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাধাগ্রস্থ করার অধিশার কারও নেই।

উল্লেখ্য, ১২ একর জমির ওপর ২০০৭ সালে শুরু হয়েছিল খুলনা নার্সিং কলেজের নির্মাণ কাজ। মেসার্স মুন কনষ্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ১৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজটি শুরু করে মাত্র দু’বছরের মাথায় বন্ধ করে দিয়ে দেশত্যাগ করেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। দু’বছরে নির্মাণ করা হয় একটি গেষ্ট হাউজ, অধ্যক্ষের বাসভবন, তিনটি স্টাফ কোয়াটার, একটি একাডেমিক ভবন এবং দু’টি হোষ্টেল ভবন। দীর্ঘদিন পর অসমাপ্ত কাজ শুরু হয়েছে। সীমানা প্রাচীর নির্মাণ শেষেই প্রশাসনিক কাম একাডেমিক ভবনের বাকী সম্পন্ন করেই শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ