রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রংপুরের গঙাচড়ায় অপরিকল্পিতভাবে তিস্তা নদী খননের অভিযোগ

রংপুর : নদীপাড়ের মানুষকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে বিনবিনার চর থেকে মহিপুর শেখ হাসিনা সেতু পর্যন্ত পানি প্রবাহের জন্য ২৪শ’ মিটার ও নোহালী ইউনিয়নের কচুয়া এলাকায় ১৬শ’ মিটার নদী খননের কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। অপরিকল্পিতভাবে খনন কাজের অভিযোগ তুলেছেন নদীপাড়ের মানুষ

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস : রংপুরের গঙাচড়া উপজেলায় অপরিকল্পিতভাবে তিস্তা নদী খনন কাজ পরিচালনা করায় সরকারের নদীর নব্যতা ফিরিয়ে আনার কর্মসূচির মহৎ উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে। চরের মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। 

প্রকাশ, তিস্তা নদীর ভাঙন রোধে সরকার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় তিস্তা নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষকে নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধানে উপজেলার বিনবিনার চর থেকে মহিপুর শেখ হাসিনা তিস্তা সড়ক সেতু পর্যন্ত পানি প্রবাহের জন্য ২ হাজার ৪’শ মিটার দীর্ঘ এবং নোহালী ইউনিয়নের কচুয়া এলাকায় ১ হাজার ৬’শ মিটার দীর্ঘ তিস্তানদী খননের কাজ শুরু করা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ব্যায় করা হচ্ছে ৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এ খনন কাজে ঠিকাদারীর দায়িত্ব পেয়েছে চট্টগ্রামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স।

স্থানীয় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে, রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে অপরিকল্পিতভাবে তিস্তা নদীর এই খনন কাজ করা হচ্ছে। গঙচাড়ার চর শংকরদহে তিস্তা নদী খনন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গত বছর বন্যায় সৃষ্ট হওয়া নদীর নতুন চ্যানেল থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দুরে ৭টি বড় শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে এই খননের কাজ করা হচ্ছে। খনন করা বালু পাইপের মাধ্যমে ফেলা হচ্ছে খনন এলাকা থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে। তাঁদের অভিযোগ খনন এলাকার পাশেই বালু ফেলার কারণে ঐ বালু দিয়ে খনন করা খালটি পুনরায় ভরাট হয়ে যাওয়ার শংকা রয়েছে। এছাড়া নদী তীরবর্তী এলাকায় কোন বেঁড়ি বাঁধ নির্মান না করায় বন্যার পানি পার্শ্ববতি এলাকা প্লাবিত হওয়ার শংকা রয়েছে। ফলে এসব নদী খনন কোন কাজে আসবে না চর বাসীর কল্যানে। চরের বিক্ষুব্ধ মানুষ নদী ভাঙন রোধে বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। নদীরক্ষা বাঁধ নির্মাণ না হলে আগামী বর্ষা মওসুমে স্থানীয় ভাবে যোগযোগের রাস্তা, স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, বসতভিটাসহ ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশংঙ্কা দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে তিস্তার মূল চ্যানেলে পানি প্রবাহের জন্য খনন কাজ করা হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বিনবিনার চর এলাকা থেকে ২ হাজার ৪শ’ মিটার এলাকায় চরের মাটি খনন করে নদীতে পানি প্রবাহের জন্য নতুন চ্যানেল তৈরি করা হচ্ছে। এ চ্যানেল দিয়ে মূল নদীর সাথে পানি প্রবাহের সংযোগ দেয়া হবে। নদী খনন কাজ শুরু হওয়ায় নদীপাড়ের মানুষ আশার আলো দেখছে। তবে অপরিকল্পিতভাবে নদী খনন করায় তাদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। লহ্মীটারী ইউনিয়নের কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক (৬০) জানান, নদী খননের যে কাজ করা হচ্ছে সেটি কোন কাজে আসবে না। নদীতে বাঁধ না দিলে শংকরদহ এক ও তিন নম্বর ওয়ার্ড নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার শংকা রয়েছে।   একই এলাকার মমিনুর রহমান (৫৬), মাহাতাব আলী (৬৫), জয়নাল মিয়া (৫৫) জানালেন, গত ২ বছর ধরে নদী ভাঙনে অনেক ফসলী জমি, বাড়ি ভিটা নদীতে চলে গেছে। নদীতে বাঁধ নির্মাণ হলে শংকরদহ ও জয়রাম ওঝা চরের মানুষ নদী ভাঙন থেকে বাঁচতে পারতো। 

লহ্মীটারী ইউনিয়ন ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল মোন্নাফ বলেন, ২ হাজার ৪’শ মিটার দৈর্ঘ্যরে যে নদী খননটা হচ্ছে তার প্রস্থ হচ্ছে মাত্র ৪০ মিটার। খনন করা বালু অপরিকল্পিতভাবে মাত্র ১০০ মিটার দুরে ফেলা হচ্ছে। চৈত্র কিংবা বৈশাখ মাসের বাতাসে খনন করা বালু পুনরায় নদী ভরাট হয়ে যাবে। বর্তমানে বিনবিনা চর এলাকায় তিস্তা নদীর যে নতুন চ্যানেল তৈরি হয়েছে সেটির কারণে গত বর্ষায় শেখ হাসিনা তিস্তা সড়ক সেতু উদ্বোধনের আগেই রংপুর- লালমনিরহাট সংযোগ সড়কের একটি ব্রীজ ভাঙনের উপক্রম হয়েছিল। এবার বাঁধ দেয়া না হলে বন্যায় ব্রীজসহ যোগাযোগে ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার আশংকা। 

লহ্মীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ্ আল হাদী জানান, যে ভাবে নদী খনন করা হচ্ছে সেটি যেনপুকুর খনন করা হচ্ছে। বিনবিনা চর এলাকা থেকে শেখ হাসিনা সেতু তিস্তা সড়ক পর্যন্ত একটি বাঁধ দেয়া হলে এখানকার অন্ততঃ ৩০ হাজার পরিবার নদী ভাঙন থেকে রক্ষা পাবে। আমরা চাই পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীতে বাঁধ দিয়ে এখানকার স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, বসতভিটা, ফসলী জমি বাঁচাতে কাজ করবে। এছাড়া খননের নামে অর্থ লোপাট করা হবে। এ বিষয়ে সরকারকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। 

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মেহেদী হাসান জানান, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে বন্যায় তিস্তা নদীর নতুন চ্যানেল তৈরি হওয়ায় ভিন্ন পথে পানি প্রবাহের কারণে শংকরদহ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রংপুর থেকে লালমনিরহাট যোগাযোগের জন্য শংকরদহে এলজিইডি’র একটি ব্রীজ গত বন্যায় ভাঙনের উপক্রম হয়েছিল। ঐ এলাকা রক্ষার্থে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিনবিনা চর এলাকা থেকে ২ হাজার ৪’শ মিটার দীর্ঘ খনন কাজ শুরু করেছে। খননের বালুগুলো নদীর দিকে নিচু এলাকায় ফেলা হচ্ছে। নতুন চ্যানেল তৈরি করে নদীর পানি মূল তিস্তা নদীতে দেয়া হবে। খননের সময় খালের প্রস্থ কম হলেও পানি প্রবাহ শুরু হলে পানির তোড়ে এর আকার প্রশস্ত হয়ে যাবে বলে আশা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ