শনিবার ০৬ জুন ২০২০
Online Edition

অবগুণ্ঠনের আড়ালে চামেলি হাউজ

মুহাম্মদ নূরে আলম : চামেরী হাউস বা চামেরী ভবন  ইংরেজদের কুটিরের আদলে নির্মিত ভবনটি ঢাকার  হাইকোর্ট ভবনের উল্টাদিকে ১৯২০ সালে নির্মিত হয়। ঔপনিবেশিক স্থাপত্যকলা একটা চমৎকার নিদর্শন চামেলী হাউস। চামেলী হাউস মূলত নির্মিত হয়েছিল ইংরেজ প্রশাসকদের জন্য ১৯২৬ সালে! ১৯০৫ সালে ঢাকা পূর্ববঙ্গ এবং আসামের রাজধানী হবার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিন্টো রোড এলাকায় অনেকগুলো ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল প্রশাসকদের থাকবার জন্য, চামেলী হাউস তাদের মধ্যে একটি! রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ঢাকা পরিভ্রমনের সময়ে এই চামেলী হাউসেই থেকেছিলেন! চামেলী হাউস এখন বর্তমানে অবশ্য আপনারা এই ভবনের সামনে নামফলকে দেখতে পাবেন “চামেলি হাউস”এটা প্রকৃতপক্ষে সঠিক নয়। আসলে ভবনটি পরিচিত ছিল ‘চামেরী হাউস’ নামেই। ইংরেজ আমলে অবিবাহিত ইংরেজ সিভিলিয়ানরা কয়েকজন মিলে যে ভবনে থাকতো তাকে বলা হতো ‘চামেরী’ (ইংরেজি চাম বা বন্ধু থেকে)। বঙ্গভঙ্গের পর যতদিন ঢাকা রাজধানী ছিল ততদিন এটা ইংরেজ ব্যাচেলর প্রশাসকদের আবাসস্থল বা মেস হিসাবেই ব্যবহৃত হতো চামেরী হাউস। পরবর্তী কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে, রমনা এলাকার সব ভবন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তখন চামেরি হাউস বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলো অধ্যাপকদের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দেশ বিভাগের পর কিছুদিনের জন্য বাড়িটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের হোস্টেল। স্বাধীনতার পর পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রধান কার্যালয় ছিল এই বাড়িটি। পরবর্তিতে ১৯২৯ সালে মুসলিম হলের কতিপয় আবাসিক ছাত্রকে বাংলোটি বরাদ্ধ দেয়া হয়েছিল। এটিকে ১৯৩৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের হল হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, ১৯৫৭ সালে রোকেয়া হল নির্মাণের আগ পর্যন্ত এটা ছাত্রী নিবাসই ছিল। এরপর চামেলী হাউস সরকারের তত্বাবধানে চলে যায়। বর্তমানে এখানে ‘সিরডাপ’ এর কার্যালায়। পাকিস্তান আমল ও স্বাধীনতার পর কিছুকাল এটিকে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ১৯৮৫ সালে ভবনটি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির (সিরডাপ) অফিসের নিকট হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে ভবনটি সিরডাপ ভবন নামে পরিচিত। হাইকোর্টের মোড়ে, শিক্ষা অধিদপ্তরের পাশে গেলেই দেখতে পাওয়া যাবে চামেরী হাউসকে। বর্তমানে এই বাড়িটি সিরডাপ এর কার্যালয় মোটামুটি পুরাতন হলেও বাড়িটি এখনও তার মূল স্থাপত্য ফর্ম অপরিবর্তিত রেখেছে। আশেপাশে আরো কয়েকটি এরকম বাড়ি ছিল যেগুলো সব ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।
ঢাকায় এসে প্রথম মুগ্ধতার স্মৃতি ‘চামেলি হাউজ’কে ঘিরে। রিকশায় বসা থাকা অবস্থায় আসতে যেতে ঘাড় ফেরাতে হতো তোপখানা রোডের এই বাড়িটির দিকে। আজকের তরুণদের অনেকেই জানে না প্রেসক্লাব আর শিক্ষা ভবনের মধ্যবর্তী লাল রঙের চমৎকার এই বাড়িটির অস্তিত্ব সম্পর্কে। সত্যি কথা বলতে কি ২০০৩ এ প্রথম দেখার সময় যেমন বাড়ি মনে হয়েছিল এটিকে, আজ দেখলাম বাড়ি নয় আর এটা, এখন এটা একটা অফিস কমপ্লেক্স। অবশ্য এক সুযোগে ফটক পেরিয়ে ঢুকার কারণে এই অনুধাবন। নতুবা বাইরে থেকে কিছু বুঝারও উপায় নেই কংক্রিট পর্দার আড়ালে কি আছে কি নেই।
চামেলি হাউজ: এদেশের দায়িত্বশীল পদে নিয়োজিত ঊর্ধ্বতন সিদ্ধান্ত দাতাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার চমৎকার নিদর্শন এই বাড়িটি। দর্শনীয় লাল দ্বিতল বাড়িটি নয়, এখন চোখে পড়ে কিম্ভূতকিমাকার বিশাল বপুর পিলারাকৃতি এক ভবন। চতুর্পাশের ফাঁকা অংশ ছিল এই বাড়ির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বেঢপ এই বিল্ডিং ছাড়াও পেছনে করা হয়েছে আরো বিল্ডিং। এই বাড়ির পারিপার্শ্বিক মূল পরিবেশের সাথে একেবারেই বেমানান এ সমস্ত স্থাপনা।
নুতন এই বিল্ডিংএর প্রতিটি তলায় দেখা গেলো সম্মেলন স্থল, অডিটরিয়াম ও সংশ্লিষ্ট স্পেস (ডাইনিং হল ইত্যাদি)। এক এক ফ্লোরে সেমিনার, সম্মেলন  এ সবের জন্য ভাড়া নিয়েছে এক এক সংস্থা। খাওয়া দাওয়ার জন্যও ফ্লোরে ফ্লোরে ডাইনিং হল। ভাড়া দিয়ে অর্থোপার্জনের চমৎকার ব্যবস্থা। ঐতিহ্যবাহী একটি বাড়িকে প্রকারান্তরে রূপান্তর করা হয়েছে কমিউনিটি সেন্টারে। প্রথমে মূল ভবনটির পেছনে ১৯৯৫ তে  করা হয় দ্বিতল কনফারেন্স হল। শুরু হয় সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা আর সংস্কারের নামে বাড়িটির নির্মান তথা স্থাপত্য বিকৃতির। ব্যতিক্রমী গঠনশৈলী ছাড়াও এই বাড়ির অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল আয়তাকার ছোট ছোট ‘স্লেট টালি’র ছাদে। ২০০১ সালে নিরাপত্তা দেয়াল নামক পর্দা তুলে ২০০৬ সালে করা হয় এর ‘সংস্কার’। আসলে সংস্কারের নামে পিন্ডি চটকানো হয়েছে শতবর্ষের ঐতিহ্যময় এই বাড়িটির।
শুধু আকৃতি ঠিক রেখে ২০০৬-এ ছাদের এন্টিক মানের ‘স্লেট টালি’ ফেলে দিয়ে বসানো হয় ঢালাই ছাদ। ২০০৯ এ অনুষ্ঠিতব্য সিরডাপ সদস্য দেশগুলোর সম্মেলনের ছুতোয় নির্মাণ করা হয় পিলারাকৃতি ভবনটি যেখানে আজ প্রত্যক্ষ করা গেছে অন্তত দুটো বেশ বড় সম্মিলনি। ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানী হিসাবে ঢাকাকে গড়ে তুলতে এই এলাকা সহ রমনা গ্রীনের ল্যান্ডস্কেপ পরিকল্পনা করেন বৃটিশ স্থপতি রবার্ট লুইস প্রোডল্ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন ছাত্রী নিয়ে ১৯৩৮ সালে রোকেয়া হলের যাত্রা শুরু হয় এই বাড়িতে। চামারি হাউজ এর অপভ্রংশ হিসাবে নাম চালু হয়ে যায় চামেলি হাউজ। এই ছাত্রী নিবাস পরে স্থানান্তর হয় বর্তমান রোকেয়া হলের পাশে ‘হুদা হাউজে’। চামেলি হাউজের নামানুসারেই ছাত্রী নিবাস হিসাবে হুদা হাউজেরও নাম পড়ে চামেলি হাউজ। ভাষা আন্দোলনকালেও ছাত্রী নিবাস ছিল পরের চামেলি হাউজ ( যা ছিল হুদা হাউজ)।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ