শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

দুটি অণুগল্প

হাফিজ ইকবাল : 

১. মেটোরঙের পোকা ও নির্জীব পাতা

আউলিয়াখানা নদীর দক্ষিণপার। একটি টঙ। টঙের টনিতে জাল লাগানো আছে। ঝিরঝির বাতাসে জালটি ক্ষাণিকটা দুলছে। রমজানের শেষদিনের সূর্যটা অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তবুও তাকে ঈষৎ কালো মেঘ খ-গুলো ছেপে যাচ্ছে। সূর্যটি প্রাণপণ চেষ্টা করছে তার আজকের বরাদ্দ রোদের সবটুকুই পৃথিবীকে দিয়ে যেতে। বাতাস তার সহায়ক হয়ে মেঘখ-গুলোকে কিঞ্চিত সরিয়ে দিচ্ছে। ফাঁক ফোকর দিয়ে ঠিকরে ঠিকরে পড়ছে মিষ্টি রোদ। টঙে বসে এসব খেয়াল করছিলো অশীতিপর মোজাম্মেল হক। 

টনির জালে আটকা পড়া একটি পোয়ামাছ শুকিয়ে শুটকি হয়েছে। একটি পাখি সেই জালের ফাঁসের শুটকিটিকে ভক্ষণ করতে চেয়েও ব্যর্থ মনে উড়ে গিয়ে বিঘাদূরে পরিবেশ দূষণকারী আকাশমনি গাছে বসলো। গাছ থেকে কয়েকটি শুকনো পাতা খসে পড়লো। তার একটি পাতাকে পূর্বদিক থেকে বয়ে যাওয়া বাতাস টঙের কাছে স্বচ্ছপানিতে উড়িয়ে ফেলে দিলো। টঙের কাছের স্বচ্ছপানিতে চারপায়া মেটো রঙের অনেকগুলো পোকা। পোকাগুলো স্ফটিক পানির উপর ভেসে চলার চেষ্টা করছে। একটু স্থির থাকলেই আউলিয়াখানার মৃদু স্রোত তাদেরকে ভাসিয়ে ভাটিতে নিয়ে যাচ্ছে। অর্ধবিঘত ভাটিতে যাওয়ার পরই পোকাগুলো টাইটানিক জাহাজের মতই পানিতে ঢেউ তুলে উজানে আসছে। এভাবে তারা নিজেদেরকে স্বস্থানে ধরে রেখেছে ভাটির টানের স্রোতের বিপরীতে যুদ্ধ করে ।

চারপায়া মেটোরঙের পোকাগুলোর মধ্যে শুকনো নির্জীব পাতাটি পড়াতে পোকাগুলো কিছুটা বিচ্ছিন্ন হলো। তবে কালবিলম্ব না করে তারা আবার আগের মতই পিছিয়ে পড়া ও টাইটানিক গতিতে স্বস্থানে ফেরার স্বকীয় কাজে মত্ত হলো। নির্জীব শুকনো পাতাটিকে ভাটির টানের স্রোত নিজস্ব গতিতেই বয়ে নিয়ে চললো। মোজাম্মেল একদৃষ্টিতে স্রোতের সাথে বয়ে চলা পাতাটিকে লক্ষ করছিলো। স্রোতের সাথে বইতে বইতে পাতাটি পূর্বদিকে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলো। শুধু মৃদু ঢেউ চোখে পড়ছিলো মোজাম্মেলের। দৃষ্টি ক্ষান্ত হলে টঙের সামনের স্বচ্ছ পানির দিকে তাকাতেই দেখে চারপায়া মেটো রঙের পোকাগুলি তাদের স্বকর্মেই ব্যস্ত।

দীর্ঘ একটা শ্বাসফেলে মোজাম্মেল বলছে, 'হায় আমার জাতি! তোমরাও শুকনো নির্জীব পাতাটার মতই ভেসে ভেসে যাচ্ছো। একবারও নিজ যায়গায় থাকার জন্য চারপায়া মেটোরঙের পোকাগুলোর মতো সচেষ্ট হচ্ছো না।'

 

২. ধারী ছাগল

চারদিকে খাঁ খাঁ করা রোদ। ছোট্ট মরে যাওয়া নদীটার জলরাশি চুলোয় টগবগ করে ফোটার মতই গরম।

হাঁসগুলো মনে হয় গরম কী জিনিষ তা বুঝেই না। মাথা পানিতে ডুবিয়ে খাদ্য সংগ্রহ করছে। সাদা কালো মেশানো রঙের একটি তরতাজা ছাগী ভূট্টা তুলে নেয়া ক্ষেতে আপন মনে চরছে। কী মনোনিবেশ তার খুটে খুটে সবুজ কচি লতা পাতা চিবুতে! তার মতো অনেক ছাগী ও ছাগল বাঁশ ঝাড়ের ছায়ায় হাঁপাচ্ছে। ক্ষেতটিতে একফোটা ছায়ার দেখা মিলছে না। সাদা শালিকের দুটো ছানা মা শালিকটাকে আদার খাওয়ানোর জন্য চিচি ডাকের পেরেশানিতে রেখেছে। শালিকটি  জ্যৈষ্ঠের দুপুরের বেরহম রোদের তাপে আলঘেষা ছায়ায় কেচো-পোকা খুঁজছে। দুজোড়া শ্বেত-কৃষ্ণ পায়রা পারছে না শস্যদানা খুঁজতে। অপেক্ষমান একখ- মেঘের। গাঁয়ের কৃষক ধেনুকে ছায়ায় নিয়ে দরদর করে ঝরা ঘাম মুছছে গামছা দিয়ে। বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে সাদা-কালো ছাগীটার দিকে।

স্বগতোক্তি করছে, 'ও আচ্ছা! এটাতো রহিমার ধারী ছাগলটা। পেটটা উঁচু। মনে হয় দশদিনের মধ্যেই বাচ্চা প্রসব করবে। নিজ গর্ভের অনাগত বাচ্চার জন্য কী রোদের মধ্যে ঘাস খাচ্ছে! ছাগলটার মতো রবিউলের বউকেও দেখি ক্ষুধা-তৃষ্ণাহীন হয়েও ভাত-তরকারি গিলতে।'

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ