বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ঘুষের আখড়া রূপগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিস

রুহুল আমিন, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা : রূপগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিস পরিণত হয়েছে ঘুষের আখড়ায়। ঘুষ ছাড়া যেমন কোনো সেবা মেলে না তেমনি ঘুষেই মিলছে অহরহ জাল দলিল। ফলে ঘুষের কারবারেরই হাওয়া হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। এসব অপকর্মের হোতা হিসেবে অভিযোগের তীর সাব-রেজিস্ট্রার শহিদুল ইসলামের দিকে। যদিও তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে জমি, প্লট রেজিস্ট্রি করে দিয়ে কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন এই সাব-রেজিস্ট্রার। ভূমি কর্মকর্তাদের নাম, সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে ভুয়া কাগজ তৈরি করার পর জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে দলিল করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এতে কিছু অসাধু দলিল লেখকও তাকে সহযোগিতা করে থাকেন। এরকম জাল দলিলের আটটি নথি খোলা কাগজের কাছে এসেছে। এসব অপকর্মে মাসে অন্তত ৬০ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলিল করতে সরকারি ফি বাবদ ৭৫০ টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও সাব রেজিস্ট্রার হাতিয়ে নেন হাজার হাজার টাকা। রূপগঞ্জ উপজেলার আওতাভুক্ত এলাকার দলিল করতে নেন ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। আর উপজেলার বাইরের এলাকার জন্য ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এ ছাড়াও, সাব কবলা দলিল করতে শতকরা ১১ টাকা হিসাবে ব্যাংকে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে দলিলপ্রতি লাখে ৩০০ টাকা দিতে হয় সাব রেজিস্ট্রারকে। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলে ফি নেওয়ার নিয়ম না থাকলেও এ দলিলে ঘুষ দিতে হয় এক থেকে ১০ হাজার টাকা। হেবা ঘোষণা দলিল ফি-বিহীন করার বিধান থাকলেও নেওয়া হয় ১২০০-১৫০০ টাকা। বণ্টননামা দলিলে নেওয়া হয় ৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। কোনো দলিলের মূল পর্চা না থাকলে ফটোকপি পর্চায় নেওয়া হয় পাঁচ হাজার টাকা। এছাড়া দলিলের নকল তুলতে দলিলপ্রতি নেওয়া হয় দুই হাজার টাকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের জনৈক কর্মচারী বলেন, পশ্চিম সাব রেজিস্ট্রি অফিসে গড়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি দলিল হয়, অর্থাৎ মাসে দলিল হয় ১৩০০ থেকে ১৫০০টি। এসব খাত থেকে প্রতিমাসে শুধু পশ্চিম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আয় হয় ৬০ লাখ টাকা। গত মঙ্গলবার সকালে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিতে আসা কয়েকজন জমির মালিকের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা বলেন, দুপুর ২টা বাজলেই সাব-রেজিস্ট্রার ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করেন। বিকেল ৩টার পর থেকে বিলম্ব ফি নেওয়া হয়। জমির পরিমাণ ও ক্রেতাদের ধরন অনুযায়ী ৮০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। বিলম্ব ফির মাধ্যমে অধিকাংশ সময়ই রেজিস্ট্রি চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বেশ কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রূপগঞ্জে যোগদানের পর থেকেই শহিদুল ইসলাম নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে খাড়া (জাল) দলিলেও তিনি রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন। এ ছাড়া সরকারি ‘ক’ তালিকাভুক্ত সম্পত্তিও মোটা অঙ্কের বিনিময়ে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন। বাদ যায়নি কুলিয়াদি মৌজার বনের জমিও। গুতিয়াবো মৌজায় এক খ ‘ক’ তফসিলের জমি ইউপি সদস্য দলিল করে নেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।  সাবরেজিষ্ট্রি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে জাঙ্গীর মৌজার আর এস ১০২২ দাগের সরকারের ‘ক’ তফসিলভুক্ত ৩২ শতক জমি ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে রেজিস্ট্রি সম্পাদন করে দিয়েছেন। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আসাদুজ্জামানের নির্দেশ অমান্য করেই এ জমি রেজিস্ট্রি দেওয়া হয়। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৮০ লাখ টাকা। এ বিষয়ে কথা হয় উপজেলার কেয়ারিয়া এলাকার ভুক্তভোগী শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, তার ১৮০ শতক জমি টাকার বিনিময়ে ভুয়া দলিলে একজনকে রেজিস্ট্রি করে দেয়। এ নিয়ে তার দরবারে বেশ কয়েকবার ধরনাও দেওয়া হয়। কোনো কাজে না আসায় পরে নারায়ণগঞ্জ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। নগরপাড়া এলাকার আনোয়ার হোসেন নামের এক ভুক্তভোগী জানান, তিনি তার বোনের কাছ থেকে হেবানামা করে দুই শতক জায়গা রেজিস্ট্রি করাতে চাইলে সাব-রেজিস্টার শহিদুল ইসলাম সেটা করে দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। পরে ১০ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে তিনি রেজিস্ট্রি করান। গুতিয়াবো মৌজার এসএ ৮২৫ দাগের খাস খতিয়ান ‘ক’ তফসিলভুক্ত জমি লাখ টাকার বিনিময়ে গত বছরের ৭ জুন ভুয়া দলিলে রেজিস্ট্রি করে দেন এ সাব-রেজিস্ট্রার। এ বিষয়ে জমির ভোগ দখলে থাকা মিম্বর আলী উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগও দায়ের করেন। এছাড়াও গোয়ালপাড়া এলাকার শফিকুল ও বাগবের এলাকার একটি জালিয়াত চক্র এ কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রায় ২৫টি জাল দলিল তৈরি করে নিরীহ মানুষের জমি আত্মসাৎ করেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে আদালতে মামলাও চলছে বলে জানা যায়। এ সব অভিযোগের বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার শহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘আমার এখানে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয় না। ‘ক’ তফসিলভুক্ত জমি রেজিস্ট্রির বিষয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি বলেন, এটা আদালতের ব্যাপার। আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা যদি নিতে হয় সেটা আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আদালত দেখবে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ