রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

শিক্ষার সকল অমানিশা দূর করতে হবে

আবুল হাসান ও খনরঞ্জন রায়:

বর্তমানে যেটা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের আগে সেটাই ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান’। পূর্ব পাকিস্তান মানে, পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের দুটি প্রদেশের মধ্যে একটি। অপর প্রদেশটির নাম পশ্চিম পাকিস্তান। বর্তমানে যেটা পাকিস্তান নামক দেশ, সেটাই ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, এর দু’টি প্রদেশের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল এক হাজার থেকে দেড় হাজার মাইল এবং মধ্যখানে ছিল আরেকটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ যার নাম ভারত। ভারত এখনো আছে; ভারতের পশ্চিম দিকের প্রতিবেশী হচ্ছে পাকিস্তান এবং ভারতের পূর্ব দিকের অন্যতম প্রতিবেশী হচ্ছে বাংলাদেশ। ভারতের পূর্ব দিকে আরো প্রতিবেশী আছে চিন ও মিয়ানমার। বর্তমান বাংলাদেশ, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের আগে সেটাই ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল নামক প্রদেশের অংশ। তখনকার বেঙ্গল নামক প্রদেশটি একটি পুরাতন প্রদেশ। বেঙ্গল বা বঙ্গ নামক প্রদেশে প্রধানত হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করত।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান ও তার কয়েকজন সঙ্গীর বিশ্বাসঘাতকতায় ব্রিটিশরা জয়ী হয়েছিল। আমাদের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। অল্পদিনের মধ্যেই সিরাজউদ্দৌলার শাসনাধীন পুরো এলাকা ব্রিটিশদের করায়ত্ব হয়ে যায়। এখান থেকেই তারা পুরো ভারতকে তাদের শাসনে বা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। তাদের শাসন ও শোষণ দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্যে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার বেঙ্গল নামক প্রদেশের পূর্ব অংশকে দুইটি আলাদা প্রদেশ করে দেয়া হয়। নতুন প্রদেশের নাম হলো ইস্ট বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম এবং রাজধানী হলো ঢাকা। অপরটি হলো ওয়েস্ট বেঙ্গল বা পশ্চিমবঙ্গ। রাজধানী হলো কলিকাতা।

বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে ব্রিটিশ সরকার ক্ষান্ত হয়নি। পূর্ববঙ্গের অধিবাসীদের জ্ঞানে বিজ্ঞানে পিছিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে হাসিল করার লক্ষে শিক্ষা ও সংস্কৃতির উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ করে। শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং ডিপ্লোমা শিক্ষা তিনভাগে বিভক্ত করে। ডিপ্লোমা শিক্ষাকে বিভিন্নধারা উপধারায় বিভক্ত করে প্রতিষ্ঠা করে কারিগরি, হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী ও আয়ূবের্দীয়, নার্সিং, প্রাথমিক শিক্ষা, স্টেট মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টির ফার্মেসির মত নানান কিসিমের ডিপ্লোমা শিক্ষা। বিভক্তির কুটচালে ছিন্ন ভিন্ন হয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানমুখি ডিপ্লোমা শিক্ষা ব্যবস্থা।

পূর্ববঙ্গের ব্রিটিশদের শাসনামলে ১৭৫৭ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের তুলনায় মুসলমানেরা শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভীষণভাবে পিছিয়ে পড়েছিল। বৈষম্যে পড়েছিল অর্থনৈতিক দিক দিয়েও। ১৯১১ থেকে নিয়ে ১৯৩৭ বা ১৯৪০ বা ১৯৪৬ সাল দীর্ঘ সময়। কালক্রমে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা রাজনৈতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ‘পাকিস্তান’ সৃষ্টি হয়েছিল। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ব্রিটিশদের বিভক্তি করা ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ বিলুপ্ত করে নাই, বরং তারা আরো একধাপ এগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই শিক্ষাকে দ্বিধাবিভক্তি করে ফেলে। বিভ্রান্ত সৃষ্টি হয় এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই ধারা অব্যাহত থাকে লেখাপড়ায় সিভিল সার্ভিসে, সামরিক সার্ভিসে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে বিভিন্ন কারণে। ক্রমান্বয়ে পাকিস্তানের দুটি প্রদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য দূরত্ব ও ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়।

শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ওয়াজিউল্লাহ, গোলাম মোস্তফাকে গুলিতে প্রাণ দিতে হয়েছিলো। অনেক ছাত্র নেতা নির্যাতিত, আহত হয়েছিলো। অনেক সাধারণ মানুষ নিগৃহীত, অপদস্ত হয়েছিলো। ঢাকার বাইরে সারা দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ, লাঠিচার্জ, গুলি চলে। চট্টগ্রাম ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষে পঞ্চাশ উর্ধ্ব ব্যক্তি ও পুলিশ-ছাত্র আহত হন। দুর্বার ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকার গণ-ধীকৃত শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। একই সাথে যে সব ছাত্র স্নাতক পরীক্ষায় ফরম পূরণ করেছিল পরীক্ষা না নিয়ে সবাইকে পাস করিয়ে ডিগ্রি প্রদান করার ঘোষণা দেয়। এরপরের ইতিহাস কেবলই অভ্যুত্থানের ইতিহাস। স্বাধীনতা অর্জনের প্রেক্ষাপট রচনার ইতিহাস। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয় অর্জন করেছিলাম। ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে আমাদের এই বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত সময় হচ্ছে চার বছর; ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ১০ বছর; ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সময় হচ্ছে ১৯ বছর; ১৯৭২ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত হচ্ছে ৩৪ বছর; ১৯৭২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হচ্ছে ৪৭ বছর (আর মাত্র তিনবছর গত হলেই বাংলাদেশের বয়স ৫০ বছর হয়ে যাবে)। আমরা পালন করব স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব। এই দীর্ঘ সময়ে আমরা ব্রিটিশ মতাদর্শের শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারিনি। 

গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থান কেন্দ্রিক ডিপ্লোমা শিক্ষাকে রাখা হয়েছে অবহেলিত। বিভিন্ন ধারার ডিপ্লোমা শিক্ষাকে সমন্বয় করা যায়নি। প্রতিষ্ঠা হয়নি ডিপ্লোমা শিক্ষার আলাদা স্বাধীন স্বতন্ত্র শিক্ষা বোর্ড। শিক্ষাকে কর্মপ্রাপ্তির সোপান হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৫৭ সালের ২৩ জুন ১৯৪৭ এর ১৪ আগস্ট আর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এই তিন ক্রান্তিকালেও তরুণ ও তারুণ্য মিলে শিক্ষার সকল অমানিসা দূর করা যায়নি।

দেশ ও জাতিকে তার সার্বিক গন্তব্যে পৌঁছে দিতে আমাদের চর্চা করতে হবে ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নের শিক্ষা। তরুণ যুবকদের কর্মক্ষম করে সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ শিক্ষা ‘ডিপ্লোমায়’ আকর্ষণ বাড়াতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ