মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

জাসরত স্যারের অবদান অসামান্য 

জাসরত স্যার

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী :

নিউজিল্যান্ডের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ জাফরুল্লাহ আমার কাছে বারবারই অকপটে স্বীকার করেন, ‘মাস্টার কাকু না হলে আমার পক্ষে বিদেশবিভূঁইয়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার সৌভাগ্য নিশ্চয়ই হতো না।’

এইতো সেদিন ‘তাঁর প্রিয় মাস্টার কাকু’ মারা যাবার রাতেও সুদূর নিউজিল্যান্ড থেকে তিনি আমাকে একইভাবে শোকসংবাদটি দিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জার্মানির ব্রেমেন থেকেও ড. জাফরের ছোটবোন সালেহা একই শোকখবর জানালেন। শুনে মনটা আমার খারাপই হলো। 

রাত প্রায় ১১টা। মঙ্গলবার। ২২ জানুয়ারি, ২০১৯। খবরটা পেয়ে জাসরত স্যারের ছেলে মোতাহারকে কল দিলাম। তখন সে বউ-বাচ্চাদের নিয়ে ঢাকার কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছে বাসে ওঠবার জন্য। এরপর মরহুমের বড়ছেলে জাবরহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক কামরুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। কামরুলও জানালো, রাতে খেয়েদেয়ে শুয়েছিলেন স্যার। কামরুলরা তখনও রাতের খাবার খাচ্ছিল। এরই মধ্যে কামরুলকে ডাক দেন স্যার। বললেন, ‘বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে। রাতে ভাত খাওয়া বোধহয় ঠিক হয়নি।’ এরপর দুয়েকবার বমি ওঠে। ব্যস! আর নেই! ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। চলে গেলেন জাফর-সালেহাদের মাস্টার কাকু। আমার প্রিয় শিক্ষক জাসরত আলী।

১৯৬৪ সাল। বর্তমান ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার মল্লিকপুর প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক জাসরত স্যার। প্রধানশিক্ষক শ্রী মণিলাল রায়। আরেক জন সহকারী শিক্ষক শ্রী কুহরাম রায়। সম্পর্কে আমার জ্যাঠামশাই। বাবা এই স্কুলে আমাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন ‘বড়ওয়ান’ ক্লাসে। তখন প্রথম শ্রেণিতে ‘ছোটওয়ান’ এবং ‘বড়ওয়ান’ বলে দুটো ভাগ ছিল। আমার বয়সটা একটু বেশি বলে সরাসরি বড়ওয়ানে ভর্তির সুযোগ পেয়ে গেলাম।

স্কুলটি সরকারি। মাটির ঘর। ওপরে টিনের ছাউনি। ছাত্রসংখ্যা খুব বেশি নয়। স্কুলটির কয়েকশ’ গজ দূরেই আমাদের বসবাস। সংসারে বাবা শান্তরাম রায় আর আমি। মা বেঁচে থেকেও নেই। অন্তত পাঁচ-ছয় মাইল দূরে গিলাবাড়ি গ্রামে ভিন্ন এক সংসার পেতেছেন। অবশ্য এ গিলাবাড়ি গ্রামেই আমার জন্ম। এ এক ভিন্ন কাহিনী। অনেকেই জানেন। তাই জাসরত স্যারকে নিয়েই আজ কথা বলতে চাই।

স্থানীয় যাত্রার দলে যোগ দিয়ে শৈশব থেকেই আমি গানবাজনা নিয়ে মেতে থাকি। আজ এখানে তো কাল ওখানে। যাত্রাপালায় অভিনয়। এ নিয়েই ব্যস্ত। জাসরত স্যার ও মণিলাল স্যারের চেষ্টায় স্কুলের ক্লাসে ফিরলেও সুযোগ পেলেই আবারও যাত্রা দলে গিয়ে স্কুল ফাঁকি। অথচ স্কুলে আমি ফার্স্ট বয়। আমাকে নিয়ে স্যারদের অনেক আশাভরসা। আমার আগের ব্যাচের জাফরুল্লাহ ক্লাস ফাইভে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। আমাকেও বৃত্তি পেতে হবে। স্যারেরা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। কিন্তু আমি ‘বাউ-ুলে নজরুল’ সেজে যাত্রাপালায় মেতে থাকি। ফলে আমার পড়াশোনা গোল্লায় যেতে বসে। বারবার চেষ্টা করেও যখন আমাকে যাত্রাদল থেকে ফেরানো যাচ্ছিল না, তখন যাত্রাদলের ম্যানেজারের বিরুদ্ধে মামলা করবার হুমকি দেন এই জাসরত স্যার। এরপর স্কুলে ফেরা নিশ্চিত হয় আমার। পড়াশোনায় মনোনিবেশ করি পুনরায়। 

অঙ্ক শেখাতেন কুহরাম স্যার। একদিন অঙ্ক পারিনি। সম্পর্কে জ্যাঠামশাই। তাই তাঁর হাতে ধোলাই খেলাম আচ্ছামতো। পরে দুপুরের প্রখর রৌদ্রেও দাঁড় করিয়ে রাখেন আমাকে। এ দেখে জাসরত স্যার ও মণিলাল স্যার দু’জনই কুহরাম স্যারকে অনেক বকাবকি করেন সেদিন। আমি মনে মনে বেশ লজ্জিত হই। 

জাসরত স্যার যাত্রাদল থেকে আমাকে ফিরিয়ে না আনলে আমার পড়াশোনা যে হতো না, তা প্রায় নিশ্চিত ছিল। বলা যায়, যাত্রাদলে থাকতে থাকতে আমি ‘ফাত্রা’ হয়েই থাকতাম। ফাত্রা মানে বাজে ছেলে। ভবঘুরে। কাজকর্ম নেই, অপকর্ম করে এমন লোক। অর্থাৎ প্রায় নষ্ট মানুষ। এমন নষ্ট মানুষ হওয়া থেকে তিনি আমাকে রক্ষা করেছেন তা আমাকে স্বীকার করতেই হবে। এখনও যে সবাই আমাকে ভালো মানুষ মনে করেন তা আমি বলছি না। তবে কারুর কোনও উপকার না করতে পারি, অনিষ্ট চিন্তা করিনি কখনও।

আমি স্কুলে পড়াশোনা করি তা স্থানীয় বিত্তবানরা চাইতেন না। গরিবের ছেলে স্কুলে পড়বে কেন? এটা মানায় না। তাঁদের ধারণা আমিও বাবার মতো অন্যের কামলা খাটবো। তাই আমার স্কুলে ভর্তি নিয়ে তাঁরা বিদ্রƒপ করতেন। ঠাট্টা করতেন। বাবাকে তাচ্ছিল্য করতেও ছাড়েননি। এমনকি আমার পড়াশোনা নিয়ে জাসরত স্যারকেও উপহাস করতেন কোনও কোনও বিত্তবান প্রতিবেশী। তবে জাসরত স্যারও সব উপেক্ষা করে আমার পড়াশোনার ব্যাপারে সিরিয়াস ছিলেন। বলা যায়, তিনি আমাকে  পড়াশোনা করাবেন এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন। সত্যি বলতে কী, স্যারের এ দৃঢ়তাই আমাকে ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ করে দেয়। 

খাতার অভাবে অনেক দিন আমি স্কুল থেকে দেয়া বাড়ির কাজ যেমন অঙ্ক, হাতের লেখা নিয়ে আসতে পারতাম না। এটা জানতে পেরে জাসরত স্যার আমাকে বাজার থেকে কাগজ বা খাতা কিনে দিতেন। আজকাল ক’জন শিক্ষক এমন করেন? তবে কেউই করেন না, এমনটা নিশ্চয়ই নয়।

ড. মুহাম্মাদ জাফরুল্লাহর বাবা ছিলেন নিম্নবিত্ত পরিবারের লোক। কোনওরকমে সংসার চলতো। ছেলে স্কুল-কলেজে পড়ুক তা চাইতেন না। আর্থিক সামর্থ্যও ছিল না। কেবল চাচা এবং শিক্ষক জাসরত স্যারের অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও প্রবল ইচ্ছাতেই তাঁর এতোদূর পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আমার খুবই ভালো লাগে জাফরুল্লাহ যখন তাঁর মাস্টার কাকুর অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। আর উপকারীর উপকারের কথা মনে রাখা মহৎ মানুষের বৈশিষ্ট্য। আমি এজন্য জাফরুল্লাহকে ধন্যবাদ দেই। ভালোবাসি। 

জাসরত স্যার মল্লিকপুর প্রাইমারি স্কুল এবং পরে জাবরহাট প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরগ্রহণ করেন।

জাসরত স্যার সম্পর্কে আরেকটা গোপনকথা না বললেই নয়। কী সেটা? আমার একটা ছোট বইয়ে খুব সংক্ষেপে তা উল্লেখ করেছি। অনেকেরই তা হয়তো মনে নেই। তাই আবারও বলছি। এই জাসরত স্যারই সর্বপ্রথম আমাকে পবিত্র কালেমা তথা ইসলামের দাওয়াত দেন। যার অনিবার্য ফল এক অন্ধকার গুহা থেকে আলোর সড়কে আমার পদচারণা। এজন্য জাসরত স্যার সহকর্মী মণিলাল স্যারসহ অনেকের কাছেই বিরাগভাজন হন। তাঁকে অনেক অপ্রিয় কথাও শুনতে হয়। তবে আমার জীবনে এটা মরহুমের অসামান্য ও তাৎপর্যময় অবদান বলে আমি আজও মনে করি। আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই এর পুরস্কার মরহুমকে দেবেন ইন শা আল্লাহ।

বছরখানেক আগে ঢাকায় ছেলে মোতাহারের বাসায় এসেই আমার খোঁজ নেন। আমি দ্রুত গিয়ে প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করে আসি। দেখলাম স্যার চোখে প্রায় দেখতেই পান না। আমার কণ্ঠ পেয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। মাথায় হাত রেখে দু’আ করলেন প্রাণভরে। রেটিনা নষ্ট হয়ে যাওয়া চোখ দিয়েও ঝরঝর করে অশ্রু ঝরলো অনেকক্ষণ। এরপর আর দেখা হয়নি স্যারের সঙ্গে। ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার বড়বাড়ি গ্রামের নিজবাড়িতে স্যার তাঁর রবের ডাকে সাড়া দিলেন সেরাতে হঠাৎই। আমি স্যারের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। আল্লাহ তোমার এই বান্দাকে তুমি ক্ষমা করে দিও। আমিন!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ