বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ভুল ভাবনায় যতি টানো এবার

মানুষ উপাসনা করে, তৈরি করে উপাসনালয়ও। স্রষ্টাকে কেন্দ্র করেই তো উপাসনালয়। তবে সেই উপাসনালয়ে স্রষ্টার বিধান কতটা চলে আর কতটা চলে মানুষের বিধান- তা এক বিচার্য বিষয় বটে। মাঝে মাঝে গণমাধ্যমে এমন সব সংবাদ মুদ্রিত হয় তখন ওই বিষয়টা বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বেশ কিছু দিন আগে দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন শবরীমালা মন্দিরে প্রবেশ করে ইতিহাস গড়েছিলেন দুই নারী। সেই বহুল আলোচিত দুই নারীর একজনকে বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছে না পরিবার। কনক দুর্গা নামে ৩৯ বছরের ওই নারী জানুয়ারি মাসের গোড়ায় শবরীমালা মন্দিরে প্রবেশের পর আত্মগোপন থেকে যখন বাড়ি ফেরেন, তখন তার শাশুড়ি তাকে লাঠিপেটা করে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর আহত কনক দুর্গা হাসপাতালে ভর্তি হন।
বিবিসি পরিবেশিত খবরে বলা হয়, ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের শবরীমালা মন্দিরে প্রবেশ করতে না দেওয়ার যে শতাব্দীপ্রাচীন প্রথা রয়েছে, সেই প্রথা বাড়ির বউ হয়ে কেন ভেঙেছেন- এটাই ছিল কনক দুর্গার অপরাধ। হাসপাতাল থেকে তিনি বাড়ি ফিরে দেখেন স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির কেউ সেখানে নেই। বাড়ি তালাবদ্ধ। সমাজকর্মী থাঙ্কাচান ভিথায়াতিল বিবিসিকে জানান, কনক দুর্গা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে দেখেন সেখানে কেউ নেই। পুলিশও তার সঙ্গে গিয়েছিলেন। বাড়িতে ঢুকতে পারছেন না দেখে পুলিশই নারীদের জন্য তৈরি আশ্রয় শিবিরে তাকে নিয়ে যান। পরে থানায় গিয়ে কনক দুর্গা জানতে পারেন শ্বশুরবাড়ির  লোকেরা চান না তিনি বাড়িতে ফেরেন। এরপর কনক দুর্গার স্বামী কিষাণ উন্নিকে থানায় ডাকা হয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।
মালাপ্পুরাম জেলার পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট প্রতীশ কুমার জানান, কনক দুর্গার স্বামী থানায় এসেছিলেন কিন্তু কনক দুর্গাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে রাজি হননি। পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, বিষয়টি এখন পারিবারিক সহিসংতার পর্যায়ে গিয়েছে। কনক দুর্গা থানায় অভিযোগও দায়ের করেছেন। এখন বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াবে। ভাবতে অবাক লাগে, মন্দিরে প্রবেশের কারণে শাশুড়ি বউয়ের মাথা ফাটালেন, আর স্বামী তাকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে নারাজ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নারী মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবে না এমন কোন ধর্মীয়  বিধান আছে কী? অন্যান্য মন্দিরে তো নারীরা প্রবেশ করছেন এটি নারীদের ধর্মীয় অধিকার। বলা হচ্ছে, ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীরা শবরীমালা মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবে না, এটি একটি প্রথা। এখন বিবেচনার বিষয় হলো, এই প্রথা কতটা ধর্মসম্মত, কতটা ন্যায়সঙ্গত? বিষয়টি এখন আদালতে যাবে। আদালতে কনক দুর্গা ন্যায়বিচার পাবে বলে আমরা আশা করি।
বর্তমান সভ্যতায় ন্যায় কম, অন্যায় বেশি; সাথে যুক্ত হয়েছে ষড়যন্ত্র। ২৪ জানুয়ারি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম ‘নিউইয়র্কে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’। এমন খবর আমাদের ভাবনার মাত্রা বাড়ায়। প্রশ্ন জাগে, মানুষের বিরুদ্ধে মানুষ ষড়যন্ত্র করবে কেন? মানুষ কি মানবজাতির অংশ নয়? ষড়যন্ত্রে তো মানুষের অকল্যাণ হয়। মানুষ মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণ করবে কেন? এমন চেতনা বা দর্শন মানুষ কোত্থেকে অর্জন করলো? এর দায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা বা সভ্যতার ঘাড়ে কতটা বর্তায়? এমন প্রশ্নের জবাব কে দেবে? জবাব দেয়ার মতো সৎসাহস সভ্যতার কর্ণধারদের আছে কী? তেমন কোন দায়িত্ব তারা অনুভব করেন কী?
বিবিসি পরিবেশিত খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে একটি মুসলিম কমিউনিটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে এক কিশোরসহ চারজন গ্রেফতার হয়েছেন। একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে হাতবোমা ও অস্ত্রশস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে। বলা হচ্ছে, গ্রেফতার হওয়া চারজন ইসলামবার্গ কমিউনিটির উপর হামলার ষড়যন্ত্র করছিলেন। এই কমিউনিটিটি আশির দশকে একজন পাকিস্তানী ধর্মীয় নেতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন অ্যান্ড্রিউ ক্রিসেল (১৮), ভিনসেন্ট ভেট্টোমাইল (১৯) এবং ২০ বছর বয়সী ব্রায়ান কর্লানেরি। এছাড়া ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরও এ ঘটনায় অভিযুক্ত হয়েছে। তারা নিউইয়র্কের গ্রিস শহরে থাকেন। এই শহরের পুলিশ প্রধান প্যাট্রিক ফেলান জানান, ১৬ বছর বয়সী ওই কিশোর স্কুলে এ বিষয়ে কথা বলার সময় অন্যরা শুনে ফেলেন এবং তার ভিত্তিতেই পরে তদন্ত শুরু হয়। তদন্তকারীরা বলছেন, আটক কিশোরের বাড়িতে বিস্ফোরক দ্রব্য পাওয়া গেছে এবং আরো অন্তত ২৩টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বিভিন্ন জায়গা থেকে। ইসলামবার্গ কমিউনিটি সিংহ্যামটন শহরের কাছে ক্যাটস্কিল পর্বতের পশ্চিমে বসবাস করে। মূলত আফ্রিকান-আমেরিকান একটি গ্রুপ নিউইয়র্ক থেকে সরে গিয়ে সেখানে বসতি গড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা এই কমিউনিটিকে শান্তিকামী ও বন্ধুভাবাপন্ন বলে বিবেচনা করেন।
প্রশ্ন জাগে, এমন শান্তিকামী একটি কমিউনিটির ওপর হামলার ষড়যন্ত্র কেন হলো? অভিযুক্ত যে ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের বয়সই বা কত? ১৬ থেকে ২০ বছর। এই বয়সের কিশোরদেরতো কোন কমিউনিটির শান্তিপ্রিয় মানুষদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর কথা নয়। তাহলে তাদের হিংসাত্মক ওই কাজে উদ্বুদ্ধ করলো কারা? ওদের মধ্যে ভুল চিন্তার বীজ বপিত হলো কেমন করে? এসব বিষয়ে তদন্ত ও গবেষণা করা আমাদের কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি উপলব্ধি করলে মঙ্গল।
শান্তি মানুষের কাম্য, কিন্তু মানুষ শান্তির পথে হাঁটছে কই? আসলে সাধারণ মানুষকে নয়, অশান্তির জন্য দায়ী করতে হয় বড় মানুষদেরই। অশান্তি প্রাচীনকালেও ছিল, তখনো যুদ্ধ হতো। তবে তখন যুদ্ধে ব্যবহার হতো তরবারি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল সীমিত। তবে সেই প্রাচীনকালেও তরবারিকে পরাস্ত করতে ব্যবহার হতো বর্শা। আবার বর্শাকে পরাস্ত করতে আবিষ্কৃত হলো গুলতি জাতীয় অস্ত্রের- যা দূর থেকে নিক্ষেপ করা যায়। আধুনিক যুগের সমরবিদরা নিজেদের অস্ত্র প্রতিযোগিতার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে এভাবে তুলে আনছেন প্রাচীন যুগের অস্ত্র-বিবর্তনের কথা। তাঁরা আরো বলছেন, নিজে আক্রান্ত না হয়ে শত্রুর ওপর হামলার কথাই ভাবা হয় যুদ্ধের সময়। এভাবেই আমরা পৌঁছে গেছি মহাকামানের যুগে। গোলন্দাজ বাহিনীর গুরুত্বও তাই এখন বেড়ে গেছে বহুগুণে।
আগেও মানুষকে মানুষ শত্রু ভাবতো, এখনও ভাবে। তাহলে আমরা সভ্য হলাম কেমন করে? তাই বলতে হয়, আধুনিক হলেও আমরা এখনো সভ্য হতে পারিনি। তবে আধুনিক হওয়াটাও কম কিসের? তরবারি ও বর্শার যুগে তো মানুষে-মানুষে যুদ্ধ হলে মারা যেত শত বা সহস্রজন। আর এখন তো এক বোতাম টিপলেই মারা যাবে লাখো-কোটি মানুষ। আর মহাজনদের ভ্রষ্ট মাথা বিগড়ে গেলেতো স্বল্প সময়েই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে পুরো পৃথিবী। পারমাণবিক যুগ বলে কথা। এ যুগে তো পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা থামার কোনো লক্ষণ নেই।
দূরপাল্লার কামান বা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কথা এখন প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। মানুষকে শত্রুজ্ঞানে খতম করার কী প্রবল ইচ্ছা আমাদের এই সভ্যতায়। চীন, রাশিয়া, আমেরিকা - কেউ পিছিয়ে নেই এই প্রতিযোগিতায়। মার্কিন সেনাবাহিনী এখন ১০০০ মাইল পাল্লার মহাকামান তৈরির কাজ করছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সঙ্গে চলমান টানাপড়েন যুদ্ধে রূপ নিলে, চীনা যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিতে এমন মহাকামান ব্যবহার করা সম্ভব হবে বলে মার্কিন সমরবিদরা মনে করছেন।
মার্কিন সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে এক গোলটেবিল বৈঠকে সম্প্রতি এমন তথ্য দিয়েছেন দেশটির সামরিক মন্ত্রী মার্ক অস্পার। ধারণা করা যায়, এই প্রতিযোগিতায় অন্য দানবরাও পিছিয়ে থাকতে চাইবে না। গণমাধ্যমে আবার প্রকাশিত হবে অস্ত্র প্রতিযোগিতার নতুন খবর। অদ্ভুত এক সভ্যতায় এখন আমাদের বসবাস। গুটিকয় দেশের হাতে এখন পৃথিবীর প্রায় সব সম্পদ ও মারণাস্ত্র। অভাব-অনটনে, অশিক্ষা ও কুসংস্কারে বাকি বিশ্ব ধুঁকছে। অথচ ওদের দিকে হাত বাড়াবার কোনো গরজ নেই সভ্যতার চ্যাম্পিয়নদের। অস্ত্র প্রতিযোগিতার এই মরণখেলায় যারা এখন উন্মাদ, তাদের হাতে আমাদের এই পৃথিবীটা আসলে কতটা নিরাপদ?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ