রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

শেকড়ের সন্ধানে : ইংরেজি মাস ও দিনগুলি

মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল:

যদি আমাদের জিজ্ঞেস করা হয়, ইংরেজি বারো মাসের নাম কি কি? তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আমরা বলতে শুরু করবো জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ.............। তেমনি দিনগুলির কথা বলা হলে বলবো, সানডে, মানডে, ইত্যাদি। এতো জানা কথা। সবাই তা জানে। কিন্তু নামগুলি কোত্থেকে এলো সে কথা হয়তো আমরা অনেকেই জানিনা।

সে এক মজার ইতিহাস। প্রথমে ইংরেজি দিনগুলির কথাই ধরা যাক। কিন্তু তার আগে “টিউটনদের” সম্বন্ধে আমাদের কিছু জানা দরকার। কেননা, সপ্তাহের সাতটি দিনের ভেতর চারটি দিনের নামকরণ টিউটনরাই করেছিল।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, রোমান সাম্রাজ্যের উত্তর প্রান্তে বহু যুগ ধরে শক্তিমান একদল লোক বাস করতো। তারা লেখাপড়া কিছুই জানতো না। তবে যুদ্ধ করতে তারা ভালোবাসতো। অর্থাৎ অর্ধ সভ্য ছিল এই সব লোকেরা। টিউটনদের গায়ের রঙ ছিল সাদা। ইংরেজি, ফরাসী, জার্মান ও আমেরিকানদের অনেকেরেই পূর্ব পুরুষ ছিল এই টিউটনরা।

গ্রীক বা রোমানদের মতো টিউটনরাও দেব-দেবতায় বিশ্বাসী ছিল। তবে তাদের দেব-দেবীরা ছিল ভিন্ন ধরণের। গ্রীক, রোমানদের দেব-দেবীর সঙ্গে তাদের কোন মিল ছিল না। টিউটনের শ্রেষ্ঠ দেবতার নাম “উডেন”। উডেন হলো যুদ্ধের এবং আকাশের দেবতা। টিউটনরা মনে করতো উডেন আকাশের “ভাল হাল্লা” নামের এক আজব প্রাসাদে বাস করতো। এই দেবতার নামানুসারেই উডনেস-ডে বা বুধবার নামকরণ হয়েছে। টিউটনদের পরবর্তী শ্রেষ্ঠ দেবতা ছিল “থর”। থর ছিল মেঘ-গর্জন ও বিদ্যুতের দেবতা। হাতে একটা হাতুড়ী নিয়ে থর দূর-দূরান্তে অবস্থিত ঠান্ডা দেশের দানব-দৈত্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করতো। তার নামানুসারেই হয়েছে “থারস-ডে” বা বৃহস্পতিবার।

টিউটনদের দু’জন দেবতার একজনের নাম ছিল “টিউ” আর একজনের নাম ছিল “ফেরা”। তাদের নামনুসারে টুইস ডে বা মঙ্গলবার এবং ফ্রাই-ডে বা শুক্রবার হয়েছে। বাকী তিনদিন সান-ডে বা রোববার, মান- ডে বা সোমবার হয়েছে সূর্য ও চন্দ্রের নামানুসারে। গ্রীকদের কৃষি ও সভ্যতার দেবতা “স্যাটান” এর নামানুসারে স্যাটার-ডে বা শনিবারের নামকরণ হয়েছে।

এবার ইংরেজি মাসগুলির নাম কি করে হলে সে কথাই বলছিÑ

প্রথমে আসছে জানুয়ারি মাসের কথা। রোমানদের বহু দেব-দেবী ছিল। তোরণ ও দরজার জন্য ছিল দুই মুখ বিশিষ্ট এক দেবতা নাম তার “জানুস”। আমরা জানি কোন জায়গায় প্রবেশ করতে হলে প্রথমে তোরণ বা দরজা অতিক্রম করতে হয়। সেই জন্য জানুসকে আরম্ভের দেবতাও বলা হতো।

মাসগুলির ভেতর জানুয়ারি প্রথম থাকায় দেবতা জানুস এর নামানুসারে নামকরণ করা হয়।

মাসের পনের তারিখে রোমানরা পবিত্র ও শুদ্ধির জন্য ভোজের আয়োজন করতো। ল্যাটিন ভাষায় এটাকে বলা হয় “ফেব্রুয়া” সেই থেকে পরবর্তী মাসকে তারা ফেব্রুয়ারী নামে অভিহিত করতো।

মার্চ মাসের নাম এসেছে রোমানদের দেবতা “মারস্” এর নাম হতে। মারস্ ছিলেন যুদ্ধ ও কৃষির দেবতা। এ্যাফ্রোডাইট ছিলেন প্রেমের দেবী। গ্রীকরা সংক্ষেপে তাঁকে “এ্যাফ্রো” নামে ডাকতো। এপ্রিল মাসের নাম হয়েছে এ্যাফ্রো দেবীর নামানুসারে।

রোমানদের দেবী “মে” ও “জুনো”র নামানুসারে ইংরেজি মে ও জুন মাসের নাম হয়েছে। জুনো ছিল স্বর্গের দেবী। তাছাড়া মেয়েদের অভিভাবিকা ও বিয়ের দেবীও ছিলেন জুনো।

রোমের বীর সেনাপতি সীজারের নামেই ইংরেজি জুলাই মাসের নামকরণ করা হয়েছে। সীজারের পুরো নাম ছিল জুলিয়াস সীজার। তার নামের প্রথম শব্দ জুলিয়াস থেকে জুলাই কথাটি গ্রহণ করা হয়েছে,

অগাষ্টাস সীজার ছিলেন সীজারের পোষ্য পুত্র। তার আসল নাম ছিল অক্টভিয়াস্। বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়ে তিনি এই উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। রোমকদের কাছে সুশাসনের জন্যে তিনি দেবতা রূপে পুঁজিত হতেন। তার নামেই অগাষ্ট মাসের নামকরণ করা হয়েছে।

“সেপ্টেম” “অক্টো” “নভেম্” ও “ডিসেম্” প্রভৃতি ল্যাটিন শব্দগুলি থেকে বছরের বাকী চারটি মাস যথাক্রমে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের নামকরণ করা হয়েছে।

ল্যাটিন ভাষায় সেপ্টেম্ শব্দের অর্থ সাত, অক্টো অর্থ আট, নভেম্ ও ডিসেম অর্থ যথাক্রমে নয় ও দশ। সুতরাং রোমানদের কাছে এই মাসগুলি ছিল যথাক্রমে সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম মাস। কিন্তু ইংরেজরা এই নিয়ম পাল্টে দিয়েছে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাস আজ আর সপ্তম, অষ্টম, নবম, দশম মাস নয় বরং নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ মাস। এভাবেই ইংরেজি মাসের নামকরণ হয়েছে।

 

লেখক : সাহিত্যিক, কলামিষ্ট, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ