সোমবার ০৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ইসলামী ঐক্য : সময়ের অপরিহার্য দাবি

ড. মো. নূরুল আমিন :

॥ শেষ কিস্তি ॥

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক ঐক্যের পাশাপাশি আদর্শিক ঐক্য প্রতিষ্ঠাকেও বিশ্লেষকরা অপরিহার্য বলে মনে করছেন। এই আদর্শিক ঐক্যে ইসলামী দল এবং আলেম সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলোর অবস্থা পর্যালোচনা করলে আলেমদের ঐক্যের বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। বলাবাহুল্য, এক সময় এই দেশের আলেমদের একটা বৃহৎ অংশ রাজনীতিকে হারাম বলে মনে করতেন। সত্তরের দশক পর্যন্ত এই অবস্থা ছিল। কিন্তু পরে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং মরহুম হাফেজজী হুজুরের মত জাঁদরেল আলেমও রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাকে অনুসরণ করেন শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক, ফজলুল হক আমিনী প্রমুখ।

১৯৮১ সালের ২৯ নবেম্বর হাফেজজী হুজুরের নেতৃত্বে খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয়। মাওলানা ফজলুল হক আমিনী, আল্লামা আজিজুল হক, মাওলানা বোরহান উদ্দিন, মাওলানা ফজলুল করিম চরমোনাই প্রমুখ এই আন্দোলনে ছিলেন। ১৯৮৭ সালের ৩ মার্চ চরমোনাইর পীর মাওলানা ফজলুল করিম ও আরো ৫ জন আলেম একটি শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান করেন এবং ওই দিনই ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন গঠন করেন। ২০০৫ সালের জুলাই মাসে খেলাফত আন্দোলন দুই ভাগ হয়ে যায়, একভাগের নেতৃত্ব দেন মাওলানা শাহ আহমদ উল্লাহ আশ্রাফ আরেক ভাগের নেতৃত্ব দেন মাওলানা মমিনুল্লাহ। বলা বাহুল্য, এর আগে ১৯৮৯ সালের ৮ ডিসেম্বর খেলাফত আন্দোলনের অংশ বিশেষ এবং যুব শিবিরের অংশ বিশেষ নিয়ে খেলাফত মজলিস গঠিত হয়। ২০০৫ সালের ২২ মে আবার শায়খুল হাদিস ও মাওলানা ইসহাকের নেতৃত্বে দুই ভাগ হয়ে যায়। উপরোক্ত দলগুলোর অস্তিত্ব এখনো আছে। ১৯৮৯ সালের অক্টোবর মাসে জাকের পার্টি গঠিত হয়। ১৯৯০ সালের ১০ মার্চ বাংলাদেশ মুসলিম পার্টি নামে একটি দল গঠিত হয়। ১৯৯৩ সালের নবেম্বর মুসলিম মিল্লাত পার্টি নামে আরেকটি দল গঠিত হয়। ১৯৯২ সালে মাওলানা শামছুল হক ও মাওলানা তৈয়বের নেতৃত্বে উলেমা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে উলেমা কমিটি গঠন করা হয়। এর অব্যবহিত পরেই মাওলানা মহিউদ্দিন খান ও মাওলানা ফজলুল হক আমিনী ইসলামী মোর্চা নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। ফটিকছটির মাইজভান্ডার কেন্দ্রিক আরেকটি ইসলামী দলও আছে। তার নাম তরিকত ফেডারেশন।

১৯৯৫ সালের ১৫ জানুয়ারি মাওলানা আতাউর রহমান আরেফী ও মাওলানা মাহমুদুল হাসান শরিয়তপুরীর নেতৃত্বে ইত্তেহাদ মুসলিম উম্মাহ নামে একটি দল গঠিত হয়। ১৯৯৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইসলামী সংগ্রাম পরিষদ নামে আরেকটি সংস্থা গঠন করা হয়। ২০০৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ইসলামী ঐক্যজোট নামে একটি দল জন্ম নেয়।

১৯৯৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আল্লাহর দল নামে একটি পার্টি গঠন করা হয়। ২০০০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম নেয় জমিয়তে উলেমা মঞ্চ। ২০০১ সালের জানুয়ারিতে জাগ্রত জনতা, আগস্ট মাসে ইসলামী হুকুমত আন্দোলন এবং প্রায় একই সময়ে তাহফিজে হারামাইন পরিষদ গঠিত হয়। ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে ইসলামিক ফোরাম এবং একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক মহিউদ্দিনের উদ্যোগে হিজবুত তাহরির নামে একটি দল গঠিত হয়। এই দলগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি এখনো সক্রিয় আছে, তবে অনেকগুলোরই অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুস্কিল। এই দলগুলোর একটির সাথে আরেকটির  সম্পর্ক কোন কোন ক্ষেত্রে ওহি-নকুলের, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে খুবই শীতল। এক দল আরেক দলকে চেনে না। এমন অবস্থাও প্রচুর। আবার ১৯৪১ সাল থেকে সক্রিয় দেশের বৃহত্তম আন্দোলন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাথে সিংহভাগ দলেরই কোনও সম্পর্ক নেই। তারা একে অপরের ইসলামী দাওয়াহ ও তরবিয়াহ তৎপরতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে। কোন কোন ক্ষেত্রে একদল অন্য দলকে গোমরাহ বলে মনে করে। অথচ ইসলামী দল হিসেবে তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতার মনোভাব থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা, শিরকের উৎখাত, দেশী-বিদেশী ইসলাম বিরোধী শক্তির মোকাবিলায় তাদের মধ্যে ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের অভাব থাকলে লক্ষ্যে পৌঁছা কখনো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। পরিবেশকে ইসলামের অনুকূলে নিতে হলে সমাজ-রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। গণতন্ত্র ছাড়া সমাজ, রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন করা যায় না। মানুষের চরিত্রকে ইসলামী অনুশাসনের ভিত্তিতে ঢালাই করতে হলে যুগের চাহিদা অনুযায়ী দাওয়াহ ও তরবিয়াহর প্রয়োজন। এটি একটি বিশাল কাজ। এককভাবে কোনও দলের পক্ষে এই কাজ সম্পাদন সম্ভব নয়। আবার এই কাজ করতে গেলে যে ঝুঁকি তা মোকাবিলা করাও কঠিন। আদর্শিক ঐক্য থাকলে কোন শক্তিই এদের গায়ে হাত দিতে যেমন সাহস করবে না তেমনি তাদের পক্ষেও বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছা সহজতর হয়। মুসলিম উম্মাহকে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হয়। ইতিহাস থেকে যারা শিক্ষা নেয় না তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হয়। ইসলাম একটি বিজয়ী জীবনাদর্শ বিজিত নয়। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের ওলামায়ে কেরামদের ঐক্য অপরিহার্য। তাদের মধ্যে ঐক্য থাকলে সাধারণ মানুষ তথা সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে স্বাভাবিকভাব ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

কেউ কেউ বলে থাকেন যে হিমালয়ের চূড়ায় আরোহণ সহজ কিন্তু আমাদের দেশের আলেমদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা সহজ নয়। কথাটা হয়তো সত্য হয়তো সত্য নয়। বৃটিশ আমল থেকেই আলেমদের বিভক্ত রেখে আমাদের উপর ছড়ি ঘুরানোর অপচেষ্টা চলে আসছে। আমাদের মধ্যে দেওবন্দি-নন দেওবন্দি, কওমী-নন কওমী এবং আলিয়া-নন আলিয়া বিভেদ বিভক্তি কোন কোন ক্ষেত্রে চরম অবস্থায় পৌঁছেছে। আবার ওহাবী-ননওহাবী ভাবধারাও কারুর কারুর মাঝে প্রবল অহংরোধ এখানে প্রকট। শোনা কথায় বিশ্বাস করে, খানা তল্লাশি ছাড়াই ছহিহ  ছিলছিলার অনেক আলেম বুজুর্গের চরিত্র হননে আমরা দ্বিধা করি না।

আগেই বলেছি, ইখতিলাফ সব সময় ছিল, থাকবে। ঐক্যের পথে এটি বাধা হতে পারে না। আমরা আমাদের সামনে যে হুমকিগুলো (threats) আছে (১)  সেগুলো যদি উপলব্ধি করি এবং সেগুলো দূর করে এগিয়ে যেতে চাই তাহলে ঐক্য কঠিন কিছু নয়। এই দেশ থেকে ইসলামকে মিটিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আলেম-উলামাদের উপর নির্যাতন চলছে। মাদরাসা শিক্ষাকে এমনভাবে ছাঁটাই করা হয়েছে যে মাদরাসার সংখ্যা বাড়বে, ছাত্র বাড়বে কিন্তু আলেম সৃষ্টি হবে না। বরেণ্য আলেমদের উপর জেলজুলুম ফাঁসির দ- প্রভৃতির ন্যায় অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে যে বেইজ্জতি করা হচ্ছে তার নজির দুনিয়ায় নেই। ইসলামের অনুসরণ ও অনুশাসনের অনুশীলন, টুপি পরা ও দাড়ি রাখা অপরাধ হিসাবে গণ্য হওয়া শুরু হয়েছে। ইসলামী তাহজিব তমদ্দুন ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। মেয়েদের হিজাব পরা অপরাধে পরিণত হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। ব্যভিচারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এগুলো আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। এই হুমকির মোকাবেলা এবং বিজয়ী শক্তি হিসাবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠার জন্য আলেমদের ঐক্যের বিকল্প নেই।

ভারতে দেওবন্দি-নন দেওবন্দি দ্বন্দ্ব আলেমদের ঐক্যে বিরাট বাধা ছিল। বাবরি মসজিদ সংকট তাদের সামনে যে হুমকি সৃষ্টি করেছিল তা তাদের ঐক্যের পথ প্রশস্ত করে দেয়। এখন সেখানে আলেমরা অনেক অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। পাকিস্তানের আলেমরাও আগের তুলনায় ঐক্যের পথে অনেক বেশি এগিয়ে গেছেন। আমরা বাধাগুলো দূর করতে পারিনি। দুঃখের বিষয় বহু প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী সংগঠন তাবলীগ জামাতও আমাদের হাতে সম্প্রতি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। 

আদর্শিক ঐক্য ছাড়া শুধু রাজনৈতিক ঐক্য কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে না। আদর্শিক ঐক্যের ভিত্তি আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস এবং তার রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ।

আলেম সমাজের ঐক্য বিষয়ে উপমহাদেশের দেশগুলো ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং তুরস্কের অবস্থা অধ্যয়ন করার আমি সুযোগ পেয়েছি। এই উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর শীর্ষস্থানীয় বেশ কিছু আলেমের মতামত আমি সংগ্রহ করেছি। এর মধ্যে ঐক্যের জন্য তুরস্কের আলেমরা ভিত্তি হিসাবে যে মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন সেগুলোই আমার কাছে খুব যৌক্তিক বলে মনে হয়েছে। মূলনীতিগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ:

১। তৌহিদের দৃষ্টিকোন থেকেই সব কিছু দেখতে হবে।

২। সর্বাবস্থায় হকের পাশে থাকতে হবে শক্তির পাশে নয়।

৩। সুন্নাহকে প্রাধান্য দিতে হবে। সুন্নাহ না জানলে কুরআন শেখা যাবে না।

৪। চিন্তা ও কাজে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে হবে।

৫। বিদাত থেকে দূরে থাকতে হবে। দ্বীনের পরিপন্থী কোন কিছুই গ্রহণ করা যাবে না।

৬। কোনও মুসলমানকে কাফের বলা যাবে না। এজন্য সুস্পষ্ট  দলিল থাকতে হবে। 

৭। মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য চেষ্টা করতে হবে।

৮। সাহাবায়ে কেরাম আমাদের পথ প্রদর্শক তাদের বিরুদ্ধে কটূ কথা বলা যাবে না।

৯। সজাগ ও অনুভুতিসম্পন্ন একজন মুসলমানের সামনে ৫টি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে :

ক) শয়তান

খ) নফস

গ) কাফির, মুশরিক

ঘ) মুনাফেক, (বিশ্বাস ও আকিদায়)

ঙ) জালেম

এই ৫ জনের বাইরে কারুর সাথে মুসলমানদের দুশমনি নেই।

১০। গুনাহগার হলেও মুসলমানদের ঘৃণা করা যাবে না, তারপ্রতি দরদ নিয়ে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।

১১। ইসলামের চেয়ে আর কোন কিছুকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা যাবে না।

১২। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেই থাকি না কেন সব সময় ইসলামী ঐক্যের জন্য কাজ করবো।

 

উপরোক্ত ১২টি ভিত্তি বা মূলনীতিকে সামনে রেখে আলেম সমাজ এবং আমাদের ইসলামী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন বলে আমি মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ