বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

আওয়ামী লীগ পারে, সাবাস!

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী :

আওয়ামী লীগ শুধু পারে, সাবাস। আর বিএনপি কিছুই পারে না, দুয়ো। এ কথা মানতেই হবে যে, আওয়ামী লীগ যা পারে পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম দেশই তা পেরেছে। গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনই শুধু নয়, তার আগেও সরকারি দলে থাকতে ও বিরোধী দলে থাকতে আওয়ামী লীগ অনেক কিছু পেরেছে আর এখনও শুধু পেরেই যাচ্ছে। এ কথা বলা হয় যে, দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল প্রেরণা ছিল গণতন্ত্র। পাকিস্তানী শাসকেরা গণতন্ত্র হরণ করেছিল বলেই গণতন্ত্রের পথে আত্মনিয়ন্ত্রের অধিকারের জন্য এদেশের মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল স্বাধীনতার জন্য। সে স্বাধীনতা যুদ্ধ আওয়ামী লীগ একা করেনি। সে যুদ্ধ করেছিল ছাত্র শ্রমিক কৃষক বুদ্ধিজীবিসহ এদেশের সর্বস্তরের মানুষ। কিন্তু সে যুদ্ধের বিজয়ের ভাগীদার যাতে সেই সাধারণ মানুষেরা না হতে পারে, তার জন্য তারা গঠন করেছিল বাংলাদেশে লিবারেলন ফোর্স (বিএলএফ) বা মুজিব বাহিনী। এই মুজিব বাহিনীতে বেছে বেছে নেয়া হয়েছিল ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীদের। যাতে অন্য কেউ এই বাহিনীতে ঢুকে যেতে না পারে, তার জন্য আওয়ামী লীগ নানা ধরনের চেকপোস্ট বসিয়েছিল। ভারতীয় জেনারেলের তত্ত্বাবধানে গঠিত এই বাহিনীর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না তাজউদ্দিন আহমদের প্রবাসী সরকারের। এর লক্ষ্য ছিল, সাধারণ মানুষের যে মুক্তিবাহিনী, তারা যেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ক্ষমতা গ্রহণ করতে না পারে। সে জায়গায় ক্ষমতায় বসানো হবে ঐ মুজিব বাহিনীকে। কারণ, তৎকালের ইন্দিরা গান্ধী সরকার ধরেই নিয়েছিল যে, পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে জীবিত ছাড়বে না। সে ক্ষেত্রে ভারত অনুগতরাই যেন বাংলাদেশের ক্ষমতায় বসতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাজউদ্দিন আহমদ ও কর্নেল ওসমানীর দৃঢ়তায় ভারতের যে অভিলাষ বাস্তবায়িত হয়নি। আওয়ামী লীগের একাংশ ও ভারত সরকারের যে চক্রান্ত ব্যর্থ হয়ে যায়। ব্যর্থ হয়ে কি যায়? সেটি বোধকরি নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ, স্বাধীনতার পরপরই বামদের উত্থান, গণবাহিনী গঠন ও শেখ মুজিবুর রহমানের বিয়োগান্ত পরিণতি একই সূত্রে গাঁথা ছিল। এই প্রক্রিয়ায় যারা যুক্ত ছিল, শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে সামরিক কায়দায় উৎখাতের জন্য যারা গণবাহিনী গঠন করেছিল, শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর যারা উল্লাস করেছিল বেতার কেন্দ্রে ও ট্যাংকে, তাদের আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভায় টাঁই দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আওয়ামী লীগ পারে, সাবাস।

আবার ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনকালে তারা আবারও দেখিয়ে দিয়েছিল যে, তারা পারে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারির আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতারা গণতন্ত্রের জন্য দিনরাত মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন। একদিকে গণতন্ত্রের লালিত বাণী, অপরদিকে ভিন্নমত দলনে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আইন তাদের গণতন্ত্রের জজবাকে ভ্রুকুটি করেছে। রক্ষী বাহিনী গঠন করে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের নির্বিচারে হত্যা ও দলন করা হয়েছে। যাদের বয়স এখন ষাটের কোঠায় তারা নিশ্চয়ই সেসব নির্যাতনের লোমহর্ষক ঘটনা ভুলে যাননি। সে সময়ও আওয়ামী লীগ বার বার সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলেছে। কিন্তু সংবাদপত্র দলনে, ভিন্নমত প্রকাশের পথ রুদ্ধ করতে তারা করেছেন নতুন নতুন আইন। করেছেন বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪, করেছেন প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট, করেছেন নিউজ প্রিন্ট নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ। এ সবরের মাধ্যমে তারা সে সময় মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল। কারাগারে পুরেছিল সাপ্তাহিক হলিডে সম্পাদক এনায়েতউল্লাহ খানকে। কারাগারে পুরেছিল গণকণ্ঠ সম্পাদক কবি আল মাহমুদকে। কারাগারে পুরেছিল মুখপাত্র ও স্পোকসম্যান সম্পাদক ফয়জুর রহমানকে। কারাগারে পুরেছিল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন এক্সামিনার সম্পাদককে। কারাগারে পুরেছিল হক-কথা সম্পাক ইহসানুল বারীকে। তারা একের পর এক বন্ধ করে দিয়েছে সংবাদপত্র এবং সর্বশেষ ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন মাত্র চারটি সংবাদপত্র সরকারের নিয়ন্ত্রণে রেখে বাকী সকল সাংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিল। হ্যাঁ, প্রমাণিত হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ পারে।

আওয়ামী লীগ যে পারে, সে কাহিনী এখানেই শেষ নয়। এরপর আওয়ামী লীগের আরও কাহিনী আছে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ঘটেছে সে ঘটনা। সেদিন জাতীয় সংসদের সংক্ষিপ্ততম অধিবেশনে দেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যববস্থা রদ করে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়। আর তার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগসহ দেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আর গঠন করা হয় নতুন একটি মাত্র রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল। সেই অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমানকে এভাবে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয় যে, যেন তিনি রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন।’ এটি আওয়ামী লীগের দীর্ঘকালের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের সম্পূর্ণ বিপরীত। সেই বাকশাল ব্যবস্থা এমন ছিল যে, সকল সামরিক-বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য এই বাকশালের সদস্য হওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। বাকশালের বাইরে ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক চিন্তা, দল সাংগঠন করা বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশে গণতন্ত্র খুন হয়ে গেল। বাংলাদেশের মানুষ খাঁচায় বন্দী জানোয়ারে পরিণত হলো। স্বীকার করতেই হবে যে, আওয়ামী লীগ পারে, সাবাস!

১৯৭৫ সালের ট্রাজেডির পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিল খোন্দকার মুশতাক আহমদের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগই। এরপর ক্ষমতার পট পরিবর্তন ঘটে ১৯৭৫ সালের নবেম্বরে। ৩ নবেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ঘটে সামরিক অভ্যুত্থান। কিন্তু সে অভ্যুত্থান স্থায়ী হয়নি। ৭ নবেম্বর ঘটে সিপাহী জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব। সে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সামনে আসেন জিয়াউর রহমান। রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে পেয়ে জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করেন। আওয়ামী লীগসহ বহু সংখ্যক রাজনৈতিক দল আবার নিজস্ব মত পথ নিয়ে রাজনীতি শুরু করে। বাংলাদেশে সূচনা হয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্তে হত্যা করা হয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে। বাংলাদেশে অনেক কিছুই এলোমেলো হয়ে যায়। ১৯৮১ সালেই সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে আওয়ামী লীগও অংশগ্রহণ করে। সে নির্বাচনে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার বিপুল ভোটে জয়ী হন। কিন্তু চক্রান্তকারীরা থেমে ছিল না। বাংলাদেশ থেকে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে বিলোপের ষড়যন্ত্রে যোগ দেন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেন। গণতান্ত্রিক সরকারকে হঠিয়ে সামরিক সরকারের আগমন সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তখন শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “আই অ্যাম নট আন হ্যাপি।’ আওয়ামী লীগ পারে, সাবাস!

এরশাদের সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর থেকেই তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের দহরম-মহরমের খবর সবাই জানেন। ঐ সরকারকে বৈধতা দেবার জন্য আওয়ামী লীগ এরশাদের পাতানো নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। বিএনপি নেয়নি। আওয়ামী লীগ এরশাদকে সব ধরনের সহযোগিতা করেছে। তাদের সেই সখ্য এখনও বহাল আছে। এরশাদ যেমন এক সময় আওয়ামী লীগকে নিয়ে খেলেছে তখন আওয়ামী লীগ তেমনিভাবে এরশাদকে নিয়ে খেলছে। ২০১৪ সালের একতরফা তথাকথিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এরশাদকে অংশ নিতে বাধ্য করেছে। তারা ছিল আওয়ামী মহাজোটের অংশীদার। এরপর আওয়ামী লীগ ও এরশাদের জাতীয় পার্টি এক আজব কা- করেছে। আ’লীগ জাতীয় পার্টিকে বসিয়েছে বিরোধী দলের আসনে। এরশাদকে বানিয়েছে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। এরশাদের দল থেকে আরও তিনজনকে মন্ত্রী বানিয়েছে। এরশাদের জাতীয় পার্টি তাই ছিল একই সঙ্গে সরকারি ও বিরোধী দলে। এমন কিম্ভুত অবস্থা পৃথিবীর সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এখন এরশাদ বার বার বলছেন যে, তিনি কখনও মুক্ত মানুষ ছিলেন না। এখনও নেই। কোথায় তার এই পরাধীনতা, বুঝতে খুব বেশি অসুবিধা হবার কথা নয়। তবে এবার এক জালিয়াতির নির্বাচন দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। যাতে আওয়ামী লীগের কাছে এরশাদেরও প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আওয়ামী লীগ এরশাদের জাতীয় পার্টির কাউকে কিংবা ইনু-মেননকে আর মন্ত্রী করেনি। তার দরকারও নেই। জাতীয় পার্টি, ইনু-মেনন আশা করে ছিলেন যে, এবারও তারা মন্ত্রী হবেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদের ব্যবহৃত টিস্যু পেপারের মতো ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। তারা এখন শোকে বিহ্বল। জাতীয় পার্টির আপাতত সাধারণ সম্পাদক রাঙ্গা তো ক্ষমতার লোভে বলেই বসেছিলেন যে, এখন আর জনগণ সংসদে বিরোধী দল চায় না। কিন্তু তাতেও চিড়া ভিজেনি। আওয়ামী লীগ এবার তাদের ২২টি আসন দিয়ে দূরে ঠেলেছে। স্বীকার করতেই হবে যে, আওয়ামী লীগ পারে, সাবাস!

সে তুলনায় বিএনপি আসলেই কিছু পারে না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তো তার টানা টানা কণ্ঠে অবিরাম বলে যাচ্ছেন যে, গত দশ 

বছরে বিএনপি দশ মিনিটের জন্যও আন্দোলন করতে পারেনি। তারা ক্ষমতায় যাবে কীভাবে? আওয়ামী লীগ আন্দোলন বলতে বোঝে জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও। হত্যা করো। আরও যা যা বোঝে, তা আমরা মতিউর রহমান রেন্টুর ‘আমার ফাঁসি চাই’ বইয়ে পড়ে ফেলেছি। আওয়ামী লীগ লগি-বৈঠার আন্দোলন করেছে। তাতে আওয়ামী লীগের কর্মীরা রাজপথে তাদের লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে নিরীহ মানুষদের হত্যা করেছে। টিভি চ্যানেলগুলো সে ‘আন্দোলনে’র ছবি লাইভ প্রচার করেছে। আওয়ামী লীগের এক উপজেলা সভাপতি বলেছেন, তাদের এমপি পঙ্কজন দেবনাথ প্রধানমন্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্য বাসে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছে। আওয়ামী লীগ তাও পেরেছে। শুধু বিএনপি তা পারেনি। বিএনপি মানববন্ধন করতে চেয়েছে, সরকারি বাধায় তা পারেনি। বিএনপি জনসভা করতে চেয়েছে, সরকার থেকে তার অনুমতি দেওয়া হয়নি। প্রতিবাদে বিএনপি নগর জ্বালিয়ে দেয়নি। তারা মানুষের মাঝে লিফলেট বিতরণ করে তাদের কথা জানান দিয়েছে। বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিম্ন আদালতের মাধ্যমে সরকার কারাগারে পাঠিয়েছে। বিএনপি সারা দেশ জ্বালিয়ে দেয়নি। বরং বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন, তাকে কারাগারে প্রেরণে যেন কোনো সহিংসতার সৃষ্টি না হয়। এই বিএনপি ক্ষমতায় যাবে? আসলে বিএনপি কিছুই পারে না, দুয়ো..।

তবে আওয়ামী লীগও অনেক কিছু পারে না। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘মহাজালিয়াত, মহাধাপ্পাবাজি ও মহাপ্রহসেনের যে নির্বাচন হয়েছে (৩০ ডিসেম্বর) সে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে কেউ যদি অংশ না নেয়, তাহলে তাদের দোষ না দিয়ে যারা এই নির্বাচন করলোÑ তাদেরকে দোষ দেওয়া উচিত। তাই যেন বিএনপি পারল না বা বিএনপি এখন কী করবে, সেসব আলোচনা না করে উচিত জালিয়াত বা ধাপ্পাবাজদের বিরুদ্ধে কথা বলা। কিন্তু শুধু বিএনপি নয়, বাম দল থেকে শুরু করে গণমাধ্যম কেউই এর বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারছে না। শুধু বিএনপির একলা দোষ দিলে চলবে না।’

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হলো তখন আওয়ামী লীগের কোনো মানুষ প্রতিবাদ করেনি কেন? কেউ নামে নাই কেন রাস্তায়? কেউ কোনো মিছিল করেনি কেন? ওয়ান ইলেভেনে যখন দুই নেত্রীকেই গ্রেফতার করা হলো, তখন সঙ্গে সঙ্গেই রাস্তায় প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায় নাই কেন? নির্বাচিত সরকারকে যখন বন্দুক দিয়ে সরিয়ে ক্ষমতায় আসে তখন কেউ প্রতিবাদ করতে পারে নাই কেন? আসলে বাংলাদেশের জাতির ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যখন এমন ভীতি, এমন আতঙ্ক মানুষকে গ্রাস করে। তখন মানুষ সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ করতে পারে না। নিশ্চয়ই তেমন কোনো পরিস্থিতিই আবার এসেছিল। এখন রেডিও- টেলিভিশনে একটাই প্রশ্ন করা হয় যে, বিএনপি কেন সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ করতে পারল না? তাই এই প্রশ্নটা করা দরকার যে, বঙ্গবন্ধুর মতো ব্যক্তিত্ব, যিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যার ঋণ বাংলাদেশ কোনোদিন শোধ করতে পারবে না- তাকে তো মেরেই ফেলেছে। তারপরও তার মৃত্যুর পর সঙ্গে সঙ্গে তো দূরের কথা, এক-দুই বছরের মধ্যেও কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে পারল না কেন? তাহলে কি বঙ্গবন্ধু এক সেকেন্ডের মধ্যে প্রচ- অজনপ্রিয় হয়ে গেছে? তখন বা তারপর কি আওয়ামী লীগের সংগঠন উধাও হয়ে গেছে? আসলে ভয়াল আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে যার কারণে কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে পারেনি। সেই রকম একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলেই এত বড় জ্বালিয়াতির নির্বাচনের পরও মানুষ চুপ থাকছে।’

ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘এটা শুধু বিএনপির সঙ্কট নয়, এই সঙ্কট বাংলাদেশের মানুষের পুরো জাতির। কিন্তু সর্বত্রই এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন আওয়ামী লীগ ভার্সেস বিএনপি। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যে এখানে একটি পক্ষ- তা সবাই ভুলেই যাচ্ছে।’ তার মতে, ‘আমার ছাত্রদের মধ্যে এমন আছে যারা নৌকায় ভোট দিতে চেয়েও পারে নাই। সুলতানা কামাল পত্রিকায় ইন্টারভিউ দিয়ে বলেছেন, তার বাসার গৃহকর্মী নৌকায় ভোট দিতে চেয়েও পারেন নি। এটা বাংলােেশর মানুষকে চিট করা হয়েছে। মানুষের বেদনা, মানুষের আর্তনাদকে মূল্য দিতে হবে। বিএনপি প্রতিবাদ করতে পারল না, সিপিবি পেরেছে? তারা তো সরাসরিই বলেছে, ভুয়া নির্বাচন। আর গণমাধ্যম তো সব সময় নির্বাচনের সময় নানা ধরনের রিপোর্ট করে, তাহলে এবার কেন হলো না? যে আসনে আওয়ামী লীগ আট হাজারের বেশি ভোট পায় না, সেখানে কীভাবে আড়াই লাখের বেশি ভোট পড়ল? যেখানে ইভিএম-এ ভোট পড়ল ৫৩ শতাংশ, তাহলে অন্যখানে কেন ৯০ শতাংমের বেশি ভোট পড়ল? সেখানে সব সময় সামিল ব্যবধান হয়, সেখানে কেন এবার অস্বাভাবিক বেশি ব্যবধান হলো? কেন বিদেশী পর্যবেক্ষকদের রাখা হলো না? কেন মোবাইলের গতি স্লো করে রাখা হলো? এসব প্রশ্ন গণমাধ্যম করতে পারে না, এসব কারণেই বিএনপি প্রতিবাদ করতে পারছে না, বিএনপি নির্বাচনে যেতে পারছে না, বা তথাকথিত ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বা এখন তেমন কিছুই করতে পারছে না।’ ড. আসিফের এসব প্রশ্নের কেউ কি জবাব দেবেন?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ