রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

গ্রেফতার ও মামলা প্রসঙ্গে

গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের নামে আসলেও যে চরম প্রহসনই করা হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে ‘নির্বাচিত’ সরকারের দমনমূলক কর্মকান্ডে। দেশকে যখন গণতন্ত্রসম্মত পথে এগিয়ে নেয়ার কথা তখন নির্বাচনের পর কয়েকদিন পর্যন্ত সারাদেশেই বিরোধী দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা ও নির্যাতন যেমন করা হয়েছে তেমনি ঢালাও গ্রেফতার ও গায়েবি মামলার ঘটনাও বেড়েছে আশংকাজনকভাবে। আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি গ্রেফতার ও গায়েবি মামলার প্রধান শিকার হয়েছেন বিশেষ করে যারা নৌকার পরিবর্তে ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন বলে চিহ্নিত হয়েছেন। এখনও সরকারের সেই অভিযান চলছেই। 

এর প্রতিবাদে সরব হয়েছে দেশের ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব অভিযোগ করেছেন, দেশের বিভিন্নস্থানে ৯৮ হাজার মিথ্যা মামলায় বিরোধী দলের ২৫ লাখের বেশি নেতা-কর্মীকে আসামী করা হয়েছে। তাদের অনেককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। যারা গ্রেফতার এড়াতে পেরেছেন তারা পুলিশের ধাওয়ার মুখে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। স্বজনদের অবস্থাও বর্তমানে অত্যন্ত করুণ হয়ে উঠেছে। তারা থানা-পুলিশ করতে এবং মিথ্যা মামলার খরচ যোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন। 

ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিতে গিয়ে সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ের এক সমাবেশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, ক্ষমতাসীনরা মানুষের ভোটের অধিকার ও স্বাধীনতাকে হত্যা করেছেন। ভোটের আগের রাতেই ভোট ডাকাতি করেছেন। কারণ, তারা জানতেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে এবং সাধারণ ভোটাররা ভোট দেয়ার সুযোগ পেলে তারা কোনোভাবেই জিততে এবং ক্ষমতায় আসতে পারতেন না। ্এজন্যই হামলা চালিয়েই তারা থেমে যাননি, নিজেদের দলীয় কর্মীদের দিয়ে গাড়ি ভাংচুর করিয়ে মামলা দিয়েছেন বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের নামে।

মির্জা ফখরুল প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, এভাবে দেশ চলতে পারে না। আমাদের এক ভয়াবহ অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্য পুলিশ ও প্রশাসনকে ঘুষ দিয়েছেন ক্ষমতাসীনরা। টাকাভর্তি খাম ও বিরিয়ানির প্যাকেট বিলিয়েছেন। তিনি সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং হামলা মামলা ও গ্রেফতারের প্রতিবাদে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন। বলেছেন, দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে এবং জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।  

বলার অপেক্ষা রাখে না, অত্যন্ত কঠোর শোনালেও বিএনপি মহাসচিবের অভিযোগ ও বক্তব্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আসলেও মিথ্যা ও সাজানো মামলায় গ্রেফতার করা হচ্ছে বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থককে। এলাকা ও ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকেই। এভাবে সব মিলিয়েই সারাদেশে ভয়ংকর এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে পুলিশ এবং আওয়ামী দুর্বৃত্তরা। আমরা এসব হামলা, মামলা ও গ্রেফতারকে ন্যক্কারজনক এবং সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত বিপদজনক বলে মনে করি। কারণ, গণতন্ত্রে দেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরই যে কোনো দলকে সমর্থন করার এবং যে কোনো দলের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার শতভাগ ভাগ অধিকার রয়েছে। এটাই গণতন্ত্রের নির্দেশনা। বাংলাদেশের সংবিধানও প্রতিটি নাগরিককে সে অধিকার দিয়েছে। 

অন্যদিকে কেবলই ক্ষমতাসীন দলকে ভোট না দেয়ার কারণে গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা জনগণের ওপর সশস্ত্র হামলা তো চালাচ্ছেই, তাদের ঘরবাড়ি এবং দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও জ্বালিয়ে দিচ্ছে। ধর্ষণ করছে নারীদের, লুণ্ঠন করছে অর্থ-সম্পদ। ওদিকে গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে পুলিশও উল্টো আক্রান্তদের নামে মামলা দায়ের করছে, অনেককে জেলে ঢোকাচ্ছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সকল এলাকার জনগণও এক বাক্যে বলছেন, নৌকা মার্কায় তথা ক্ষমতাসীন দলকে ভোট না দেয়ার কারণেই নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়া হচ্ছে। জনগণ আসলে প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে। এখনো হচ্ছে। 

আমরা এ ধরনের ফ্যাসিবাদী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং মনে করি, হামলা ও গ্রেফতারসহ প্রতিটি ঘটনা ও কার্যক্রমই সংবিধান ও গণতন্ত্রের পরিপন্থী। সরকারের উচিত দেশজুড়ে চলমান প্রতিহিংসার অভিযান বন্ধে দ্রুত তৎপর হয়ে ওঠা। আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীগুলোকে দিয়ে এমন পরিবেশ অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দেশের কোথাও আর কোনো হামলা-সহিংসতা ঘটতে না পারে এবং কোথাও যাতে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী-সমর্থক ও ভোটাররা হামলা, নির্যাতন ও গ্রেফতারের শিকার না হন। 

এ উদ্দেশ্যে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের পরিবর্তে গুন্ডা-সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে, যাতে তারা আর কোথাও কোনো প্রার্থী ও তার সমর্থকদের ওপর হামলা চালানোর সাহস না পায়। পুলিশের গ্রেফতার অভিযানও অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত দেশের রাজনীতিতে সুষ্ঠু ও গণতন্ত্রসম্মত পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে ওঠা। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ