শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

প্রহসনের সরকারকে গ্রহণযোগ্য করতেই গণভবনে চা-চক্রের আয়োজন -মঈন খান

গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদ আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : প্রহসনের সরকারকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করতেই গণভবনে চা-চক্রের আয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চা-চক্রের আমন্ত্রণের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল রোববার বিকেলে এক আলোচনা সভায় তিনি এরকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। মঈন খান বলেন, ৩০ ডিসেম্বর যে প্রহসনের নির্বাচন সারা বিশ্ব দেখেছে, তার মাধ্যমে আমরা এদেশে যে একটি প্রহসনের সংসদ দাঁড় করিয়েছি এবং যে সংসদের মাধ্যমে এদেশে একটি নতুন করে সরকারও গঠিত হয়েছে। সেই সরকারের সত্যিকারের অবস্থান কোথায়- সেটা আমরা যদি নাও জানি, সরকার নিজে কিন্তু ঠিকই জানে। আর নিজে ঠিকই জানে বলেই আজকে সরকার ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে কিভাবে তাদের এই যে প্রহসনের সরকার, সেই সরকারকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়। তিনি বলেন, দেশের মানুষ ১৯৭১ সালে একবার স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিল। এবার দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় আবারো দ্বিতীয়বারের মতো যুদ্ধ করতে হবে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে কোকোর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলমগীর হোসেনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন, স্মৃতি সংসদের শামীম তালুকদার, আলমগীর হোসেন, শাহিন খন্দকার, রেজাউল করীম রেজাসহ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
মঈন খান বলেন, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করার এই যে প্রচেষ্টা, সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই চা-চক্রে (গণভবনে) আয়োজন করা হয়েছে। এটাই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করে। তারা জানে ২৯ ডিসেম্বর রাতে ও ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে কী নাটক ঘটেছিলো তা সকলে অবহিত আছেন।
আগামী ২ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে একাদশ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের চা-চক্রের আমন্ত্রণ করেছেন। বিএনপিকে নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির নেতারাও এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের একাদশ নির্বাচনের ভোট কারচুপির সংবাদ প্রকাশের বিষয়টি তুলে ধরে আবদুল মঈন খান বলেন, এটা কোনো নির্বাচন হয়নি, এটা হচ্ছে একটা প্রহসনের নির্বাচন, একটা ভুয়া নির্বাচন। সেই ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংসদ আজকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে সেই সংসদ বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। কার প্রতিনিধিত্ব করে সেটা আপনারাই বুঝে নিতে পারেন, আমার অধিকতর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নাই।
বিএনপির এই নীতি নির্ধারক বলেন, এই সংসদ আজকে প্রতিনিধিত্ব করে সন্ত্রাসীদের, যে সন্ত্রাসীরা ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে সারা বাংলাদেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে তারা ভোট জালিয়াতি করে নিজেদের বিজয়ী বলে ঘোষণা করেছে। তিনি বলেন, আমাকে কয়েকজন রাষ্ট্রদূত প্রশ্ন করেছিলেন আচ্ছা বিএনপির তো পাঁচজন নির্বাচিত হয়েছেন, পরে আরেকজন নির্বাচিত হয়ে্েছন। আমাকে যখন রাষ্ট্রদূতরা জিজ্ঞাসা করেছেন তখন ৫ জন নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাহলে সেই পাঁচজন কী সংসদে যাবে না। আমি বললাম কেউ যদি নির্বাচিত হয় সংসদে যাবে না কেনো? কিন্তু আপনারা (রাষ্ট্রদূত) কী জানেন না। বিএনপির পাঁচজন তো নির্বাচিত হয়নি, তাদেরকে নির্বাচিত দেখানো হয়েছে। যাদের নির্বাচিত দেখানো হয়েছে তাদের সংসদে যাওয়ার কি রাইট রয়েছে- সেই প্রশ্নের জবাব দেন তাহলে নিশ্চয় বিএনপির পাঁচজন সংসদে যাবেন।
মঈন খান বলন, আসলে এই নির্বাচনে কে জয়ী কে বিজয়ী সেটা কোনো প্রশ্নই নয়। নির্বাচনে যাদেরকে জয়ী দেখানো হয়েছে তারা জয়ী হয়েছেন, এই নির্বাচেন যাদেরকে পরাজিত দেখানো হয়েছে তারা পরাজিত হয়েছেন এবং সেটা করা হয়েছে শুধু ভোট রিগিংয়ের মাধ্যমে নয়, এটা করা হয়েছে সন্ত্রাসের মাধ্যমে।
১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের প্রচারণার প্রথম দিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ তার ওপর হামলার ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমার ওপরে, মহাসচিবের ওপরে এভাবে বাংলাদেশে যে কত জায়গায় আক্রমন হয়েছে এবং সেই আক্রমন নির্বাচনের দিন পর্যন্ত অব্যাহতভাবে চলেছে। এখানে কোনো নির্বাচন হয়নি বাংলাদেশে। এভাবে কোনো দেশে নির্বাচন হতে পারে না।
শুধু বিএনপি নয়, যারা বিএনপির সমর্থক তারা নয়, আওয়ামী লীগের একজন নেতাকে জিজ্ঞাসা করুন তাকে বলুন আপনারা বুকে হাত দিয়ে বলুন দেখি- এটা কেমন নির্বাচন হয়েছে। তারা নিজেরাই উত্তর দেবে গোপনে আপনার কানে কানে বলবে, প্রকাশ্যে বলবে না। প্রকাশ্যে বলবে চমৎকার নির্বাচন। চমৎকার নির্বাচনে কী ধারা আপনারা দেখেছেন ১৯৭৩ সালে ২৯৩টি আসন পেয়েছিলো এবং পরবর্তিতে আমরা দেখলাম এই ৩০ ডিসেম্বরের তথাকথিত নির্বাচনে আবারো ২৯৩টি আসন। চমতকার। এই ধরনের সমীকরণ বিএনপির করার যোগ্যতা নাই, আমরা এসব ভোট জালিয়াতির দক্ষমতায় পারদর্শি নই, আমরা এটা কখনো করিনি।
সরকারের সমালোচনা করে সাবেক মন্ত্রী মঈন খান বলেন, আজকে যত উন্নয়নের কথা বলা হোক না কেনো, উন্নয়নের নামে মেগা দুর্নীতি হয়েছে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, এই নতুন সরকারের বয়স চার সাপ্তাহ হয়েছে। সংসদ এখনো বসেনি। দুইটি মন্ত্রিসভার বৈঠক সম্ভবত হয়েছে। কিন্তু দেখুন- এই ৪ সাপ্তাহের ভেতরে ১০/১৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। কিভাবে হলো, কারা নিলো, কোনো দায়িত্বে নিলো? উত্তর হচ্ছে- মেগা প্রজেক্ট, মেগা দুর্নীতি।
দেশের এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সকলকে সংগঠিত হওয়ার আহবান জানিয়ে মঈন খান বলেন, যেখানে অলিখিত বাকশাল চলে সেখানে সুশাসনের কথা, মায়া-মমতার কথা, হৃদয় বেদনার কথা বলে কোনো লাভ নেই। অনেক বক্তা বলেছেন, যে আমাদের এখন নতুন করে ভাববার, নতুন করে কৌশল নেয়ার সময় এসেছে। আমি বলতে চাই, অন্যায়-নির্যাতন করে কোটি কোটি মানুষকে হয়ত সাময়িকভাবে স্তব্ধ করে রাখা যাবে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষকে চিরকালের জন্য কোনো অপশক্তি স্তব্ধ করে রাখতে পারবে না। আমরা দেখেছি একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে তারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। সেই সংগ্রাম স্তব্ধ করে দিতে পারেনি পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। সেই কথা স্মরণ করে আজকে আমাদের নতুন করে জোর গলায় বলতে হবে যদি প্রয়োজন হয়, বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের জন্য স্বাধীনতার যুদ্ধ করতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, স্বাধীনতার পাশাপাশি যে অর্থনৈতিক মুক্তির যে আন্দোলন ছিলো তাকে স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে আজকে। এখন বাংলাদেশে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ছে। তার অর্থ স্বাধীনতার অর্থনৈতিক মুক্তির যে আন্দোলন তা সফল হয়নি সেই সেই আন্দোলনে আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
আরাফাত রহমান কোকো ‘ক্রীড়া সংগঠক’ হওয়া স্বত্ত্বেও তার ওপর ১/১১ এর সরকারসহ পরবর্তি সরকারের নির্যাতনের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। তিনি বলেন, এই সরকারের ভয় হচ্ছে জিয়া পরিবার। তাই তারা বারবার টার্গেট করেছে জিয়া পরিবারকে। তারই অংশ হিসেবে ওয়ান ইলেভেন এবং তার পরবর্তী সময় জিয়া পরিবারের উপর নেমে এসেছে নির্মম নির্যাতন। সেই নির্যাতনের শিকার শহীদ প্রেসেিডন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। তিনি চিকিৎসা চলাকালীন অবস্থাতেই মারা গেছেন। তিনি বলেন, এই সরকারের হাত থেকে রেহাই পাননি আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও। সরকারের ষড়যন্ত্রের কারণেই বেগম জিয়া এখনো জেলে। তিনি বলেন, যতই নির্যাতন করা হোক না কেন এই সরকার কখনোই জনগণের সরকার হতে পারবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ