মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বাংলাদেশে বিলুপ্ত ‘নীলগাই’ অবশেষে জুটি বাঁধতে যাচ্ছে

রাজশাহী : (বামে) নওগাঁয় ধরাপড়া পুরুষ নীলগাই ও (ডানে) ঠাকুরগাঁওয়ে আটক মাদি নীল গাই -ফাইল ফটো

সরদার আবদুর রহমান : বাংলাদেশে বিলুপ্তপ্রায় নীলগাই অবশেষে জুটি বাঁধতে যাচ্ছে। ঘটনাক্রমে দু’টি নীলগাই মিলে যাওয়ায় এখন এর বংশবিস্তারের স্বপ্ন দেখছেন বন্য প্রাণী কর্মকর্তারা। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ঠাকুরগাঁও এবং নওগাঁয় গ্রামবাসীদের হাতে ধরা পড়ে এই বন্য প্রাণী দু’টি। বাংলাদেশে এখন বন্য নীলগাইয়ের সংখ্যা দুই বলে জানান কর্মকর্তারা।
নীলগাই-এর ইংরেজি নাম ইষঁব নঁষষ যা ভারত উপমহাদেশে অ্যান্টিলোপ জাতীয় প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বৃহদাকৃতির। পুরুষ অ্যান্টিলোপ নীলগাও নামেও পরিচিত। ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলেই নীলগাই দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মালাবার উপকূল ও বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন অঞ্চলগুলো বাদে উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে দক্ষিণে কর্ণাটক প্রদেশ পর্যন্ত এদের দেখা মেলে। এছাড়া পাকিস্তান ও নেপালের ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকায় নীলগাই দেখা যায়। চীনেও নীলগাই রয়েছে বলে জানা যায়। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত এরা বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের নিম্ন বনভূমি এলাকা বিশেষ করে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার মাঠ-প্রান্তর দাপিয়ে বেড়াতো। এখন এরা এদেশে বিলুপ্তির খাতায় নাম লিখিয়েছে।
পুরুষ নীলগাইয়ের গাত্র বর্ণ গাঢ় ধূসর, প্রায় কালচে রঙের। অনেক সময় গায়ে নীলচে আভা দেখা যায় বলে এদের নীলগাই নামকরণ। অন্যদিকে স্ত্রী নীলগাই ও শাবকের গাত্র বর্ণ লালচে বাদামী। কিন্তু খুরের উপরের লোম সাদা এবং প্রত্যেক গালে, চোখের নিচে ও পেছনে দু’টি সাদা ছোপ থাকে। ঠোঁট, থুতনি, কানের ভেতরের দিক ও লেজের নিচের তলদেশ সাদাটে। শুধু পুরুষ নীলগাইয়ের শিং হয়। শিং দুটি মসৃণ, অনুচ্চ, কৌণিক ও সামনের দিকে ঈষৎ বাঁকানো। পুরুষ নীলগাইয়ের উচ্চতা সাধারণত ৫২-৫৮ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। স্ত্রী নীলগাই আকারে একটু ছোট হয়। নীলগাই ছোট পাহাড় আর ঝোঁপ-জঙ্গলপূর্ণ মাঠে চরে বেড়াতে ভালবাসে। তবে ডাল জাতীয় যেমন মাসকলাই, মসুর ও ছোলা নীলগাইয়ের খুব প্রিয়। এরা ঘন বন এড়িয়ে চলে। সচরাচর ৪ থেকে ১০ সদস্যের দল নিয়েই এরা ঘুরে বেড়ায়। এই সংখ্যা ২০ বা তার বেশিও হতে পারে। গাছে ঢাকা উঁচু-নিচু সমতলে বা তৃণভূমিতে যেমন স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতে পারে, তেমনি শস্যক্ষেত্রে নেমে ব্যাপক ক্ষতি করতে পটু। পানি ছাড়া এরা দীর্ঘসময় কাটিয়ে দেয়, এমনকি গরমের দিনেও এরা নিয়মিত পানি খায় না। এদের ঘ্রাণশক্তি খুবই প্রখর। আত্মরক্ষার প্রধান উপায় দৌড়ে পালানো। মাদি নীলগাই ২৫ মাস বয়সে যৌবনপ্রাপ্ত হয়। গর্ভধারণের সময়কাল ৮ থেকে ৯ মাস। বাচ্চা প্রসব করে ১/২ টি। এদের গড় আয়ু ১৫-২০ বছর। কিন্তু সমস্যা হলো এই কয়েকটা বছরও এরা নিরাপদে থাকতে পারে না। লোভাতুর শিকারীর দল নির্বিচারে নীলগাই নিধন করে এদের বংশপ্রদীপ নিভিয়ে ফেলে।
বাংলাদেশে যে দু’টি নীলগাই বর্তমানে অবস্থান করছে এর প্রথমটি গত বছর ৫ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে ধরা পড়ে। পার্শ্ববর্তী ভারত থেকে এটি দলছুট হয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এদিন বিকেলে পথচারীরা ওই নীলগাইটিকে ধাওয়া করলে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দৌড়ে কুলিক নদী পারাপারের সময় নদীতে প্রায় অর্ধশত এলাকাবাসী পানিতে নীলগাইটিকে আটকের চেষ্টা করে। এসময় দু’জন আহত হন। অনেক কষ্ট করে এলাকাবাসী ওই নীলগাইকে উদ্ধার করে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে রাণীশংকৈলের যদুয়ার এলাকার জনৈক আবু বকরের বাড়িতে। পরে খবর পেলে বন বিভাগের কর্মকর্তা, ইউপি চেয়ারম্যান, রাণীশংকৈল থানার পুলিশ উপস্থিত হয়। আবুবক্কর নীলগাইটিকে হস্তান্তর করতে আপত্তি করলে রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী আফরোজা উপস্থিত হয়ে আবু বক্করকে বুঝিয়ে নীলগাইটি বুঝে নেন। পরে এটি স্থানান্তর করা হয় দিনাজপুরের রামসাগর জাতীয় উদ্যানে।
দ্বিতীয় নীলগাইটি এবছর ২২ জানুয়ারি নওগাঁর মান্দা উপজেলায় ধরা পড়ে। উপজেলার জোতবাজার এলাকায় পুরুষ জাতের এই নীলগাইটি উদ্দেশ্যহীনভাবে ছোটাছুটি করছিল। গ্রামের শতাধিক মানুষ ধাওয়া করে সেটি আটক করে প্রাণীটি বেঁধে রেখে পুলিশ ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের খবর দেয়। সেখান থেকে নীলগাইটি উদ্ধার করা হয়। পুরুষ নীলগাইটি বর্তমানে রাজশাহী বন্যপ্রাণী ও পরিচর্যা কেন্দ্রের ভেতরের প্রাকৃতিক পরিবেশে রেখে চিকিৎসা করা হচ্ছে। এটি উদ্ধারের সময় পায়ে, পেটে ও রানের কাছে আঘাত পায়। এটিও রামসাগর জাতীয় উদ্যানে মাদি নীলগাইটির সঙ্গে রাখার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বন বিভাগ। এই জুটি থেকে বংশবিস্তার ঘটার সম্ভাবনার কথা ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ