শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় সেই তিমিরেই রয়ে গেছে শেয়ারবাজার

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : ২০১০ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির পর শেয়ারবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় বিনিয়োগকারীরা। মহা ধসের ৮বছর পার হলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি শেয়ারবাজার। শতচেষ্টা সত্ত্বেও বাজার ভালো করতে পারেনি সরকার। বিচার হয়নি কেলেঙ্কারির সাথে জড়িতদের। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, শেয়ার কেলেঙ্কারির সাথে যারা জড়িত তারাই এখনো শেয়ারবাজারে সক্রিয় রয়েছে। সে কারণেই তারা বাজারমুখী হচ্ছেন না। সে সময় শেয়ারবাজার থেকে বিনিয়োগকারীদের লাখ লাখ টাকা লুট হয়ে যায়। পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব অনেক বিনিয়োগকারী আত্মহত্যা করে। অর্থ লুটপাটের সাথে জড়িতদের বিচারের দাবি ওঠে। জড়িতদের চিহ্নিত করতে কমিটি গঠিত হয়। সে কমিটি রিপোর্টে দোষিদের শাস্তির সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সরকার বিচার তো দূরের কথা রিপোর্টটি পর্যন্ত আজও প্রকাশ করেনি। সে ঘটনায় শেয়ারবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা এমন তলানিতে গেছে যে বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন তারা। অর্থ হারানোর ভয় আজও তাদের তাড়া করছে। ফলে চরম আস্থাহীনতায় সেই তিমিরেই রয়ে গেছে শেয়ারবাজার। তাই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছে এখনো এটি পুঁজি হারানোর বাজার হিসাবেই চিহ্নিত হয়ে আছে।
গতবছরের সেপ্টেম্বর মাসে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ২৫ শতাংশ শেয়ার চীনের দুই প্রতিষ্ঠান শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়ামকে (জোট) আনুষ্ঠাকিভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়। এর আগে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে ওই বছরের ১৪ মে চীনা জোটের সঙ্গে চুক্তি সই করে ডিএসই। ওই চুক্তি অনুযায়ী, কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনা জোট ডিএসইর ২৫ শতাংশ বা ৪৫ কোটি ৯ লাখ ৪৪ হাজার ১২৫টি শেয়ার কিনে নেয়। এজন্য প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ২১ টাকা দরে মোট ৯৪৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা পরিশোধ করে সাংহাই ও সেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ জোট। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল চীনা কোম্পানি বাজারে আসলে শেয়ারবাজার স্থিতিশীল হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তার কোনো শুভ লক্ষণ দেখা যায়নি। একদিন বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকে তো আবার টানা পতনের কবলে পড়ে। উত্থান পতনের দোলাচলে পড়ে পার হয়ে গেলো ৮ বছর। বাজার ভালো না হওয়ার পেছনে বিনিয়োগকারীরা কেলেঙ্কারির সাথে জড়িতরাই বাজারে সক্রিয় থাকাকে দায়ী করেছেন। তারা বলছেন, আবারও আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এসেছে। বাজার কতটা ভালো হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।
গত বছরের ডিসেম্বরে স্টক ডিলার ও স্টক ব্রোকারের মক্কেলের মার্জিন হিসাবের পুনঃমূল্যায়নজনিত অনাদায় ক্ষতির বিপরীতে রাখা প্রভিশন সংক্রান্ত ঐচ্ছিক সুবিধার মেয়াদ বাড়ায় পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিএসইসির চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেনের সভাপতিত্বে কমিশনের ৬৬৯তম সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। কমিশন সভায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধসের পর ২০১৩ সালে স্টক ব্রোকার ও স্টক ডিলারের অনাদায় ক্ষতির বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণে সুবিধা দিয়ে নির্দেশনা জারি করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। বিএসইসি’র জারি করা ওই নির্দেশনায় বলা হয়, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিনেন্সের ১৯৬৯ সেকশন ২০-এ প্রদত্ত ক্ষমতা বলে কমিশন স্টক ব্রোকার/স্টক ডিলারগুলোর অনাদায় ক্ষতির বিপরীতে রক্ষিতব্য প্রভিশন সংরক্ষণের সুবিধা প্রদান করে। এ সুবিধার পরেও বাজারে কাক্সিক্ষত গতি আসেনি।
কেলেঙ্কারির পর থেকে প্রত্যেক বছরই শেয়ারবাজার ভালো হবে বলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বার বার ঘোষণা দিয়ে আসছিলেন। অর্থমন্ত্রীর এমন ঘোষণাই বাজার ভালো যাবে বলে প্রত্যাশা করে ছিল সবাই। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। দেশের শেয়ারবাজারে আবারও চরম আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কমছে সূচক ও শেয়ারের দাম। আবারও নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। অব্যাহত দরপতনে সাধারণ বিনিয়োগকারীর মধ্যে ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের বাজারধসের আতঙ্ক আবারও ভর করছে। শেয়ারবাজারের এ দুটি বড় কেলেঙ্কারির ঘটনাই ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শাসনামলে। বাছবিচার ছাড়াই সব ধরনের শেয়ারের দরপতনে সূচক একের পর এক মনস্তাত্ত্বিক সীমা ভেঙে নিচে নামছে। প্রথম দফায় ডিএসইর সূচক ৬ হাজারের মাইলফলকের নিচে নামার পর অনেক বিনিয়োগকারী ভেবেছিলেন সূচক হয়তো ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু উল্টো তা সাড়ে ৫ হাজার পয়েন্টের মাইলফলকের নিচে নেমে আসে। গতবছরের জুনের বাজেট-পরবর্তী সময়ে ডিএসইতে সূচক যতটা বেড়েছিল, গত প্রায় দুই মাসের পতনে তা আগের অবস্থাতেই ফিরে যায়। ক্রমগত দরপতনে একটু একটু করে পুঁজি কমছে বিনিয়োগকারীদের। ফলে আবারও পুঁজি হারানোর সঙ্কায় ভুগছেন বিনিয়োগকারীরা। কেউ কেউ দরপতনকে বিনিয়োগকারীদের রক্ত ক্ষরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। পুঁজি হারানোর শঙ্কার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকটও ভর করেছে। বর্তমানে ডিএসইর (২১ জানুয়ারি ২০১৯) সূচক দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৫৬ পয়েন্ট।
শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক কোম্পানিগুলোর খারাপ লভ্যাংশ ঘোষণার কারণেই শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকগুলো যে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে তাতে তারা বলছেন, চীনের দুই প্রতিষ্ঠান শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়ামকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে পাওয়া দেশের শেয়ারবাজারের জন্য বিরাট সুখবর। কিন্তু এ সুখবর আশার পরও শেয়ারবাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। আবার সরকার থেকে ব্যাংকগুলোর তারল্য বাড়াতে বিশেষ সুবিধা দেয়া হলেও ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়ায়নি। ফলে শেয়ারবাজারে যে তারল্য সংকট ছিল তা রয়েই গেছে।
বাজারে এ দরপতনের বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাজারে আবারও আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এ দরপতনের যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। কারসাজির হাতিয়ার হিসেবে কিছু অযৌক্তিক কারণকে সামনে আনা হয়েছে। অনেকেই বাজারের সাম্প্রতিক এ দরপতনের জন্য তারল্যসংকটকে দায়ী করছেন। তবে তারল্যসংকট বড় কারণ বলে আমি মনে করি না। বছরেরও জানুয়ারিতেও ব্যাংক খাতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ছিল ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। তার মানে বেসরকারি খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এখনো বেশি ঋণ যাচ্ছে। তাই তারল্যসংকট বাস্তব কারণ নয়, বরং এটিকে বড় কারণ বানানো হচ্ছে বলেই আমার ধারণা।
ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ একেবারেই কমে গেছে। অনেক ব্যাংক তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলে নিয়ে অন্যত্র খাটাচ্ছে।
জানতে চাইলে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান বলেন, ক্রমাগত দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বাজারে কিছুটা তারল্যসংকটও বিরাজ করছে।
বিনিয়োগকারী মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি দুর্বলতার কারণেই বাজারে নানাভাবে কারসাজির ঘটনা ঘটে। যেদিন বাজারে বিএসইসির তদারকি শক্তিশালী থাকে সেদিন খুব বেশি সূচক কমে না। বাজারে যদি সংকটই থাকবে তাহলে মাঝেমধ্যে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে কীভাবে? আসলে একটি গোষ্ঠী তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য বাজারকে নানাভাবে ব্যবহার করছে। আর তাতে বারবার নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
ডিএসইর সাবেক পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, শেয়ারবাজারে উত্থান-পতন থাকবেই, এটা স্বাভাবিক নিয়ম। এখন শেয়ারবাজারে তেমন কোনো সমস্যা নেই। তবে ব্যাংকগুলো ভালো লভ্যাংশ না দেয়ার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। টানা দরপতনের জন্য এটি একটি কারণ।
এমতাবস্থায় সেই সময়ের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মহিত বলেছিলেন, দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কাজ করছে। কিন্তু এটা তাদের কাজ না। পুঁজিবাজারই দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের উৎস হওয়া উচিত। আমাদের একটি ভালো পুঁজিবাজার স্থাপন করতে হবে যা দীর্ঘ মেয়াদী অর্থায়নের উৎস হবে। তিনি আরও জানান, শেয়ারবাজার কিছু মেজর প্লেয়ারকে (শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট) ডাকবো। পুঁজিবাজারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের লক্ষ্যে আমরা কিছু কারার চেষ্টা করব। কিন্তু সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত সেই স্বপ্ন আর পূরণ করতে পারেননি। হয়নি কোনো বৈঠক। ভালো হয়নি বাজারও।
উল্লেখ্য ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রায় ৯ হাজারে উঠে যাওয়া দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি ২০১৩ সালের এপ্রিলে নেমে এসেছিল সর্বনিম্ন ৩ হাজার ৫০০ পয়েন্টের নিচে। আর এখন এসে সেই সূচক সাড়ে ৫ হাজার পয়েন্টে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ ২০১০ সালের পর গত আট বছরে ৭০টির বেশি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তাতেও সূচকের খুব বেশি উন্নতি হয়নি। বাজারের দৈনন্দিন লেনদেনের অবস্থা আরও খারাপ। ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর ডিএসইতে লেনদেন উঠেছিল ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকায়। কমতে কমতে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে সেটি নেমে আসে সর্বনিম্ন ১০১ কোটি টাকায়। ২০১৪ সালে ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। ২০১৫ সাল শেষে দৈনিক গড় লেনদেন আরও কমে নেমে আসে ৪২২ কোটিতে। ২০১৮ সালের ১৭ মে লেনদেন নেমে আসে ৪৯২ কোটি টাকায়।
২০১৩ সালের জুলইয়ে সূচক ৪ হাজার ৯০ পয়েন্টে ঠেকেছিল। এরপর ২০১৫ সালে এপ্রিলে ডিএসইর সূচক ৪ হাজার ৯৪ পয়েন্টে নেমেছিল। ২০১৬ সালে ৫ হাজার ৮৮৮ পয়েন্টে নেমে আসে। চলতি বছরেও সাড়ে ৫ হাজার পয়েন্টে ঘুরপাক খায়। বরং এ অবস্থা দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। ২০১৭ সালের ১৭ মে ডিএসই সূচক ৪ হাজার ৪৪৩ পয়েন্টে নেমে আসে। ২০১৮ সালে ডিএসই সূচক ৫ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করে। ২০১০ সালে ধসের পর আজও বিনিয়োগকারীর কাছে এখনো আস্থাহীন দেশের শেয়ারবাজার। এখনো এটি পুঁজি হারানোর বাজার। ভালো কিংবা মন্দ অনেক কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেও লাভের দেখা মিলছে না। তাই বাজারে আসতে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।
এ ব্যাপার বিএসইসির চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেন বলেন, ২০১০ সালের ধসের পর বাজারে অনেক সংস্কার হয়েছে। তবে সেই অর্থে এখনও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাওয়া যায়নি।
২০১০ সালে শেয়ারবাজার ধসের পর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের মতে, কেলেঙ্কারির ঘটনার পর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হলেও এ কমিশনের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। আবার বাজারে দেশের ভালো কোম্পানিগুলো না আসার কারণে এখনো বাজার একটি দুষ্টচক্রের হাতে ঘুরপাক খাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ