শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

পাথরঘাটায় পান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে চাষিরা

পাথরঘাটা উপজেলার আমড়াতলা গ্রামের একটি পানের বরজ

মো. মাহবুবুর রহমান, পাথরঘাটা (বরগুনা), ১৮ জানুয়ারি : উপকূলীয় এলাকা বরগুনার পাথরঘাটায় পান চাষে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও কৃষি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবসহ নানা কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে পান চাষের পরিমাণ। পান চাষীদের পাশে কেউ নেই। সরকারি বেসরকারি কোন সাহায্য সহায়তা তারা পাচ্ছে না। একদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি অপর দিকে প্রকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদেরকে সরকারি প্রণোদনা দেয়ার ব্যবস্থা না থাকায় সুস্বাদু বাংলা পান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন চাষীরা। পান বাংলাদেশের একটি অন্যতম অর্থকরী ফসল। বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় উৎসবসহ বিয়ে-শাদিতে পান-সুপারির কদর আদিকাল থেকে। পানের জাতের মধ্যে বাংলা পান অন্যতম। উপজেলার কালমেঘা ইউনিয়নের শতাধিক পরিবার বহুকাল ধরে পান চাষে জড়িত রয়েছে। এ পান স্থানীয়দের কাছে খুবই প্রিয়। এর চাহিদাও প্রচুর। এ অঞ্চলে পানের পরিকল্পিত চাষাবাদ ঘুরিয়ে দিতে পারে স্থানীয় বারই সম্প্রদায়ের ভাগ্যের চাকা। জাতীয় অর্থনীতিতেও রাখতে পারে ভূমিকা। এক সময় প্রায় প্রতিটি গ্রামে পানের বরজ থাকলেও এখন তা অনেকটা কমে এসেছে। পূর্ব পুরুষের পেশা হিসেবে এখনো যারা পানের বরজ নিয়ে আছেন তারা জানান, পান চাষের জন্য সরকারি কোন সাহায্য সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে যে কোন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকার তাদের সহায়তা করে কিন্তু পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে চাষীদের পাশে কেউ দাঁড়ায় না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বাধীনতার আগ থেকে পাথরঘাটার বারই সম্প্রদায়ের কিছু পান চাষী স্থানীয়ভাবে পান চাষ করে ব্যাপক সাফল্য লাভ করেন। পরে আমড়াতলা, কালিপুর, কালিবাড়ি ছোনবুনিয়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের বিভিন্ন শ্রেনীর মানুষের মাঝে পান চাষে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। পর্যায়ক্রমে ওই এলাকার চাষীরা পান চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং সফলতার মুখও দেখেন। বর্তমানে চাষীরা কৃষি বিভাগের পরামর্শ না থাকায় পান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। রোগবালাই পান উৎপাদনের একটি প্রধান অন্তরায়। পানে গোড়া পঁচা, ঢলে পড়া, পাতা পঁচা, অ্যানথ্যাকনোজ ও সাদা গুঁড়া ইত্যাদি রোগ দেখা যায়। এর মধ্যে পঁচন ধরা পানের জন্য একটি মারাত্মক রোগ। গাছের যে কোনো বয়সে এ রোগ হতে পারে। পানের বরজে সাধারণত কার্তিক ও অগ্রহায়ন মাসে এ রোগের প্রকোপ মহামারী আকারে দেখা দেয়। এ রোগের লক্ষণ হচ্ছে গাছের গোড়ায় আক্রমণ করে। গোড়ায় লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, মাটির কাছের একটি বা দুটি পর্বের মধ্যে কালো বর্ণ ধারণ করেছে। উপরে লতা-পাতা হলুদ হয়ে যায় ও ঝরে পড়ে। মাটি সংলগ্ন লতার ওপর সাদা সুতার মতো ছত্রাক মাইসেলিয়া দেখা যায়। পরে হালকা বাদামি থেকে বাদামি সরিষার ন্যায় এক প্রকার অসংখ্য দানার মতো স্কে-রোসিয়া দেখা যায়। মাটি সংলগ্ন ডাঁটা পঁচে যায় এবং গাছ ঢলে পড়ে মরে যায়। পানের রোগগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ফলন অনেকাংশে বৃদ্ধি পেত। পান চাষীদের সাথে আলাপকালে জানাযায়, পানের বরজ তৈরি করে পানের লতা লাগিয়ে ভাল ফলন পেলেও সার কীটনাশক ব্যবহারে পানের রোগ ঠেকাতে পারছেন না তারা। রোগবালাই কিংবা সমস্যা দেখা দিলে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা কিংবা ঔষধ বিক্রেতাদের সাথে পরামর্শ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তখন কৃষি বিভাগ থেকে কোন পরামর্শ পায়না চাষীরা। তাই পানের বরজ বাদ দিয়ে অন্য ফসল ফলানোর দিকে ঝুকেঁ পড়ছে পান চাষীরা। পান চাষের প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন সার, খৈল, বরজ তৈরির বাঁশ ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের মজুরির হার বাড়লেও সেই তুলনায় পানের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এতে পান চাষীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। একসময় এ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে পান চাষ হতো। এই পান এলাকার বাজারগুলোর চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলসহ বিদেশে রপ্তানী হত। কিন্তু নানাবিধ সমস্যায় পানের চাষ দিন দিন কমে যাচ্ছে। স্থানীয় চাষীরা জানান, সরকার কৃষকদের জন্য সারা দেশে বিনামূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক বিতরণ করলেও পাথরঘাটায় পান চাষীদের কপালে একশত গ্রাম সার-বীজ ও এক বোতল কীটনাশকও জোটেনি। কালমেঘা ইউনিয়নে একজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকলেও কোনো দিন তাকে পানের ক্ষেতে দেখা পাইনি। কৃষি উন্নয়নে নিয়োজিত এই কর্মকর্তারা যদি পান চাষে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করতেন তাহলে চাষীরা আগ্রহ হারাতো না। এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শিশির কুমার বড়াল জানান, পান চাষের উপর কৃষি বিভাগের কোন কার্যক্রম নেই। তবে চাষীদেরকে বিভিন্ন সময় পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করা হয় বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ