শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

খুলনার হাজ্বী আব্দুল মালেক গার্লস্ হাইস্কুলের ভবনের ছাদটি নানারকম ফল ও ওষুধি গাছের বাগান

খুলনা : নগরীর হাজী আব্দুল মালেক গার্লস হাইস্কুলের ছাদটি যেন নানারকম ফল ও ওষুধি গাছের একটি বাগান। স্কুলের দায়িত্ব পালনের ফাঁকে নিজেই পরিচর্যা করছেন ‘ছাদ বাগান’-এর উদ্যোক্তা স্কুলের শিক্ষক মো. জাকির হোসেন

খুলনা অফিস : খুলনার হাজ্বী আব্দুল মালেক গার্লস্ হাইস্কুলের ভবনের ছাদটি যেন নানারকম ফল ও ওষুধি গাছের এক খণ্ড বাগান। দীর্ঘ ২৯ বছরের এই স্কুলের শিক্ষকতা জীবনের শেষ দিকে এসে প্রধান শিক্ষক মো. জাকির হোসেন একটি বৃক্ষ মেলা থেকে ধারণা নিয়ে স্কুল ভবনের ছাদেই শুরু করেন ‘ছাদ বাগান’। স্কুলের দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকে নিজেই পরিচর্যা করেন এই ‘ছাদ বাগানের’। এ বাগানে রয়েছে লেবু, ঘৃত কুমারী, পুদিনা পাতা, তুলসী পাতা, পাথর কুচিসহ নানা প্রকার ফল ও ওষুধি গাছ। মওসুমী বিভিন্ন শাক-সবজিও চাষ করেন এই ছাদ বাগানে। পরিবেশ সুরক্ষা আর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করে বাড়িতে ‘ছাদ বাগান’ এ উৎসাহ দেয়ার লক্ষ্য নিয়েই তার এ প্রয়াস বলে জানালেন মো. জাকির হোসেন।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) নবগঠিত লবণচরা থানা এলাকার নারী শিক্ষার একমাত্র প্রতিষ্ঠান নগরীর শিপইয়ার্ড মতিয়াখালীস্থ হাজ্বী আব্দুল মালেক গার্লস্ হাইস্কুল। টিনসেডেই যার যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজ সেখানে একটি তিনতলাসহ তিনটি ভবন। ছাত্রী সংখ্যা সাত শতাধিক। স্কুলটিতে ১৯৯০ সালে যোগ দিয়েছিলেন আজকের প্রধান শিক্ষক মো. জাকির হোসেন। পিরোজপুরের নাজিরপুরে গ্রামের বাড়ি হলেও স্কুলটিই তার প্রাণ। দিনের অধিকাংশ সময়ই তিনি কাটান এই স্কুলে। স্কুল শেষে বিকেলে ছাদ বাগানের পরিচর্যা শেষে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরেন। স্কুলের ছাদের বাগানে লাগানো বিভিন্ন ওষুধি গাছ অনেক সময় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায়ও কাজে লাগে বলে জানান তিনি। অতিথি আপ্যায়নেও ছাদ বাগানের লেবুর রস যুক্ত হয় কোন কোন সময়। যেটি অন্য স্কুল থেকে অনেকটা ভিন্নতাও আনে। সম্প্রতি এ স্কুলটি পরিদর্শন করেন খুলনা সদর থানা শিক্ষা অফিসার মো. আবদুল মমিন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের প্রোগ্রামার মো. সাইফুল ইসলামও এসময় উপস্থিত ছিলেন। হাজ্বী আব্দুল মালেক গার্লস্ হাই স্কুলের এ ছাদ বাগানকে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বলেও উল্লেখ করেন এই শিক্ষা অফিসার। তিনি বলেন, সদর থানা এলাকায় মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি মিলিয়ে সর্বমোট ১১৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অল্পকিছু স্কুল টিনসেডে থাকলেও অন্তত একশ’র মত রয়েছে বিল্ডিং। এই একশ’ স্কুল ভবনে ছাদ বাগান গড়ে তোলা হলে পাল্টে যেতে পারে চিত্র। ধীরে ধীরে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা জেলা, বিভাগ এমনকি দেশব্যাপীও। এটি তিনি একটি উদ্ভাবনী প্রকল্প হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত করবেন বলেও জানান। সেই সাথে তিনি তার আওতাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিঠি দিয়ে ছাদ বাগান গড়ে তোলার জন্য যেমন প্রধান শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানাবেন তেমনি নতুন করে গড়ে তোলা ভবনগুলোকে যেন ছাদ বাগান উপযোগী করে গড়ে তোলা হয় সেজন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের পত্র দেবেন। একইসাথে স্কুলগুলোর ম্যানেজিং কমিটিকেও ছাদ বাগানের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে ফান্ড তৈরির জন্য অনুরোধ জানাবেন।

লবণচরা মেট্রোপলিটন কৃষি অফিসার জেসমিন ফেরদৌস বলেন, কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে মানুষকে ছাদ বাগান করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কিন্তু ছাদে প্রচুর সময় দিতে হয়। কিছুটা প্রশিক্ষণ দিয়ে ছাদ বাগান করা গেলে নিরাপদ সবজি উৎপাদন সম্ভব। মাঝে-মধ্যে তাদের উপ-সহকারী কৃষি অফিসাররা এলাকায় গিয়ে বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে থাকেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি নিজেও অনেক সময় এলাকায় গিয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। হাজ্বী আব্দুল মালেক গার্লস্ হাইস্কুলের ছাদ বাগান সম্পর্কে তিনি আগেও অবহিত হয়েছেন। এভাবে অন্যান্য স্কুল-কলেজ ও মাদরাসায় যাদের নিজস্ব ছাদ রয়েছে সেসব ছাদ ফেলে না রেখে বাগান করা হলে একদিকে যেমন নিরাপদ সবজি উৎপাদন সম্ভব তেমনি পরিবেশেরও ভারসাম্য হয়। তাছাড়া স্কুলের শিক্ষার্থীরাও এ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাড়িতেও ছাদ বাগান করতে উৎসাহিত হবে।

হাজ্বী আব্দুল মালেক গার্লস্ হাই স্কুলের বিদ্যোৎসাহী সদস্য শহীদুল ইসলাম বলেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. জাকির হোসেন নিজ উদ্যোগে ছাদ বাগানটি করলেও এটিকে এগিয়ে নেয়া এখন কমিটির একজন সদস্য হিসেবে তারও দায়িত্ব এসে গেছে। সুতরাং এখন থেকে তিনি এর দেখভাল করবেন বলেও জানান।

স্থানীয় সমাজসেবক ও মরহুম হাজ্বী আব্দুল মালেকের ছেলে মো. কামাল হোসেন বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। সবাই নিজ উদ্যোগে এভাবে ছাদ বাগান করতে উদ্বুদ্ধ হলে নিরাপদ সবজি উৎপাদন সম্ভব। সেই সাথে কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও বাড়িতে ছাদ বাগান করতে আরও উৎসাহিত হবে।

উল্লেখ্য, শিপইয়ার্ড মতিয়াখালী খাল সংলগ্ন হাজ্বী আব্দুল মালেক গার্লস্ হাইস্কুলটি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন দানবীর মরহুম হাজ্বী আব্দুল মালেক। যেটি খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন। শিক্ষা, শক্তি, প্রগতি এ শ্লোগানে মাত্র নয়জন ছাত্রী নিয়ে যাত্রা হয়েছিল যে স্কুলটির সেটিতে এখন ছাত্রী সংখ্যা সাত শতাধিক। ১৯৯৬ সালে হাজ্বী আব্দুল মালেকের ইন্তিকালের পর এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আরও একজন যুক্ত হন। যার নাম এম,এ, মান্নান। যে ভবনটিতে ছাদ বাগান করা হয়েছে সেটি ২০০৯ সালে প্রথমবার কেসিসির মেয়র হওয়ার পর তালুকদার আব্দুল খালেক একতলা ভবন করে দিয়েছিলেন। ২০০২ সালে ওয়ার্ল্ড ভিশনের সহযোগিতায় ওই ভবনের ওপর আরও দু’তলা যুক্ত হয়ে এখন সেটি তিনতলা ভবনে পরিণত। ওই ভবনের ছাদের ওপরই গড়ে তোলা হয়েছে ছাদ বাগান। স্কুলটি থেকে ২০১৮ সালে ১১১ জন ছাত্রী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৮৪% পাশ করে। ক্রীড়া ক্ষেত্রেও স্কুলটির রয়েছে বিরাট সাফল্য। এ স্কুলেরই ছাত্রী উর্মি আক্তার ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টে জাতীয়ভাবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ