মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

একাদশ সংসদ বাতিল করার দাবি প্রসঙ্গে

আশিকুল হামিদ : দেশীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো মানবাধিকার সংস্থা বা কমিশনের কোনো রিপোর্টের মূলকথা বিশেষ করে সরকারের পক্ষে না গেলেই শোরগোল তুলে ফেলেন ক্ষমতাসীনরা। সে সময় যে দল বা নেতা-নেত্রীই ক্ষমতায় থাকুন না কেন, প্রকাশিত রিপোর্ট এবং অভিযোগসহ বক্তব্য ‘নাকচ’ তারা করবেনই! শুধু নাকচ এবং প্রত্যাখ্যান করেও তারা থেমে পড়বেন না, এমন অভিযোগও হাজির করবেন যেন বিরোধী দলের সঙ্গে জোট বেঁধে কিংবা বিরোধী দলের গোপন পরামর্শেই সংস্থাটি রিপোর্ট পেশ করেছে! তাদের উদ্দেশ্য যে দুর্নাম প্রচার করে সরকারকে বিপদে ফেলা সেকথা বলতেও ক্ষমতাসীনরা দ্বিধা করেন না। এমন অবস্থা চলে আসছে বহুদিন ধরে এবং সব সরকারের আমলেই একই ঘটনার তথা প্রতিক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে।
বর্তমান পর্যায়ে কথা উঠেছে গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক রিপোর্ট ও তার প্রতিক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশÑ টিআইবি ১৫ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রাথমিক রিপোর্টে অভিযোগ করেছে, তিনশ’র মধ্যে ৫০টি আসনের ভোটকেন্দ্রে প্রতিপক্ষের তথা বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পোলিং এজেন্টদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি এবং প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বাহিনীগুলো নীরব ভূমিকা পালন করেছে। রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ৫০টির মধ্যে ৪৭টিতেই নানামুখী অনিয়ম ঘটেছে, ৪১টি আসনে বিপুল সংখ্যায় জাল ভোট পড়েছে। ফলে সব মিলিয়েই ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ‘প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত’ হয়েছে। বিষয়টির বিচার বিভাগীয় তদন্তেরও দাবি জানিয়েছে টিআইবি।
টিআইবির এ রিপোর্টের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনরা যাকে বলে ‘আদাজল খেয়ে’ প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। কেন বিশেষ ৫০টি আসনের ব্যাপারেই টিআইবি এত আগ্রহ দেখিয়েছে- সে প্রশ্নও তুলেছেন তারা। অন্যদিকে টিআইবি কিন্তু শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছে, সময় এবং জনবল স্বল্পতার কারণে সংস্থাটির পক্ষে এক সঙ্গে তিনশ আসনের ওপর জরিপ বা গবেষণা চালানো সম্ভব হয়নি। টিআইবি তাই ‘দ্বৈবচয়ন’ নীতির ভিত্তিতে ৫০টি আসনকে বেছে নিয়েছিল। উল্লেখ্য, সারা বিশ্বেই ‘দ্বৈবচয়ন’ একটি স্বীকৃত গবেষণা পদ্ধতি। ইংরেজিতে একে র‌্যান্ডম স্যামপ্লিং বলা হয়। এটা অনেকাংশে দু-একটি ভাত টিপে হাড়ির সব ভাতের ব্যাপারে জেনে নেয়ার মতো পদ্ধতি।
টিআইবি তার ১৫ জানুয়ারির রিপোর্টে বলেছে, তাদের নির্বাচিত আসনগুলোর অনিয়ম অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, ৫০টির মধ্যে ৩০টিতেই আগের রাতে ব্যালট পেপারে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পক্ষে সিল মেরে রাখা হয়েছিল। এছাড়া ৪১টি আসনে জাল ভোট দেয়ার এবং ৪২টি আসনে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বাহিনীগুলোর নীরব ভূমিকা পালন সম্পর্কে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ৩৩টি আসনে আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে রাখার এবং ৩০টি আসনে বুথ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মেরে জাল ভোট দেয়ার তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে টিআইবি।
এর বাইরে ২১টি আসনে আগ্রহী ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো হয়েছে, অনেককে ভোটকেন্দ্রেই প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট মার্কায় তথা ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে ২৬টি আসনে। শুধু তা-ই নয়, ২০টি আসনে ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট বাক্স ভরে রেখেছিল ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। তাছাড়া ২২টি আসনে নির্দিষ্ট সময় শেষ না হতেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে গেছে বলে ভোটারদের জানানো হয়েছিল এবং ২৯টি আসনে প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।
সব মিলিয়ে জরিপ ও গবেষণার যে ফল পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে টিআইবি তার রিপোর্টে বলেছে, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ‘প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত’ হয়েছে। স্মরণ করা দরকার, সংস্থাগতভাবে আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট প্রকাশ করারও আগেÑ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরদিনই সহিংসতায় মানুষের মৃত্যু এবং বলপ্রয়োগসহ আচরণবিধি লংঘনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচন ‘প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত’ হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ লংঘনের বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগসমূহের বিচারবিভাগীয় তদন্তও দাবি করেছিলেন তিনি। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছিলেন, সহিংসতা এবং বলপ্রয়োগ সংক্রান্ত সকল অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে তার ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। টিআইবি শুরু থেকেই সব পক্ষের জন্য প্রতিযোগিতার সমান ক্ষেত্র নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে এসেছে উল্লেখ করে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক বলেছিলেন, তাদের এই দাবির প্রতি উপেক্ষা দেখানো হয়েছে। একটি প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের তথা বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফন্টের প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করার পাশাপাশি তাদের ওপর হামলা ও নির্যাতন চালানো হয়েছেÑ যা গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত। এমনকি নির্বাচনের আগের রাতে এবং নির্বাচনের দিনও নির্যাতন ও হয়রানি চলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান তার বিবৃতিতে বলেছিলেন, উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কারণ হলো, এর ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি দেশের জনগণের আস্থাহীনতা তৈরির আশংকা দেখা দিয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক প্রসঙ্গক্রমে কিছু ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন। যেমন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পোলিং এজেন্টরা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেননি। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার অত্যন্ত গুরুতর এই অভিযোগও এড়িয়ে গেছেন। ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে সিইসির এ ধরনের মনোভাব শুধু বিব্রতকর নয়, নির্বাচন কমিশন আদৌ তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে কি না এর মধ্য দিয়ে সে বিষয়েও সন্দেহ ও উদ্বেগ ঘনীভূত হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ লংঘন করে মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতির নামে ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখারও সমালোচনা করা হয়েছিল বিবৃতিতে। ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেছিলেন, তাছাড়া ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট পেপার ভর্তি বাক্স নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, বহু ভোটারের ভোট দেয়া বাকি থাকতেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে গেছে বলে জানানো এবং ভোটকেন্দ্রে প্রার্থীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মতো যেসব সচিত্র খবর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর বিষয়েও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া এবং ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনকে তাদের ব্যর্থতা নিরুপণ করে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। ‘অভূতপূর্ব নির্বাচন’ ও ‘অভূতপূর্ব ফলাফলের’ ওপর ভিত্তি করে নতুন যে সরকার গঠিত হবে তার মর্যাদা, আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এ তদন্ত অবশ্যকরণীয় বলে মন্তব্য করেছিলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের বিবৃতির মূলকথাগুলোকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সচেতন সকল মহলই বলেছিলেন, সহিংসতা ও আইনের লংঘনসহ কোনো একটি প্রসঙ্গেই ড. ইফতেখারুজ্জামান অসত্য বা সামান্য বাড়িয়ে বলেননি। কারণ, এই সত্য প্রমাণিত হয়েছে যে, বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তথা বিরোধী দলকে প্রতিহত করার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দল এবং নির্বাচন কমিশন ‘এক হয়ে’ কাজ করেছে। পুলিশ ও প্রশাসনও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষেই ভূমিকা পালন করেছে। ফলে বিরোধী দলের প্রার্থীরা নির্বিঘেœ প্রচারণা চালাতে পারেননি। নির্বাচনমুখী কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই দেশের বিভিন্নস্থানে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন সহিংসতা শুরু করেছিল। প্রতিদিনই আক্রান্ত হয়েছেন বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও নেতা-কর্মীরা।
কিন্তু সুনির্দিষ্ট ও তথ্যভিত্তিক অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। প্রশাসন ও পুলিশ উল্টো ঐক্যফ্রন্টের আক্রান্ত ও আহত নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করেছে। তাদের তাড়িয়ে ফিরেছে। ফলে একদিকে সন্ত্রাস-সহিংসতা অব্যাহত থেকেছে এবং বিরোধী দলগুলোর পক্ষে নির্বিঘেœ প্রচারণা চালানো সম্ভব হয়নি, অন্যদিকে ভীত-সন্ত্রস্ত ভোটার জনগণের পক্ষেও তাদের পছন্দের প্রার্থীদের নির্ভয়ে ভোট দেয়া সম্ভব হয়নি। এমন অসংখ্য ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে যেখানে ভোটাররা ভোট দিতে না পেরে ফিরে গেছেন। আগের রাতে ব্যালট পেপারে নৌকার সিল মেরে বাক্স ভরে ফেলার সচিত্র খবর এমনকি বিবিসি পর্যন্ত প্রচার করেছে। অর্থাৎ সব মিলিয়েই নিরপেক্ষ নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হতে পারেনি। নির্বাচনও সুষ্ঠু হয়নি।
এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই টিআইবির পক্ষ থেকে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছিল। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ, এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী জোট শুধু অবিশ্বাস্য সংখ্যক আসনই দখল করেনি, প্রদত্ত ভোটের সংখ্যাও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। টাঙ্গাইলের মতো কোনো কোনো এলাকায় ভোট পড়েছে এমনকি ৯০  থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত!
এভাবে সব মিলিয়েই অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল জনগণকে স্তম্ভিত করেছে। একই কারণে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক শুধু সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানাননি, একথাও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গেই বলেছেন যে, ‘অভূতপূর্ব’ নির্বাচন ও ‘অভূতপূর্ব’ ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে নতুন যে সরকার গঠিত হবে তার মর্যাদা, আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এ তদন্ত অবশ্যকরণীয়।
টিআইবির আনুষ্ঠানিক প্রথম রিপোর্টেও নির্বাহী পচিালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মূল্যায়ন ও বক্তব্যের পুনরুল্লেখ লক্ষ্য করা গেছে। সংখ্যা উল্লেখ করে বিভিন্ন অনিয়মের কথা জানানোর পাশাপাশি রিপোর্টে নির্বাচন কমিশনের ভ’মিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। সভা-সমাবেশ করার ব্যাপারে সব দলের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং বিরোধী দলকে দমনে সরকারকে বাধা না দেয়ার এবং বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও চরম ব্যর্থতা দেখিয়েছে কমিশন। নির্বাচনী অনিয়ম ও আচরণবিধি লংঘনের ক্ষেত্রেও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী-প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কমিশনকে কোনো প্রতিরোধমূলক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এছাড়া নির্বাচনের সময় পর্যবেক্ষক ও সংবাদ মাধ্যমের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, মোবাইলের ফোর-জি ও থ্রি-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা এবং যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমেও কমিশন ক্ষমতাসীনদের পক্ষে ভূমিকা পালন করেছে।
আগের সংসদ না ভেঙে নির্বাচন করার সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা সরকারের প্রশাসনিক ও আর্থিক সুবিধা ভোগ করলেও কমিশন উদাসিনতা দেখিয়েছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মী-প্রার্থীদের গ্রেফতার প্রতিরোধের জন্যও কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। প্রচারণার প্রতিটি পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা সম্পূর্ণ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও এবং এককভাবে তৎপরতা চালালেও বিরোধী দলের প্রার্থীরা থেকেছেন সুযোগবঞ্চিত অবস্থায়। ৫০টির মধ্যে ৩৬টি আসনে বিরোধী দলের প্রার্থীদের প্রচারণাকাজে বাধা দেয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মনোনয়নপত্র চ’ড়ান্ত হওয়ার পর ৪৪টি আসনে বিরোধী দলের প্রার্থী ও নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা এবং ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। ১৯টি আসনে সহিংসতার শিকার হয়েছেন তারা। তাদের নির্বাচনী ক্যাম্পও ভাংচুর করেছে ক্ষমতাসীন দলের কর্মী ও সমর্থকরা। কিন্তু কোনো বিষয়েই নির্বাচন কমিশনকে তৎপর হতে দেখা যায়নি। এভাবে সব মিলিয়েই কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কমিশন ক্ষমতাসীন দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেছে।
টিআইবির প্রাথমিক রিপোর্টে অন্য আরো কিছু অনিয়মের তথ্যও রয়েছে। সেসব তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতেই টিআইবি একদিকে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে ‘বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, অন্যদিকে দাবি জানিয়েছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করার জন্য। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের আসল কাজে ব্যর্থতা, উদাসিনতা ও অযোগ্যতা দেখালেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অবশ্য প্রতিক্রিয়া এসেছে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে। নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, টিআইবির এই রিপোর্ট নাকি ‘মনগড়া’ এবং ‘পূর্বনির্ধারিত’! টিআইবি নাকি এ ধরনের বিষয়ে গবেষণার যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তা না করেই ‘মনগড়া’ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে! সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য না থাকার কারণে রিপোর্টটিকে ‘পূর্বনির্ধারিত’ বলেও নাকচ করতে চেয়েছেন ওই নির্বাচন কমিশনার। অন্যদিকে দেশের সচেতন সকল মানুষের মতো রাজনৈতিক দলগুলোও কিন্তু টিআইবির রিপোর্টটিকে সঠিক, তথ্যনির্ভর এবং বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গ্রহণযোগ্যও বলেছে। গবেষণা পদ্ধতির অনুসরণেও টিআইবির কোনো ভুল হয়নি।
এজন্যই একবাক্যে নাকচ ও প্রত্যাখ্যান করার পরিবর্তে দলগুলো রিপোর্টে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহবান জানিয়েছে। বলেছে, সরকারকেও অনতিবিলম্বে এবং আরো বেশি জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আগেই তৎপর হতে হবে। কারণ, টিআইবি যেখানে ‘প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত’ বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে, সেখানে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে সম্পূর্ণ নির্বাচনটিকেই বাতিল করার জোর দাবি উঠতে শুরু করেছে। দেশপ্রেমিক গণতন্ত্রকামীরা চান না, একাদশ জাতীয় সংসদ প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত হোক এবং শেষ পর্যন্ত ওই সংসদ বাতিল হয়ে যাক। একই কারণে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকেও ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন বাতিল করার দাবিটির ব্যাপারে দ্রুত তৎপর হতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ