শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

দেশের এক-তৃতীয়াংশ শিশু এখনো ভুগছে পুষ্টিহীনতায়

মুহাম্মদ নূরে আলম : দারিদ্র্য হ্রাসে ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। দারিদ্র্যের হার এখন ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু সে হারে উন্নতি হয়নি পুষ্টি পরিস্থিতির। সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর ৩৬ শতাংশ এখনো খর্বকায়। আর শীর্ণকায় ১৪ শতাংশ শিশু। পাশাপাশি অপুষ্টির কারণে কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে ৩৩ শতাংশ শিশু। এদিকে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪১ শতাংশ শিশু এখনও পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বয়সী ৭৩ শতাংশ নারীর রয়েছে জিঙ্ক স্বল্পতা। পাঁচ বছর বয়সী তিন শিশুর মধ্যে একজন খর্বাকৃতির। সার্বিকভাবে উচ্চমাত্রার অপুষ্টির ঝুঁকিতে এখন বাংলাদেশ। তাই পুষ্টি নিরাপত্তাকে শুধু স্বাস্থ্যগত ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। কৃষি উৎপাদনকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন সম্ভব। দেশে খর্ব ও শীর্ণকায় শিশুর চিত্র উঠে এসেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ‘ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন বাংলাদেশ’ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিটের (এফপিএমইউ) ‘ন্যাশনাল ফুড পলিসি ক্যাপাসিটি স্ট্রেনদেনিং প্রোগ্রাম: মনিটরিং রিপোর্ট ২০১৬’-এর সূত্রে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের পুষ্টি নিরাপত্তায় বায়োফরটিফাইড ক্রপের কোন বিকল্প নেই। দেশের খাদ্য চাহিদার সিংহভাগই আসছে চাল থেকে। পুষ্টিসমৃদ্ধ অন্যান্য খাবার সেভাবে গ্রহণ করতে পারছে না মানুষ। খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্যের অভাব ও দরিদ্র পরিবারে খাদ্য সংকটের কারণে পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে এসব পরিবারের শিশুরা। অপুষ্টির মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠছে তারা। অর্থনৈতিকভাবে পরবর্তীতে কম উৎপাদনশীল হচ্ছে এসব শিশু।
দেশে খর্ব ও শীর্ণকায় শিশুর চিত্র উঠে এসেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ‘ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন বাংলাদেশ’ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিটের (এফপিএমইউ) ‘ন্যাশনাল ফুড পলিসি ক্যাপাসিটি স্ট্রেনদেনিং প্রোগ্রাম: মনিটরিং রিপোর্ট ২০১৬’-এ। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ১৯৯৬-৯৭ সালে দেশে খর্বকায় শিশু ছিল ৬০ শতাংশ। ২০১৫ সালে খর্বকায় শিশুর হার দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশে। ১৯৯৯-২০০০ সালে দেশে খর্বকায় শিশুর হার ছিল ৫১, ২০০৪ সালে ৪৩ ও ২০১১ সালে ৪১ শতাংশ। খর্বকায় শিশুর হার অনেকটা কমিয়ে আনা গেলেও শীর্ণকায় শিশুর সংখ্যা কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি বেশ ধীর। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬-৯৭ সালে ১২ শতাংশ শিশু শীর্ণকায় হলেও ১৯৯৯-২০০০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ শতাংশে। তবে ২০০৪ সালে এ হার ১৫ শতাংশে নেমে আসে। এছাড়া ২০০৭ সালে দেশে খর্বকায় শিশু ছিল ১৭, ২০১১ সালে ১৬ ও ২০১৪ সালে ১৪ শতাংশ। অন্যদিকে এ সময়ে দারিদ্র্য কমেছে উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ৫০ দশমিক ১ শতাংশ থাকলেও চলতি বছর তা নেমে এসেছে ২৪ শতাংশে।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়া ডিজিজ রিসার্চ বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) পরিচালক (সেন্টার ফর নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সেফটি) ড. তাহামিদ আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, এককভাবে একটি খাদ্যশস্যের ওপর নির্ভরতা পুষ্টির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। আবার অপুষ্টি রোধে এখনো দেশে সঠিক কোনো নীতিমালা বা দিকনির্দেশনা তৈরি হয়নি। তাই সবাই বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এতে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। খাদ্য তালিকায় বৈচিত্র্য আনতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, অপুষ্টি রোধে জাতীয়ভাবে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের মান উন্নয়নেও উদ্যোগ নিতে হবে। সমন্বয় আনতে হবে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমগুলোর মধ্যে।
আইসিডিডিআর,বি ও ব্র্যাকের ‘স্কেলিং আপ নিউট্রিশন: অ্যান আরজেন্ট কল ফর কমিটমেন্ট অ্যান্ড মাল্টি-সেক্টরাল একশন’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, উচ্চমাত্রার অপুষ্টির ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের ৩৬টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের ৫১ শতাংশ শিশু এনিমিয়ায় (রক্তস্বল্পতা) ভুগছে। মায়েদের ক্ষেত্রে এ হার ৪২ শতাংশ। দেশের অপুষ্টি ও খর্বকায়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বিশ্বব্যাংকও। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে অপুষ্টি ও খর্বকায় কমাতে আগামী দুই অর্থবছরে বাড়তি আরো ১ বিলিয়ন ডলার প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, অপুষ্টি নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ আছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন ও তদারকিতে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। গ্রামের চেয়ে এখন শহরে অপুষ্টি বেশি মাত্রায় দেখা দিচ্ছে। কেননা নগরে মানুষ নগদ খাদ্য ক্রয়ের মধ্যে অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তারা বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম একমাত্রিক হওয়ায় এটি বাস্তবায়ন সহজ হয়েছে। কিন্তু পুষ্টিনিরাপত্তা কার্যক্রমটিকে দেখতে হবে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে। খাদ্যের প্রাপ্তি ও ক্রয়ক্ষমতার পাশাপাশি, নিরাপদ খাদ্য, খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। বহুমুখিতা আনতে হবে কৃষি উৎপাদনেও। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) ‘গ্লোবাল নিউট্রিশন রিপোর্ট’ বলছে, দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদার ৭১ শতাংশই আসছে চাল থেকে। একক পণ্য হিসেবে চালের ওপর এ নির্ভরতার কারণে অপুষ্টি থেকে দ্রুত বেরোতে পারছে না বাংলাদেশ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি পুষ্টিনিরাপত্তায় সরকার কৃষিপণ্য উৎপাদনে বহুমুখিতা আনছে। দানাদার খাদ্যশস্যের পাশাপাশি ফল-সবজির উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া পুষ্টিকর বিশেষ করে জিংক ও ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ চালের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত উৎপাদন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
গবেষক আনোয়ার ফারুক বলেন, হারভেস্ট প্লাস প্রোগাম বাংলাদেশে জিঙ্কের ঘাটতি পূরণে ব্রি ও ইরির সহায়তায় আবিষ্কার করে জিঙ্ক ধান। প্রয়োজনীয় শক্তির ৮৪ শতাংশই আসছে ভাত থেকে। মোট জমির ৭০ শতাংশ জমিতে ধান চাষ হয়। সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশেই প্রথম জিংক সমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। জিংক সমৃদ্ধ ধানে জিঙ্কের পরিমান বেশি থাকে। জিঙ্ক সহ অন্যান্য অপুষ্টির ঘাটতি পুরণে বিশ্বে ২০০২ সাল হতে কাজ করে যাচ্ছে হারভেস্টপ্লাস প্রোগ্রাম। হারভেস্ট প্লাস প্রোগ্রামটি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ট্রপিক্যাল এগ্রিকালচার ও ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রির্সাচ ইনিস্টিটিউটের যৌথ প্রয়াসে পরিচালিত। যেটি ইন্টারন্যাশনাল কনসালটেটিভ গ্রুপ ফর এগ্রিকালচারাল রির্সাচ অন এগ্রিকালচারাল ফর নিউট্রিশন এন্ড হেলথ এর অংশ। দেশের পুষ্টি নিরাপত্তায় বায়োফরটিফাইড ক্রপের কোন বিকল্প নেই। তাই এটিকে উৎসাহিত করতে গেলে যেমন গবেষনায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, তেমনি কৃষক পর্যায়ে আবাদের জন্য ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে হবে।
পুষ্টিহীনতায় ভুগছে হাওর অঞ্চলের শিশুরা: খাদ্য স্বল্পতার কারণে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে হাওর অঞ্চলের শিশুরা। চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের পুষ্টিকর খাবার, ডিম, শাকসবজি খেতে দিতে হবে। এ ছাড়া, সমস্যা বেশি হলে, স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এদিকে, ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বার্থে সুষম খাদ্য বিতরণের দাবি জানিয়েছে হাওরবাসী। মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকলেও, অকাল বন্যায় ফসলহানির কারণে পরিমিত খাবার পাচ্ছে না হাওরাঞ্চলের অনেক শিশু।
হাওরবেষ্ঠিত নেত্রকোনা জেলার মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি উপজেলায় একদিন থেকে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার শিশু রয়েছে। অভাব-অনটন, দুঃখ-দুর্দশাই বেশিরভাগ শিশুর নিত্যসঙ্গী। হাওরে অকাল বন্যা সেই দুর্দশা আরো বাড়িয়েছে। অপুষ্টির কারণে দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন ধরণের রোগ। প্রত্যন্ত হাওর এলাকায় কোন চিকিৎসক বা মাঠকর্মী না পাওয়ার অভিযোগ করেছে হাওরবাসী। তবে, ওই এলাকায় পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ রয়েছে জানিয়ে চিকিৎসকরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সার্বক্ষণিক তৎপরতা রয়েছে। এদিকে, হাওরাঞ্চলে শিশুখাদ্যের বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। শিশুদের সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে হাওরবাসী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ