শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

বাদশাহ আকবরের প্রেম কাহন

মো. জোবায়ের আলী জুয়েল : পিতা হুমায়ুনের মৃত্যুর সময় আকবরের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। আর এ বয়সেই ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ জানুয়ারি তাঁর প্রধান সহায়ক বৈরাম খাঁ তাঁকে দিল্লীর সিংহাসনে বসালেন।
আকবর এত সহজে হিন্দুদের প্রিয়পাত্র হলেন যে, কেউ আপন বোন, কেউ বা নিজের কন্যাকে সম্রাটের হেরেমে প্রবেশ করিয়ে দিতে কুণ্ঠিত হলেন না। অম্বর ও জয়সালমীরের হিন্দু রাজকুমারী দ্বয়কে রাজা ভগবান দাসের কন্যা এবং মাড়োয়ারের রাজা উদয় সিংহের কন্যার সাথে পুত্র সেলিমের বিয়ে দিলেন।
আকবরের জীবদ্দশাতেই তাঁর দুই পুত্র মুরাদ ও দানিয়েল অত্যন্ত মদ্যপানে মৃত্যুমুখে পতিত হন। জ্যেষ্ঠপুত্র সেলিম বা জাহাঙ্গীরও চরম মাতাল ছিলেন বলা যেতে পারে। মহামতি আকবরের পুত্রদের মধ্যে মদ্যপান এতো চরমে ওঠে যে মদে আর নেশা হতো না বলে তারা মদের সাথে ভাং নামক উগ্র মাদক দ্রব্য মিশ্রিত করে পান করতেন।
১৫৬২ খ্রিষ্টাব্দে অম্বর রাজ্যের রাজা বিহারী মল্ল আকবরের আনুগত্য স্বীকার করেন এবং তাঁর কুমারী এক কন্যাকে দান করেন। সেলিম বা জাহাঙ্গীরের জন্ম এ কন্যার গর্ভেই হয়েছিল। সেলিম চিস্তি নামে এক মুসলমান সাধক দোয়া করেছিলেন বলে তারই নামানুসারে নাম রাখা হয়েছিল “সেলিম”।
তারপর মানসিংহ আকবরকে তাঁর আপন বোন রেবারানীকে দান করেন। আকবর নিজে না বিয়ে করে পুত্র জাহাঙ্গীর সেলিমের সাথে তাঁর বিয়ে দেন। মানসিংহের বোন ছিলেন বিহারী ভগবান দাসের কন্যা। এ কন্যারই গর্ভজাত সন্তান আগ্রার তাজমহল খ্যাত খসরু ওরফে শাহজাহান।
যোদপুরের রাজা উদয়ের কন্যাকেও গ্রহণ করেন আকবর। বীকানীরের রাজা রায় সিংহ ও তাঁর কন্যাকে দান করলেন মহামতি আকবরের হেরেমে। তাঁকে বিয়ে করলেন জাহাঙ্গীর। জয়সলমীরের রাজা আকবরের বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন, শুধু বশ্যতাই নয়, সে সাথে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর প্রিয়তমা কন্যাকেও।
মোটকথা, মহামতির আসল ইতিহাস আমাদের সকলকে মনে করিয়ে দেয় তাঁর অসংখ্য স্ত্রী, অ-স্ত্রী আর পত্নী উপপত্নীর কথা, যাদের দ্বারা মহামতি আকবর সর্বসময়ই জমজমাট থাকতেন। কিন্তু যেহেতু এসব কীর্তি ইতিহাসে প্রকাশ হলে “মহামতি” নামের স্বার্থকতা থাকে না, তাই এগুলো দৃষ্টির আড়ালেই চাপা ছিল এতদিন।
আকবরের বহু সংখ্যক উপপত্নী ছিল। এসব নতুন তথ্যের সন্ধান মুসলমান লিখিত ইতিহাসে পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিখ্যাত হিন্দু ঐতিহাসিক শ্রীরাম প্রসাদ গুপ্তের লেখা “মোঘল বংশ” গ্রন্থের ১৭৮ পাতার মন্তব্য বিশেষ স্মরণযোগ্য- “আকবরের উপপত্নীর সংখ্যা ছিল পাঁচ শতের বেশি”।
পাঁচশত নারীর ধর্ষক রাজা বলে ইতিহাসে যার নাম উল্লেখ আছে তাঁকে আমরা “মহামতি” বললেও আগামীকালের ইতিহাস বলবে কি করে? ভারতের বিখ্যাত “আওরঙ্গজেব” গ্রন্থের ১৩ পৃষ্ঠায় আরও সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে- “Akbar had over five thousand wife” আকবরের পাঁচ হাজারেরও বেশি স্ত্রী ছিল। যারা আকবরকে কন্যা দিয়েছিলেন তাঁরা স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়েই কন্যাসম্প্রদান করেছিলেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরবর্তীতে তারা বাদশার অনুগ্রহে ধন্য হয়ে অর্থ সম্পদ, সম্পত্তি ও সম্মান পেয়েছেন। আর রাজপুতদের হাতে এসেছিল রাজকীয় শক্তির মোটা একটি অংশ।
ইতিহাস বলে এই ধরণের বাঈজী এই উপমহাদেশের অন্যান্য মুসলিম রাজ্যসমূহ ও প্রদেশগুলোতে এ দেখা যায়। ঐতিহাসিক ফিরিস্তার মতে, মালবের সুলতান গিয়াস উদ্দীনের হারেমে ১৫,০০০ রমনী ছিলেন। নবাব সরফরাজ খানের হারেমে ১৫০০ রমনী ছিল (উদ্ধৃত: কে. পি. সেন বাংলার ইতিহাস পৃষ্ঠা নং- ১৩৪)।
করম আলীর মতে, নবাব সিরাজউদ্দৌলার হারেমে ৫০০ রমনী ছিল এবং পলাশী যুদ্ধের পরে এরা মীরজাফর ও মীরণের অধিকারে আসে (তথ্য সূত্র:- মুজাফফর নামা পৃষ্ঠা নং- ৭৭-৭৮)। মীরজাফর পলাশী যুদ্ধের পর এসব সুন্দরী রমনীর দশজন রবার্ট ক্লাইভকে উপহার দেন (তথ্য সূত্র:- মাসির-উল ওমরাহ পৃষ্ঠা নং- ১৯১)।
এবার আবারো আকবর প্রসঙ্গে আসা যাক-
একপক্ষ বলেন, আকবর ও রাজপুতদের উদারতার সাক্ষ্য কন্যা প্রদানের ক্ষেত্রে। অপরপক্ষ বলেন নারী লোলুপতা আর চরিত্রহীনতা প্রকাশ পেয়েছে মহামতির দিক থেকে। পার্থিব উন্নতির জন্য যাঁরা নিজেদের কন্যা ও বোনকে চরিত্রহীনদের হাতে স্বেচ্ছায় অর্পণ করতে পারেন তাঁরা নিঃসন্দেহে শুভকর্ম করেন নি।
তবে ইতিহাস বলে প্রত্যেক রাজপুত বীর পাইকারী হারে এ পাপ পঙ্কিলে নিমজ্জিত হয়েছিলেন তা’ নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ১৫৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বাদশাহ আকবর যখন মধ্যপ্রদেশের গন্ডোয়ানা দখল করেন তখন সেখানকার বিধবারানী দূর্গাবতী যুদ্ধে পরাস্ত হন কিন্তু পরে তিনি আত্মহত্যা করেন তবুও আকবরের হাতে পড়েন নাই। মেবারের রানা সংগ্রাম সিংহের পুত্র উদয় সিংহ আকবরের প্রস্তাব সত্ত্বেও তাঁর কন্যাকে সমর্পন করেন নাই।
যার ফলে আকবর কর্তৃক চিতোর আক্রান্ত হয় ১৫৬৭ খ্রিষ্টাব্দে। যুদ্ধে পরাজিত রাজপুত্রদের প্রাণ দিতে হলো “মহামতি” আকবরের নিষ্ঠুর হাতের ইঙ্গিতে। আর নারীরা হাল চাল বুঝতে পেরে “জহরব্রত” পালন ও আগুনের চিতার মতো তৈরি করে তাতেই ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন  করলেন। পুত্র প্রতাপ সিংহ ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে “হলদি ঘাটের যুদ্ধে” আকবরের হাতে পরাজিত হলেন কিন্তু আকবরের নিকট বশ্যতা স্বীকার ও কন্যা দানের চিন্তাকে মুহূর্তের জন্য মস্তিষ্কে আসতে দেন নাই।
একবার আকবরের শ্যালক ও সেনাপতি মানসিংহ প্রতাপের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন। রানা প্রতাপ সিংহ মোটেই মানসিংহকে অতিথি আপ্যায়ন বা সম্মান প্রদর্শন কিছুই করেন নাই। বরং অপমানের সুরে বলেছিলেন- “যারা মুসলমানকে (বাদশাহ আকবর) পিসি, বোন বা কন্যা দিয়েছে তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। মানসিংহের এতে মান বিনষ্ট হওয়ায় তিনি বলেছিলেন- “এর কেমন করে প্রতিশোধ নিতে হয় আপনাকে দেখাতে পারি জানেন?” প্রত্যুত্তরে রানা প্রতাপ সিংহ বলেছিলেন- “যাও, তোমার পিসে মশাই, ভগ্নিপতি, জামাইদা আকবরকে গিয়ে সব বলো এবং তাঁকে ও সাথে করে নিয়ে এসো”। মোট কথা প্রতাপ সিংহ একসাথে খাদ্য গ্রহণ করেন নাই এবং ঘৃণা ভরে উঠে গিয়েছিলেন (তথ্যসূত্র: রাজপুত, মারাঠা, রমেশচন্দ্র দত্ত)।
তারপর বনে জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে প্রতাপ সিংহকে এক হৃদয় বিদারক ঘটনার সম্মূখীন হতে হলো। তাঁর আদরের কন্যা ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদতে কাঁদতে ছটপট করতে লাগলো। এরপর তিনি  ধৈর্য্য ধারণ করতে না পেরে বাদশাহ আকবরকে এক লিখিত পত্রে জানালেন তাঁর কাছে তিনি আত্মসমর্পণ করতে সম্মত। পত্র পেয়ে খুশী হয়ে আকবর সভাসদকে ডেকে বললেন- “প্রতাপ সিংহের প্রতি কোনো অত্যাচার যাতে না হয় তার ব্যবস্থা করতে” ঠিক এ সময় সভাসদগণের মধ্যথেকে বাদশাহ জাহাঙ্গীরের শ্বশুর বিকানীর রাজা রায় সিংহের কনিষ্ঠ সহোদর পৃথ্বিরাজ রায় মর্মাহত হয়ে একপত্রে  প্রতাপ সিংহকে বললেন- “আমরা রাজপুতরা আকবরের অধীনতা স্বীকার করেও এবং তাঁকে কন্যা দিয়ে অধঃপতিত হলেও আপনার জন্য গর্ববোধ করি।
রাজপুত জাত আপনার মুখের দিকে চেয়ে আছে”। সে যাই হোক এ পত্র পাওয়ার সাথে সাথে প্রতাপ সিংহ নূতন করে শক্তি ধারণ করলেন এবং আকবরের আর বশ্যতা স্বীকার করলেন না।
আবার মোঘল সম্রাট আকবরের হেরেমে আসা যাক। মোঘল সম্রাট আকবরের হেরেমে ভারতের সকল ধর্ম ও জাতি গোষ্ঠীর প্রায় ৫ হাজার নারী ছিল। এদের মধ্যে প্রায় ৩শ জন ছিল পর্তুগীজ ও স্পেনীয় এবং এসব ইউরোপীয় নারীদের সঙ্গেই সম্রাট অনেক বেশি খোলামেলা ছিলেন বলে জানা যায়। এই ইউরোপীয় নারীদের মধ্যে “দিলুবা” নামে এক পর্তুগীজ স্বর্ণকেশী নারী আকবরের বিশেষ প্রিয় পাত্র ছিল।
“দিলুবা” আকবরের সভায় বেলি ড্যান্স পরিবেশন করতো। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতি পূর্ণিমায় আকবর একজন কুমারীকে নিয়ে তার স্বপ্নকুঞ্জে (খাবঘর) যেতেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বী যোদাবাঈ ছাড়া অন্য কোনো নারীর ভাগ্যে খাব ঘরে একাধিক বার যাওয়ার সুযোগ ঘটেনি।
আকবর তাঁর সভাসদদের স্ত্রীদেরও নেকনজরের বাইরে রাখেন নাই। কখনো কখনো সভাসদদের তাদের সুন্দরী স্ত্রীকে তালাক দিতে উৎসাহিত করতেন, যাতে তালাকপ্রাপ্তা নারীদের তিনি সহজেই কব্জা করতে পারেন। এ নারীরা রাজকীয় হেরেম দ্বিতীয় শ্রেণীর সদস্যের মর্যাদা পেতেন এবং অন্যদের তুলনায় তাদের যত্ন আত্তিও কম হতো। একসময় আকবরের হেরেম এদের সংখ্যা হাজার অতিক্রম করেছিল। তবে এদের মধ্যে “সকিনা” ছিল একমাত্র ব্যতিক্রম।
লাহোরের ওবায়দুল্লা তাঁর স্ত্রী সকিনা ১৫৬৪ খ্রিষ্টাব্দে আকবরের হেরেমে বন্দী হন। তিনি ছিলেন অসামান্য সুন্দরী ও উচ্ছল এক নারী। সকিনাকে যারা একবার দেখেছিলেন তারা প্রত্যেকেই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন ঈশ্বর সকিনাকে নিজ হাতে তৈরি করেছেন। শেষ পর্যন্ত সকিনার শোকে শেখ ওবায়দুল্লা করুনভাবে মৃত্যুবরণ করেন। শেখ ওবায়দুল্লার মৃত্যুর পরে বাদশা আকবর এক ফরমান জারীর মাধ্যমে বিধবাদের বিবাহ করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
আকবরের সুযোগ্য পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর পিতার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। জাহাঙ্গীর যখন শের আফগানের স্ত্রী মেহেরুন্নিসার (নূরজাহান) প্রেমে পড়েন তখন নূরজাহানকে তালাক দিতে না বলে সম্রাট জাহাঙ্গীর শের আফগানকে খুন করেছিলেন।
সে আমলে রাজা বাদশাহদের মধ্যে একটি বানী প্রচলিত ছিল- “আওরাত আউর জমিন, বাহুতে যার তাক্দ আছে সেই উপভোগ করে”।
সুদীর্ঘ ৪৯ বছর রাজত্ব করার পর ১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে অজস্র স্ত্রীকে বিধবা করে বাদশাহ আকবর পরলোক গমন করেন। আকবরের রাজত্বের শেষ ১০ বছরের ইতিহাস ভালভাবে পাওয়া যায় না।
লেখক : কলামিষ্ট, সাহিত্যিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা
jewelwriter53@gmail.com

তথ্যসূত্র :
১) মোঘল বংশ : শ্রী রাম প্রসাদ গুপ্ত
২) বাংলার ইতিহাস     : কে.পি. সেন
৩) মুজাফফর নামা    : করম আলী
৪) রাজপুত, মারাঠা     : রমেশচন্দ্র দত্ত
৫) চেপে রাখা ইতিহাস : আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ