শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ভারত কেন ভাঙ্গলো?

মনসুর আহমদ : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের ফল ঘোষিত হলে দেখা যায় বাংলার মুসলমান ভোটারগণ পাকিস্তানের দাবিতে তাদের স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করেছে।
১৯৪৬ সালে নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী কাজ হবে বলে সিমলা কনফারেনন্সে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় সে সূত্র অনুসারে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে শ্রমিক দল কেবিনেট মিশন নামে একটি প্রতিনিধি দল ভারতে পাঠান। বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও লীগ প্রধান সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগের দাবি সম্পর্কে কেবিনেট মিশনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা বলেন। তিনি কেবিনেট মিশনকে পাকিস্তানের দাবি মেনে নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক সংকট নিরসনের আহ্বান জানান।
কংগ্রেস ও লীগ নেতৃবৃন্দের  সঙ্গে দীর্র্ঘ আলোচনার পর কেবিনেট মিশন তাদের প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্র ঘোষণা করেন। কেবিনেট মিশনের তিনটি প্রস্তাবের মধ্যে অন্যতম প্রস্তাব ছিল কেন্দ্রে একটি অর্ন্তবর্র্তী সরকার গঠিত হবে। লীগ কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা গ্রহণ করায় কংগ্রেস কার্যনির্বাহী কমিটি অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার  গঠনের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে।
তারা স্বাধীন অখণ্ড ভারতের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য প্রস্তাবিত গণপরিষদে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মুসলিম লীগ অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করলে বড় লাট তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন এবং মুসলিম লীগকে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন করতে দেন নি।  ১৯৪৬ সালে ৬ই আগস্ট লর্ড ওয়াভেল নেহরেুকে অর্ন্তবর্র্তীকালীন সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। নেহেরু কিছু শর্তে ৫ জন মুসলিম লীগ সদস্যকে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারে নিতে রাজি হন। কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এ শর্ত গ্রহণ করেননি। ইতিমধ্যে ১৬ই আগস্ট মুসলমানগণ ভারতের সর্বত্র হরতাল ও সভার আয়োজন করে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালন করে। কলকাতার গড়ের মাঠে এ দিন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সভাপতিত্বে এক বিরাট সভার আয়োজন করা হয়। সভা আরম্ভ হওয়ার আগেই কলকাতার স্থানে স্থানে দাঙ্গা শুরু হয়।
এই দাঙ্গায় কলকাতায় ভয়ঙ্কর গণহত্যা ও ধ্বংসকাণ্ডের বিবরণ দিয়ে স্টিফেনস লিখেন, “শ্যামপুকুর ও পার্শবর্তী অঞ্চলে মানুষের মৃতদেহের স্তুপ নিকটবর্তী বাড়িগুলোর দোতলার মেঝ বরাবর উচুঁ হয়ে উঠেছিল।  স্থানীয় সংবাদপত্রের মতে প্রায় ৫০,০০০ লোক হতাহত হয়েছিল।  মেননের মতে ৫০০০ নিহত ও ১৫০০০ আহত হয়েছিল। স্টেটসম্যানের হিসাব অনুযায়ী হতাহতের সংখ্যা ২০,০০০ হাজারের কিছু বেশি ছিল।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী এ সময় বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, কংগ্রেস তাঁর মন্ত্রীসভার পতনের জন্য এ দাঙ্গা বাঁধিয়েছিল। ১৯২৪ সালের ২৪শে জুন প-িত নেহেরুর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। মুসলিম লীগ প্রথমে এ সরকারে যোগ দিতে অস্বীকার করলেও মুসলমানদের স্বার্র্থ বিবেচনা করে লীগ সদস্যগণ এ সরকারে যোগ দেন। এ সময় কেন্দ্রীয় পরিষদে যোগদানের আহ্বান করা হলে মিঃ জিন্নাহ বড় লাটকে জানিয়ে দিলেন যে, যতদিন পর্যন্ত কেবিনেট মিশনের পরিকল্পনা কংগ্রেস না মেনে নেয় ততদিন মুসলিম এতে অংশগ্রহণ করতে পারে না। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মিঃ এ্যাটলী ভারতের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পার্লামেন্টে এক ভাষণে বৃটিশ সরকারের ভারত শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের সদিচ্ছা প্রকাশ করেন।
১৯৪৭ সালের ২২ শে মার্চ লর্ড ওয়াভেলের স্থলে লর্ড  মাউন্ট ব্যাটেন শেষ বড় লাটের কার্যভার গ্রহণ করেন। তিনি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন।  এ সময় জিন্নাহও মুসলিম লীগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ পাকিস্তান দাবীর প্রতি অটল মনোভাব প্রদর্শন করলে কংগ্রেস এ দাবি মেনে নেয়।
কিন্তু মুসলিম লীগকে ও পাকিস্তানকে জব্দ করার জন্য তারা  এক নতুন প্রস্তাব উত্থাপন করে  যে, বাংলা ও পাঞ্জাবকে হিন্দুু মুসলমান অধিবাসী হিসাবে ভাগ করতে হবে। কিন্তু  মুহম্মদ আলী জিন্নাহ, পাঞ্জাবের গভর্ণর স্যার জনকিনস, বাংলার প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।
ইতিহাস সত্যিই বিচিত্র। যে হিন্দুরা লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিল তারাই আবার নিজ স্বার্থে বাংলা বিভক্তি  সম্পন্ন করল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৪৭ সালের ২৭ শে এপ্রিল অখ- স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বাংলার কংগ্রেসের অন্যতম অসাম্প্রদায়িক নেতা মিঃ বসু , কিরণ শঙ্কর রায় সহ আরও অনেকে এ প্রস্তাবের প্রতি সম্মতি জানান।
সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন ‘হিন্দু মহাসভা’ এবং কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়াশীল অবাঙ্গালী নেতাগণ এর বিরোধিতা শুরু করেন।
ফলে পরিকল্পনাটি বেশিদূর অগ্রসর হতে পারে নি। ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ভারত বিভাগের নীতি ঘোষণা করেন। এক দিকে কংগ্রেস হাই কমান্ডের বিরোধিতা এবং অন্য দিকে কংগ্রেস লীগের পাকিস্তান দাবি মেনে না নেয়ায় পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
এভাবে বসু, সোহরাওয়ার্দীর  অখ- স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। ভাইসরয়ের পক্ষে লর্ড ইজমে জিন্নাহকে জানিয়ে দিলেন, “If India was to be divided, Bengal and Panjab would also have to be split  in two, `according to the will of the peoole.’ এ সব অবস্থার প্রেক্ষাপটে জিন্নাহ বলতে বাধ্য হলেন ‘Better a month- eaten Pakistan that no pakistan at all. ‘এভাবেই ইতিহাসের অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ ই আগস্ট  বৃটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামক দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রের  জন্ম হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ