শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

দ্বি-জাতি তত্ত্ব এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা

আহমদ মনসুর : কাল প্রবাহের সাথে সাথে ইতিহাসেরও অনেক পরিবর্তন ঘটে। আমরা বর্তমানে যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে অতীতের দিকে তাকালে অতীতের অনেক ঘটনাই ফিকে মনে হবে। এমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা দ্বিজাতি তত্ত্ব; যা নিয়ে বর্তমান কালের অনেক প-িত বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কিছু অপরিপক্ব মগজের ব্যক্তিবর্গ দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরুদ্ধে বিষ উদগীরণ করে থাকেন। কটুক্তি করে থাকেন মিঃ জিন্নাহকে নিয়ে। আজ পুনরায় ভালভাবে দ্বিজাতি তত্ত্ব নিয়ে উপলব্ধির সময়  এসেছে।   
মিঃ জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্ব পেশের পটভূমি : প্রথম মহাযুদ্ধে পরাজিত তুরস্কের প্রতি মিত্র পক্ষে ব্যবহার মুসলমান দেশ মাত্রেরই বিরক্তি সৃষ্টি করেছিল। ইসলামের অধিকর্তা তুরস্কের খলিফার সাম্রাজ্য -ব্যবচ্ছেদ ভারত বর্ষের মুসলমান সম্প্রদায়ের মনেও গভীর রেখাপাত করে। এ সময় ডঃ আনসারীর নেতৃত্বে ‘খিলাফত কমিটি গঠিত হয়’। এ,কে ফজলুল হক ও মওলানা মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে বাংলা খিলাফত গড়ে ওঠে। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই নভেম্বর ফজলুল হকের সভাপতিত্বে খিলাফত বৈঠকের প্রথম অধিবেশন দিল্লীতে অনুষ্ঠিত হয়। বেশ কয়েকজন কংগ্রেস নেতাও খিলাফত বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন এবং মহাত্মা গান্ধী এর একটি বিশেষ সভায় সভাপতিত্ব করে ছিলেন। তিনি খিলাফতের বিষয়ে কংগ্রেসের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একই বছরের ডিসেম্বর মাসে মওলানা শওকত আলীর সভাপতিত্বে খিলাফতের দ্বিতীয় বৈঠক লক্ষ্ণৌতে অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে তুরস্ক ও খলিফার ব্যাপারে মুসলমানদের মনোভাব জানানোর জন্য বড়লাট ও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর নিকট একটি প্রাতনিধি দল পাঠানোর প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে ডঃ আনসারীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বড় লাটের সাথে সাক্ষাত করে মুসলমানদের অভিযোগগুলি তুলে ধরেন। কিন্তু তাঁরা বড় লাটের নিকট থেকে সন্তোষজনক উত্তর পাবার ব্যাপারে ব্যর্থ হন। ১৯২০ খিষ্টাব্দের মার্চ মাসে মওলানা মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল  ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জের সাথে সাক্ষাত করতে গিয়ে ব্যর্থ হন। মার্চ মাসে গান্ধী অহিংস আন্দোলনের এক ফতোয়া জারি করেন।
কলকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে (৪ঠা সেপ্টেম্বর,১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ) গান্ধী অহিংস অসহযোগ আন্দেলনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বাংলার কতিপয় বিশিষ্ট নেতা এবং মুহম্মদ আলী জিন্নাহর বিরোধিতা সত্ত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠের  ভোটে গান্ধীর প্রস্তাব গৃহীত হয়। জিন্নাহ গান্ধীর প্রস্তাবের প্রতি বিশেষ আস্থাবান ছিলেন না।
খেলাফত আন্দোলনের সাথে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হল। বাংলার নেতা ফজলুল হক অসহযোগের নীতি পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেননি। বিভিন্ন কারণে অসহযোগ আন্দোলনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কোন কোন স্থানে হিন্দু মুসলমান জনতার মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। গান্ধী বিভিন্ন ঘটনায় ব্যথিত হয়ে তিনি আন্দোলন বন্ধ করার ডাক দেন। অসহযোগ আন্দোলনের পরিণতিতে খিলাফত আন্দোলনও ক্রমশ স্তিমিত হয়ে পড়ে। অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচীর ব্যাপারে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতাদের  মধ্যে কিছুটা ব্যবধান সৃষ্টি হয়। তখন বাংলার কয়েকজন প্রখ্যাত নেতা খোলা মন নিয়ে বাংলার রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে আলাপ আলোচনা করেন এবং একটা সমঝোতায় আসার চেষ্টা করেন। এদের মধ্যে চিত্তরঞ্জন দাস, এ,কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন উদারপন্থী এক নেতা। অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ  হয়ে গেলে চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে কংগ্রেসের অন্যান্য নেতাদের মতানৈক্য হয়। চিত্তরঞ্জন দাশ বাস্তবদর্শী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দাবিদাওয়া অবজ্ঞা করে ভারতের স্বাধীনতা লাভ সম্ভব নয়। তাই তিনি ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পথে প্রধান অন্তরায় হিন্দু-মুসলিম সমস্যা সমসাধানে এগিয়ে আসেন এবং  তিনি ফজলুল হক , সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট ’ নামক রাজনৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হন। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই জুন অকস্মাৎ চিত্তরঞ্জন দাশ মৃত্যুবরণ করলে তার স্বরাজ পার্টি ও ব্যাঙ্গল প্যাক্টের অপূরণীয় ক্ষতি হয়।  তার মৃত্যুর পরে জে, এম,  সেন এবং পরবর্তীতে সুভাষ চন্দ্র বসু স্বরাজ পার্টির নেতৃত্ব লাভ করেন। এরপরেই স্বরাজ পার্টির কর্মসূচীতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে এবং হিন্দু মুসলিম সভ্যদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় এবং বেঙ্গল প্যাক্ট অচল হয়ে পড়ে। হিন্দু মুসলিম সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। ১৯২৮ সালে নেহেরু রিপোর্টে মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনের বিরোধিতা করা হয়। মুসলিম নেতারা দলমত নির্বিশেষে নেহেরু রিপোর্টের তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
মুহম্মদ আলী জিন্নাহ শুরু থেকেই নেহেরু রিপোর্টের বিরোধিতা করেন। তিনি মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রয়োজনে ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ঐতিহাসিক চৌদ্দ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এর পর থেকে হিন্দু মুুসলিম রাজনীতি ক্রমশ স্বতন্ত্র ধারায় অগ্রসর হতে থাকে। এর পরে বিভিন্ন সময় হিন্দু নেতাদের অদূরদর্শিতা ও অনুদারতা হিন্দু মুসলিম সম্পর্কের দূরত্ব আরও প্রসারিত করে। কংগ্রেস নেতাগণ  বিভিন্ন সময়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। তারা যুক্তপ্রদেশ, বোম্বে ও মাদ্রাজ প্রভৃতি প্রদেশে নির্বচন মৈত্রী অনুযায়ী এ সমস্ত প্রদেশের মন্ত্রিত্ব গ্রহণকালে লীগের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব মেনে নিতে অস্বীকার করে। নির্বাচনের আগে ও পরে এই দুই নীতিকে জিন্নাহ বিশ্বাস ভঙ্গ মনে করেন এবং হিন্দু মুসলিম ঐক্যে আজীবন বিশ্বাসী জিন্নাহ কংগ্রেসের উপর থেকে আস্থা হারান। এর পরেই মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৩৯ সালে তাঁর দ্বি-জাতি তত্ত্ব ঘোষণা  করেন।  মিঃ জিন্নাহ দাবি করেন,  .. We maintain that Muslims and Hindu sare  two major nations by any definition or test as a nation.  We are a nation of hundred  million, and what is more. We are a nationwith our distinctive culture  and civilization, language and literature, art and architecture, names and nomenclature, sense of values and proportion, legal laws and moral codes, customs abd calendar, history and  traditions, aptitudes and ambitions: in short , we have our  distinctive outlook on life and of life. By all the canons of international law, we are a nation. 
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে জাতীয়তার যেকোন সংজ্ঞা বলে জাতীয়তা নির্ধারণে যে কোন পরীক্ষায় মুসলমান ও হিন্দু দুইটি প্রধান জাতি। আমরা শত মিলিয়ন বা তার অধিক জনতা স্বাতন্ত্র সূচক সংস্কৃতি - সভ্যতা, ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে আলাদা একটি জাতি। কলা স্থাপত্য শিল্প, নাম , নামকরণ পদ্ধতি , মূল্যবোধ , রাষ্ট্রীয় বিধান , নৈতিক রীতি নীতি, বর্ষপঞ্জী , ইতিহাস -ঐতিহ্য , রুচিবোধ ও লক্ষ্যের দিক দিয়ে আলাদা জাতি। সংক্ষেপে আমাদের রয়েছে ইহকালীন জীবন ও পরকালীন জীবন সম্পর্কিত আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি। আন্তর্জাতিক আইনের সমস্ত বিধান অনুসারে আমরা মুসলমান একটি জাতি।
দুই জাতি তত্ত্ব ও হিন্দু সমাজ
জিন্নাহকে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা বলে যারা প্রচার করেন তারা আড়াল করে রাখেন যে হিন্দুরাই ছিল দ্বিজাতি তত্ত্বের মূল ও প্রধান প্রবক্তা। 
১৯৩৭সালে হিন্দু মহাসভার সভাপতি সাভার কার বলেন, ‘ভারতবর্ষকে আজ আরেক , অভিভাজ্য ও সুসংহত জাতি মনে করা যায় না। পক্ষান্তরে এ দেশে দুটি জাতি হিন্দু ও মুসলমান। ’ (এস এ মোহাইমেন , ইতিহাসের আলোকে দেশ- বিভাগ ও কায়েদে আযম জিন্নাহ, ’ঢাকা ১৯৯৪ পৃ:১২৩।
সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল বলেন, “আমরা চাই বা না চাই ভারতে দু’টি জাতি। এ সত্য মেনে নেয়া ছাড়া গতি নেই। ” (মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, ‘ ভারত যখন স্বাধীন হল” ,ভারতীয় বাঙলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ, কলকাতা ১৯৮৯, পৃ:১৮৩- ১৮৪)
প্রফেসর ড. জয়া চ্যাটার্জি লেখেন : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে কলকাতা টাউন হলে অনুষ্ঠিত সভায় (হিন্দু)ভদ্রলোক সমাজের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব যোগদান করেন। সেখানে একজন বক্তার সুপারিশের সাথে দ্বি-জাতি তত্ত্বের তাত্ত্বিকদের অনেক মিল আছে ; (তিনি বলেন)হিন্দু ও মুসলমানের পৃথক সাংস্কৃতিক সংশ্লিষ্টতা , তাদের শিক্ষা, ব্যক্তিগত আইন (পারসোনাল ল’) এবং অনুরূপ বিষয়ের প্রেক্ষিতে তাদেরকে পৃথক জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হতে এবং অতঃপর তার কোনোরকম মতভেদ ছাড়াই অল-বেঙ্গল ফেডারেশন এ্যাসেম্বলিতে এক সাথে সমতা , ন্যায়পরায়ণতা ও ভ্রাতৃত্বের শর্তে যোগ দিতে পারে। এ ধরনের যুক্তরাষ্ট্রীয় ধারণাই বাঙলার জন্য উপযোগী হতে পারে।’ (‘বাঙলা ভাগ হলো’ পৃ: ২৯। রাদা কুমুদ মুখার্জীর বক্তৃতা।  
জয়া চ্যটার্জী লেখেন, ফুটনোটে; মুখার্জীর উত্থাপিত বাঙলার হিন্দু মুসলিম দুই জাতির যুক্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিষয়টির সঙ্গে এবং  এক দশকের মধ্যে জিন্নাহ যে পাকিস্তানের দাবি তোলেন তার একটি নিশ্চিত সাযুজ্য লক্ষ্য করা যায়। ’ পৃ: ৫৬।
এ সব তথ্য প্রমাণ করে বর্ণ হিন্দুরাই দুই জাতি তত্ত্ব প্রথম আনে; তার পর মুসলমান নেতরা। ড. জয়া সত্য প্রকাশ করেছেন।
কঙ্কর সিংহ লেখেন, ‘ সাধারণভাবে সব মুসলমান বাঙালিদের ধারণা , কি পশ্চিম বাংলায়, কি বাংলাদেশে , ১৯৪৭’র বঙ্গ বিভাগের জন্য দায়ী হিন্দু বাঙালিরা, মুসলমান বাঙালিরা নন, এ ধারণাও অসত্য নয়।’( ১৯৪৭’র বাংলা বিভাগ অনিবার্য ছিল , পৃ: ১৫) কঙ্কর  লেখেন, ‘ বাংলাকে বিভক্ত করার কৃতিত্ব অবশ্যই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর। তার যুক্তি ছিল , অখ- ভারতে যদি হিন্দু- মুসলমান একসাথে থাকতে না পারে, তা হলে অখ- বাংলায়ও হিন্দু- মুমলমান মিলে মিশে একসাথে  থাকতে  পারবে না। তিনি পাঞ্জাবের উদাহরণও তুলে ধরেছিলেন। ধর্মকে দূরে রেখে ভাষার ভিত্তিতে জাতি গঠিত হতে পারে শ্যামাপ্রসাদ তা বিশ্বাস করতে চাননি। ’ পৃ: ৯২।
কঙ্কর লেখেন, ‘কলকাতার অমৃতবাজার পত্রিকা ১৯৪৭’র মে মাসে তাদের নিজস্ব ব্যবস্থায় বাঙলার জনমত যাচাই করেছিল। তারা তখন জানিয়েছিল, বাংলার সাতানব্বই শতাংশ হিন্দু বাংলা বিভাগ চান।’পৃ: ৯৫। 
 কঙ্কর লেখেন, ‘১৯৪৭-এ ইতহাসের অলৌকিক কারণে যতি ভারত বিভক্ত না হতো, শেষ পর্যায়ে জিন্নাহ- নেহেরু এক সাথে ভারতে  যুক্ত সরকার গঠন করে, বৃটিশের কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করতে রাজী হতো, তা হলেও বাংলাকে দ’ুটি এদেশে (এখন যাহাকে রাজ্য বলা হয়)বিভক্ত করতে হতো। সেই বিভাজনের ভৌগলিক সীমারেখা  অবস্থা আলাদা হতো। এটাই ছিল তখনকার সমকালীন রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। .. .. গত ৫০বছরে দুই বাঙালী মানসিক দূরত্ব অনেক বেড়ে গেছে। ইতিহাসের গতি ধারাতেই তা হয়েছে । এটাই এখানকার বাস্তবতা। দুই বাঙালীর সেই দূরত্ব সহজে কমে যাবে সেই ভাবনাটাও ভুল।’পৃ: ১১৫-১১৭(ইতিহাসের পুনঃপাঠঃ পলাশী থেকে বাংলাদেশ। ড. মুহাম্মাদ সিদ্দিক: সোনার বাংলা -১৪ ই ডিসেম্বর ২০১৮)
দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিরোধিতায় বুদ্ধিজীবী  সমাজ : ভারতের হিন্দু সমাজ ও কংগ্রেসের আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে জিন্নাহ এ মাহসত্য ভারতবাসীর সামনে পেশ করতে বাধ্য হন। যে জিন্নাহ হিন্দু মুসলিম মিলনের অগ্রদূত বলে পরিচিত ছিলেন তিনিই শেষ  পর্যন্ত  পেশ করলেন দ্বি- জাতি তত্ত্ব। এর পরে দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিরোধিতায় হিন্দু সমাজ নেমে পড়ল। প্রত্যেক ভূ-খণ্ডে জন্মগ্রহণকারীদের একই জাতি হওয়া উচিত এ ধারণার বশবর্তী হয়ে পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু লিখলেন, “ ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘু নিয়ে মাতামাতির অর্থ কি দাঁড়ায়? এর অর্থ এটাই দাঁড়ায় যে, একটা জাতি রয়েছে এবং তা বিচ্ছিন্ন , ইতস্তঃ বিক্ষিপ্ত ও অনির্দিষ্ট।  রাজনৈতিক  দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে এ ধারণাটা একেবারেই বাজে বলে মনে হয়। আর অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে এটা খুবই অকার্যপোযোগী এবং বিবেচনার যোগ্য বলাই কঠিন।  মুসলিম জাতীয়তার উল্লেখ করার অর্থই হলো ধর্মীয় ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছাড়া আর কোন জাতিই দুনিয়ায় নেই। এ জন্যই আধুনিক অর্থে কোন জাতীয়তার বিকাশ সম্ভব হয়নি। (আমার জীবন কথা)
তিনি আর এক ধাপ এগিয়ে বলেন, “অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে এটা (আলাদা মুসলিম জাতি সত্তার ধারণা) অত্যন্ত অসংলগ্ন ও অবাস্তব এবং একে বিবেচনার যোগ্য  মনে করাই দুরূহ। ” 
হিন্দু নেতাদের অনুরূপ কিছু মুসলমান ব্যক্তিত্বও দ্বি-জাতি তত্ত্বের সমালোচনায় নেমে পড়লেন।  মুসলমান ব্যক্তিত্বের অন্যতম মওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী।  তিনি যুক্ত জাতীয়তা ও ইসলাম শিরোনামে এক খানা পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। তিনি যুক্ত জাতীয়তার পক্ষে  সাফাই গাইতে গিয়ে পুস্তিকায় লেখেন, “ যুক্ত জাতীয়তার বিরোধীতা ও তাকে ধর্ম বিরোধী আখ্যায়িত করা সংক্রান্ত  যে সব ভ্রান্ত ধারণা প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে, তার নিরসন করা অত্যাবশ্যক বিবেচিত হলো। ১৮৮৫ সাল থেকে কংগ্রেস ভারতের জনগণের কাছে স্বাদেশিকতার ভিত্তিতে জাতিগত ঐক্য গড়ার আবেদন জানিয়ে অব্যাহতভাবে জোরদার সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। আর তার বিরোধী শক্তিগুলি সেই আবেদন অগ্রহণযোগ্য, এমনকি অবৈধ ও হারাম সাব্যস্ত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের জন্য  এ জাতিগত  ঐক্যর চাইতে ভয়ংকর আর কিছুই নেই, এ কথা সুনিশ্চিত। এ জিনিসটা ময়দানে আজ নতুন আবির্ভূত হয়নি,  বরং ১৮৮৭ সাল বা তার পূর্ব থেকে আবির্ভূত। বিভিন্ন শিরোনামে এর ঐশী তাগিদ ভারতীয় জনগণের মন মগজে কার্যকর করা হয়েছে। ( পৃঃ ৫-৬) তিনি আর এক ধাপ  এগিয়ে বলেন,“ আমাদের যুগে দেশ থেকেই জাতির উৎপত্তি ঘটে থাকে। ”
মওলানা সাহেবের এই পুস্তিকা প্রকাশিত হওয়ার পর নির্ভেজাল তাত্ত্বিক দিক দিয়ে জাতীয়তাবাদের বিষয়ে পুংখানুপুংখ বিচার গবেষণা চালিয়ে মওলানা মওদূদী (রঃ) রচনা করেন  “ইসলাম  জাতীয়তাবাদ” পুস্তক। তিনি যুক্ত জাতীতাবাদের  পক্ষের সব যুক্ত খণ্ডন করে দেখিয়েছেন যে, সমগ্র পৃথিবীর গোটা মানব বসতিতে মাত্র দু’টি দলের অস্তিত্ব রয়েছে; একটি আল্লাহর দল অপরটি শয়তানের দল। তাই এই দুই দল মিলে কখন এক জাতি হতে পারে না , যেমন পারে না তেল ও পানি মিশে  এক হয়ে যেতে। মওলানার এই বই তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।
লাহোর প্রস্তাবে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভূমিকা -
এ পুস্তকের সত্যতার উপরে নির্ভর করে  ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে মার্চ মুহম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে এ সময়ে লাহোর অধিবেশনে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানান হয়। এ, কে ফজলুল হক প্রস্তাবের উপস্থাপক ছিলেন।
ফজলুল হক ছিলেন পাকিস্তান সৃষ্টির সংগ্রামী পুরষদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ’ -এর ২৭তম অধিবেশনে এ.কে. ফজলুল হকের প্রস্তাব it is the considered view oF this session oF All India Muslim League that no constitutional plan would workable in this country or  acceptable to the Muslims unless  it is designed on the following basic principles, viz, thatgeographically contiguous units are demarcated into regions which should be so constituted, with such territorial  readjustments as may be necessary, that the areas in which thw Muslims are numerically in majority as in the North –Western and Eastern  zones of India, should be grouped to constitute independent States in which the constituent units shallbe  autonomous and sovereign বিপুল করতালি  ও হর্ষধ্বনির দ্বারা প্রস্তাবটি  অভিনন্দিত ও গৃহীত হয়।  এ সামান্য আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শেরে বাংলার রাজনীতি ছিল সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য , বিশেষ করে মুসলমানদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখাই ছিল তাঁর জীবনের রাজনৈতিক লক্ষ্য।         
এভাবে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় পাকিস্তান। পরবর্তীতে পাকিস্তান  ভেঙ্গে সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র। বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রধান চালিকা শক্তি ছিল  দ্বি-জাতি তত্ত্ব; যাকে ভুল প্রমাণ করার জন্য একদল বুদ্ধিজীবী উঠে পড়ে লেগেছেন। জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্ব হঠাৎ করে আপেল পড়ার মত কোন তত্ত্ব নয়। এ তত্ত্ব মানুষের সৃষ্টি থেকে, বিশেষ করে ইসলামের আবির্ভাব  থেকে সমাজে সুস্পষ্ট ছিল। রসুল স: বলেছেন “আল কুফরু মিল্লাতুন ওয়াহেদা ”- সমস্ত  কুফর জাতি এক জাতি এবং “আল মুসলেমু আখুল মুসলেমে”  - এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। এ এক চরম সত্য। যেহেতু  মুসলিম  ধর্মের মূল শিরক বিবর্জিত ওহদানিয়াতের প্রতি বিশ্বাস  ও তদানুযায়ী জীবনাচার। এই বিশ্বাসের রূপরেখা প্রতিফলিত হয় মুসলিম সংস্কৃতিতে ও এরই সৃষ্ট  শ্রেষ্ঠ চরিত্র দিয়ে।
কোরআন ধর্মের একত্বের উপরে জোর দিয়ে একে ঈমানের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত করেছে।  যে কারণে দেশের, ভাষার বিভিন্নতা সত্ত্বেও গোটা বিশ্বের মুসলিম সংস্কৃতিতে ঐক্যের সুর বিরাজমান। সব মুসলমান এক জাতি।
অভিন্ন জাতীয়তাবাদের খোড়া যুক্তি : কিন্তু যারা এক জাতীয়তাবাদ বিশেষ করে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী তারা জেনেও না জানার ভান করেন যে, যেহেতু ইসলাম ধর্ম ও হিন্দু ধর্ম সম্পূর্ণ বিপরীত  বৈশিষ্ট্যের  সে কারণে মুসলিম সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতি কোন কালেই এক হতে পারে না। মুহম্মদ এনামুল হকের ভাষায়, ‘তাহারা বুঝিলেন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে হিন্দু হিন্দুই এবং মুসলমান মুসলমানই, তাহারা পরস্পরের  সহিত মিশিয়া এক জাতি হইতে পারে নাই ও পারিবে না।’  যদি বাঙালী সংস্কৃতির জোয়ারে মুসলিম সংস্কৃতির স্রোতধারা থেমে যায় তা হলে  জাতি হিসেবে মুসলিম জাতি বেশি দিন টিকবে না। কারণ “জাতীয় জীবনের সঙ্গে জাতির কালচারের সেই রকম সম্বন্ধ - যেমন শরীরের সঙ্গে প্রাণের। যতদিন জাতীয় কালচার বর্তমান আছে , ততদিন জাতির মৃত্যু নেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই জাতীয় কালচারের সাহায্যেই জাতি সমস্ত বিপদ- আপদ অতিক্রম করে সিদ্ধির, মুক্তির উদার আকাশ তলে এসে দাঁড়ায়।”  [এস ওয়াজেদ আলী]।
অভিন্ন জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারীদের মনে রাখা উচিত যে, মুসলিম সংস্কৃতি কখনো বাঙালী সংস্কৃতির উপাদান হতে পারে না। কারণ “ গাছ ও বীজের মধ্যে যা সম্পর্ক ধর্ম ও সংস্কৃতির সম্পর্কও তাই। ধর্ম থেকে সংস্কৃতির জন্ম , বীজ থেকেই গাছের জন্ম।  গাছের মধ্যেও বীজ রয়েছে, সংস্কৃতির মধ্যেও ধর্ম লুকিয়ে রয়েছে।” -[আবুল মনসুর আহমদ] 
সুনীতি বাবুর মতে “যখন বাঙালী সংস্কৃতির সূত্রপাত হয়  তখন কেহ বাঙালীর নিজস্ব অনার্য সংস্কৃতির দিকে দৃষ্টিপাত করে নাই;  তখন যে ছাঁচে বাঙালীর সমাজ , বাঙালী ঐতিহ্য , রীতিনীতি শিল্প - সাহিত্য সবই ঢালা হয়েছিল , তাহা ছিল উত্তর ভারতের  সর্বজয়ী হিন্দু [ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্য - বৌদ্ধ - জৈন]  মন ব্রাহ্মণ্য - বৌদ্ধ - জৈন  সমাজ, ঐতিহ্য, রীতিনীতি , শিল্প সাহিত্যের ছাঁচে।   যে ছাঁচে সৃজ্যমান বাঙালী জাতিকে ঢালা হইল , মোটের উপর সেই ছাঁচ এখনও বাঙালী সমাজে বিদ্যমান। ” 
তা ছাড়া আমরা যতই হিন্দু পিরিতিতে মজতে চাই না কেন  হিন্দু সমাজ  কখনই  মুসলমানদেরকে বাঙালী হিসাবে গ্রহণ করতে তো রাজি নয়ই বরং তাদেরকে ম্চ্ছে, যবন ইত্যাদি কুরুচিপূর্ণ বিশেষণে নিন্দা করে থাকেন। সে কারণেই দ্বি-জাতি তত্ত্বের  উদ্ভব অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল ।  মুসলমানকে লীন করার চেষ্টা কোন ভাল পদক্ষেপ নয়। হিন্দু মুসলমানকে  এক দেহে লীন করার প্রচেষ্টা যে ভাল কাজ নয় তা উপলদ্ধি করে স্বয়ং  রবীন্দ্রনাথ কলেছেন,
“.. আজ আমাদের দেশে মুসলমান স্বতন্ত্র থাকিয়া নিজের উন্নতি সাধনের চেষ্টা করিতেছে । তাহা আমাদের পক্ষে যতই অপ্রিয় হউক এবং তাহাতে আমাদের আপাততঃ যতই অসুবিধা হউক , একদিন পরস্পরের যথার্থ মিলন সাধনের পক্ষে  ইহাই প্রকৃত উপায়।” [হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।]
প্রকৃতপক্ষে যারা দ্বি-জাতি তত্ত্ব¡কে ভুল প্রমাণিত করার চেষ্টা করেন তারা প্রকৃত পক্ষে ভুলের মধ্যেই আছেন। ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেনঃ-  মুসলমানেরা মধ্যযুগের আরম্ভ হইতে শেষ পর্যন্ত স্থল বিশেষে ১০০০ হইতে ৭০০ বৎসর হিন্দুর সঙ্গে পাশাপাশি বাস করিয়াও ঠিক পূর্বের মতোই আছে।- অষ্টম শতাব্দীর আরম্ভে মুসলমানেরা যখন সিন্ধু দেশ জয় করিয়া ভারতে প্রথম বসতি স্থাপন করে, তখনও হিন্দু মুসলমানের মধ্যে যে মৌলিক প্রভেদগুলি ছিল , সহস্র বছর পরেও এক ভাষার পার্থক্য ছাড়া ঠিক সেই রূপই ছিল ...
এই সত্যকে যারা অগ্রাহ্য করে যারা দ্বি-জাতি তত্ত্বকে ভুল বলতে চান তারা প্রকৃত পক্ষে  বাংলাদেশের স্বাধীনতা চান না। ১৯৭১ সালে Indian  Institute of Defence studies এর পরিচালক Mr. Subramanian পূর্ব বাংলা পরিস্থিতি সম্পর্কে ভরতে গিয়ে বলেছিলেন ‘What India must realize is the Fact that the break-upof East Pakistan is in our interest and we have an opportunity, the like of which will never come again.’
ভারতের একজন রাজনৈতিক বিশেষক মিঃ সুব্রানিয়াম স্বামী দৈনিক ডেইলী মাদার ল্যা- পত্রিকায় লিখেছিলেন, “The territorial gntegrity of Pakistan is none of our business, That is Pakistan’sworry All we should concern ourselves wich is two question; It is break up of Pakistan in our long-term national interest? If so, can we do something about it? and the commentator concluded that  the break- up of Pakisanisnot only in our external security interests.India should emerge as super power internationally and we have to natically  intergrarte our citizens for this role. For this the dismemberment of Pakistan is an essential precondition.  
এ সমান্য লেখা থেকে সুস্পষ্ট যে, যারা পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য মর্মাহত  তারাই বাংলাদেশকে ভারতের সাথে একাকার করে দিয়ে অভিন্ন দেশ,  অভিন্ন  জাতি হিসাবে দেখতে আগ্রহী। আর তাই জিন্নাহর উত্থাপিত দ্বি-জাতি তত্ত্ব  একটি ভুল তত্ত্ব ছিল প্রমাণ করার জন্য বৃথা কসরত করে যাচ্ছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ