বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি

মনসুর আহমদ : জে.এস. মিল ছিলেন গণতন্ত্রের প্রতি অনুরক্ত। তিনি তাঁর গ্রন্থে বলেন যে, একটি উত্তম সরকার হলেই জনগণ ভাল থাকবে এবং উত্তম সরকার হলো প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার। কিন্তু প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও তিনি ইংল্যান্ড ও আমেরিকার প্রচলিত প্রধিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের যে চিত্র প্রত্যক্ষ করেন তাতে তার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটে।
তিনি বলেন যে, বর্তমান যে গণতন্ত্র প্রচলিত আছে তা প্রকৃত প্রতিনিধিত্বমূলক নয়। কারণ এই পদ্ধতিতে জনগণ যাকে ভোট দেয় এবং সে যদি পরাজিত হয় তা হলে সে তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না। ফলে আইন পরিষদে জনগণের সেই অংশের প্রতিনিধি থাকে না। এ সব কারণে দেখা যায় জনগণের বৃহত্তর অংশের প্রতিনিধি আইন পরিষদে থাকে না। ফলে সংখ্যার দিক দিয়ে মাইনরিটি অংশই এ সরকার পরিচালনা করে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন দেখলে জে.এস. মিল নিশ্চয়ই ঘৃণার সাথে এ গণতন্ত্র প্রত্যাখ্যান করতেন। সত্যিকারভাবে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র পেতে হলে নিরপেক্ষ তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন ব্যতীত কোন প্রকারেই সম্ভব নয় বলে চিন্তাবিদগণ পুনরায় মনে করছেন।
 বর্তমান বাংলাদেশের উদ্ভবের মূলে আছে পাকিস্তানের অভ্যুদয়। পাকিস্তান না হলে আজকের বাংলাদেশ হতো না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাঙালি হিন্দু কোন দিনই চায়নি বাংলা ভাষাভিত্তিক একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গড়তে। যে কারণে সব বাংলা ভাষাভাষী মানুষ আসতে পরেনি একটি রাষ্ট্রের পতাকা তলে। বাংলা যাদের মাতৃভাষা তাদের ৬০% বাস করেন বাংলাদেশে। বাকি ৪০% বাস করেন ভারতে। বর্তমান বাংলাদেশ সৃষ্টি হতে পেরেছিল বাংলাভাষী মুসলমান থাকার কারণে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় বাংলাভাষী মুসলমান পূর্ব-পাকিস্তানে স্বাধীন হতে চেয়েছে। কিন্তু তারা কোন রাষ্ট্রের সাথে লীন হতে চায়নি। এখনও বাংলাদেশের মুসললিম চেতনা ও জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী জনগণের মধ্যে সেই মানসিক বাস্তবতা ও চেতনা বিরাজ করছে। কিন্তু আফ সুসের বিষয়, যারাই অন্য কোন রাষ্ট্রের গর্ভে বালাদেশের রাজনীতি , সাহিত্য-সংস্কৃতি, অর্থনীতি ইত্যাদি লীন হয়ে যাক চায় না তারা স্বাধীনতার শত্রু হিসেবে কিছু অর্বাচীনের কাছে বিবেচিত হচ্ছে।
 দেশটি যে গণতান্ত্রিক পথ পরিহার করে ফ্যাসিবাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এতে কোন সন্দেহ নেই। আইনস্টাইন বলেছেন যে, ফ্যাসিবাদ হল অন্ধ জাতীয়তাবাদ, জাতি বিদ্বেষী মনোভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত আদর্শ সম্বলিত একদলীয় সরকার। বর্তমান সরকার সমস্ত রাজনৈতিক দলের আদর্শের উপর কোন শ্রদ্ধা না রেখে অন্য সবকে দেশের শত্রু হিসেবে মনে করে থাকে। এটাই হল ফ্যাসিবাদের আসল চেহারা। আর এই চেহারাই স্পস্ট ফুটে উঠছে বর্তমান সরকারের মধ্যে। ফ্যাসিবাদের জন্মদাতা মুসোলিনির যেমন ছিল ‘ সংগ্রামী বাহিনী’ তেমনি বিরোধী দলকে দমন, নিশ্চিহ্ন করার মানসে সৃষ্টি করা হয়েছে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী লাঠিয়াল বাহিনী।
এ ভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সুষ্ঠু ভোট ব্যবস্থার প্রয়োজন। ভোট না থাকলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। ইতিহাস বলে, ফ্রান্সের চতুর্থ রিপাবলিক চলেছিল ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল, মোট বার বছর। এই ১২ বছরে মন্ত্রিসভার পতন ঘটেছিল ২০ বার। তাই বলা চলে  ফ্রান্সে ভোট ছিল তাই গণতন্ত্র ছিল। অবশ্য ভোট থাকলেই যে যথাযথ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা উদ্ভূত হয় তা কিন্তু ঠিক নয়। এর জন্য চাই নিরপেক্ষ ও মুক্ত নির্বাচন পদ্ধতি।
আমরা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য উঁচু গলায় হর্র্ষধ্বনি করে থাকি; আসলে তা ঠিক নয়। সাম্প্রতিক সময়ে যে নির্বাচন হয়ে গেল তা গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও পুনরুদ্ধার নয় ,বরং গণতন্ত্রকে কবর দেয়ার শামিল। এ নির্বাচন সম্পর্কে কিছু সত্য কথা বেরিয়ে এসেছে নানা জনের মুখ থেকে, যা মোটেই অতি রঞ্জিত নয়। ১লা জানুয়ারির একটি জাতীয় সংবাদ পত্রের সম্পাদকীয়তে এ ব্যাপারে বিস্তারিত লেখা এসছে; তার সামন্য অংশ মাত্র তুলে ধরা অনুচিত হবে না। বলা হয়েছে- ‘বিরোধীদলীয় এজেন্টদেরকে ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়া , বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে, ২০ দলীয় জোট তথা ঐক্যফ্রন্ট ও অন্যান্য বিরোধী দল ও ব্যক্তিদের এজেন্টদেরকে মারপিট, ভয়ভীতি দেখিয়ে বের করে দেয়া, কেন্দ্র দখল করে নৌকা মার্কায় সীল মারা বিভিন্ন স্থানে হামলা গ্রেফতার ও হত্যাকা-ের মতো মর্মান্তিক ঘটনা বাংলা দেশের ইতিহাসে কলংকজনক অধ্যায় সৃষ্টি করেছে।’ এমন নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র মুক্তি পেতে পারে না। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের নামে যে গণতন্ত্র চালু হতে চলছে তা ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারে না। এমন ধরনের গণতন্ত্রকে জে.এস. মিল মিথ্যা গণতন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর এ ভাবে গঠিত ক্ষমতাসীন সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রে কতটুকু শান্তি আসতে পারে তা প্রশ্ন বোধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর উত্তর পেতে বেশি দূর যাবার প্রয়োজন নেই। অবাধ অর্থ নীতির জনক এ্যাডাম স্মিথ সরকারের কার্যাবলী তিনটি কাজে সীমাবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী রাজার মাত্র তিনটি দায়িত্বের দিকে মনোনিবেশ করা দরকার; প্রথমত , সমাজকে অন্যান্য স্বাধীন সমাজের উৎপীড়ন ও আক্রমণ থেকে রক্ষা করা কর্তব্য; দ্বিতীয়ত, সমাজের প্রতিটি লোককে যতদূর সম্ভব অন্যান্য লোকের অবিচার ও নিপীড়ন থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু যে সরকার গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে নিপীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে তাদের মাধ্যমে  সমাজের জনগণ কি ভাবে অবিচার ও নিপীড়ন থেকে রক্ষা পেতে পারে? উত্তরে স্পষ্ট ভাবে বলা চলে; কোন ভাবেই সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে রুশ দার্শনিক রাদিশ্যেভের একটি বাণীর প্রতি । তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘এমন উদাহরণ নেই এবং পৃথিবীর শেষাবধি পাওয়া যাবে না যে সিংহাসনের উপবিষ্ট জার স্বেচ্ছায় তার কিছু ক্ষমতা ত্যাগ করেছে।’ 
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা দেখে মনে পড়ে হজরত মুসা (আঃ) ও ফেরাউনের ইতিহাস। “ হজরত মুসা (আঃ)-এর পূর্বে ইসরাইলী পশুপালক ও কিষাণ পরিবারগুলো মিসরের ফেরাউনের শাসনাধীন তাদের অবর্ণনীয় দুর্দশার উপর তুষ্ট ছিল। মিসরীয় শাসক গোষ্ঠীর কর্ম কৌশল ছিল বনী ইসরাইলী জনশক্তিকে দুর্বল করে দেয়া , কিন্তু একবারে নিশ্চিহ্ন করা নয়। যাতে করে দাস ও অর্ধ-দাসরূপী এই শ্রেণীটি মিসরবাসীদের জন্য সস্তা শ্রমিকের কাজ দিতে পারে। তাই হজরত মুসা (আঃ) যখন এই অর্ধ দাস[-দাসীরূপী জনগোষ্ঠীকে মিসর থেকে বের করে সীনাই প্রান্তরে নিয়ে আসার প্রস্তাব পেশ করেন, তখন তিনি মিসরের শাসক গোষ্ঠীরই বিরোধিতার সম্মুখীন হননি, বরং স্বয়ং বনি ইসরাইলও এই বিপজ্জনক পদক্ষেপের পোষকতা থেকে দূরে থাকে।” একটু চিন্তা করলে বুঝা যায়, বাংলাদেশের অবস্থাা প্রায় তাদের অনুরূপ। স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরাউন নেই, সবাইকে বঞ্চিত করা নির্বাচন আছে।
ক্ষমতালিপ্সুদের এই অপচেষ্টা দেখে মনে পড়ে সিরিয়ার গ্রীক শাসক এন্তাকিসের কথা। সিরিয়ার গ্রীক শাসক চতুর্থ এন্তাকিস গ্রীক সাংস্কৃতিকে জোর করে ইহুদীদের মধ্যে বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করেন। ১৭০ খৃষ্টপূর্ব সালে তিনি ইহুদীদের মধ্যে এক গণহত্যা চালান হয় এবং তাদের উপাসনালয় লুট করে তাকে গ্রীক দেবতা যিউসের উপাসনালয়ে রূপান্তরিত করেন। অখ- ভারত স্বপ্নে যারা বিভোর তারাও সেই একই কায়দায় মুসলিম সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য ইসলামের পতাকা বাহীদেরকে নানা কৌশলে হত্যা করে চলছে; তাদের উপরে নির্য়াতন চালাচ্ছে। বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে সেটিকে রাম মন্দিরে রূপান্তরিত করছে। শুধু তারা তাদের দেশের অভ্যন্তরে নয় , প্রতিবেশী রাষ্ট্রেও নাক গলাতে তারা কসুর করছে না। এটাই শক্তিধরের ধর্ম। শক্তিধরেরা দুর্বল রাষ্ট্র সমূহকে তাদের তাবেদারীতে রাখার জন্য কৌশল করে যাচ্ছে। পৃথিবী এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বড় বড় ক্ষমতাধারীদের ইশারায়। উদাহরণ স্বরূপ মিশরের দুটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে।
এক: “তৌফিকের বিশ্বাস ঘাতকতার পর বৃটিশ শক্তি ১৮৮২ খ্রীঃ মিসরে প্রবেশ করে। ওরাবীর নেতৃত্বে যে গণবিপ্লব দানা বেঁধে উঠেছিল , তারা তাকে প্রতিরোধ করবার উদ্দেশ্যে তৌফিকের সাথে চক্রান্ত করে মিসর অধিকার করবার চক্রান্ত করে। এর পর অনিবার্যত বৃটিশ নীতির লক্ষ্য ছিল একটি: ইসলামী বিশ্বের উপর তাদের দখল আরও সুদৃঢ় করা এবং ইসলামী জাগরণের ঢেউ লেগে তাদের কায়েমী স্বার্থ নিশ্চিহ্ন না হয় যায় তার চেষ্টা করা। ’
দুই: প্রেসিডেন্ট মুরসী গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। কিন্তু তিনি ও তাঁর পার্টি ‘ইখওয়ানুল মুসলেমুন’ সে দেশে ইসলামের পক্ষে কিছু কাজ শুরু করেছিলেন যা ইসলাম বিদ্বেষী পরশক্তির সহ্য হয়নি। তারা কৌশলে জেনালের সি. সি’র মাধ্যমে মুরসী ও তাঁর পার্টিকে ধ্বংস করতে অনেকটা সফল হয়েছে।
 আমাদের দেশটিও যে পরাশক্তির নজরের বাইরে তা কিন্তু নয়। এখানেও চলছে তাদের খেলা। এই খেলার জন্য ঘঁটিও তারা হাতে পেয়েছে। এ দেশে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী চেতনায় সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন তা সেই খেলারই অশুভ পরিণতি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ