বৃহস্পতিবার ২৭ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন ও ইন্টারনেটের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারে মানসিক রোগির সংখ্যা বাড়ছে

মুহাম্মদ নূরে আলম : জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের দেয়া তথ্য মতে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশ বা প্রায় ৫ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। দেশে প্রায় সোয়া দুই কোটিরও বেশি মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত। খোদ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট দিয়েছে এই তথ্য। মানসিক রোগীর এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, দেশে আঠারো বছরের বেশি বয়সী ১৬ দশমিক ১ শতাংশ এবং আঠারো বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানসিক রোগী। মূলত বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন, ইন্টারনেটের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার, প্রযুক্তির প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি, অর্থ উপার্জনের অসম প্রতিযোগিতা, মাদকের প্রভাব, পরিবারের মধ্যে টানাপড়েন, হৃদয়হীনতা, লোভ, স্বার্থপরতা, সামাজিক অস্থিরতা, বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্নতা, মানসিক চাপ, আর্থ-সামাজিক অস্থিরতা, রাস্তায় তীব্র শব্দদূষণের কারণে মানসিক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে হু হু করে। দেখা যাচ্ছে, যতই মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে ততই বাড়ছে মানসিক রোগ। পাশাপাশি মাদক হিসেবে ইয়াবা গ্রহণের ব্যাপকতায়ও বেড়েছে মানসিক রোগীর সংখ্যা। কিন্তু বাংলাদেশে এই বিশাল সংখ্যক মানুষের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছে আড়াইশোর একটু বেশি। আর মানসিক রোগীদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল মাত্র দু’টি। বড় সরকারি হাসপাতালের কয়েকটিতে অল্পকিছু ব্যবস্থা রয়েছে। কিছু বেসরকারি কেন্দ্র রয়েছে যা মাদকাসক্তির ও মনোরোগের চিকিৎসা একসাথে করে। পুলিশের দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ২০১৭ সালে আত্মহত্যার মামলা হয়েছে সাড়ে ১৩ হাজারের মতো। অথচ ২০১৬ সালে তা ছিল তিন হাজার বেশি। কত লোক তার চেষ্টা করেছেন সেই বিষয়ক তথ্য পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ- এক বছরে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে চার গুণেরও বেশি।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আত্মহত্যায় মৃত্যুর সংখ্যা সড়ক দুর্ঘটনার চেয়েও বেশি। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রচুর মনোযোগ ও সরকারি তহবিল পায় এমন রোগে মৃত্যুর চেয়েও আত্মহত্যায় মৃত্যুর সংখ্যা বহুগুণ। আলাদা করে থেরাপিস্ট বা কাউন্সেলর এদেশে নেই বললেই চলে। মনোরোগ চিকিৎসকেরাই ঔষধও দেন আবার কাউন্সেলিং- এর চেষ্টা করেন। এই অপ্রতুল চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণ কি? এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের মনোবিজ্ঞানী ডাঃ মেখালা সরকার বলছেন, যখন এমবিবিএস পড়ে তখন স্টুডেন্টরা ঠিক করে নেয় কোনো সাবজেক্টে যাবে। যে সাবজেক্টের গুরুত্ব বেশি সেটার দিকেই তাদের ঝোঁক বেশি। আমাদের দেশে প্রচুর জনসংখ্যা, আমাদের রিসোর্স খুব সীমিত। সেই প্রভাবতো সব সেক্টরেই পড়বে। বিশেষায়িত ডাক্তারতো এমনিতে সবক্ষেত্রেই কম। তিনি বলছেন, মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ চিকিৎসক হতে গেলে বাংলাদেশে পড়াশুনা করার জায়গাও খুব সীমিত। কিন্তু সেই তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। আত্মহত্যার প্রবণতায় ভোগা মানুষদের জন্য কোনো হেল্পলাইন নেই। মানসিক চিকিৎসার ব্যাপারে যথেষ্ট সরকারি সহায়তা এদেশে কেন গড়ে উঠছে না?
বাংলাদেশে মানসিক রোগীকে প্রায়শই চেইন দিয়ে বেঁধে রাখা হয়: ডাঃ মেখালা সরকার বলছেন, একটা হেল্প লাইন খুবই জরুরি। কারণ যখনই আত্মহত্যার মতো একটা চিন্তা মাথায় আসে। সেক্ষেত্রে কিন্তু অনেকে একটা শেষ উপায় খোঁজে। সেই সাহায্যের শেষ জায়গাগুলো খোঁজে। কোথাও ফোন করলে সেখানে কথা বলতে পারলে তা সুইসাইড প্রিভেনশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশে এমন কিছু নেই। খুব সীমিত আকারে ‘কান পেতে রই’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি মানসিক সহায়তার হেল্পলাইন তৈরি করেছে। নিজের পরিবারে এমন ঘটনার অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের উদ্যোগেও কিছু ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। কিছু ফেসবুক গ্রুপও রয়েছে। কিন্তু এই সব উদ্যোগ সমস্যার তুলনায় খুবই সীমিত। বাংলাদেশে আত্মহত্যা ও মানসিক রোগীদের সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও খুব নেতিবাচক। এমন পরিস্থিতিতে খুব অল্প কজনই নিজেকে সামলানোর নানা কায়দা নিজেই তৈরি করে নিচ্ছেন। কিন্তু যারা তা পারছেন না তারা কোনো না কোনো সময় নিজের জীবন শেষ করে দেয়ার চেষ্টা করছেন। হাজার হাজার লোক তাতে সফলও হচ্ছেন।
বাড়ছে মানসিক রোগী: বিরূপ প্রভাব পড়ছে বিদেশী সংস্কৃতি, ইন্টারনেটের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার, সমাজে অর্থবিত্তের অতি প্রতিযোগিতা, সামাজিক ও নৈতিকতার অবক্ষয়। বাংলাদেশে অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে মানসিক রোগী। ধারণা করা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে আড়াই কোটির বেশি মানসিক রোগী আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বলেন, প্রযুক্তি এবং বিদেশী সংস্কৃতির প্রবণতায় পাল্টে যাচ্ছে জীবনযাত্রার ধরন। ব্যক্তিজীবনের অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, প্রতিযোগিতা, লোভের কারণে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক পরিবেশ। ক্রোধ, কর্মপরিবেশে বিশৃঙ্খলা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব মানুষকে চাপে ফেলছে। আস্তে আস্তে হতাশায় ডুবে মানসিক রোগীতে পরিণত হচ্ছে মানুষ। শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বজুড়ে মানসিক রোগী বাড়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে এই কারণগুলো।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বলেন, প্রযুক্তির উৎকর্ষ জীবনযাপনকে চাপে ফেলছে, তৈরি করছে সংকট, বাড়াচ্ছে প্রতিযোগিতা। এগুলো মানসিক রোগের উৎস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের অতি ব্যবহার শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েরা এসব চাপের মধ্যে থাকায় ব্রেনের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতা, মানিয়ে নেওয়ার শক্তি হারিয়ে হতাশায় ডুবে যাচ্ছে মানুষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বলেন, ভিনদেশি আকাশ সংস্কৃতি এবং উন্মুক্ত ইন্টারনেট সমাজে কুরুচিপূর্ণ উপাদান ছড়িয়ে দিচ্ছে। অশ্লীলতা ঢুকে যাচ্ছে সামাজিক স্তরগুলোতে। ফলে অবক্ষয় ঘটছে নৈতিকতার, ভাঙছে মূল্যবোধ। সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে বাড়ছে মানসিক রোগীর সংখ্যা। তিনি বলেন, হাল আমলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ছে ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রবণতা। ক্রোধ, লোভ, হিংগ্রতা বাড়ছে মানুষের মধ্যে। সমাজের নিষিদ্ধ বিষয়গুলোকে উন্মুক্ত করায় বাড়ছে কদর্যতা।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ডা. মো. গোলাম রাব্বানী বলেন, আগের তুলনায় দেশে মানসিক রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। দিন দিন এ অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। সাধারণত দুইভাবে রোগীরা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়। বায়োলজিক্যালভাবে মা-বাবার কাছ থেকে এবং সামাজিকভাবে মা-বাবার সম্পর্কের অবনতি ঘটলে শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হয়। শিশুদের পৈশাচিকভাবে হত্যার কারণে তাদের মধ্যে ‘চ্যানেলাইজ এগ্রেশন’ তৈরি হচ্ছে। এজন্য তাদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও নানা রকম মানসিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আগের চেয়ে মানুষের চাহিদা বেড়ে গেছে। মানুষ এখন দ্রুত প্রতিষ্ঠার পেছনে ছুটছে। পিতা-মাতার মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। এজন্য মানসিক সমস্যাও বেড়ে যাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে এখন একক পরিবার হওয়ায় মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ার কুপ্রভাব এবং সিনেমায় গঠনমূলক কিছু না থাকায়, গল্প-উপন্যাসে কাল্পনিক বিষয় পাঠ করায় মানুষ অস্বাভাবিক আচরণ করছে। মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক মেহতাব খানম বলেন, তরুণ প্রজন্ম বর্তমানে একটি অস্থির সমাজ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। যুবকরা এখন সহজেই সহিংসতামূলক আচরণে প্রলুব্ধ হচ্ছে। মোবাইল-ইন্টারনেট প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে যুবকরা শিশু হত্যার মতো নেতিবাচক আচরণে প্রলুব্ধ হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ এ এম আমানউল্লাহ বলেন, সমাজে বর্তমানে যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে তার সঙ্গে পরিবারগুলো তাল মেলাতে পারছে না। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাজ করছে অসম প্রতিযোগিতা। ধনী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর একটি শ্রেণি তাদের মূল্যবোধ হারাচ্ছে। আর এ অবস্থার জন্য রাষ্ট্রের উদাসীনতা দায়ী। সব মিলিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক, মিডিয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতায় মানুষ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। এতে সামাজিক সম্পর্কে ভাঙন দেখা দিচ্ছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয় আশির দশকে। ১৯৮১ সালে তৈরি হয় অরগানাইজেশন অব ট্রেনিং মেন্টাল হেলথ (ওটিএমএইচ)। তখনও এ হাসপাতালটি সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের একটি অংশ নিয়ে নিজস্ব কার্যক্রম পরিচালনা করত ওটিএমএইচ। ওই হাসপাতালের কয়েকটি কক্ষে এর কাজ চলত। পরে জায়গা সংকুলন না হওয়ায় ১৯৮১ সালের শেষের দিকে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মিটফোর্ড হাসপাতাল) স্থানান্তরিত হয় এটি। ১৯৮৮ সালে মিটফোর্ড হাসপাতালে থাকার সময় একে ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড রিসার্চ (আইএমএইচএআর) হিসেবে নামকরণ করা হয়।
১৯৯০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রতিষ্ঠানটি স্থানান্তরিত হয়। তবে বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগের সুবিধা তখন ছিল না। সে সময় পরিচালক ছিলেন অধ্যাপক ডা. হেদায়েতুল ইসলাম। তখন হাসপাতালটিকে বড় করার চিন্তা করা হয়। ১৯৯২ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করলে অধ্যাপক ডা. আনোয়ারা বেগম এর হাল ধরেন। তার কঠিন পরিশ্রমে বর্তমানের শেরেবাংলা নগরের জায়গাটি বরাদ্দ নেয়া হয়। ১৯৯৭ সালে অধ্যাপক আনোয়ারা বেগম অবসর নেন। এরপর ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠানটি অধিকতর উন্নত হয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেন। সে সময় পরিচালক হন অধ্যাপক ডা. নাজমুল আহসান। এ সময় সরকার নির্ধারিত নিজস্ব ১ দশমিক ৭৯ একর জমিতে ভবন তৈরি হয়। নতুন জায়গায় হাসপাতালটি প্রথমে কেবল আউটডোর হিসেবে চালু হয়। এরপর সব কর্মকর্তা নিয়োগের পর আউটডোর এবং ইনডোর ও জরুরি বিভাগ চালু হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ