বৃহস্পতিবার ২৭ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

খুলনায় প্রকাশ্যে বৃদ্ধ কৃষকের দুই হাতের কব্জি কর্তন মামলাটি চাঞ্চল্যকর হিসেবে ডিবিতে হস্তান্তর

খুলনা অফিস : খুলনার রূপসা উপজেলার জনবহুল খান জাহান আলী সেতুর নিচে প্রকাশ্যে বৃদ্ধ সাদ্দাম হোসেন শেখের দুই হাতের কব্জি ও দুই পায়ের রগ কর্তন মামলাটি চাঞ্চল্যকর হিসেবে পুলিশ সুপারের নির্দেশে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। দায়িত্ব পাওয়ার পরই জেলা ডিবি’র ওসি তোফায়েল আহম্মেদ, ইন্সপেক্টর কনি মিয়া ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গত শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে রামপাল উপজেলার ঝনঝনিয়া এলাকা থেকে মামলার অন্যতম আসামী জাবুসা গ্রামের লোকমান ফকিরের ছেলে কামাল ফকির কে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃত কামাল এবং রিমান্ডে থাকা আসামি নজরুল ইসলাম ওরফে নজু ফকির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই মুক্ত রায় চৌধুরী পিপিএম জানান, গ্রেফতারকৃত আসামি কামাল এবং রিমান্ডে থাকা নজরুল ইসলাম ওরফে নজু ফকিরকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পর তারা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিতে রাজি হয়। সে মোতাবেক শনিবার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুসরত জাহানের আদালতে উক্ত ২ আসামি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি প্রদান করে। আসামি নজু ফকির ও কামাল উক্ত ঘটনার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে বিজ্ঞ আদালকে জানায় গত ৭ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টার দিকে জাবুসা গ্রামের মৃত শামসু শেখের ছেলে সাদ্দাম শেখ চা খাওয়ার উদ্দেশ্যে সেতুর নিচে আসে। এ সময় পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে থাকা কতিপয় দুর্বৃৃত্তসহ তারা দুই জন সাদ্দাম হোসেনকে বেধড়ক মারপিট ও জখম করে। এ সময় তারা সাদ্দাম শেখকে জাপটে ধরে দুই হাতের কব্জি কেটে বাহু  থেকে বিচ্ছিন্ন এবং দুই পায়ের রগ কেটে দেয়। তার আত্মচিৎকারে আশে পাশের লোক থাকলেও তাদের ভয়ে কেউ কাছে আসতে সাহস পায়নি। তারা চলে গেলে পরিবারের লোকজন সাদ্দামকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। এদিকে মামলার প্রধান আসামি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-প্রচার সম্পাদক রবিউল ইসলাম লিটুকে ঢাকা থেকে গ্রেফতারের পর তাকেও ডিবি পুলিশ রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, আসামি লিটুকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে এবং রোববার তার রিমান্ড শেষ হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৭ জানুয়ারি সোমবার সাদ্দাম হোসেন শেখ ফজরের নামাজ শেষে স্ত্রীকে নিয়ে রূপসা সেতুর নিচে চা খাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর ৭/৮ জন সন্ত্রাসী ধারালো অস্ত্র নিয়ে তার ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তার দুই হাতের কব্জি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এছাড়া সন্ত্রাসীরা তার দুই পায়ের রগ কেটে দেয়। এরপর তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনার সময় আহতের স্ত্রী ঠেকাতে গেলে তাকেও সন্ত্রাসীরা হুমকি-ধামকি দিয়ে ধাওয়া দেয়। সাদ্দামের বাড়ি নৈহাটী ইউনিয়নের জাবুসা পশ্চিমপাড়ায়। এ ঘটনার পরের দিন ৮ জানুয়ারি মঙ্গলবার আহত সাদ্দামের ছেলে মো. অসীম শেখ বাদি হয়ে ৯ জনকে আসামি করে রূপসা থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় জাবুসা গ্রামের মৃত আলতাফ হোসেনের ছেলে ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-প্রচার সম্পাদক মো. রবিউল ইসলাম লিটু শেখকে প্রধান আসামি করা হয়। এজাহারভুক্ত অন্যান্য আসামীরা হলো একই গ্রামের ইশারাত ফকিরের ছেলে মো. রাসেল ফকির, মো. রাজু ফকির, মো. লিয়াকত ফকিরের ছেলে মো. শাকিল ফকির, আকমল ফকিরের ছেলে তূর্য্য ফকির, মৃত আরশাদ ফকিরের ছেলে মো. নজু ফকির, হাশেম ফকিরের ছেলে তামীম ফকির, হাফিজার মোল্লার ছেলে মো. নাদিম মোল্লা ও লোকমান ফকিরের ছেলে মো. কামাল ফকির। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাত পরিচয়ের আরও ৩/৪ জন জড়িত বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে বাদি উল্লেখ করেছেন, ঘটনার দিন সোমবার ফজরের নামাজ আদায় করার পর সকাল ৭টার দিকে তার বাবা সাদ্দাম হোসেন রূপসা সেতুর নিচে তোফাজ্জেলের চায়ের দোকানে চা পান করতে যান। দোকানে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে রূপসা সেতুর নিচে পৌঁছালে উল্লিখিত আসামিরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে আগে থেকে চাইনিজ কুড়াল, চাপাতি, কুড়াল, আগ্নেয়াস্ত্র, ছুরিসহ তিনটি মোটরসাইকেল ও একটি ভ্যানযোগে সেতুর নিচে পৌঁছে পিলারের আড়ালে অবস্থান করতে থাকে। এক পর্যায়ে আসামিরা পিলারের আড়াল থেকে বের হয়ে চারদিক থেকে তার বাবাকে ঘিরে ফেলতে থাকে। আসামীদের উপস্থিতিতে তার বাবার সন্দেহ হলে তিনি বাড়িতে ফোন দিতে গেলে লিটু শেখের হুকুমে অন্যান্য আসামীরা তাকে জাপটে ধরে। এ সময় কামাল ও নজু ফকির তার দুই হাত মাটিতে ফেলে চেপে ধরে। রাসেল তার পিঠের ওপর উঠে গলা চেপে ধরে। এ সময় তামিম চাপাতি দিয়ে তার ডান হাতের কব্জি এবং শাকিল চাপাতি দিয়ে বাঁ হাতের কব্জি কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আর নাদিম ছুরি দিয়ে বাঁ পা ও কামাল ফকির চাইনিজ কুড়াল দিয়ে ডান পায়ের গোড়ালির ওপর কুপিয়ে শিরা কেটে পা বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে। এ খবর পেয়ে আমার মা ছায়রা বেগম ও ছেলে অসীম ঘটনাস্থলে যেতে গেলে নজু ফকির ও কামাল ফকির ধারাল অস্ত্র নিয়ে হত্যার উদ্দেশে ধাওয়া করে। এ সময় তাদের চিৎকারে লোকজন জড়ো হতে থাকলে আসামীরা তার বাবার কেটে ফেলা হাত দু’টি নদীর পাড়ে ফেলে মোটরসাইকেল ও ভ্যানযোগে গ্রামের দিকে চলে যায়। এর আগে ২০১২ সালে একবার সাদ্দাম শেখকে কুপিয়ে জখম করেছিল সন্ত্রাসীরা। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ