বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অবহেলিত ঋষিপাড়ার নারীদের মুখে এখন হাঁসির ঝিলিক

 

মোঃ আকরাম হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার তিতাস নদীর তীরে অবস্থিত অবহেলিত ঋষিপাড়ার নারীদের মুখে এখন হাঁসির ঝিলিক। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মদক্ষ করায় তারা এখন বাড়িতে বসেই রোজগার  করতে পারছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুহিলপুর ইউনিয়নের সীতানগর গ্রামের ঋষিপাড়া একটি পিছিয়ে পড়া জনপদ। তিতাস নদীর তীরে অবস্থিত এই গ্রামের পুরুষরা শহরের বিভিন্ন স্থানে মুচির কাজ (জুতা সেলাই, জুতা পালিশ) এবং শহরের বিভিন্ন বাজারে কুলির (শ্রমিক) কাজ করে। গ্রামের মহিলাদের কেউ কেউ শহরের বিভিন্ন বাসায় গৃহকর্মীর (ঝি) কাজ করলেও অধিকাংশ মহিলা বেকার। বাড়িতে বসেই তাদের অলস সময় কাটতো। ফলে তাদের সংসারে সব সময় লেগে থাকতো অভাব-অনটন। অভাব-অনটনের কারণে ঋষিপাড়ার মেয়েরা লেখাপড়া করতোনা।

বিষয়টি জানতে পেরে ঋষিপাড়ার নারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জান্নাতুল ফেরদৌস। তিনি তাদেরকে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিলে গ্রামের নারীরা এতো দূরে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ সম্ভব নয় বলে তাঁকে জানিয়ে দেন।  পরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জান্নাতুল ফেরদৌস উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের মাধ্যমে ঋষিপাড়ায় একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মান করেন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের পর তিনি স্থানীয় সংরক্ষিত ইউপি সদস্যা আনোয়ারা বেগমের মাধ্যমে ঋষিপাড়ার ২৭৫টি পরিবারের ২৪০জন নারীকে প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করেন।

গত ২০১৮ সালের ১ জুলাই ১২০ নারীকে নিয়ে প্রথম দফায় ৩ মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তাদেরকে পাটজাত দ্রব্য তৈরী, মোমবাতি তৈরি, নকশী কাঁথা সেলাই, টেইলারিং (পুরুষ ও মহিলাদের কাপড় তৈরী) এবং পুঁথি দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রথম দফার প্রশিক্ষণ  শেষে  গত ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর বাকী ১২০জনকে নিয়ে দ্বিতীয় দফার প্রশিক্ষণ শুরু হয়। জামালপুর জেলা থেকে দু’জন প্রশিক্ষক এনে তাদেরকে দুই দফায় ৬ মাস প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বর্তমানে দুই গ্রুপের নারীরা (মহিলা ও মেয়ে) প্রশিক্ষণ শেষ করে কাজ করা (উৎপাদন) শুরু করেছে। তাদের উৎপাদিত পন্য এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের জেল রোডে অবস্থিত নারী উন্নয়ন ফোরামের শো-রুম “অপরাজিতা” নামক দোকানে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও শহরের বিভিন্ন মার্কেটের কাপড়ের দোকানে চাহিদা মতো সরবরাহ করা হচ্ছে। সরেজমিন সীতানগরের ঋষিপাড়ার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় ঋষি সম্প্রদায়ের নারীরা বিভিন্ন ধরনের সেলাইয়ের কাজ ও মোমবাতি তৈরির কাজে ব্যস্ত। ১১টি সেলাই মেশিনে তারা বিভিন্ন ধরনের কাপড়-চোপড়সহ ও বিভিন্ন ধরনের পাটের ব্যাগ তৈরি করছে। নারীদের কেউ কেউ তৈরি করছে মোমবাতি।

প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ঋষিপাড়ার শরৎ ঋষির মেয়ে সুমিত্রা ঋষি-(১৫) জানায়, তার বাবা শহরের আনন্দ বাজারে শ্রমিকের (কুলি) কাজ করে। তারা ৪ বোন ১ ভাই। বাবার রোজগারে ঠিক মতো তাদের সংসার চলতোনা। সে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে। অভাবের কারনে  আর লেখাপড়া করতে পারেনি। সুমিত্রা জানায়, প্রথমধাপে সে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। বর্তমানে মহিলাদের থ্রি-পিছ, সেলোয়ার, কামিজ ও ছোট বাচ্চাদের কাপড় তৈরী করে প্রতিদিন ভালো টাকা রোজগার করছে। তার রোজগারের কারনে তাদের পরিবারে এখন স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে। একই কথা জানালেন, এই এলাকার প্রতীত ঋষির মেয়ে শাখা ঋষি-(১৮)। সে জানায়, তার পরিবারের ৭জন সদস্য। বাবার রোজগারে সংসার চলেনা। অভাবের কারনে পঞ্চম শ্রেণির পর সে আর পড়াশুনা করেনি। এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন সে  এখন স্বাবলম্বী। শাখা জানায়, সে ছেলেদের পাঞ্জাবী, ছোট বাচ্চাদের ফ্রকসহ বিভিন্ন ধরনের কাপড়-চোপড় ও মহিলাদের জন্য শাড়ীতে বিভিন্ন ধরনের ডিজাইনের কাজ করে। শাখা জানায়, নিজেরা রোজগার করায় পরিবারে এখন তাদের সম্মান বেড়েছে।

প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সমতারা ঋষি-(৩৫) জানান, তিনি মোমবাতি তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্তমানে মোমবাতি তৈরির কাজ করেন। তিনি জানান, তাদের তৈরি মোমবাতি প্যাকেটজাত করে শহরের বিভিন্ন দোকানে পাইকারী বিক্রি করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সুহিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত সদস্যা (৭, ৮ এবং ৯নং ওয়ার্ড)  আনোয়ারা বেগম বলেন, এটি তার নির্বাচনী এলাকা। তিনি বলেন, তিনি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির তদারকি করেন। আনোয়ারা বেগম বলেন, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌসের উদ্যোগের কারনে সীতানগর এলাকার ঋষিপাড়ার মহিলারা এখন স্বাবলম্বী হয়েছে। তাদের মুখে এখন হাঁসি ফুটেছে।

এ ব্যাপারে সদর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি এডভোকেট তাসলিমা সুলতানা খানম নিশাত বলেন, প্রায় ২০লাখ টাকা ব্যয়ে সুবিধাবঞ্চিত ঋষিপাড়ার মহিলাদের জন্য এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত এখানে ২৪০জন নারী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজেরা স্বাবলম্বী হয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস তাদেরকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। এজন্য তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ জানান। এডভোকেট নিশাত বলেন, তাদের এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি ইউএনসিডিএফ’র সদস্যরা পরিদর্শন করেছে এবং ৫ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা করেছেন। তিনি বলেন, উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের উদ্যোগে মহিলাদেরকে পন্য তৈরির কাচামাল সরবরাহ করা হয় এবং তাদের তৈরি পণ্য নারী উন্নয়ন ফোরামের  শো-রুম “অপরাজিতা” নামক দোকানে বিক্রি করা হয় ও শহরের বিভিন্ন মার্কেটের কাপড়ের দোকানে সরবরাহ করা হয়।

এ ব্যাপারে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, সীতানগর গ্রামের ঋষিপাড়াটি অবহেলিত ছিলো। এই পাড়ার পুরুষরা মুচির কাজ ও বিভিন্ন বাজারের কুলির (শ্রমিক) কাজ করতো। মহিলারা ছিলো অবহেলিত। পরিবারে মহিলাদের কোন গুরুত্ব ছিলোনা। বিষয়টি জানার পর তিনি তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এখানকার ২৪০জন নারীকে তিনি দুইধাপে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করেন। তাদের জন্য অর্থের ব্যবস্থা করেন। তারা বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প, নকশী কাঁথা সেলাই, মোমবাতি তৈরী ও টেইলারিংয়ের প্রশিক্ষন নিয়ে এখন নিজেরা কাজ করতে পারছে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় পরিবারে নারীদের গুরুত্ব বেড়েছে। তারা এখন সুন্দরভাবে জীবনযাপন করছেন। তিনি বলেন, অবহেলিত নারীদের জন্য কিছু করতে পেরে তিনিও তৃপ্ত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ