বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

নতুন ভুবনে সফল হবেন মাশরাফি

অরণ্য আলভী তন্ময় : মাশরাফি বিন মর্তুজা এখন শুধু একজন ক্রিকেটার কিংবা জাতীয় দলের ওয়ানডে অধিনায়কই নন, তিনি একজন সংসদ সদস্য। গেল ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-২ আসন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত হয়েছেন। দেশের ইতিহাসে প্রথম হিসেবে খেলোয়াড় থাকা অবস্থায় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন নড়াইল এক্সপ্রেস। সেই কারণে এখন তিনি আর শুধু ক্রিকেটার নয়, নিজ এলাকার আপামর জনতার আশা-ভরসার প্রতীক। ক্রিকেটার হিসেবে সারা বাংলাদেশে তুমুল জনপ্রিয় মাশরাফি বিন মর্তুজা। ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে দেশের সাফল্যের অন্যতম কান্ডারি তিনি। কারণ তার নেতৃত্বে দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে ঈর্ষণীয় যত সেরা সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ দল। তাই ওয়ানডে ক্রিকেটে টাইগাররা প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হলেই দেশের ১৬ কোটি মানুষ আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে বলেন, ‘আমাদের মাশরাফি আছেন!’ সেই আস্থা ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই অর্জন করেছেন মাশরাফি দেশের ক্রিকেটপ্রেমী কোটি কোটি মানুষের। গত বছরটাও তিনি বেশকিছু সাফল্য এনে দিয়েছেন, ক্রিকেটার হিসেবে এবং অধিনায়ক হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে সাফল্য মন্ডিত ছিলেন। আর বছরের শেষভাগে তিনি নিজ এলাকা নড়াইলের মানুষের জন্য হয়ে গেছেন আশা, ভরসা ও আস্থার অন্যতম প্রতীক। উন্নয়নের ব্যাপক কর্মকান্ডে থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাই নতুন বছরে নতুন পরিচয়ে মাশরাফি শুরু করবেন তার পথচলা। এ বছর ওয়ানডে বিশ্বকাপের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ আসর। সেখানেও মাশরাফির নেতৃত্বে দারুণ কিছু করার প্রত্যাশা নিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে থাকবে পুরো দেশ।
রাজনীতির মাঠে একেবারেই নবীন হিসেবে যাত্রা করে গুরুদায়িত্বভার চেপেছে কাঁধে! শুধু নড়াইলবাসীর জন্যই নয়, সারা দেশের মানুষই ক্রিকেট মাঠের বাইরে সোনার বাংলায় মাশরাফির অভাবনীয় উন্নতির কর্মকান্ড দেখার প্রত্যাশায় তাকিয়ে থাকবে ১৬ কোটি মানুষ। উন্নয়নের গতি আরও দ্রুত হবে এটা এখন আপামর জনতার চাওয়া। কারণ, তিনি ‘নড়াইল এক্সপ্রেস!’ ক্রিকেট মাঠ আর রাজনীতির মাঠ এক নয়। কিন্তু মাশরাফি প্রাণের মানুষ। তাই তো নড়াইল-২ (লোহাগড়া-নড়াইল সদর) আসন থেকে ৯৬ ভাগ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এই আসনে এর আগে এত ভোট পায়নি কোন প্রার্থী। অথচ সংসদ নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ক্রিকেট মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। কিন্তু মানুষ ভালবেসে নির্বাচনী প্রচারণা নিজেদের উদ্যোগে চালিয়ে গেছেন মাশরাফির জন্য। দল-মত নির্বিশেষে আপামর জনতা তাদের ভালবাসার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন নির্বাচনের দিন মাশরাফিকে ভোট প্রদান করে। তাই তো রেকর্ড জয়ে এখন তিনি সংসদ সদস্য। নতুন পরিচয়ে একেবারেই অনভিজ্ঞ মাশরাফি সেই জয়ের পর বলেছেন, ‘নড়াইলের সাধারণ মানুষ যে আমাকে কতটা ভালবাসে সেটি আরো একবার প্রমাণিত হয়েছে। খেলার মাঠ ও রাজনীতির মাঠের মধ্যে কোন পার্থক্য দেখতে চাই না। খেলার মাঠে যেমন পরিচ্ছন্নভাবে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে আনার চেষ্টা করি, রাজনীতিতেও দলমত সবার প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে। রাজনীতিতে আমি কোন গ্রুপিংয়ে বিশ্বাস করি না। কৃষিনির্ভর নড়াইলকে সামনে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কৃষির উন্নয়নের পাশাপাশি রাস্তাঘাট, বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কের উন্নয়নে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রাস্তাঘাট ও তরুণ সমাজের উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। নদীভাঙন রোধকল্পে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এছাড়া মাদকের ভয়াবহতা থেকে তরুণ সমাজকে দূরে সরাতে খেলাধুলায় মনোনিবেশসহ সব ধরনের সহযোগিতা করব।’ মাশরাফির প্রথম ভালবাসা ক্রিকেট। ক্রীড়া তার মনের গভীরে গেঁথে থাকা একটি ব্যাপার। সেজন্য শুধু নড়াইল নয়, দেশের খেলাধুলায় বড় রকমের কর্মকান্ড আরও গতিশীল করবেন তিনি এমন প্রত্যাশা থাকবে সবারই। এ বিষয়ে মাশরাফি বলেন, ‘এখানে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম নির্মাণের দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরব।’ রাজনীতি নয়, মাশরাফি যেমন ক্রিকেট দলকে এক সুতোয় গেঁথেছেন, তেমনি বাংলাদেশের মানুষকেও এক সুতোয় গাঁথার কথাই বলেছেন বার বার। এবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তাদের ভাগ্যোন্নয়নে নেতৃত্ব দিতে হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সফল মাশরাফিকে। এ বছর বড় চ্যালেঞ্জ তার সামনে ওয়ানডে বিশ্বকাপ। তার আগে ফেব্রুয়ারিতে নিউজিল্যান্ড সফরে ৩ টেস্ট, ৩ ওয়ানডের সিরিজ এবং আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ। ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলকে ইতিহাসের সেরা সাফল্য পাইয়ে দিয়েছিলেন নেতৃত্ব দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে। এবারও ওয়ানডে বিশ্বকাপে তার দিকেই তাকিয়ে থাকবে পুরো বাংলাদেশ। কারণ, অধিনায়ক হিসেবে এবং পারফর্মার হিসেবে ওয়ানডের অন্যতম অপরিহার্য ক্রিকেটার ‘নড়াইল এক্সপ্রেস!’ গত বছর তার হাত ধরে দারুণ কিছু সাফল্য পেয়েছে টাইগাররা ওয়ানডে ক্রিকেটে। বাংলাদেশ দলকে এশিয়া কাপের ফাইনালে একাই কাঁধে বয়ে নিয়ে গেছেন মাশরাফি। অভিজ্ঞ ক্রিকেটার সাকিব-তামিমের অনুপস্থিতিতে তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে দুর্দান্ত নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশ্ব দরবারে প্রশংসিতও হয়েছেন টাইগার অধিনায়ক। বাংলাদেশকে ২০ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে ১৩ জয় এনে দিয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালে তার চেয়ে বেশি জয় দলকে দিতে পেরেছেন শুধু ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ইয়ন মরগান। ২২ ম্যাচে দলকে ১৬ জয় পাইয়ে দিয়েছেন মরগান। বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে সর্বাধিক ৭০ ম্যাচ দলকে নেতৃত্ব দেয়ার অনন্য রেকর্ডও গড়েছেন তিনি। খেলেছেন প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে ২০০ ওয়ানডে ম্যাচ। এছাড়া বর্তমান বিশ্বের নতুন বলের অন্যতম অভিজ্ঞ বোলার মাশরাফি। ২০ ম্যাচ খেলে ২৬ উইকেট নিয়েছেন তিনি, বোলিং করেছেন মাত্র ৪.৯১ ইকোনমিতে।
মাশরাফি বাংলাদেশের মতো একটি উঠতি দলের হয়ে সেই ২০০৬ সালে একটি অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়েছিলেন, টাইগারদের দেখিয়েছিলেন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নিশানা। সে বছর ওয়ানডে ক্রিকেটের পারফর্মেন্সে বিশ্বের সবাইকে ছাড়িয়ে সেরা হয়েছিলেন এ ডানহাতি পেসার সর্বাধিক ৪৯ উইকেট নিয়ে। এখন ক্যারিয়ারের ১৭ বছর পার করেছেন, অনন্য এক উচ্চতায়ই হয়ত আসীন হয়ে কিংবদন্তিদের কাতারে থাকতে পারতেন। ২০১৮ সালেও তিনি বিশ্বের সব বোলারকে ছাড়িয়ে গেছেন। তবে এবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নয়, লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে। শুধু ওয়ানডে ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়া মাশরাফি ২০১৮ সালে পেয়েছেন ওয়ানডেতে ২৬ উইকেট। তবে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটের পরিসংখ্যানে ৩৬ ম্যাচে ২১.১৬ গড়ে মোট ৬৫ উইকেট শিকার করেছেন মাশরাফি। ইকোনমি মাত্র ৪.৬৯। তার পরে দ্বিতীয় স্থানে ইংলিশ লেগস্পিনার আদিল রশিদ। তিনি ৩২ ম্যাচে ২৮.১৫ গড়ে নিয়েছেন ৫৭ উইকেট। ২১ ম্যাচে ৫১ উইকেট নিয়ে তিন নম্বরে আফগানিস্তানের লেগস্পিনার রশিদ খান। এখন পর্যন্ত ২০২ ওয়ানডে খেলে ২৫৮ উইকেট শিকার করে দেশের সেরা ওয়ানডে বোলার মাশরাফি। বিশ্বের ওয়ানডে ইতিহাসে তার অবস্থান এই মুহূর্তে উইকেট শিকারের বিবেচনায় ২৪ নম্বরে, পেসারদের তালিকায় ১৬ নম্বরে।
তাই তার দিকেই নতুন বছরে আরও সাফল্য পাওয়ার জন্য তাকিয়ে থাকবে সমগ্র বাংলাদেশ। সেইসঙ্গে যোগ হয়েছে জনতার রায়ে সংসদ সদস্যপদ প্রাপ্তির মতো বিরাট এক সাফল্য। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এমন ঘটনা বিরল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম এমন কোন ঘটনার সাক্ষী হলো জনগণ। আর তারা সংসদ সদস্য হিসেবে পেয়ে গেল বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফিকে। ক্রিকেটাঙ্গনও নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের পর দ্বিতীয় কোন অধিনায়ককে পেয়ে গেল সংসদ সদস্য হিসেবে। দুর্জয় অবশ্য অবসর নেয়ার অনেক পরে নির্বাচন করেছিলেন। সেখানে মাশরাফি খেলা চালিয়ে যাওয়ার সময়েই নির্বাচিত হয়ে নতুন এক রেকর্ড গড়লেন। এ বছর তাই অনেক গুরুভার নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে মাশরাফিকে, আর সমগ্র বাংলাদেশ তার দুটি দায়িত্ব পালনের সাফল্য দেখতে আশায় বুক বেঁধে আকাক্সক্ষা নিয়ে তাকিয়ে থাকবে। দেখা যাক জনপ্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারেন ক্রিকেটের এই মহানায়ক। কারণ তার উপর প্রত্যাশার চাপটা এখন পাহাড়সম হতে থাকবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ