রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

দিনাজপুর সঙ্গীতাঙ্গনের বাতিঘর ওস্তাদ সাইমুদ আলী খান

অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ জেলার রাতুয়া থানার আড়াইডাঙ্গা গ্রামে ১লা জুলাই ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিবেদিত প্রাণ একনিষ্ঠ সাধক ওস্তাদ সাইমুদ আলী খান। তাঁর পিতার নাম আব্দুল মতিন খান এবং মাতা তাবিয়ান নেসা। শৈশবে বাড়ির এক সদস্যের পাঠ্য বইয়ের পড়া শুনে শুনেই পর্যায়ক্রমে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সব বইয়ের পড়া মুখস্থ হয়ে যায় প্রতিভাবান সাইমুদ আলী খানের। ফলে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে সরাসরি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। হাইস্কুলে পড়ার বয়সেই শুরু হয় তাঁর সঙ্গীত চর্চা। গ্রামের হাইস্কুল থেকে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সে সময় তার নিজ গ্রামে “দেশ গৌরব পাঠাগার” নামে একটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থাগার ছিলো। সেখানে প্রায় সতেরো হাজার বইয়ের সমৃদ্ধ এক বিশাল ভা-ার ছিলো সবার জন্য উন্মুক্ত। ম্যাট্রিকুলেশন পাশের পূর্বেই পাঠাগারের সমস্ত বই পড়া শেষ করে ফেলেন সাইমুদ আলী খান। মাত্র বিশ বছর বয়স পেরুনোর সাথে সাথেই সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল তাঁর জ্ঞানের ভান্ডার।
ছোটবেলা থেকেই নৃপেন্দ্র নাথ দাস ওরফে টুলু বাবুর কাছে তাঁর সঙ্গীতের হাতে খড়ি। পরবর্তীতে তিনি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নেন তার নিজ গ্রাম আড়াইডাঙ্গার বিজয় চন্দ্রের কাছে। প্রথাগত পড়াশোনায় সময় নষ্ট না করে পন্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ তথা বিশ্বের প্রখ্যাত সঙ্গীত মনীষীদের জীবনী এবং তাঁদের লেখা পুস্তকাদি অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন। ওস্তাদ বিজয় চন্দ্র কুমার এর কাছে দু’বছর শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, উপ-শাস্ত্রীয় ও লঘু সঙ্গীত বিষয়ে তিনি তালিম গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি অধ্যয়ন করেন সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখার অজ¯্র গ্রন্থ। পাশাপাশি টানা ১৪ বছর সঙ্গীতের বিভিন্ন শৈলীর তালিম গ্রহণ করেন বেনারস ঘরানার শেষ প্রতিনিধি কুলদীপ পন্ডিত বিষ্ণু সেবক মিশ্রের কাছে। প্রখ্যাত বেহালা শিল্পী রঘুনাথ দাসের কাছে শেখেন বেহালা বাজানো।
পরবর্তীতে দিনাজপুর শহরে সঙ্গীত প্রেমীদের আমন্ত্রণে ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ জুলাই তিনি দিনাজপুরে আসেন। পরের দিন তিনি দিনাজপুর নাট্য সমিতি মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন করেন সারারাত ব্যাপী। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিল্পী সমাজ, সাধারণ দর্শক শ্রোতা, প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা সকলেই শিল্পীর চমৎকার সঙ্গীত নৈপুন্যে বিমােহিত হয়ে পড়েন। তৎকালীন দিনাজপুরে স্বনামধন্য জেলা প্রশাসক জনাব আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে ওস্তাদজীকে দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে থেকে যেতে অনুরােধ করেন এবং “ফ্যামিলি প্লানিং ডিপার্টমেন্টে” তার চাকরির ব্যবস্থা করেন। সেই থেকে উত্তরবঙ্গের সীমান্ত জেলা শহর দিনাজপুরে তার শেকড় প্রােথিত হয়। উপশহরের ছােট্ট একটি ঘরে সাধনা চলতে থাকে তার। পরবর্তীতে এই পরিবার পরিকল্পনা অফিস থেকে করণিক পদে তিনি অবসরে যান ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে ওস্তাদ সাইমুদ আলী খান দিনাজপুরের শিল্পী সমাজকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি দিনাজপুর তথা দেশের বেশ কয়েকজন গুণী শিল্পীদের সাথে যুক্ত হয়ে গান গেয়ে বেড়াতেন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে। সে সময় যেখানেই তিনি যেতেন লোকেরা তাঁদের “জয় বাংলা শিল্পী গোষ্ঠী” নামে অভিহিত করতো। স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম হলে দিনাজপুরে অবস্থিত সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন।
পরবর্তীতে ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে স্থানীয় কে. বি. এম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। এরপর তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শাস্ত্রে বি, এইচ, এম, এইচ ডিগ্রী লাভ করেন। আরবী পাঠাভ্যাস ছাড়াও তিনি মাতৃভাষা বাংলা ছাড়াও হিন্দী, উর্দু, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। এছাড়াও ভারতের স্বীকৃতি প্রাপ্ত ১৬টি ভাষার মধ্যে ১২টি ভাষা মোটামুটিভাবে বুঝতে পারতেন তিনি।
বাংলাদেশ বেতার রংপুর কেন্দ্রে ১৯৭৪-৭৫ খ্রিষ্টাব্দে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত পরিবেশন করতেন ওস্তাদ সাইমুদ আলী খান। দিনাজপুর সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে তিনি অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন। দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান “নবরূপীর সঙ্গীত বিভাগ” ও “সুরবাণী সঙ্গী শিক্ষা কেন্দ্রের অধ্যক্ষ ও গুরু হিসেরে বহুদিন যাবৎ নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশুদ্ধ এবং সুস্থ সঙ্গীত চর্চা ও প্রসারে নিষ্ঠার সাথে সঙ্গীতসাধক ওস্তাদ সাইমুদ আলী খান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সেবায় ৬৩ বছর যাবত নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।
দিনাজপুরে থাকাকালীন বহু গুনগ্রাহী তাঁর কাছে সঙ্গীতের তালিম গ্রহণ করেছেন। স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান “নবরূপী”তে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সঙ্গীত বিভাগের অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেছেন। দিনাজপুর সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করেন প্রায় একযুগ ধরে। এছাড়াও তিনি দিনাজপুরের উদীচী, ঢাকার বুলবুল একাডেমীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীকে সঙ্গীত শিক্ষা দান করেছেন নিষ্ঠার সাথে।
দিনাজপুরে ১৯৮৬ ও ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সঙ্গীত সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কারিকুলাম কমিটিরও সদস্য ছিলেন তিনি।
তাঁর শিষ্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত গজল শিল্পী চন্দন দাস, এনায়েত-এ-মওলা জিন্নাহ, ডাক্তার শহীদুল ইসলাম খান, মোঃ তজিরুল ইসলাম, দোলন সরকার, বিপ্লব কুমার পন্ডিত, হাফিজা শারমীন সুমী, শ্বাশ্বতী দেবনাথ খেয়া, কৃষ্ণা পন্ডিত, ফরহাদ আহমেদ, শুক্লা পন্ডিত, ওস্তাদজীর তৃতীয় সন্তান ও বড় কন্যা সাবেরা খাতুন বাবলী (বেতার শিল্পী, রংপুর), জামাতা মঈনুল আহসান প্রামানিক খােকন (বেতার শিল্পী, রংপুর), আবুল কালাম আজাদ, সন্ধ্যা ভট্টাচার্য প্রমূখ।
ছোটদের উপযোগী করে লেখা সঙ্গীত বিষয়ক তার গল্প গ্রন্থ “সঙ্গীতকন্যা শিক্ষার্থী শিক্ষক মহল ও সুধী মহলে ব্যাপক নন্দিত ও প্রশংসিত হয়েছে। এরপর পরিণত সঙ্গীত শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি ‘উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত প্রবেশ”, “শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বিষয়ক মূল্যবান গ্রন্থ দুটি রচনা করেছেন।
সঙ্গীতগুণী এই মহান সাধক ব্যক্তি জীবনে ছিলেন বন্ধুবৎসল, সৎ, বিনয়ী, নিরহংকারী ও ধর্মপরায়ণ। জীবনের প্রায় সবটুকু সময়ই সুরের সাধনায় নিমগ্ন থেকে অসংখ্য শিষ্য ও গুণগ্রাহী তৈরি করে গেছেন। নিভৃতচারী এই শিল্পীর স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন সংগঠন প্রদত্ত সম্মাননার মধ্যে ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে নীলফামারীর বাঁশরী সংস্থা, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে দিনাজপুরের শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র, ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহীর সঙ্গীত ভবণ, ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে তেঁতুলিয়া সঙ্গীত বিদ্যালয়, ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে নারায়ণগঞ্জের শ্রুতি একাডেমী, ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে উদীচী দিনাজপুর জেলা সংসদ, ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে দিনাজপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমী, ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, দিনাজপুর শাখা এবং সুইহারী সঙ্গীত নিকেতন প্রদত্ত সম্মাননা পদক উল্লেখযোগ্য। তিনি খ্যাতি-প্রতিপত্তির কথা ভাবেননি কখনও। দীর্ঘদিন নীরবে সঙ্গীতের সাধনা করে গেছেন। এই গুণী প্রথিতযশা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী, শিক্ষা গুরু, সঙ্গীতের নিবেদিত প্রাণ সাধক ওস্তাদ সাইমুদ আলী খান ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ মার্চ নিজ বাসভবন দিনাজপুরে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। আমরা তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ