সোমবার ০৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

নতুন বইয়ের গন্ধে প্রাণের উচ্ছ্বাস

গতকাল মঙ্গলবার আজিমপুর গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে পাঠ্যপুস্তক উৎসব-২০১৯ অনুষ্ঠিত হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : শীতের সকালের মিষ্টি রোদ পড়ে যে কচি মুখগুলো ঝলমল করছিল, নতুন বছরের নতুন বই হাতে পেয়ে সেই মুখেই যেন খুশি আর ধরছিল না। বরাবরের মতো এবারও ইংরেজি বছরের প্রথমদিনে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্র এমনই; সারা দেশ মেতেছে বই উৎসবে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে আজিমপুর সরকারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র সাহা এবং আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. হাছিবুর রহমান। গত ২৪ ডিসেম্বর নতুন বছরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মন্ত্রী জানান, এবছর চার কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৮৬৫ জন শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ৩৫ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮২ খানা বই। আর ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৯৬ কোটি ৭ লাখ ৮৯ হাজার ১৭২টি বই বিতরণ করা হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি দেশের জনগণের আস্থা আছে বলে তারা একতরফা ভোট দিয়ে আমাদের বিজয়ী করেছে। আমরা এ আস্থা ও বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়া হবে। মন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর দেশের জনগণের আস্থা রয়েছে। যার নমুনা হিসেবে গত ৩০ ডিসেম্বর একতরফা রায় দিয়ে নৌকা প্রতীককে বিজয়ী করছে। জনগণের এ আস্থার মূল্য দিয়ে আমরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যাব। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে আগামী দিনের উন্নত বাংলাদেশ গড়ায় বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছরই সরকার বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যে বই বিতরণের উৎসব করে আসছে। এমন উদ্যোগ পৃথিবীর কোনো দেশেই নেই, সারা পৃথিবী বাংলাদেশের এই কাজে অবাক হচ্ছে।
নাহিদ বলেন, আধুনিক ও উন্নতশিক্ষায় শিক্ষিত একটি জাতি গঠনে সরকার এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। আগে বই পুস্তক ও শিক্ষা সরঞ্জামের অভাবে সবাই স্কুলেই যেত না, প্রতিবছরই অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ত। এখন সেই ঝরে পড়ার হার নেই বললেই চলে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন বলেন, বই পড়ে সবাইকে পরীক্ষা দিতে হবে। কোথাও নকল করে পাস করার অপচেষ্টা করলে সেসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হবে। এ জন্য শিক্ষকদের সঠিক দায়িত্ব পালন করার অনুরোধ জানান তিনি।
বই উৎসবের সূচনায় মন্ত্রী আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত ইশা, গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির সোলায়মান তানভীর রাজ, লালবাগ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মেহেদী হাসান অমিত, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের আবিদ হাসান সিদ্দিকী, হাজারীবাগ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের কারিগরি ভোকেশনাল বিভাগের নবম শ্রেণির জান্নাতুল আফরিন, হাফেজ আব্দুর রাজ্জাক জামেয়া ইসলামিয়ার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ফাউজিয়া নওরিন বুশরার হাতে বই তুলে দেন।
মিরপুর রূপনগরের বার্ডো স্কুল থেকে আসা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মো. ওবায়দুল হকও মন্ত্রীর হাত থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির ব্রেইল বই নেয়।
বিভিন্ন বোর্ড চেয়ারম্যান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তা, ঢাকা মহানগরের ২৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭ হাজার শিক্ষার্থী, তিন হাজার শিক্ষক, অভিভাবক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
প্রাথমিকের বই উৎসব: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উদ্যোগে সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে আয়োজন করা হয় ‘বই বিতরণ উৎসব ২০১৯’। উৎসবে ঢাকার রমনা, ধানমন্ডি, লালবাগ, কোতোয়ালীসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন বই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে মঙ্গলবার পাঠ্যপুস্তক উৎসবে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেন অধ্যাপক জাফর ইকবাল। আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার। তবে অসুস্থতার কারণে অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি তিনি। তবে ফোনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন মন্ত্রী।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। বই উৎসবে বিশেষ অতিথি ছিলেন লেখক-অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, কথা সাহিত্যিক আনিসুল হক, জাতীয় দলের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান।
অনুষ্ঠানে ফোনে দেওয়া বক্তব্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের মনোযোগ সারা পৃথিবীব্যাপী ‘তাক লাগিয়ে দিয়েছে’। আশা করব, আমাদের শিক্ষার্থীরা নতুন বই পেয়ে পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হবে এবং সরকারের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করে দেশকে স্বাবলম্বী করে তুলবে এবং উপযুক্ত মানুষে হিসেবে গড়ে উঠবে- তাদের কাছে এই প্রত্যাশা রাখি।
জাফর ইকবাল বলেন, এত বই পৃথিবীর কোনো দেশ ছাপায় না। কোনো দেশ ছাপাতে পারবেও না, শুধু বাংলাদেশ পারবে। এত কষ্ট করে এতগুলি বই কেন ছাপায়, বলো? তোমাদের জন্য। তোমরা বইটা পড়বে তো? সারা পৃথিবীর কোনো মানুষ এত নতুন বই পায় না। বাসায় গিয়ে আজকে রাতেই সবগুলো বই পড়ে ফেলবে, ঠিক আছে?”
জাতীয় টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা দেশের ভবিষ্যৎ, তাই তোমাদের হাতে বই তুলে দেওয়াটা সব থেকে বড় কাজ। আমি ধন্যবাদ জানাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে, যার অক্লান্ত পরিশ্রমেই এটা সফল হয়েছে। আশা করি, তোমরা সবাই পড়াশোনায় মনোনিবেশ করবে, সাথে সাথে খেলাধুলাটাও করতে হবে। দুইটা জিনিসই একসাথে চালাতে হবে এবং সবগুলোতেই ভালো করতে হবে।
এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২০১৯ শিক্ষাবর্ষে দেশের ৫০৮টি উপজেলার প্রাথমিক স্তরের ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৪৭টি বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের ২ কোটি ৩৯ লাখ ৬৫ হাজার ১৫১ জন শিক্ষার্থীদের হাতে ৩৪ লাখ ২৮ হাজার ১০টি ‘আমার বই’ ও অনুশীলন খাতা এবং ৯ কোটি ৮৮ লাখ ৯৯ হাজার ৮২৪টি বই বিতরণ করা হবে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আওতাভুক্ত প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৮টি পাঠ্যপুস্তক ছাপানো হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ