বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

‘কেন আমি মুসলিম হলাম’, ধর্মান্তরিত কেয়া গ্রাভিতার মর্মস্পর্শী জবানবন্দি

ইয়াহু লাইফস্টাইলে ‘আমেরিকান বিউটি’ নামের একটি নতুন সিরিজ শুরু করেছে। যেখানে সৌন্দর্য কি তা আবিষ্কার করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একধরনের ভার্চুয়াল ভ্রমণের আয়োজন করেছে। এটা পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে উঠা সংস্কৃতিকে সবার সামনে পরিচিত করিয়ে দেয়ার একটি উদ্যোগ।
এই উদ্যোগের প্রথম অনুষ্ঠানে মুসলিম-আমেরিকান নারীদের জীবনবৈচিত্র্যকে সামনে আনা, কিসে তাদেরকে এতটা অনন্য করেছে এবং তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের এতটা কাছাকাছি করার যোগসূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা চালানো হয়। প্রবন্ধে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে কেয়া গ্রাভিতার ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়া সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাসমূহ তুলে ধরেন।
কেয়া গ্রাভিতার বলেন, ক্যান্টাকীর খ্রিস্টান পেন্টেকোস্টাল ধর্ম যাজকের (খ্রিস্টীয় ধর্মের নতুন একটি শাখা) নাতনী হিসাবে আমি যখন বড় হচ্ছিলাম যিনি সেখানে একটি চার্চ চালু করেছিলেন। এবং সেই চার্চটির শিক্ষা আমার মাথায় একেবারে গেঁথে গিয়েছিল। কিন্তু  শৈশব থেকেই আমার মনে এমন সব প্রশ্নের উদয় হতে থাকে যা সম্পর্কে বাইবেল এবং বেশিরভাগ খ্রিস্টান উত্তর দিতে অক্ষম ছিল। সাত বছর বয়সের সময় আমি আমার বাইবেলের শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘২৫শে ডিসেম্বর আমরা কেন জিসুর জন্মদিন পালন করি?’ (আমি সম্প্রতিক সময়ে জেনেছি যে, জিসু ক্রিসমাসে জন্ম গ্রহণ করেননি।) আমি আরো অনেক প্রশ্ন করতাম যেমন- ‘জিসুর মৃত্যুর পরে কেন ট্রিনিটির (এক প্রকার নব আবিষ্কৃত খ্রিস্ট্রীয় বিশ্বাস) উদ্ভব হয়েছিল?’
আমার ১০ বছর বয়সের সময় আমি পেন্টেকোস্টাল ধর্ম ত্যাগ করি এবং লুথেরান (আরেকটি খ্রিস্ট্রীয় বিশ্বাস) গ্রহণ করি। খ্রিস্টান ধর্ম সম্পর্কে দ্বিধা থাকা সত্ত্বেও আমি রবিবার চার্চে যেতাম, প্রতিদিন বাইবেল পড়তাম এবং অবসর সময়ে বাইবেল স্কুলগুলোতে বাইবেল পড়াতাম আর চার্চে গান গাইতাম। এমনকি প্রতিটি গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে আমি হাই স্কুলগুলোতে নেতৃত্ব তৈরি করার ক্যাম্প করতাম, যেখানে আমরা প্রধানত পুরাতন এবং নতুন টেস্টামেন্টের উপর গুরুত্ব দিতাম।
আমার ১৬ বছর বয়সের সময় সৃষ্টিকর্তার প্রতি সরাসরি প্রার্থনা করার আগ্রহ জন্মায়। আমি এমন একটি পরিবারে ছিলাম তাদের প্রার্থনায় বলত ‘প্রিয় জিসু তোমাকে ধন্যবাদ’ আর অন্যদিকে আমি বলতাম ‘প্রিয় সৃষ্টিকর্তা লোকজন সরাসরি আপনার প্রার্থনা করছেনা দেখে আমি বিব্রত।’ (এটা সে সময়ে হয়েছিল যখন আমি ইসলাম সম্পর্কে জানতাম না। এমনকি এটাও জানতাম না যে মুসলিমরা জিসুর প্রার্থনা করে না, মেরীর প্রার্থনা করে না, মুহাম্মদ (সা.) এর প্রার্থনা করে না বরং তারা সরাসরি সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনা করে।)
আমার প্রথম অগ্রগতি হয়েছিল ২০১১ সালের দিকে যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলাম এবং সেখানে আমার অনেক মুসলিম বন্ধু তৈরি হয়েছিল। তাদের একজন আমাকে বলেছিলেন ‘তোমাদের মতই আমাদের ধর্মেও একই নবীদের সম্মান করে’। তখন থেকে আমি আব্রাহামিক ধর্মগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করে দিই। সত্যি কথা বলতে গেলে আমি প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম যে ইসলাম একটি উদ্ভট ধর্ম এবং গণমাধ্যমগুলো ইসলাম সম্পর্কে যা প্রচার করে তা সঠিক। আমার আশা ছিল আমি তাদেরকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করবো।
২০১৩ সালে ধর্ম সম্পর্কে এক বছরেরও অধিক সময় ধরে পড়াশোনা করার পর আমি ধর্ম সম্পর্কে পরিচিতিমূলক পাঠে ভর্তি হই। একদিন আমাদের শিক্ষক ক্লাসে আলোচানার ফাঁকে বলেন যে, বাইবেলের কিছু বই ছিল যা এখন হারিয়ে গেছে। বাইবেলের একজন বিশ্বাসী হিসাবে তার এই কথায় আমি খুবই মনক্ষুন্ন হলাম। আমি জেনেছিলাম যে কুরআনকে কখনো পরিবর্তন করা হয়নি। সুতরাং আমার মুসলিম বন্ধুদের খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা একেবারেই উবে গেল, বরং এবার উল্টোটা ঘটল। যতই আমি ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করছিলাম ততই আমি বিজ্ঞান, সৃষ্টিকর্তা, জিসু সম্পর্কে আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাচ্ছিলাম। তার মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল এরকম যে, ‘সৃষ্টিকর্তা আসলেই কি এই মহাবিশ্ব ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন? অথবা একেবারে শূন্য থেকে কিভাবে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হলো?’
কুরআনের মতে, সৃষ্টিকর্তা এই পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। (আল-কুরআন ৪১:৯-১২) এবং সেখানে সাত দিন সম্পর্কে কোন কথা ছিল না। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সৃষ্টিকর্তা এই মহাবিশ্ব একেবারেই শূণ্য থেকেই সৃষ্টি করেছেন। আমি জানিনা এটা কি বিগ-ব্যাং ছিল না অন্যকিছু।
রামজান মাসে যখন মুসলিমরা সারাদিন উপোস থাকেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সত্যিকারের কুরআন পড়তে, ইন্টারনেট থেকে নয়। আমি আমার এক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে আমাকে ইফতারিতে দাওয়াত দিয়েছিল, যদি সে আমাকে তার ধর্মীয় গ্রন্থ ধার দেয়। সেই রাতে আমি এটিকে আমার সাথে বাসায় নিয়ে এসেছিলাম এবং পড়তে শুরু করেছিলাম। প্রথম বাক্য পড়ার সাথে সাথেই আমার হৃদয় আলোতে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
শুধুমাত্র একটি কারণে আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিনি বরং সেখানে অনেকগুলো কারণ ছিল। কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত নেয়ার পিছনে কুরআন পড়াটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আরবী কলেজে ভর্তি হবো যাতে আমি আরবীতে কুরআন পড়তে পারি। এখন আমি পবিত্র কুরআন আরবীতেই পড়তে পারি যদিও আমি এর পুরোটা বুঝতে পারিনা।
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ‘শাহাদা’ পাঠের মাধ্যমে আমি ইসলাম গ্রহণ করি, সৃষ্টিকর্তার উপর আমার বিশ্বাসের ঘোষণা করি এবং এও স্বীকার করি যে মুহাম্মাদ (সা.) তার প্রেরিত একজন বার্তাবাহক। আমি অনুভব করি যে আমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি যদিও আমি আমার বাসায় সকলের অজান্তেই এটা করি। এটা ছিল সৃষ্টিকর্তা এবং আমার মধ্যে গোপন একটি ব্যাপার।
এর কয়েক বছর পরেও আমি চিন্তা করতে পারিনি যে- এটা আমার জীবনকে পরিবর্তন করে দিবে। কারণ মুসলিম হওয়ার পরেও আমি ততটা ভালো হতে পারিনি, তবে আমি একজন ভালো দানশীল ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলাম। আমি আমার পিতামাতার মতোই একই সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনা করি এবং আল্লাহ শব্দটি হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার আরবী শব্দ। আমার মধ্যে একটি জিনিস পরিবর্তন হয়েছিল আর তা হচ্ছে শালীন পোশাক পরতে শুরু করা।
যখন আমি ইসলাম গ্রহণ করি তখন শুধুমাত্র কিছু লোকজনই এটা জানত। আমি আমার কিছু মুসলিম বন্ধু এবং আমার খ্রিস্টান প্রিয় বন্ধু লিনডেসির নিকট এটা স্বীকার করি। সে ছিল একমাত্র ব্যক্তি যে আমাকে সমর্থন করেছিল। ইসলাম গ্রহণ করাটাকে গোপন রেখে আমার কাছে মনে হত আমি যা গ্রহণ করেছি সে সম্পর্কে আমি মিথ্যাবাদীর মত আচরণ করছি। অবশেষে কলেজের শেষবর্ষে অনেক লোকজনকেই আমার ইসলাম গ্রহণ করার ব্যাপারে জানাই।
লোকজন যত বেশি ইসলাম সম্পর্কে বাজে কথা বলত ততই আমি তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করি। এটা শুরু হয়েছিল যখন আমি হিজাব পরা শুরু করে দিই। আমার পরিবার এটার বিরুদ্ধে ছিল এবং তার চাইতে আমি যেন আমার চুল ছেড়ে দিই এবং তারা মনে করত আমি এটা কেউ একজনের জন্য পরা শুরু করেছি কিন্তু আমি হিজাব পরা শুরু করেছিলাম আমার নিজের জন্যই।
মুসলিম এবং অমুসলিমদের অনেকেই সচরাচার একটি প্রশ্ন করতেন ‘তুমি কি একজন পুরুষের জন্য ধর্মান্তরিত হয়েছ?’ না! আমি এমন অনেককেই চিনি যারা ধর্মান্তরিত হয়েছে শুধুমাত্র এ জন্য নয় যে আমার কোনো মুসলিমের প্রেমে পড়েছি। লোকজন আমার দিকে ঘৃণা ভরে তাকাত এবং বলত ‘মুর্খ মুসলিম’। আমাকে অনেক সময় এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো যে, ‘তুমি কেন এমন একটি বস্তু তোমার মাথায় পরতে শুরু করে দিয়েছ?’ আমি সচরাচার বলতাম এটা আমার এবং সৃষ্টিকর্তার মধ্যে একটি ব্যাপার। এমনকি আমি বলতাম- আমি মাতা মেরীর মত পর্দা পরাকে পছন্দ করি।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পূর্বে আমি আমার পরিবারের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু তাদের কাছে এ বিষয়ে সুন্দর কিছু ছিল না। ‘কেন তাদের মধ্যে পারিবারিকভাবে আয়োজন করে বিবাহ দেয়ার প্রথা রয়েছে?’ এটা ইসলাম এবং মুসলিমদের সম্পর্কে একটি জনপ্রিয় ভুল ধারণা। আয়োজিত বিবাহ এমনকি ইসলামের সাথে যায় না। কারণ পাত্র-পাত্রীদের অধিকার রয়েছে যাকে তার পছন্দ নয় তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হতে। আমি আমার পিতামাতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বলিনি তারা এটা জানতে পারে যখন আমি এ সম্পর্কে ‘ইউটিউবে’ একটি পোস্ট দিই। আমার পরিবারের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া স্বরূপ তারা আমাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে বলে। তারা আমাকে নিতে আসে এবং আমার জীবনযাপন দেখে তারা মনক্ষুন্ন হয়।
এ সম্পর্কে আমি আরেকটি প্রশ্নের মুখোমুখি হই, ‘তোমার ইসলাম গ্রহণ করা সম্পর্কে তোমার পরিবার কি অনুভব করে?’ আমার মনে হয় অমুসলিমরা আমাকে এসব জিজ্ঞেস করে হেয় করার জন্য এবং তারা এটা জানাতে চায় যে, তুমি তোমার পিতামাতার দ্বারা ভালো ব্যবহারের যোগ্য নও। যদিও আমার পিতামাতা আমার মুসলিম হওয়াতে মনক্ষুন্ন হয়েছে কিন্তু এটা আমাকে তাদেরকে আরো বেশি ভালোবাসতে উৎসাহ দেয়।
কলেজে যাওয়ার আগেই আমি মুসলিমদের সম্পর্কে প্রচলিত সকল ধ্যানধারণার সবকিছুকেই বিশ্বাস করতাম। আমি মনে করতাম মুসলিমদের কেউই তেমন ভালো না। আমি মনে করতাম তাদের সকলেই ঘৃণার যোগ্য এবং সন্ত্রাসী। আমি ইসলামকে এতটাই এড়িয়ে যেতাম যে, গণমাধ্যমগুলো যা বলত তাই বিশ্বাস করতাম। অথচ ইসলাম এবং মুসলিমদের মূল্যবোধ হচ্ছেঃ শান্তি, ভালোবাসা এবং মহত্বের।
সূত্র : ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত মুসলিম কেয়া গ্রাভিতারকে নিয়ে ইয়াহু লাইফ স্টাইলের প্রচারিত অনলাইন সিরিজ থেকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ