বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মুসলিম সাহিত্যিকদের লেখনীতে দেশপ্রেম

তসলিমা কবির : দেহের পুষ্টি সাধনের জন্য যেমন সুষম খাদ্যের প্রয়োজন তেমনি মনের পুষ্টি সাধনের জন্য প্রয়োজন মননশীল সাহিত্যের। একজন ব্যক্তির মানস গঠনের পাশাপাশি একটি জাতির মানস গঠনে সাহিত্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে। সাহিত্যের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবও সমাজের উপর সমানভাবে বর্তায়। সাহিত্য যদি অশ্লীল অনৈতিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ে তাহলে সমগ্র জাতি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে সাহিত্যের মধ্যে যদি দেশের কথা, দেশের মানুষের কথা, কল্যাণের কথা থাকে তাহলে সে সাহিত্য হয়ে যায় আদর্শ সাহিত্য। এ সাহিত্য নীরবে একটা বিপ্লব ঘটাতে পারে। ধ্বংস প্রায় একটা সমাজকে মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। প্রাচীন যুগের। সাহিত্যের ধারা ব্যাপকতর ছিল না। এ সময়ের সাহিত্যের একমাত্র নিদর্শন “চর্যাপদ”। চব্বিশ জন পদকর্তার সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ নিয়ে চর্যাপদের গঠিত। এই পদকর্তাদের সবাই ছিলেন বৌদ্ধ পন্ডিত। মধ্যযুগের সাহিত্য ছিল মূলত দেব- দেবীর কাহিনী নির্ভর। মুসলমান কিছু লেখক এ সময় ইসলামের মর্মবাণী প্রচারের জন্য কলম ধরলেও তাদের লেখনীতে মানবতা, প্রকৃতি প্রেম ও দেশপ্রেম গভীরভাবে ফুটে ওঠে। দেশের মানুষ, দেশের ভাষা, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি তাদের কলমের আঁচড়ে যেন নতুন জীবন পেতে থাকে। আরাকান রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতায় যে সাহিত্যিকগণ তৈরি হয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দৌলত কাজী ও মহাকবি আলাওল। কবি আলাওলের সাহিত্য কর্মের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলো “পদ্মাবতী”। হিন্দি কবি মালিক মুহাম্মদ জায়সীর “পদুমাবৎ” কাব্যের অবলম্বনে লেখা এ কাব্য। এখানে পদ্মাবতীর রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি পদ্মাবতীর চুল, সিঁথি, চোখ, নখ, ঠোঁট ইত্যাদির সাথে আমাদের দেশের ফুল, ফল, পাখি, পাতা, নদী, মেঘকে মিলিয়ে দিয়েছেন। এ সময়ের আরো কিছু শক্তিমান কবি হলেন শাহ মুহাম্মদ সগীর, জৈনুদ্দিন, সাবিরিদ খান, মুহাম্মদ কবির, দোনা গাজী, দৌলত উজির বাহরাম খান, আব্দুল হাকিম প্রমুখ। কবি আব্দুল হাকিমের কালজয়ী কবিতা “বঙ্গবনী”-তে মাতৃভাষা বাংলার প্রতি ফুটে উঠেছে প্রগাঢ় দেশপ্রেম। তিনি লিখেছেন...
“যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবানী
সেসব কাহারো জন্ম নির্ণয়ন জানি।”
১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের শুরু। এ সময়ের লেখকদের লেখায় বিষয় বৈচিত্র্যতা লক্ষ্যণীয়। মীর মশাররফ হোসেন তার “জমিদার দর্পণ” নাটক এ সময়ে লেখেন। এখানে তিনি দেশের মানুষের উপর ব্রিটিশ বেনিয়াদের চরম নির্যাতন ও  শোষণের চিত্র তুলে ধরেন। তার “উদাসীন পথিকের মনের কথা” আত্মজীবনীমূল গ্রন্থেও দেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের আগমণ বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন স্বাধীনতার আন্দোলন ছাড়া আমাদের জাতি ইংরেজদের হাত থেকে রেহাই পাবে না। ঘুমন্ত জাতিকে তিনি জাগিয়ে তুলেছেন তার গান কবিতার মাধ্যমে। তিনি তার “সাত সাগরের মাঝি” কাব্যগ্রন্থের “সিন্দবাদ” কবিতা সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন এভাবে-
“ছিড়ে ফেলে আজ আয়েশী রাতের মখমল অবসাদ,
নতুন পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দবাদ।”
ফররুখ আহমদ ছদ্মনাম ব্যবহার করে মোহাম্মদী, সওগাত, দৈনিক আজাদ প্রভৃতি পত্রিকায় যে ব্যঙ্গ বিদ্রুপাত্মক কবিতা লিখেছিলেন তার মধ্যেও দেশপ্রেমের ছবি ফুটে উঠেছিলো। 
দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি দরদ থেকেই কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য অঙ্গনে আগমন। তার কলম অস্ত্রের ভূমিকা পালন করেছে। দেশের স্বার্থে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে কলম ধরার জন্য তাকে বার বার কারাবরণ করতে হয়েছে তবু তার কলম থেমে থাকেনি। দেশের জন্য তিনি লিখেছেন অসংখ্য গান, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ। তার “চক্রবাক” কাব্যের অধিকাংশ কবিতাগুলোর মধ্যেই আমাদের দেশের প্রকৃতির এক চমৎকার রূপের পরিচয় পাওয়া যায়। নজরুলের গানের মধ্যে যেন আমরা দেশপ্রেমের মিষ্টি অনুভূতি অনুভব করতে পারি। তিনি লিখেছেন
“সোনা  সোনা  সোনা
লোকে বলে সোনা
সোনা নয় তত খাঁটি
বলো যত খাঁটি তার চেয়ে খাঁটি বাংলাদেশের মাটিরে আমার জন্মভূমির মাটি।”
তিনি আরো লিখেছেন-
“একি অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লি জননী।
 ফুলে ও ফসলে কাঁদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবণী।”
 আর একজন প্রতিভাবান কবি হলেন কবি কায়কোবাদ। কবি কায়কোবাদের কবিতায় দেশপ্রেম অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। বাংলার প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি লিখতে পেরেছেন-
“বাংলা আমার মাতৃভাষা
বাংলা আমার জন্মভূমি।
 গঙ্গা পদ্মা যাচ্ছে ব’য়ে,
 যাহার চরণ চুমি।”
 স্মরণীয় বরণীয় খ্যাতিমান আরো একজন গীতিকার হলেন অধ্যাপক আবু জাফর। তার গানে দেশপ্রেমের কথা ফুটে উঠেছে এভাবে
“আমার দেশের মাটির গন্ধে ভরে আছে সারা মন
শ্যামল কোমল পরশ ছাড়া যে নেই কিছু প্রয়োজন।”
দেশের ক্রান্তিকালের কবি হলেন কবি গোলাম মোহাম্মদ। প্রতিবেশী দেশের ফারাক্কা বাঁধের ফলে শুষ্ক মৌসুমে আমাদের দেশের নদীগুলো তাদের যৌবন হারায়। নদীমাতৃক এ দেশের মানুষের তখনকার নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়। এসময় আফসোস করে কবি লিখেছেন-
“এই মাঠে কি গহীন গাঙের তীর ছিল না?
 ফুল পাখিদের ভিড় ছিল না?
কে কেড়েছে আমার নদীর উছল করা পানি?
আমার সবুজ মাঠ কেন আজ শুষ্ক মরুর কানি?”
 এ চরণ কয়েকটির মাঝেই আমরা তার দেশের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা উপলব্ধি করতে পারি।
কবি গোলাম মোহাম্মদের সময়কার আর একজন জনপ্রিয় কবি ও গীতিকার হলেন মতিউর রহমান মল্লিক। তার গানে কবিতায় দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে এভাবে-
“মাঠ ভরা ঐ সবুজ দেখে
 নীল আকাশের স্বপ্ন এঁকে
 যার কথা মনে পড়ে
 সে যে আমার পাল্নেওয়ালা।”
দেশের প্রতি ভালোবাসা তার মিশে একাকার হয়েছে স্রষ্টার সাথে এখনও পর্যন্ত যিনি দেশপ্রেমকে বুকের মধ্যে লালন করে সাহিত্য সাধনায় মগ্ন তিনি হলে আমাদের দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি কবি আল মাহমুদ। তার অসংখ্য লেখার মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে দেশপ্রেম। তার “নোলক” কবিতায় প্রকৃতির রূপের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-
“সবুজ চুলে ফুল পিন্দেছি নোলক পরি না তো!
ফুলের গন্ধ চাও যদি নাও, হাত পাতো হাত পাতো।”
 বাংলার রূপের এ বর্ণনা বুঝি কেবল কবি আল মাহমুদকেই শোভা পায়।
আমাদের দেশ ধানের দেশ, গানের দেশ। জলের দেশ, ফলের দেশ। কবির দেশ, কবিতার দেশ। সবুজ বাংলার প্রকৃতিতে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই শক্তভাবে কলম ধরেছেন। কেউ কলম ধরেছেন মাতৃভূমি, মাতৃভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে। এ ভালোবাসাই দেশকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। মুসলিম কবি সাধকগণ এ সমৃদ্ধির জন্যই এগিয়ে এসেছিলেন। দেশপ্রেমকে মনের গভীরে লালন করলেই কেবল এটা সম্ভব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ