বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

অনতিবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবি

গতকাল সোমবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে ২০ দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় -সংগ্রাম

# শপথ না নেয়ার ঘোষণা মির্জা ফখরুলের
# এই নির্বাচন পূর্ব-পরিকল্পনায় হয়েছে, আর ইঞ্জিনিয়ারিংটা হয়েছে ভোটের আগের রাতে
# আমরা নির্বাচনে গিয়েছি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে
স্টাফ রিপোর্টার : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে অনতিবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির জরুরী বৈঠক শেষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এ দাবি জানান দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নির্বাচন পরবর্তী দলের করণীয়, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও কর্মসূচি নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করতে স্থায়ী কমিটির এই বৈঠক ডাকা হয়। পরে ২০ দলীয় জোটের বৈঠক থেকেও একাদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবি জানানো হয়েছে।
মির্জা ফখরুল বলেন, পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে একেবারে বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে আমাদের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে নজিরবিহীনভাবে একটা যুদ্ধাবস্থা তৈরি করে ত্রাস-ভীতি সৃষ্টি করে এই নির্বাচনটি করা হয়েছে। আমরা এই নির্বাচন যেটা নজিরবিহীন সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং ভোট ডাকাতি বলা যেতে পারে, এই ভোট ডাকাতির ফলে আমরা এই নির্বাচনের ফলাফলকে পুরোপুরি প্রত্যাখান করেছি। আমরা মনে করি, এই কলঙ্কজনক নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় অনুষ্ঠিত করতে হবে এবং এটা অনতিবিলম্বে করতে হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার পুনঃনির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয় বলেছেন সেক্ষেত্রে আপনারা এগুবেন কিভাবে প্রশ্ন করা হলে মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার সবচাইতে পক্ষপাতদুষ্ট একজন ব্যক্তি এবং আপনারা জানেন যে, প্রথম থেকে তার বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে আসছিলাম। তিনি একজন দলীয় ব্যক্তি, তার সমস্ত কার্যকলাপ ইতিমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। উনি যেভাবে কথা বলেন তাতে সম্পূর্ণভাবে সরকার যে কথা বলতে চায় তার প্রতিধ্বনি করেন। তিনি সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন।
তবে কিভাবে বিএনপি এগুবে তা ‘সময়মত’ জানাবেন বলে জানান তিনি। আমরা সমস্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সিদ্ধান্ত নেব। এজন্য জোটের সাথে আলাপ করে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করবো।
নির্বাচিতরা কী করবে?: যারা নির্বাচিত হয়েছে শপথ নেবেন কিনা প্রশ্ন করা হলে ফখরুল বলেন, আমরা ফলাফল সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছি। একই সঙ্গে এই দাবি আদায়ে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি আন্দোলনও করবে বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, অবশ্যই আমাদের কর্মসূচি থাকবে। এই নির্বাচনে এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে দলীয় সরকারের অধীনে কখনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।  মির্জা ফখরুল বলেন, এবার এই সরকার নির্বাচন কমিশনের সাথে যোগসাজশ করে এমন একটা নির্বাচন করলো এটা জাতির রাজনৈতিক ইতিহাস ও নির্বাচনের ইতিহাসে সবচাইতে কলঙ্কময় ঘটনা বলে আমি মনে করি। নতুন ভোটাররা এবার সবচাইতে বেশি ডিপরাইভড হয়েছেন। তাদের যে অধিকার সেই অধিকার তারা প্রয়োগ করতে পারেননি। রাজধানীসহ প্রত্যেকটি কেন্দ্র ভোটার শূন্য ছিলো।
২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন সঠিক ছিলো: মির্জা ফখরুল বলেন, এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়ার যে সিদ্ধান্ত ছিলো সেই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলো। অর্থাৎ আমরা যেটা বলে আসছি যে দলীয় সরকারের অধীনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক যে সংস্কৃতি আছে সেই সংস্কৃতিতে এখানে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ২০১৪ সালেও একইরকম ফলাফল হতো।
সিইসির বক্তব্য সঠিক নয়: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যের জবাবে বলেন, উনি (সিইসি) বলেছেন, এজেন্ট না আসলে আমি কি করব? আরে এজেন্ট না আসতে দিলে আমরা (বিএনপি) কী করবো। এজেন্টকে তো আপনারা আসতে দেননি। এই সরকার তার রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ও নির্বাচন কমিশনের যোগসাজশে আমাদের এজেন্টদেরকে কেন্দ্রে যেতেই দেননি। যেখানে যেখানে গেছেন সেখানে যেমন আমার নির্বাচনী এলাকায় একশ ভাগ এজেন্ট ছিলো কিন্তু তাদেরকে বের করে দেয়া হয়েছে। আমাদের দলের নেতা গয়েশ্বর বাবুর (ঢাকা-৩) ওখানে একশ ভাগ এজেন্ট ছিলো, তাদেরকে বের করে দেয়া হয়েছে। আমাদের নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাহেবের নির্বাচনী এলাকায় এজেন্ট ছিলো তাদেরকে বের করে দেয়া হয়েছে। এভাবে স্টাফিং করা হয়েছে। এজেন্টদের বিরুদ্ধে আগে থেকে মামলা দিয়ে রেখেছে, অনেককে গ্রেপ্তার করেছে এবং নির্বাচন এজেন্টদের মনোনীত করবার যে কাগজটা প্রার্থী দেবে সেই কাগজটাকে ওরা ছিঁড়ে ফেলেছে বহু জায়গায়। তিনি বলেন, এই নির্বাচন আগে থেকে পূর্ব পরিকল্পনায় হয়েছে। আর ইঞ্জিনিয়ারিংটা করা হয়েছে ভোটের আগের রাতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। এই কারণে জনগণ যে ১০ বছর ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পারছিলো না সেটা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হলো।
 ভোট পরবর্তী সহিংসতার অভিযোগ: ভোটের পর বিভিণœ স্থানে ক্ষমতাসীনরা সহিংসতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে সহিংসতা হয়েছে, নির্বাচনের দিন হয়েছে। এখন ভোটের পরে পরেই শুরু হয়েছে সহিংসতা। বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় প্রার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আক্রমণ চালানো হচ্ছে, নেতা-কর্মীদের বাড়িতে আক্রমণ চালানো হচ্ছে, তাদের সমর্থকদের আক্রমণ চালানো হচ্ছে এবং বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। যেমন আমার নিজের নির্বাচনী এলাকায় আজকে বেগুনবাড়ি ইউনিয়নের দানারহাট কেন্দ্রে আমার নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বাড়ি পুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, ভেঙে ফেলা হচ্ছে। নির্বাচনের দিন ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ কেন্দ্রে আমার প্রধান এজেন্টের বাড়িতে আক্রমণ করে ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমার স্ত্রীকে ঘটনাস্থলে যেতে দেয়া হয়নি। আমি নিজে গিয়ে ওই কেন্দ্র দেখেছি ৪/৫ টা বুথে কোনো এজেন্ট নেই। ভয়ভীতি তৈরি করা হয়েছে যাতে কেউ না আসে।
নির্বাচনে কেনো গেলাম?: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, অনেকে প্রশ্ন করেছেন এতো গ্রেপ্তার-হামলার পর নির্বাচনে আমরা কেনো গেলাম। তখনও বলেছি, এখানো স্পষ্ট করে বলছি- আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল। আমরা নির্বাচন করতে চাই, নির্বাচন করে সরকার পরিবর্তনে বিশ্বাসী। সেই কারণে আমরা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা নির্বাচনে গিয়েছি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য, মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য। নির্বাচন কমিশনকে বার বার বলে এসেছি আপনি একটা পরিবেশ তৈরি করুন, লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করুন। আপনারা জানেন যে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের কাছে গিয়েছি নির্বাচনের একটা পরিবেশ তৈরি করতে। কিন্তু তারা সেটা করতে পারেনি।
নির্বাচন উপলক্ষে তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্য়ন্ত ২১ হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে বিভিন্ন মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অভিযোগ করে অবিলম্বে তাদের মুক্তির দাবিও জানান বিএনপি মহাসচিব। মির্জা ফখরুল বলেন, তফসিল ঘোষণার পরপরই তারা বিরোধী প্রার্থীদের গ্রেফতার, গুম, হত্যা করতে থাকে। তাদের উদ্দেশ্যই ছিল একতরফা নির্বাচন করা। তিনি বলেন, ভোটের আগে প্রশাসনের সহযোগিতায় ব্যালটে সিল মারা হয়েছে। তাই আমরা এ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছি। প্রত্যাখ্যান শব্দটি কয়েকবার উচ্চারণ করেন তিনি।
বিদেশী পর্যবেক্ষক আইওয়াশ: অপর এক প্রশ্নের জবাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষকের বিষয়টি আইওয়াস বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ফখরুল বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বিদেশী পর্যটক আসার বিষয়টি আওয়ামী লীগের আইওয়াস। বিএনপির মহাসচিব বলেন, এ নির্বাচনে কোনো বিদেশী পর্যবেক্ষক ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষকদের আসতে দেওয়া হয়নি। আর ইইউ তাদের কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায়নি। যারা এসেছে তারা সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত। সরকার নিজের টাকায় তাদের নিয়ে এসেছে। ভারতের যে কয়জন এসেছে তারা পর্যবেক্ষক হিসেবে নয় সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসেছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ড. মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও  আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এর আগে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বিকাল ৪টা থেকে দেড় ঘন্টা বৈঠক করেন। এই বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলন হয়।
২০ দলীয় জোটের বৈঠক: বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর ২০ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বৈঠকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম, বিজেপির ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, মোস্তফা জামাল হায়দার, ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানসহ বিভিন্ন শরিক দলের নেতারা ছিলেন। বৈঠকে নির্বাচনের সার্বিক বিষয়াদি ছাড়াও আগামী দিনের করণীয় বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ