মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ভূমির মালিকানা : প্রেক্ষিত ইসলাম

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : ভূমি মানব জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ মতে ভূমি হতেই সকল কিছুই উৎপত্তি। আবার এই ভূমিতেই সব কিছু বিলীন হয়ে যাবে। ভূমি বা জমি মানুসের মূল্যবান সম্পদ। ভূমির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সৃষ্টির শুরু থেকে সকল দেশে ভূমির ব্যবহার বিদ্যমান। মানব সমাজের ক্রমবিকাশ, ভূমির চাহিদার ক্রমবিকাশ, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃংখলা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভূমি ব্যবহারের নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ভূমির মালিকানা কার? সৃষ্টির শুরু থেকে এ প্রশ্ন চলে আসছে। এক সময় যে জঙ্গল পরিষ্কার করে জমি চাষযোগ্য করতো সে তার মালিক বনে যেতো। কিংবা কেউ যদি কোন পরিত্যক্ত জমি বা অন্যের জমি জোরপূর্বক দখল করে নিরবচ্ছিন্নভাবে তা ১২ বছর যাবত ভোগ দখল করতো তবে সে ঐ জমির মালিকানা অর্জন করতো। কিন্তু ইসলাম এ ধরনের মালিকানাকে স্বীকার করে না। ইসলাম উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত কিংবা বৈধ উপায়ে উপার্জিত ভূমির মালিককেই প্রকৃত মালিক হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ প্রবন্ধে ভূমির পরিচয়, মালিকানা, বিশ্লেষণ, মালিকানা লাভের সাধারণ নিয়ম ইত্যাদি বিষয় স্থান পাবে।
ভূমির পরিচয় : ভূমির একাধিক পরিচয় পাওয়া যায়। নিম্নে কয়েকটি সংজ্ঞা প্রদত্ত হলো ঃ ভূমি শব্দের অর্থ হল পৃথিবী, ভূ-পৃষ্ঠ, মাটি, মেঝে, ক্ষেত্র, জমি ইত্যাদি। সাধারণ অর্থে মাটি বা জমির উপরিভাগকে ভূমি বলে। ভূ-পৃষ্ঠে অবস্থিত প্রাথমিক স্তরের ক্ষয় সাধনের ফলে যে ক্ষুদ্র কণা ভূ-পৃষ্ঠে জমা হয় এবং তার সাথে জৈব পদার্থের সংমিশ্রণের ফলে যে পদার্থ গঠিত হয় তাই ভূমি বা মাটি। মৃত্তিকা বা মাটি শব্দের আরবী প্রতিশব্দ ‘তুরাব’, আর ভূ-পৃষ্ঠ শব্দের প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘আল-আরদ’। ‘আরদ’ বা ভূ-পৃষ্ঠ বলতে আমরা যে গ্রহে বাস করছি তাকে বোঝায়। কুরআনুল করীমে বলা হয়েছে : ‘হে জিন ও মানব সম্প্রদায়! আকাশম-লী ও পৃথিবীর সীমা তোমরা যদি অতিক্রম করতে পার অতিক্রম কর, কিন্তু তোমরা তা অতিক্রম করতে পারবে না ছাড়পত্র ছাড়া।’ ভূ-পৃষ্ঠ দ্বারা বাসগৃহকে বোঝানো হয়েছে কুরআনুল করীমে। বলা হয়েছে: ‘তিনি তোমাদের মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাতেই তিনি তোমাদের বসতি দান করেছেন।’ কোন কোন আয়াতে ‘আরদুন’ শব্দটি বিস্তৃত বিছানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআন মজীদে উল্লেখ আছে: ‘যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্য বিছানা ও আকাশকে ছাদ করেছেন এবং আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তার সাহায্যে তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেন। সুতরাং তোমরা জেনে শুনে কাউকেও আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করো না।’
‘আরদুন’ শব্দটি মাটি অর্থেও কুরআনুল করীমের বিভিন্ন আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ‘যখন তোমরা বলেছিলে, হে মূসা! আমরা একই রকম খাদ্যে কখনো ধৈর্য ধারণ করব না। সুতরাং ভূমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা করÑ যেন তিনি ভূমিজাত দ্রব্য শাক-সবজী, কাঁকুড়, গম, মসুর ও পিঁয়াজ আমাদের জন্য উৎপাদন করেন। মূসা বললেন, তোমরা কি উৎকৃষ্টতর বস্তুকে নিকৃষ্টতর বস্তুর সাথে বদল করতে চাও?’ মানব সৃষ্টির মূল উপাদান মাটি। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল করীমের ভাষ্য : ‘আমি মাটি থেকেই তোমাদের সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদের ফিরিয়ে দিব এবং এ থেকেই তোমাদের পুনরায় বের করব।’ মহানবী স. বলেছেন : ‘যার ভূমি আছে সে যেন তা চাষ করে। আর যদি সে চাষ করতে অপারগ হয় তাহলে যেন তার ভাইকে (চাষ করার জন্য) দান করে দেয়।’ তিনি আরও বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি কোন পতিত অনাবাদি ভূমি আবাদ করবে সে নিজেই সে ভূমির মালিক হবে।’
এভাবে কুরআনুল করীম ও আল-হাদীসে মানব জাতিকে ভূমির সদ্ব্যবহার করে রিযিকের ব্যবস্থা করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যার স্ফীতি কোন কোন দেশে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। অপরদিকে বর্তমান বিশ্বের বহু দেশে চাষযোগ্য জমি অনাবাদ পড়ে আছে, যেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে পারলে দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মানব জাতি খানিকটা হলেও মুক্তি লাভ করতে পারতো।
ভূমির মালিকানা : ‘মালিকানা’ অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন অর্থব্যবস্থায় মালিকানার ধারণা বিভিন্নরূপ। যেমন- ক. পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় মালিকানা বলতে সম্পদের ওপর ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিরংকুশ, সীমাহীন ও শর্তহীন অধিকারকে বুঝায়। খ. সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় সম্পদের মালিকানা হল রাষ্ট্রের। সরকার রাষ্ট্রের পক্ষ হতে মালিকানা স্বত্ব ভোগ করে থাকে। এ অবস্থায় সম্পদের ওপর ব্যক্তির কোন অধিকার স্বীকার করা হয় না। গ. পক্ষান্তরে ‘মালিকানা’-এর ব্যাপারে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সার্বজনীন নীতি গ্রহণ করেছে, যা পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা ও সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার সংকীর্ণতা ও সীমা লংঘনের ত্রুটিমুক্ত। কারণ বস্তুবাদী এই দুই দর্শনের অবস্থান পুরোপুরি দুই মেরুতে। কিন্তু ইসলামে এ ধরনের বস্তুবাদী চিন্তার কোন অবকাশ নেই। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কোন কিছুর মালিকানা যেমন কোন ব্যক্তি বা দলের নয়, তেমনি রাষ্ট্রেরও নয়। বরং ভূমিসহ যাবতীয় সম্পদের প্রকৃত ও নিরঙ্কুশ মালিকানা একমাত্র মহান আল্লাহর। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল করীমে বলা হয়েছে : ‘আসমান ও জমীনে যা কিছু আছে সমস্ত আল্লাহরই।’ অপর এক আয়াতে বলা হয়েছে : ‘আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর যা যাবতীয় বস্তুর মালিক।
উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, ভূমি তথা ধন-সম্পদ ও যাবতীয় কল্যাণকর উপকরণসামগ্রী যত কিছুর অস্তিত্ব আছে- তা মাটি, জমি, নদী-সমুদ্র, পানি, সূর্যতাপ, চন্দ্রের আলো যাই হোক না কেন সব কিছু নিরংকুশভাবে মহান আল্লাহর মালিকানাভূক্ত। এ ব্যাপারে কেউ তাঁর সমতুল্য নেই, কেউ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, এ মালিকানায় কেউ তাঁর সাথে শরীকও নেই।
এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় যে, পৃথিবী ও ভূমির প্রকৃত মালিক নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ। তবে তাঁর মালিকানার অর্থ এই নয় যে, মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্ট সম্পদ ভোগ করবেন। মূলত আল্লাহর মালিকানার অর্থ সৃষ্টি জীবের তত্ত্বাবধানের ও ভোগের অধিকার, আরও একটু সীমিত অর্থে সামাজিক ও তত্ত্বাবধানের ও ব্যবস্থাপনায় ভোগাধিকার। তাই মহান আল্লাহকে ভূমি তথা সম্পদের মূল মালিক ও একক নিয়ন্ত্রক মনে করে মানুষ কেবল ভূমির ভোগাধিকার স্বত্ব লাভ করে। এ ভোগ বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষ ভূমি বা সম্পদের মূল মালিক মহান আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ থাকে। সেহেতু মহান আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায়ই তাকে ভূমি বা সম্পদ ভোগ করতে হয়। তাই সে এর যথেচ্ছ ব্যবহার করতে পারে না।
ইসলামী অর্থনীতিতে মালিকানা : ইসলামী অর্থনীতিতে মালিকানা দুই প্রকার : ক. প্রকৃত মালিকানা খ. ব্যক্তি মালিকানা। সৃষ্টিকর্তা ও একক নিয়ন্ত্রক হিসাবে সম্পদের মূল মালিক আল্লাহ এবং পৃথিবীতে তাঁর নিযুক্ত প্রতিনিধি হিসাবে মানুষ এর ব্যক্তিগত মালিক।
ব্যক্তি মালিকানা প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ আবুল কাসেম বলেন, ‘মানুষের জীবনই অস্থায়ী। এই অস্থায়ী জীবনে ধন-সম্পদ কখনো স্থায়ী হয় না। মহাকালের মহাসাগরে মানুষ যেন এক একটা অতি ক্ষুদ্র বুদবুদ। এই বুদবুদ অতিশয় অস্থির ও অনিত্য। মহাকালব্যাপী অসংখ্য প্রাকৃতিক সম্পদের সামান্যতম মাত্র ভোগ দখল করতে পারে ব্যক্তি-মানুষ অল্প সময়ের জন্য। তাই সম্পদের স্থায়ী ও প্রকৃত মালিক আল্লাহ, মানুষ নয়। মানুষ অল্প সময়ের জন্য সীমিতভাবে সম্পদের ব্যবহার করতে পারে মাত্র। যে নিজেই নিজের মালিক নয় সে আবার অপরের মালিক হয় কি করে? তাই মানুষ শ্রম ও মেধা দিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদকে পরিবর্তিত করে ব্যবহার উপযোগী করে তুলে মহাকালের ক্ষুদ্রতম সময়ের আওতায়। অস্থায়ীভাবে সে তার অধিকারী হয় মাত্র কখনো মূল মালিক হয় না। একে ‘ব্যক্তি মালিকানা’ বা আমানতী মালিকানা বলা হয়।
ইসলামে ‘ব্যক্তি মালিকানা’ বা আমানতী মালিকানা এক বিশেষ বৈশিষ্টের অধিকারী। অংকশাস্ত্রে যেমন সাইন ব্যতীত কোন অংকের মান নির্ধারণ হয় না, তেমনি ইসলামের নৈতিক বাধ্যবাধকতা ছাড়া মালিকানা সংজ্ঞায়িত হয় না। পুঁজিবাদ ও সমাজবাদ ব্যক্তিকে সমাজের সোপান হিসাবে সংগঠিত করতে কার্যত সফল হতে পারেনি। কিন্তু ইসলামী অর্থনীতি এ ক্ষেত্রে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের তুলনায় সর্বতোভাবে সফল। পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় ব্যক্তি মালিকানা মানব দেহে রক্ত কণিকার মতই প্রয়োজনীয় অথচ সমাজতন্ত্রে তা সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য। পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় লাগামহীন ব্যক্তি মালিকানা বহু অপচয় ও অপবণ্টনের জন্য দায়ী। ফলে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সমাজে ধনী আরও ধনী হয় এবং দরিদ্র আরও দরিদ্র হতে থাকে। ভোক্তার সার্বভৌমত্বের নামে মূল্য ব্যবস্থার আঘাতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ শোষিত হয়। অপরদিকে সমাজতন্ত্রে যৌথ মালিকানা ও রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার পক্ষে ব্যক্তি মালিকানাকে উপেক্ষা করা হয়। এ ব্যবস্থায় বেকার সমস্যা ও অসম বণ্টনের খানিকটা সুরাহা হতে পারে, কিন্তু উৎপাদনে মানুষের অভিনবত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। তাছাড়া সমাজতন্ত্রে ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে কিছুই থাকে না। শ্রমিকগণ রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ হিসেবে বেঁচে থাকে। এ দু’টি অর্থব্যবস্থা একই রোগের দ্বিবিধ লক্ষণ মাত্র। কিন্তু ইসলামী অর্থব্যবস্থা পুঁজিবাদ ও সমাজবাদ এই দু’প্রান্তিক চরম মতবাদ পরিহার করে মধ্যমপন্থা অনুসরণ করে। এ ব্যবস্থায় উৎপাদনে উৎসাহ, সুষম বণ্টন এবং মানবিক মূল্যবোধ সবই অক্ষুণœ রাখা সম্ভব। সুতরাং ইসলামী অর্থনীতিতে ব্যক্তি মালিকানা স্বীকার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল করীমে বলা হয়েছে : ‘ইয়াতীমদেরকে তাদের ধন-সম্পদ সমর্পণ করবে এবং ভালোর সাথে মন্দ বদল করবে না। তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদ মিশিয়ে গ্রাস করো না; নিশ্চয় তা মহাপাপ।’ অন্যত্র বলা হয়েছে : ‘পুরুষ যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ এবং নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ।’ আরও বলা হয়েছে : ‘পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তির প্রত্যেকটির জন্য আমি উত্তরাধিকারী করেছি এবং যাদের সাথে তোমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ তাদেরকে তাদের অংশ দিবে।’
মহানবী স. বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি কারো এক বিঘত পরিমাণ জমি জোর করে দখল করবে কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তার গলায় সাত স্তর জমি বেড়ি রূপে পরিয়ে দিবেন।’ ইসলাম ব্যক্তি মালিকানা স্বীকার করে নিলেও তা শর্তহীন নয়। বরং ইসলামে ব্যক্তি মালিকানা কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে স্বীকৃত। সম্পদের কল্যাণকর ও সর্বজনীন ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষে এ শর্তগুলো আরোপ করা হয়েছে। শর্তগুলো হলো :
ভূমির নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহার : ভূমির নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মালিকানা রহিত বলে গণ্য হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, হযরত বেলাল ইবনুল হারিস রা.-কে মহানবী স. প্রচুর জমি আবাদ করার জন্য দিয়েছিলেন। হযরত উমর রা. খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পর তাঁকে ডেকে বললেন, ‘মহানবী স. আপনাকে অনেক জমি দিয়েছেন। আর আপনি পুরো জমি চাষাবাদ করতে পারছেন না। অতঃপর বললেন, আপনি বিবেচনা করে দেখুন; যে পরিমাণ জমি আপনি নিজে চাষাবাদ করতে সক্ষম হবেন, সে পরিমাণই আপনি নিজের দখলে রাখুন। আর যা সামলাতে পারবেন না কিংবা যে পরিমাণ জমির ব্যবস্থাপনা করা আপনার পক্ষে সাধ্যাতীত, তা আমাদের (রাষ্ট্রের) নিকট ফেরত দিন, আমরা তা অন্যান্য মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেব। হযরত বেলাল রা. তাঁর জমি ফেরত দিতে রাজি না হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সাধ্যাতীত পরিমাণ জমি হযরত উমর রা. ফেরত নিলেন এবং মুসলমানদের মধ্যে পুর্নবণ্টন করলেন।’
ভূমির কল্যাণকর ব্যবহার : ভূমি হতে উৎপন্ন ফসলের কিছু অংশ মহান আল্লাহর রাস্তায় অর্থাৎ কল্যাণকর কাজে ব্যয় করতে হবে। ইসলামী অর্থনীতিতে ভূমি তথা সম্পদের ব্যবহার নীতি কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন : ‘যারা নিজেদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা একটি শস্যবীজ, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শীষে থাকে একশত শস্যদানা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। যারা আল্লাহর পথে ধন-সম্পদ ব্যয় করে অতপর যা ব্যয় করে তার কথা বলে বেড়ায় না এবং ক্লেশও দেয় না, তাদের পুরষ্কার তাদের প্রতিপালকের নিকট। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ অপর এক আয়াতে বলা হয়েছে : ‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান কর তবে তা ভাল, আর যদি গোপনে কর এবং অভাবগ্রস্তকে দাও তা তোমাদের জন্য আরও ভালো।’
যাকাত প্রদান : সমাজের যে ক’জন লোক তাদের উচ্চতর যোগ্যতা ও সৌভাগ্যের কারণে নিজেদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধন-সম্পদ আহরণ করেছে ইসলাম চায় তারা যেন এ সম্পদ পুঞ্জিভূত করে না রাখে বরং এগুলো ব্যয় করে এবং এমন সব ক্ষেত্রে ব্যয় করে যেখান থেকে সম্পদের আবর্তনের ফলে সমাজের স্বল্পবিত্ত ভোগীরাও যথেষ্ট অংশ লাভ করতে সক্ষম হয়। এ লক্ষ্যেই ইসলাম যাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছে। ইসলামের নির্দেশ অনুযায়ী নিসাব পরিমাণ যাকাত প্রদান করতে হবে। যাকাতের বিধানাবলী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, কৃষিজ পণ্যই এর অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। ভূমি একটি রাষ্ট্রের অপরিহার্য উপাদান। ভূমি মানুষের রিযক ও জীবন ধারণের মূল উৎস এবং স্থিতি স্থাপনের ক্ষেত্র। এটা যাকাত আইনেরও মূল ভিত্তি। ইসলামের ভূমি ব্যবস্থা ইনসাফপূর্ণ। ভূমি ব্যবস্থারই অন্যতম দিক হল উশর ও খারাজ। কোন কোন অবস্থায় উৎপাদিত ফসলের এক-দশমাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দেয়া ফরজ হয়, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে শতকরা বিশ ভাগ দিতে হয়। ইসলামী সরকার কর্তৃক ফসল ও ভূমির উপর আরোপিত করকে উশর ও খারাজ বলা হয়। উশর মুসলমানদের জমির সাথে সংশ্লিষ্ট ও নির্দিষ্ট। অমুসলিমদের জমিতে উশর নেই, আছে খারাজ। উশর মুসলমানদের ওপর কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা প্রামাণ্য ফরয।
ভূমির অকল্যাণকর ব্যবহার রোধ : ইসলাম ভূমি তথা সম্পদের কল্যাণমূলক ব্যবহারকে উৎসাহিত এবং অকল্যাণকর ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করেছে। যেহেতু ভূমির প্রকৃত এবং অবিমিশ্র মালিক মহান আল্লাহ, কাজেই এর ব্যবহার করার অধিকার প্রত্যেক মানুষেরই রয়েছে, তবে উক্ত ব্যবহারের ফলে সমাজের অপরাপর ব্যক্তি ও জনগোষ্ঠীর যাতে কোন ক্ষতি না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা অপরের ক্ষতি হলে তা আগ্রাসন হিসাবে বিবেচিত হবে এবং আগ্রাসন সব সময়েই নিষিদ্ধ। কুরআনুল করীমে বলা হয়েছে : ‘হে মু’মিনগণ! তোমরা যা উপার্জন কর এবং আমি যা ভূমি হতে তোমাদের জন্য উৎপাদন করে দেই তন্মধ্যে যা উৎকৃষ্ট তা ব্যয় কর এবং এর নিকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করার সংকল্পও করো না।’ হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে যে, মহানবী স. বলেছেন : ‘প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি আটকিয়ে রাখা উচিত নয়, তাতে তৃণভূমির উন্নয়ন ব্যাহত হবে।’ এই হাদীসের তাৎপর্য হচ্ছে মুসলমানদের অবশ্যই নিজের প্রয়োজন সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে এবং সমাজের অপরাপর ব্যক্তির যাতে ক্ষতি না হয় সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।
বহু মুসলিম দেশেই লক্ষ করা যাচ্ছে, ভূমির ব্যক্তিগত মালিকানার সুযোগে কিছু সংখ্যক ব্যক্তির হাতে দেশের মোট ভূমির বিপুল অংশ কুক্ষিগত হচ্ছে। ইসলামী আইনে এ জাতীয় অবস্থা মোটেই সমর্থিত নয়। কারণ ইসলামী বিধানে ভূমি কিছু সংখ্যক ব্যক্তির সুবিধার জন্য নয়, বরং সাধারণ জনসাধারণের কল্যাণের জন্য ব্যবহার করতে হবে। বিশিষ্ট ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ ইবনুল কাইয়িম এ সম্পর্কে বলেন : ‘আল্লাহ তাঁর সৃষ্ট মানুষের জন্য যে বিধান দিয়েছেন তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এসব বিধান মানুষর মধ্যে সুযোগ-সুবিধার সমতা বিধানের জন্য তৈরি। যখনই বিভিন্ন মানুষের কাঙ্খিত সুবিধার মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় তখনই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় বিষয়ের উপর প্রাধান্য দেয়া হয়। ইসলামী বিধান মানুষের উপকার করার জন্য পরিকল্পিত, কিন্তু যখন কোন স্বার্থহানী অনিবার্য হয়ে পড়ে তখন অপেক্ষাকৃত কম অনিষ্ট সাধনের প্রতি প্রয়াস লক্ষ করা যায়। মহান আল্লাহর দেয়া বিধানের এই হচ্ছে মৌলিক নীতি যা আল্লাহর বিজ্ঞতা ও উদারতার পরিচায়ক।’
আইনানুগ দখলস্বত্ব : ভূমি দখল আইন সংগত হতে হবে। মহানবী স. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কারও এক বিঘত জমি জোর করে দখল করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার গলায় সাত তবক জমীন বেড়ি রূপে পরিয়ে দিবেন।’ মিথ্যা দলিল ও ভুয়া সাক্ষী প্রমাণের মাধ্যমে কোর্টের রায় নিজের অনুকূলে নেয়ার প্রচেষ্টা তথা দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পত্তি ভোগ দখল করা ইসলামী ব্যবস্থায় সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
সুষম ব্যবহার : ব্যক্তি মালিকানা সম্পর্কে শরীয়তের স্পষ্ট নীতি হচ্ছে মালিককে তার ভূমি তথা সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানা অবশ্যই কুরআনুল করীম ও সুন্নাহ প্রবর্তিত নীতি থেকে যাতে বিচ্যুত না হয় সেজন্য সমাজ তথা রাষ্ট্রকে সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সম্পদের মালিককে কৃপণ কিংবা অপচয়কারী হওয়া যাবে না। কেননা মহান আল্লাহ উদ্ধত, দাম্ভিক, কৃপণ ও অপচয়কারী ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না। অন্যায়ভাবে অপরিমিত সম্পদের মালিক হওয়া ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। অমিতব্যয়িতাকে পরিহার করে মহান আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ তাঁর রাস্তায় ও মানবতার সেবায় ব্যয় করার জন্য ইসলাম কঠোর তাগিদ দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম কৃপণতা ও অপচয় এ দুয়ের মধ্যবর্তী অবস্থা সমর্থন করে।
ভূমি দ্বারা যথার্থ উপকার লাভ : ব্যক্তি মালিকানা সম্পর্কে ইসলামের অন্যতম নীতি হচ্ছে ভূমি তথা সম্পদ মালিকের যথার্থ উপকারে আসতে হবে। লক্ষণীয় যে, বহু ক্ষেত্রে মানুষ তার সম্পদ জাতীয় কল্যাণে নিয়োজিত না করে ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতার ইন্ধন হিসাবে ব্যবহার করে। এটা অবশ্যই ইসলামের মৌলিক নীতির বিরোধী। এ বিধানে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে, ভূমি কখনো ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করা যাবে না। ইসলামী আইন সকল আর্থিক চাপ ও প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রয়াসী। ব্যক্তি মালিকানা সম্পর্কে শর্ত হচ্ছে, ভূমি তথা সম্পদ জীবিত ব্যক্তির স্বার্থে ব্যয়িত হতে হবে। মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির কোন ভূমি বা সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ বা ভোগ করার প্রশ্নই আসে না। কাজেই ইসলামী বিধান মোতাবেক মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে।
হালাল হারমা বিবেচনা : ভূমি তথা সম্পদ ব্যবহারে হালাল হারামের বিবেচনা করতে হবে। অবৈধভাবে কোন ভূমি কিংবা সম্পদ দখল বা ভোগ করা সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ বলেন : ‘হে মানব জাতি! পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্য বস্তু রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না, নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শক্র।’
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা একথা স্পষ্টতই উপলব্ধি করা যাচ্ছে যে, ইসলামে ভূমি মালিকানা তথা ব্যক্তি মালিকানা নৈতিক ও ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কোন ব্যক্তি তার মালিকানাধীন ভূমি বা সম্পদ ইসলামের মৌলিক নীতি বিরোধী কাজে ব্যবহার করলে ইসলামী রাষ্ট্র তার মালিকানা রহিত করার অধিকার রাখে।
মালিকানার অধিকার বিশ্লেষণ : মহান আল্লাহর মালিকানার অধীনে ব্যক্তি মালিকানার অধিকারকে স্বীকার করে নেয়ার জন্য চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। যথা : ১. অপব্যবহার রোধ ২. অন্যায় ব্যবহার রোধ ৩. যথার্থ ব্যবহার ৪. স্থায়ী ব্যবহার। এই চার ধরনের অধিকার কেবলমাত্র একটি শর্ত দ্বারা সীমাবদ্ধ। শর্তটি হচ্ছে, এই সকল অধিকার সমাজের অন্যান্য মানুষের একইরূপ অধিকারের ক্ষেত্রে কোন প্রকার বাধার সৃষ্টি করতে পারবে না।
অপব্যবহার রোধ : বিশ্ব জগতের প্রতিটি বস্তুই কোন না কোন উদ্দেশ্যে এবং কোন না কোন নির্দিষ্ট কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। কাজেই কোন কিছু ধ্বংস বা অপব্যবহার করার অধিকার কারো নেই। ইসলামে অপচয়কে শুধু নিষেধ করা হয়নি, বরং তা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। ৪০ কুরআনে বলা হয়েছে : ‘কিছুতেই অপব্যয় করো না, যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই।
অন্যায় ব্যবহার রোধ : অন্যায়ভাবে ভূমি তথা সম্পদ কুক্ষিগত করা ইসলামে নিষিদ্ধ। অন্যায়ভাবে কারো ভূমি আটকিয়ে রাখা বা মজুদদারী ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মজুদদারীতে সম্পদকে কাজে না লাগিয়ে অলস রাখা হয় বলেই একে নিষিদ্ধ বিবেচনা করা হয়েছে। আল্লাহর সম্পদ পুঞ্জিভূত করে অপরকে তা ব্যবহারের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কারো নেই। মানুষের সম্পদ ব্যবহার করার সীমিত অধিকার আছে, কিন্তু অন্যায়ভাবে সম্পদ ব্যবহার করার অধিকার তার নেই।
যথার্থ ব্যবহার : ইসলামে যথার্থ ব্যবহারের অধিকার অবাধ নয়, বরং সীমিত। সমাজের কোন শ্রেণীর লোক যদি আশ্রয়হীন থাকে, গৃহহীন অবস্থায় তারা যদি গাছের তলায়, রাস্তায় বা পাহাড়ের গুহায় জীবন কাটায় সে অবস্থায় সম্পদ থাকলেও কেউ তার রুচি ও ইচ্ছানুযায়ী সৌখিন বাড়ি তৈরি করতে পারে না। ইসলাম তা সমর্থন করে না। ইসলাম চায় ভূমিসহ সকল সম্পদের যথার্থ ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি নাগরিকের বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে। সমাজ মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হলে সে ক্ষেত্রে কুরআনুল করীম উদ্বৃত্ত সম্পদের উপর ব্যক্তি মালিকদের অধিকার বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করেছে। কুরআনুল করীমে এসেছে : ‘আল্লাহ জনপদবাসীদের নিকট হতে তাঁর রসূল স.-কে যা কিছু দিয়েছেন তা আল্লাহর, তাঁর রসূলের, রসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান কেবল তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য্য আবর্তন না করে।’
স্থায়ী ব্যবহার : ইসলাম সীমাহীন সময়ের জন্য ভূমি তথা সম্পদের ওপর অধিকার স্বীকার করে না। যে মুহুর্তে সম্পদকে অব্যবহৃত রাখা বা সম্পদের অপব্যবহার করা হয় সেই মুহুর্তেই তা বাজেয়াপ্ত যোগ্য হয়ে যায়। ভূমি মালিক নিজে চাষ করতে না পারলে বা না করালে কিংবা নিজে যে পরিমাণ চাষ করতে পারে তার চেয়ে অধিক পরিমাণ ভূমি থাকলে, তা অন্যের দ্বারা চাষ করাবে। অথচা চাষের কাজে অন্য লোকের সাহায্য গ্রহণ করবে। নিজের ভোগ ও ব্যবহারের প্রয়োজন না হলে, অন্য কথায় কারো প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভূমি থাকলে তা অন্য কোন ভূমিহীনকে চাষাবাদ বা ভোগ করতে দিতে হবে। স্থায়ী ব্যবহারের মূল কথা হল, কুরআনুল করীমে উল্লেখিত এবং মহানবী স. এর নির্দেশিত পথে ভূমি তথা সম্পদ ব্যবহার করতে হবে।
মালিকানা লাভের বৈধ পন্থা : ইসলামে ভূমি তথা সম্পদের ব্যক্তি মালিকানা লাভের কয়েকটি বৈধ পন্থা রয়েছে। যেমন: ক. প্রাকৃতিক উপায় উপাদানের মধ্যে যে সব দ্রব্য ও সম্পদে কারো মালিকানা বা অধিকার প্রতিষ্ঠিত, প্রথম দখলের মাধ্যমে তাতে দখলকারীর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। মহানবী স. বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি এমন কোন অনাবাদী জমি আবাদ কবে, যা কারো মালিকানায় নেই, সেই তার মালিক হবে।’ খ. নিজস্ব জ্ঞান বা প্রতিভা কাজে খাটিয়ে কোন জিনিস আবিষ্কার করলে বা কোন যন্ত্র প্রস্তুত করলে, উক্ত জিনিস ব্যবহারে তার স্বত্ব স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হবে। কোন ব্যক্তির বৈধ পরিশ্রমলব্ধ অর্থ-সম্পদের ওপর তার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। ঘ. উপযুক্ত বিনিময়ে সম্পদ ক্রয়ের মাধ্যমেও ভূমি তথা সম্পদের মালিকানা লাভ করা যায়। মহান আল্লাহ বলেন : ‘হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, কিন্তু পরস্পর সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা করা বৈধ।’ ঙ. উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ কোন সম্পদ প্রাপ্ত হলে তাতে তার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। মহান আল্লাহ বলেন : ‘পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে, তা অল্পই হোক বা বেশিই হোক, নির্ধারিত অংশ।’ চ. রাষ্ট্র বা সরকার কোন নাগরিককে কোন জমি বা সম্পত্তি প্রদান করলে উক্ত ব্যক্তি প্রদত্ত সম্পত্তির মালিক হবে। ইসলামী পদ্ধতিতে একে ‘ইকতা’ পদ্ধতি বলে। ছ. উপহার-উপঢৌকন, হেবা বা অসীয়তের মাধ্যমেও সম্পদের মালিকানা লাভ করা যায়।
মালিকানাবিহীন ভূমি উন্নয়ন ও বণ্টন নীতি : ইসলামী অর্থনীতির বিশেষ উল্লেখযোগ্য নীতি হচ্ছে রাষ্ট্র ও সরকারের দখলে যে সব মালিকবিহীন জমি থাকে, এসব ভূমি ঐ সব ভূমিহীন বা স্বল্প ভূমির মালিক লোকদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে, যারা এসব ভূমি আবাদ ও চাষোপযোগী করে তুলতে এবং তাতে ফসল ফলাতে ইচ্ছুক ও সক্ষম। এই ভূমিসমূহ নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে আবাদ করার শর্তে তাদেরকে দেয়া হবে। তারা যদি এই নির্দিষ্ট মেয়াদ তথা তিন বছর মেয়াদের মধ্যে আবাদ করে, তবে এই জমি তাদের অধিকারেই থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবাদ না করলে তা সরকারের নিকট প্রত্যার্পিত হবে এবং সরকার তা অপর ভূমিহীন জনগণের মধ্যে পুনর্বণ্টন করবে। মহানবী স. ও খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলে এরূপ ভূমি বণ্টনের নিয়ম প্রচলিত ছিল। এ ভূমি বণ্টনের ব্যাপারে কিছু জরুরি শর্ত রয়েছে : ক. সেই জমি কোন নাগরিকের মালিকানাভূক্ত হবে না। খ. সেই জমি সাধারণ জন-মানুষের কল্যাণের সাথে সম্পর্কিত হবে না। এ ধরনের কোন জমি বিশেষ কোন নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে মালিকানা হিসেবে দান করার সরকারের কোন অধিকার নেই। গ. এ জমি এমন হবে না যেখানে জন-মানবের জন্য অপরিহার্য কোন ধাতু বা সম্পদের খনি অবস্থিত। এরূপ হলে সেই জমি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে দেয়া বৈধ হবে না। এই তিন প্রকার ভূমি ছাড়া অন্য সকল প্রকার ভূমি সরকার যাকে ইচ্ছে বণ্টন করে দিতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে স্বজন প্রীতি, ঘুষ কিংবা অন্য কোন দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করা যাবে না।
ইসলামের আবির্ভাবকালে আরব দেশের ভূমির তিনটি অবস্থা ছিল : ক. অনেক ভূমি ছিল ব্যক্তি মালিকানাভূক্ত। খ. এমন অনেক ভূমি ছিল, যার কেউ মালিক ছিল না। গ. গৃহপালিত পশুর সাধারণ চারণভূমিরূপে নির্দিষ্ট ছিল অনেক ভূমি। মহানবী স. মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সর্বপ্রথম মালিকানাবিহীন অনাবাদী জমি আবাদ করার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করলেন : যে ব্যক্তি এমন কোন জমি আবাদ করে যার মালিক নেই, তাহলে সে ব্যক্তিই (ঐ জমির) সবচেয়ে বেশি অধিকারী।’ লোকেরা তখন সাধ্যানুসারে জমি আবাদ করারও মালিক হবার জন্য চেষ্টা করতে লেগে গেল। এভাবে বহু লোকের মধ্যে মালিকানাবিহীন জমি বণ্টন করা হল।
ইসলামী রাষ্ট্র কর্তৃক ভূমি বণ্টনের এটাই হল মূলনীতি। অনাবাদী ভূমি আবাদ করা অথবা ভূমিহীন কৃষক বা মুহাজিরদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে সরকারের পক্ষ হতে কাউকে ভূমি দান করা ইসলামে বৈধ। একে আরবীতে ‘ইকতা’ বলে। মহানবী স. ইকতারূপে হযরত আবূ বকর, হযরত উমর, হযরত আলী, হযরত বেলাল, হযরত জুবায়ের রা. প্রমুখ সাহাবীগণকে ভূমি দান করেছিলেন। এভাবে খুলাফায়ে রাশেদীনও একাধিক ব্যক্তিকে ইকতারূপে ভূমি দান করেছেন। ‘কিতাবুল খারাজ’-এ উল্লেখ রয়েছে, ‘যদি ইকতার উদ্দেশ্য সাধিত না হয় অথবা যদি অন্যায়রূপে বা অসদুদ্দেশ্যে ইকতা প্রদান করা হয়, তবে এই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।’ হযরত উমর র. মহানবী স. কর্তৃক প্রদত্ত হযরত বেলাল ইবন হারিস মুযানীর র. ইকতার একাংশ এ জন্যই ফেরত নিয়েছিলেন যে, তিনি এই ভূমি যথাযথভাবে আবাদ করতে সক্ষম হননি। অনুরূপভাবে খলীফা উমর ইবন আবদুল আযীয র. আপন পরিবারের জন্য প্রাপ্ত লাখেরাজ ভূসম্পত্তি এজন্য বাতিল করেছিলেন যে, এগুলো উমাইয়্যা শাসকবর্গ স্বজনপ্রীতির ভিত্তিতে প্রদান করেছিলেন।
উল্লেখ্য যে, সরকারিভাবে যে ভূমি জনগণের মধ্যে বণ্টন করা হবে এর দ্বারা কোনরূপ সামন্তবাদী বা জায়গীরদারী প্রথা চালু করা যাবে না। যার পক্ষে যে পরিমাণ ভূমি চাষাবাদ, উৎপাদন করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব তাকে ঐ পরিমাণ ভূমিই দেয়া হবে। সরকারি মালিকানা ছাড়া ক্রয়কৃত ভূমির মালিকগণ যদি বেশিরভাগ আবাদী ভূমি হস্তগত করে বসে এবং গরীব কৃষকের যদি ভূমির প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে দেখা দেয়, তাহলে রাষ্ট্রপ্রধান দু’পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারবে : ১. মালিকানাবিহীন, পতিত ও অনাবাদি কৃষি ভূমি কৃষকদের মধ্যে বিনা পয়সায় বণ্টন করে দেবেন। ২. ভূমির মালিকদের নিকট কৃষিকার্যের প্রয়োজনীয় ভূমি থাকলে এসব ভূমি তাদের দখলমুক্ত করে কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করে দেবেন।
মহানবী স. এর ইন্তিকালের পর প্রথম পর্যায়ে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের সংঘর্ষ এবং যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়ী হয়ে এই দু’রাষ্ট্রের বিশাল অংশ দখল করে নেয়। ইসলামী রাষ্ট্রের দখলকৃত এই বিশাল ভূমির কেউ মালিক ছিল না। হয় ঐ জমির মালিক যুদ্ধে নিহত হয়েছে, না হয় তা আসলেই কারো মালিকানাভূক্ত ছিল না বরং পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের সরকার প্রদত্ত জতি জায়গা ছিল এবং তা-ই ইসলামী রাষ্ট্রের হাতে এসেছিল। ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফাগণ এই সব জায়গা আবাদ ও ভোগ দখল করার জন্য এমন লোকদের মধ্যে বণ্টন করলেন যারা সেগুলো আবাদ ও ফসল ফলাতে সক্ষম বলে বিবেচিত হয়েছিলেন। এ সকল ভূমি বণ্টনে শরীয়তের বিধান পুরোপুরি অনুসৃত হয়েছিল। হযরত উমর রা. গভর্নর হযরত আবূ মুসা আশআরী রা.-কে লিখে পাঠিয়েছিলেন : ‘যদি তা জিযিয়ার জমি না হয় এবং এমন জমিও না হয় যেখানে জিযিয়ার জমির জন্য পানি প্রবাহিত হয়, তবে কেবল সেই জমিই সরকারি পর্যায়ে জনগণের মধ্যে বণ্টন করতে পারো।’ এতে প্রমাণিত হয় যে, কেবলমাত্র মালিকানা বিহীন জমিই সরকারি পর্যায়ে বণ্টন করা যেতে পারে। আর এইরূপ জমির পূর্ণ বণ্টন সরকারি পর্যায়েই হতে পারে।
সরকারি পর্যায়ে জমি বণ্টনকার্য কেবলমাত্র সেসব জমির মধ্যেই সীমাবদ্ধ যা সরকারের আয়ত্তাধীন রয়েছে এবং যাতে সরাসরি সরকারি নির্দেশ কার্যকর হতে পারে। কিন্তু যেসব জমির নির্দিষ্ট মালিক রয়েছে সেসব জমি সম্পর্কে সরকার বিনা কারণে কোন নতুন নীতি গ্রহণ করতে পারে না। সরকারি পর্যায়ে জমি বণ্টনের এটাই মৌলিক বিধান। অতএব সাধারণভাবে ও কোন সামষ্টিক কল্যাণের উদ্দেশ্য ব্যতীতই খামখেয়ালীভাবে ভূমির মালিকদের উৎখাত করে দিয়ে তা নিজেদের লোকদের মধ্যে অথবা অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যের বিনিময়ে পুনর্বণ্টন করা ইসলামী অর্থনীতির দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট জুলুম।
সরকারিভাবে যে জমি জনগণের মধ্যে বণ্টন করা হবে, তার দ্বারা কোনরূপ সামন্তবাদ বা জায়গীরদারী প্রথা রচনা করা চলবে না। যার পক্ষে যত পরিমাণ জমি ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনার মধ্যে সামলানো, চাষাবাদ ও ফসল ফলানো সম্ভব হবে বলে বিবেচিত হবে, তাকে ততখানি জমিই দেয়া হবে। অধিক পরিমাণ জমি কাউকেই দেয়া যাবে না। হযরত বেলাল ইবনুল হারিস রা.-কে মহানবী স. প্রচুর জমি নিজে আবাদ করার জন্য দিয়েছিলেন। হযরত উমর ফারুক রা. খলীফা নিযুক্ত হবার পর তাঁকে ডেকে বললেন : মহানবী স. আপনাকে অনেক জমি দিয়েছেন। তার পরিমাণ এত বেশি যে, আপনি তা পুরোমাত্রায় চাষাবাদ করতে পারছেন না। অতঃপর বললেন : ‘আপনি বিবেচনা করে দেখুন। যে পরিমাণ জমি আপনি নিজে চাষাবাদ করতে সক্ষম হবেন সে পরিমাণই আপনি নিজের নিকট রাখুন। আর যা সামলাতে পারবেন না কিংবা যে পরিমাণ জমির ব্যবস্থাপনা করা আপনার সাধ্যাতীত, তা আমাদের (রাষ্ট্রের) নিকট ফেরত দিন, আমরা তা অন্যান্য মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেব। হযরত বেলাল রা. জমি ফেরত দিতে রাজি না হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সাধ্যাতীত পরিমাণ জমি হযরত উমর রা. ফেরত নিলেন এবং মুসলমানদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করলেন।
ইমাম আবু ইউসুফ রা. লিখেছেন, ‘যে সকল জমি আবাদী নয়, যার কোন মালিক নেই-তা বণ্টন না করে অব্যবহৃত ফেলে রাখা রাষ্ট্রের পক্ষে কিছুতেই উচিত হতে পারে না। কেননা আবাদ করার ফলে যেমন প্রয়োজনীয় খাদ্য ফসল লাভ করা যেতে পারে, তেমনি সরকারের আয়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে পারে। এ পর্যায়ে হযরত উমর ইবন আবদুল আযীয রা.-এর একটি আদেশ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি তাঁর গর্ভনরদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমাদের হাতে যে সব সরকারি জমি জায়গা রয়েছে তা অর্ধেক ফসলের বিনিময়ে পারস্পরিক চাষের নিয়ম অনুযায়ী জনগণকে চাষ করতে দাও। এতেও যদি তার চাষাবাদ না হয়, তাহলে এক-তৃতীয়াংশের বিনিময়ে (তিন ভাগের এক ভাগ পাবে সরকার এবং দু’ভাগ পাবে চাষী) তা চাষ করতে দাও। আর এই শর্তে যদি কেউ জমি চাষ করতে প্রস্তুত না হয়, তাহলে দশ ভাগের এক ভাগ ফসল পাওয়ার বিনিময়ে চাষ করতে দিতে পার। এতেও যদি জমি চাষ না হয় তাহলে কোনরূপ বিনিময় না নিয়ে এমনিই চাষ করতে দাও। এভাবেও কেউ চাষ করতে না চাইলে তার চাষাবাদ করার জন্য বাইতুলমাল ৬৭ হতে অর্থ ব্যয় কর এবং কোন জমিই তোমরা অব্যবহৃত থাকতে দিবে না।
ইসলামে ভূমির প্রকারভেদ : ইসলামের ভূমি নীতি একটি বিশ্বজনীন ব্যবস্থা। ইসলামের ভূমি ব্যবস্থায় বিভিন্ন প্রকারের ভূমির অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়। যেমন : ক. ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি : ইসলাম বৈধ পন্থায় ক্রয়কৃত কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমিকে ব্যক্তিমালিনাধীন জমি বলে স্বীকার করে। খ. সরকারি মালিকানাধীন ভূমি : দেশের সকল ভূমি ব্যক্তি মালিকানায় সমর্পণ না করে রাষ্ট্রের সার্বিক কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে রাখার অনুমতি রয়েছে। যাতে প্রয়োজনের সময় দেশের সার্বিক কল্যাণ ও ভূমিহীন লোকদের মধ্যে তা বণ্টন করা সম্ভব হয়। সরকারি মালিকানাধীন ভূমির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হলো।
মালিকানাবিহীন যে সকল ভূমি গ্রাম ও শহরবাসীদের সাধারণ ও যৌথ প্রয়োজনের খাতিরে ব্যবহৃত হয়। যথা- খাল, বিল, নদী, ঝরণা, গোচারণ ভূমি, সড়ক, পথঘাট, খেলার মাঠ, কবরস্থান ইত্যাদি। এছাড়া বন, খনি প্রভৃতি প্রাকৃতিক সম্পদ সমৃদ্ধ ভূমিও সরকারি মালিকানায় থাকবে। ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে পরাজিত বিধর্মীদের নিকট থেকে প্রাপ্ত ভূ-সম্পত্তি সরকার রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসাবে ঘোষণা করতে পারেন, আবার ইচ্ছা করলে এ প্রকার ভূসম্পত্তি বিজয়ী সৈনিকদের মধ্যেও বণ্টন করতে পারেন। মহানবী স. খায়বরের বিজিত ভূমির অর্ধেক বণ্টন করে বাকি অর্ধেক রাষ্ট্রীয় মালিকানায় গ্রহণ করেন। অবশ্য সরকার ইচ্ছে করলে উক্ত ভূমি খাজনা লাভের বিনিময়ে তা পূর্বতন মালিকদেরও দিতে পারেন।
শক্রদের ছেড়ে যাওয়া পরিত্যক্ত ভূ-সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় মালিকানাভূক্ত হবে। ইহুদী বনু নযীর গোত্রের ভূমি সরকারি মালিকানাধীন হয়েছিল। মালিকানাবিহীন যে সকল ভূমি পতিত অবস্থায় থাকে এবং শহর বা গ্রামের মানুষের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয় না। যেমন বন-জঙ্গল, মরুভূমি, অনাবাদী পাহাড়ী জমি ইত্যাদি। এসব জমি কার্যত যেমন আবাদ ও ফসলযোগ্য নয়, তেমনি এর দ্বারা কোন উপকারও হয় না। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় এ শ্রেণীর ভূমিকে ‘আরদে মাওয়াত’ বলা হয়। এ শ্রেণীর ভূমির মালিক হয় সরকার। যে ভূমির মালকের মৃত্যু হয়েছে এবং তার কোনও উত্তরাধিকারও নেই এমন ভূমিকে ‘আদিউল আরদ’ বলা হয়। এরূপ ভূমির মালিক হবে স্বয়ং সরকার।
বিজিত অঞ্চলের ভূমি ‘খালিসা’ বা খাস জমি হিসাবে পরিগণিত হয় এবং এর মালিকানার দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করে। যেমন হযরত উমর রা. কর্তৃক পারস্য বিজিত হলে তিনি সেখানকার সম্রাটেরও তার পরিবারের অধিকারভূক্ত ভূমিকে ‘খালিসা’ হিসেবে গ্রহণ করেন। কোন ভূমির মালিক স্বেচ্ছায় মালিকানা স্বত্ব ত্যাগ করে রাষ্ট্রের অধীনে ছেড়ে দিলে তা রাষ্ট্রের হয়ে যায়। যেমন, মদীনা রাষ্ট্র গঠিত হলে চাষাবাদে অতীব কষ্টকর এমন সব শুষ্ক অনুর্বর জমি আনসারগণ মহানবী স. এর হাতে তুলে দেন। তাঁকে ইচ্ছেমত এগুলো ব্যবহারের অধিকার দেয়া হয়।
সাধারণত আবাদী ভূমিতে ব্যক্তিগত মালিকানাই চূড়ান্তভাবে বিদ্যমান থাকে। মালিক তার ইচ্ছেমত এগুলোতে চাষাবাদ ও অন্যান্য উৎপাদনমূলক কাজ করতে পারে। মালিকের বৈধ অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ এ ধরনের ভূমিতে হাত দিতে পারে না। ব্যক্তির মালিকানায় এরূপ উৎপাদনশীল ভূমি কী পরিমাণ থাকতে পারবে তার সীমারেখা ইসলাম বেঁধে দেয়নি। কিন্তু কোন ব্যক্তির হাতে সাধ্যাতীত পরিমাণ ভূমি থাকলে অর্থাৎ তার মালিকানাধীন ভূমিতে চাষাবাদ করার ক্ষমতা না থাকলে এবং এর ফলে তার ঐ ভূমি একটানা তিন বছর অনাবাদী পড়ে থাকলে রাষ্ট্র ঐ ভূমির মালিকানার দায়িত্ব স্বয়ং গ্রহণ করে ভূমিহীন চাষীদের মধ্যে বিতরণ করতে পারবে এবং অনেক ক্ষেত্রে বর্গাচাষেও দিয়ে দিতে পারবে। যদিও বর্গাচাষের পক্ষে ও বিপক্ষে মতামত রয়েছে।
এমন সব উর্বর ও উৎপাদনশীল ভূমি আছে যেগুলো চাষাবাদ না করার কারণে অনাবাদী অবস্থায় পড়ে থাকে। এরূপ ভূমি যদি কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে চাষাবাদ করে তবে সে ঐ ভূমির মালিক হয়ে যাবে। অবশ্য এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অনুমতির প্রয়োজন আছে। এরূপ ভূমির চাষাবাদকারী ব্যক্তিকে সরকার ভূমিস্বত্ব প্রদান করতে পারে। এ স্বত্ব তারা বংশ পরস্পরায় ভোগ করার অধিকার রাখে। এ প্রকারের ভূমির মাধ্যমে ‘আরদে মাওয়াত’ নামীয় মালিকানাবিহীন ভূমিও রয়েছে। উৎপাদনের স্বার্থে এসব ভূমি সরকার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে চাষাবাদের জন্য ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টন করতে পারে। সরকারি মালিকানাধীন পশু বিচরণের জন্য সংরক্ষিত ভূমি সরকারি ভূমি হিসাবেই বিবেচিত হবে।
প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বনভূমি মানুষের কাছে মহান আল্লাহর দান স্বরূপ। এখান থেকে মানুষ বহুমুখী উপকার লাভ করে। এ ধরনের বনাঞ্চল অবশ্যই সরকারি মালিকানাধীন থাকবে। তবে বনাঞ্চল সংরক্ষণ, পরিচর্যা সর্বোপরি সম্পদ সংগ্রহের বিধি-বিধান তৈরি করে কিছু শর্ত সাপেক্ষে এ ধরনের ভূমি কোন ব্যক্তি বিশেষ বা সংগঠনকে ইজারা দেয়া যেতে পারে। খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ ভূমি কোনভাবেই ব্যক্তি মালিকানায় থাকতে পারে না। কারণ এর সাথে দেশের জনস্বার্থ সংযুক্ত। এ প্রকারের ভূমি কোন এক ব্যক্তিকে জায়গীর হিসাবে প্রদান করেও মহানবী স. সর্বসাধারণের উপকারের কথা চিন্তা করে আবার তা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে ফিরিয়ে নিয়ে নজীর সৃষ্টি করেছেন। মরু ও পাহাড়ী ভূমির উৎপাদনের ক্ষমতা নেই বলে ব্যক্তিবিশেষের কাছে এর তেমন ব্যবহারিক উপযোগিতা থাকে না। এ জাতীয় ভূমিতে ব্যক্তিগত স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। তবে রাষ্ট্রের অনুমতি নিয়ে কোন ব্যক্তি এ প্রকারের ভূমির মালিকানা লাভ করতে পারে।
অমুসলিমদের অধিকারভূক্ত ভূমির অবস্থা : মুসলমানদের নিকট যুদ্ধে অমুসলিম বাসিন্দারা পরাজিত হলে অথবা চুক্তি ভঙ্গ করার পর মুসলমানগণ বলপ্রয়োগ করে তাদেরকে পরাভূত করলে, তারা ‘যিম্মী’ হিসেবে গণ্য হবে। তাদের ধন-সম্পদ এবং জায়গা জমি গনীমতের মালরূপে পরিগণিত হবে এবং এর বিলি ব্যবস্থা, চাষাবাদ ও বন্দোবস্তের জন্য ইসলামী রাষ্ট্র ইচ্ছে করলে তা যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করে দেবে। ইচ্ছে করলে শর্তসাপেক্ষে চাষাবাদের জন্য পূর্বের চাষীদের মধ্যেও বণ্টন করে দিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে তারা আর মালিকানা ফেরত পাবে না। বস্তুত মহানবী স. খায়বরের ইয়াহুদীদের সাথে এই নীতিই প্রয়োগ করেছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে, মহানবী স. উৎপাদিত ফল কিংবা ফসলের অর্ধেক ভাগের শর্তে খায়বরের জমি (ইহুদীদেরকে) বন্দোবস্ত দিয়েছিলেন।’
স্বেচ্ছায় যে সব অমুসলিম জাতি ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে সন্ধি করবে, ইসলামী রাষ্ট্র চুক্তি অনুসারে তাদের সকল অধিকার রক্ষা করবে। তারাই তাদের জায়গা-জমি ভোগ-দখল করবে। চুক্তি অনুসারে তারা ইসলামী রাষ্ট্রের দেয় কর আদায় করতে থাকবে। খায়বর বিজয়ের পর ফাদাক নামক স্থানের অধিবাসীগণ মহানবী স.এর সাথে সন্ধি করার জন্য নিজেদের পক্ষ থেকে উদ্যোগী হয়েছিল এবং তাদের জমি থেকে উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক ইসলামী রাষ্ট্রকে দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। মহানবী স. তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদের সাথে সন্ধি করেছিলেন। ফাদাকের জমি বণ্টিত না হয়ে এর অধিবাসীদের হাতেই রেখে দেয়া হয়েছিল।
যে সব অমুসলিম ভূমি মালিক মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করে নিহত হয় কিংবা ইসলামী রাষ্ট্র হতে পালিয়ে অন্যত্র চলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত এর মালিক বা উত্তরাধিকারী কেউই অবশিষ্ট থাকে না। এসব জায়গা জমি বিজয়ী মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিরূপে পরিগণিত হবে এবং ইসলামী রাষ্ট্র তা জনগণের মধ্যে পুনর্বণ্টন করবে। হযরত উমর রা. এই নীতি অবলম্বন করেছিলেন। এ সম্পর্কে ইমাম আবু ইউসুফ র. বলেন, ‘যে সমস্ত জমি পারস্যের সম্রাটগণ তাদের বংশধর কিংবা যুদ্ধে নিহত অথবা পালিয়ে দেশ ত্যাগকারী লোকদের মালিকানাভুক্ত করে দিয়েছিল, হযরত উমর রা.-এর সবই রাষ্ট্রীয় মালিকানাভূক্ত করে নিয়েছিলেন।’
মালিকানা লাভের ক্ষেত্রে ইসলামের আদর্শ কল্যাণকর ও সর্বজনীন। এতে জুলুম বা শোষণের কোন অবকাশ নেই। সর্বোপরি ইসলামী অর্থনীতিতে মালিকানা নীতি একটি সুষম ও আদর্শিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এ ব্যবস্থায় যেমন সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা হিসাবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্ব স্বীকার করা হয়, তেমনি ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক নীতির মত যথাক্রমে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে সম্পদের নিরংকুশ মালিকানা প্রদান করে সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহারের অধিকার দেয়া হয় না। মোটকথা ইসলামী আইনে ভূমিসহ যাবতীয় সম্পদের মৌলিক মালিকানা আল্লাহর এবং তার নির্দেশিত পন্থায় ভোগ ও ব্যবহারের শর্তে ব্যক্তি মালিকানাও স্বীকৃত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ