সোমবার ২৫ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

বাংলাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাস

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : বাংলা প্রাচীন একটি জনপদ। বাংলার অনেকগুলো আদি নামের একটি নাম ছিল বঙ্গ। “মুহম্মদ আবদুর রহিম, বাংলাদেশের ইতিহাস, নওরোজ কিতাবিস্তান, ঢাকা, ২০০১, পৃ. ১৭”। আবহমান কাল থেকে এই অঞ্চলটি বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ ও গোত্রের মিলনমেলার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। মুসলমান আগমণের পূর্বে এ অঞ্চলে ছিল প্রধানত হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের বসবাস। এ সময়ে ধর্মগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্ব, কলহ ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে মানবিকতা প্রায়শই অসম্মানিত হয়েছে। অনৈতিকতা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুপ্রবেশ করেছে। ফলে সমাজ হয়েছে কলুষিত ও কর্দমাক্ত। সমাজের নিম্নবর্ণের মানুষ একটু সম্মানজনকভাবে বাঁচার চেষ্টা করেছে, কিন্তু তথাকথিত সমাজের উচ্চবিত্তরা তাদের সে আশার পাদপীঠে চপেটাঘাত করে মানবতাকে করেছে লাঞ্ছিত ও ভুলুণ্ঠিত।
ইসলামের জন্মভূমি আরবের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগের ইতিহাস প্রাচীন। প্রথমত ও যোগাযোগের কারণ ছিল ব্যবসা। পরবর্তীতে আরব ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ধর্মপ্রচারকগণও বাংলায় এসে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে থাকেন। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি বাংলা বিজয় সম্পন্ন করে এ দেশে মুসলমান শাসনের সূচনা করেন। ইসলাম ধর্ম সকলের মানবাধিকার ও সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। ফলে বাংলার সমাজের নিম্নবিত্তও বঞ্চিত জনসাধারণ ইসলাম ধর্মের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। মুসলিম শাসনাধীনে বাংলায় বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মধ্যে একটি সুন্দর, সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। ফলে সমাজ হয়ে ওঠে সুন্দর ও বাসযোগ্য। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া সুলতানি আমলে (১২০৪-১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলার সমাজে ধর্মীয় সহাবস্থানও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিদ্যমান ছিল। প্রকৃতপক্ষে কোনো ধর্মই সমাজে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ধ্বংস করার শিক্ষা দেয় না। মূলত, অধর্মই সাম্প্রদায়িকতার পোষক। সুলতানি আমলে বাংলার ধর্ম ও সমাজ-সংস্কৃতির গতি প্রকৃতির চিত্র তুলে ধরার প্রয়াশ এই প্রবন্ধে।
ভূগোল, ভাষা ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ জনগোষ্ঠীকে বাঙালি এবং যে ভূ-খণ্ডকে আমরা বাংলাশে হিসেবে নির্ণয় করে থাকি, তা আধুনিক কালের ধারণায়। “আহমদ শরীফ, বাঙালি ও বাংলা সাহিত্য, ১ম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ, বর্ণমিছিল, ঢাকা, ১৯৭৮, পৃ: ১”। প্রাচীনকালে এদেশের নাম বাংলা যেমন ছিল না তেমনি এতদঞ্চল ছিল বিভিন্ন অঞ্চল বা জনপদে বিভক্ত।
পরিবর্তমান রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে বাংলার আকার, আয়তনও অবস্থানের প্রায়শই পরিবর্তন ঘটেছে। “এ কে এম শাহনাওয়াজ ও ড. রুহুল কুদ্দুস মোঃ সালেহ (সম্পাদিত) Education for Muslim under the Bengal Sultanate বরেণ্য অধ্যাপক এ কে এম ইয়াকুব আলী সংবর্ধনা গ্রন্থ, সময় প্রকাশন, ঢাকা, ২০০৭, পৃ: ৭২৯”। মুসলিম বিজয়ের পূর্বেও এ অঞ্চলটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন শাসকের অধীনে ছিল। “শ্রী রমেশ মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস; প্রাচীন যুগ ১ম খ-, জেনারেল প্রিন্টার্স এ্যান্ড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা, ১৯৯২, পৃ: ১-২”। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি কর্তৃক বাংলায় সর্বপ্রথম মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে। “১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি কর্তৃক বাংলায় সর্বপ্রথম মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় বলেও মতামত পাওয়া যায়। Dr. P.L. Gupta, The Date of Bakhtiyar Khalji’s Oecupation of Gaur, Jurnal of the Varendra Research Muscum, Vol. IV, 1975-76, pp. 33-34; আব্দুল করিম, বাংলার ইতিহাস সুলতানী আমল, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ঢাকা, ১৯৯৯), পৃ: ৯৩; মোঃ আব্দুল করিম, বাংলা প্রশাসন-ব্যবস্থার ইতিহাস, মুসলিম আমল (১২০৫-১৭৫৭ খ্রি.) সূচিপত্র, ঢাকা, ২০০৮, পৃ: ২০”। এ সময় বাংলার অবস্থান ছিল-উত্তরে হিমালয় পর্বতের পাদদেশ, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে চট্টগ্রাম ও পশ্চিমে তেলিয়াগাতি গিরিপথ পর্যন্ত বিস্তৃত সুবিশাল জনপদ। “A K M Yaqub Ali, Education for Muslim under Bengal Sultanate,” Islamic Studies, XXIV, 4, Islamic Research Institue, Islamabad. 1985, p. 420” স্থানটি গৌড় ও লক্ষণাবতী এবং মুসলিম বিজয়ের পরে লখনৌতি হিসেবে পরিচিত হয়। “মিনহাজ-ই-সিরাজ, তবকাত-ই-নাসিরী, আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া অনুদিত ও সম্পাদিত, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৩, পৃ: ২৮”। বঙ্গ বা বাংলা নামে বিভিন্ন জনপদকে একতাবদ্ধ করার কাজ সম্পন্ন হয় সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের রাজত্বকালে (১৩৪২-১৩৫৭ খ্রিষ্টাব্দ)।
সমাজে সুন্দরভাবে বসবাসের জন্যই ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে। ধর্ম হচ্ছে মানুষের একটি বিশ্বাস যা তাকে সঠিক ও সুন্দর পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে উল্লেখ করা হয়েছে, ধর্ম হচ্ছে বিভিন্ন সম্প্রায়ের শাস্ত্রনির্দিষ্ট বিধিবিধান। এ ছাড়াও ধর্ম বলতে সৎকর্ম, পূণ্যকর্ম, সদাচার, কর্তব্যকর্ম ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। “মুহম্মদ এনামুল হক, শিব প্রসন্ন লাহিড়ী ও স্বরোচিস সরকার, (কর্তৃক সম্পাদিত) বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পরিমার্জিত সংস্করণ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ২০০৫, পৃ: ৬৩৯”। আবহমান কাল ধরে যুগেযুগে সমাজে ধর্ম প্রচলিত ছিল। ধর্ম মানুষকে অন্যায়, অপকর্ম, লোভ-লালসা, অনাচার-ব্যাভিচার, কুসংস্কার পরিহার করে সত্য, যুক্তিপূর্ণ, সুন্দর ও কল্যাণের পথে চলতে সাহায্য করে। ফলে সমাজ সকল অনাচারমুক্ত হয়ে ভালো মানুষের সহাবস্থানে পরিণত হয়। সকল ধর্মের মূল কথা হচ্ছে সমাজের মানুষের কল্যাণ। “এ কে এম ইয়াকুব আলী, বরেন্দ্র অঞ্চলে মুসলিম ইতিহাস ঐতিহ্য, সময় প্রকাশন, ঢাকা, ২০০২, পৃ: ৮৯”। পালনীয় কার্যে কিছুটা ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হলেও সকল ধর্মের উদ্দেশ্য সমাজে সুন্দরভবাবে বসবাস করা। সকল ধর্ম মানুষকে ভালো কাজের দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকলেও ধর্মের অনুসারীরা অনেক সময়ে তাদের নিজেদের স্বার্থে ধর্মের অপব্যাখ্যা করে অন্যায় কাজে প্রলুব্ধ হয়। ফলে ধর্মের মূল ধারা থেকে তারা হয় বিচ্যুত। এ সব কিচু বিবেচনা করে বলা যায়, ধার্মিকরা হন সমাজের সুন্দর ও পরিশীলিত মানুষ। ধর্ম সমাজকে অকল্যাণের পথ থেকে কল্যাণের পথে, অন্যায়ের পথ থেকে ন্যায় ও সুন্দরের পথে পরিচালিত করে। ফলে সমাজ হয়ে উঠে সুন্দর ও বসবাসযোগ্য।
সুলতানি বাংলার ধর্ম : উৎস ও প্রেক্ষাপট ঃ সুলতানি আমলে বাংলার সমাজ ছিল নানা ধর্ম ও বর্ণে বিভক্ত। প্রধানত তিন ধর্মের মানুষ এই সময়ে বাংলায় ছিল। এরা হচ্ছে-হিন্দু, মুসলিম ও বৌদ্ধ। এই তিনটি ধর্মের মধ্যে হিন্দু ও মুসলিমই ছিল সমাজে গুরুত্বপূর্ণ। “মুহম্মদ আবদুল জলিল, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বাংলা ও বাঙালী সমাজ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, পৃ: ২৮”। সংখ্যাল্পতা ও সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের গুরুত্ব সমাজে তেমনছিল না বললেই চলে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ দূরাচার “অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায়, (সম্পাদিত), বাঙালীর ধর্ম ও দর্শনচিন্তা, নবপত্র প্রকাশনী, কলিকাতা, ১৯৮০, পৃ: ৫৪-৬০”। হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তির দাপট, পক্ষান্তরে ইসলামের উদারনৈতিক আহ্বানে দিন দিন তাদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ফলে সমাজে তাঁদের অবস্থা ছিল অনেকটাই নিশ্চিহ্ন প্রায়। “আব্দুল করিম, বঙ্গালা ও বাঙ্গালী, সদর আলী (সম্পাদিত), বাঙ্গালীর আত্মপরিচয়, ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ ষ্টাডিজ, রাজশাহী, ১৯৯১, পৃ: ২৪৫”।
বর্ণের দিক হতে বাংলায় হিন্দু সমাজ নানা শ্রেণি উপশ্রেণিতে ছিল বিভক্ত। হিন্দু সমাজে বর্ণবাদের ঐতিহ্য সুদীর্ঘকালের। কারণ বর্ণবিন্যাসের ভিত্তিতেই ভারতে সমাজ বিন্যাসিত হয়েছে। “নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালির ইতিহাস আদিপর্ব, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, দ্বিতীয় সংস্করণ, বাংলা ১৪০২,পৃ: ১৩২”। এ সময়ে বাংলা প্রধানত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চার বর্ণের হিন্দু দেখা যেত। এর বাইরে আরো অসংখ্য বর্ণ ও কোম বিদ্যমান ছিল। প্রত্যেক বর্ণ ও কোমের ভেতর আবার স্তর এবং উপস্তর ছিল। “প্রাগুক্ত, পৃ: ১৩২”। হিন্দু ধর্ম মূলত আর্য ধর্মের আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত। “মুহম্মদ আবদুল জলিল, প্রাগুক্ত, পৃ: ৩০”। আর্যরা ছিল বহু ঈশ্বরে বিম্বাসী। একতাবাদী অনার্য তথা দ্রাবিড়দের পরেই আর্যরা বাংলায় আগমনের ধারা রচনা করতে শুরু করে। বাংলায় দ্রাবিড়রা প্রথম ধর্ম পালন করতো বলে ধারণা পাওয়া যায়। তাদের ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে যেটুকু জানা যায়, তাতে অনুমান করা সমীচীন যে, তারা ছিল সেমিটিক “সেমিটক ধর্ম আরবের প্রাচীন ধর্ম। এরা হজরত নূহ (আ) এর পুত্র হজরত শাম (আ.)-এর বংশোদ্ভুত। এরা পরবর্তীতে মেসোপটেমিয়া ভূ-মধ্য-সাগরের পূর্ব উপকূল অঞ্চল ও নীল নদের ব-দ্বীপ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। দ্র. আব্দুল মান্নান তালিব, বাংলাদেশে ইসলাম, আধুনিক প্রকাশনী, ঢাকা, ১৯৮০, পৃ: ৩৪”। ধর্মের অনুসারী। সেমিটিক ধর্মমত একত্ববাদের ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। পক্ষান্তরে পরবর্তীতে আর্যরা যারা বাংলায় এসেছিল তারা ছিল বহুত্ববাদের অনুসারী। এ কারণে সেমিটিক দ্রাবিড়দের সঙ্গে আর্যদের বিরোধ চলতে থাকে। আর এ বিরোধ দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়েছিল। “আব্দুল মান্নান তালিব, প্রাগুক্ত, পৃ: ৩৫”। তার প্রমাণ হিন্দুদের পুরাণাদি বিভিন্ন গ্রন্থ থেকেও জানা যায়। “রামাই পন্ডিত, শূন্য পুরাণ, সম্পাদনা, এম.এন. বসু, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলিকাতা, ১৩১৪, পৃ: ১৪০-১৪২”।
আর্য বা হিন্দু ধর্ম : আর্যরা অগ্নি, ইন্দ্র, বরুণ, পবন প্রভৃতির পূজা করতো। এভাবে তাদের মধ্যে পৌত্তলিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় বলে অনুমিত হয়। ধর্মকার্য অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দানের ফলে সমাজে তারা বেশ সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে ধীরে ধীরে তারা নিজেদেরকে ব্রাহ্মণ, অবতার, অতিমানব ও মানবশ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রচার করতে থাকে। এভাবেই আর্য ধর্ম ব্রাহ্মণ্য ধর্মে পরিণত হয়। আর্যধর্মে ব্রাহ্মণদের প্রাধান্য স্বীকৃত হবার পর সমাজ জীবনেও তার প্রভাব পড়ে। তাঁরা সমাজের উচ্চ শ্রেণীর নাগরিক পরিণত হয়। এমনকি অস্ত্র পরিচালনা ও শাসনকার্য পরিচালনায় ক্ষত্রিয়রাও ব্রাহ্মণদের নীচের শ্রেণির নাগরিক হিসেবে সমাজে স্বীকৃত হয়। তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বৈশ্যরা স্থান লাভ করে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কারবার ছিল তাদের কাজ। সমাজের সর্বনিম্ন পর্যায়ের নাগরিক হিসেবে স্থান পায় শূদ্ররা। এভাবে আর্যরা নিজেদের অবস্থানকে ঊর্ধ্বে রেখে সমাজের বিস্তৃত অগণিত সাধারণ নাগরিকদের চতুর্থ শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করে তাদের উপর অকথ্য নির্যাতন ও বঞ্চনার মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে থাকে। ফলে সমাজ জীবনে এক অসহনীয় পরিবেশ বিস্তার লাভ করে।
জৈন ধর্ম : খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৯ অব্দে জৈন ধর্মের প্রচারক বর্ধমান মহানবীর “মহাবীর খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৯ অব্দে ক্ষত্রিয় বংশে জন্মগ্রহণ করেন। ২৮ বৎসর পর্যন্ত তিনি গৃহে অবস্থান করে সংসার ধর্ম পালন করেন। ২৮ বৎসর পর তিনি গৃহত্যাগ করে একাদিক্রমে চৌদ্দ বছর তপস্যা করে সিদ্ধি লাভ করে ধর্মপ্রচার করেন। ৫২৭ খ্রি: বিহারের বাওয়াপুরী নামক স্থানে মারা যান। জৈনদের মধ্যে অনেকে ঋষভ নামক এক ব্যক্তিকে ধর্ম প্রবর্তক মনে করেন। তবে জৈনদের সকল ধর্মীয় গ্রন্থের উৎস হচ্ছেন মহাবীর। আব্দুল মান্নান তালিব, প্রাগুক্ত, পৃ: ৩৫-৩৬”। এক বঞ্চিত ক্ষত্রিয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সমাজের অস্থিতিশীল, উশৃঙ্খলাপূর্ণ এবং মানবতার দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা অবলোকন করে শান্তির প্রত্যাশায় গৃহত্যাগ করে বনে জঙ্গলে কৃচ্ছতা সাধনে ব্রতী হন। “নীহাররঞ্জন রায় প্রাগুক্ত, পৃ: ৫০১”। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মহাবীর বাংলার রাঢ় প্রদেশে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আগমন করেন। “নজরুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ: ২৩”। সপ্তম শতকের দিকে চীন দেশীয় পরিব্রাজক হিউয়েন সাং (৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দ) বিবরণের আলোকে জানা যায় বাংলার জৈন ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা অনেক বেশী ছিল। “নীহাররঞ্জন রায় প্রাগুক্ত, পৃ: ৫০১-৫০২”। জৈনরা হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বেদকে নিজেদের ধর্মগ্রন্থ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার এবং হিন্দুদের রীতিনীতিকে অর্থহীন মনে করলে তারা হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতিহিংসার শিকারে পরিণত হয়।
বৌদ্ধ ধর্ম : ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রবল আধিপত্যের প্রতিক্রিয়ায় বৌদ্ধ ধর্ম বাংলায় বঞ্চিত ও নির্যাতিত মানুষের মাঝে বেশ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। এ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গৌতম বুদ্ধ। “গৌতমবুদ্ধ খ্রিষ্টপূর্ব ৫৬৭ অব্দে হিমালয়ের কপিলাবস্তু নামক নগরে জন্মগ্রহণ করেন। যৌবনে তিনি সংসার ধর্মে রত ছিলেন। হঠাৎ করে একদিন তিনি সংসার ত্যাগ করে দীর্ঘ ছয় বছর সাধনার পর সিদ্ধি লাভ করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৭ অব্দে কুশী নগরে দেহত্যাগ করেন। বৌদ্ধ দেবের শিক্ষা ছিল : অহিংসা, দয়া, দান, সৎচিন্তা, সংযম, সত্যভাষণ, সংকার্য সাধন, স্রষ্টাতে আত্মসমর্পণ প্রভৃতি। দ্র. আব্দুল মান্নান তালিব, প্রাগুক্ত, পৃ: ৩৬-৩৭”। হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ অনার্য ও দ্রাবিড়রা বৌদ্ধমত গ্রহণ করে নিজেদের সম্মান ও মানবাধিকার রক্ষার চেষ্টা করে। গুপ্ত যুগ ও গুপ্তোত্তর বাংলায় বৌদ্ধধর্মের অবস্থান বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
সপ্তম শতকের দিকে খড়গ বংশীয় রাজারা অষ্টম শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত পাল রাজারা, দশম শতকে কান্তিদেব দশম-একাদশ শতকের দিকে চন্দ্র বংশীয় রাজারা, দশম শতকের কম্বোজাম্বর রাজারা সকলেই বৌদ্ধ ছিলেন। “নজরুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ: ৩৩-৩৪”। তারাও ব্রাহ্মণ্যবাদের রোষানলে পতিত হয় “আব্দুল মান্নান তালিব, প্রাগুক্ত, পৃ: ৩৭”। এবং ব্রাহ্মণ্য মতাদর্শীদের প্রভাবেই বৌদ্ধ ধর্ম ভেঙ্গে মহাযান ও হীনযান অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিভক্ত অংশগুলোও হিন্দুদের প্রভাবে অনেক অংশে বিভক্ত হয়েযায়। বৌদ্ধধর্মের বিভক্ত মহাযান মতবাদ থেকে বজ্রযান “বজ্রয়ানীরা জ্ঞানকে দেবরূপে কল্পনা করে। তাদের মতে বোধি চিত্ত জ্ঞানের সাথে মিলিত হয়ে নিরাকারে বিলীন হয়ে মহাসুখের উৎপত্তি করে। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ