বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

উপকূলের চরে শুঁটকি উৎপাদন শুরু

বঙ্গোপসাগরের মোহনা লালদিয়ার একটি শুঁটকি পল্লী

পাথরঘাটা (বরগুনা) সংবাদদাতা: বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় এলাকায় প্রতি বছরের মতো এ মৌসুমেও বিভিন্ন চরে শুঁটকি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। শুঁটকি তৈরি এ কর্মযজ্ঞকে ঘিরে কর্মসংস্থান হয় উপকূলীয় এলাকার প্রায় দশ হাজার নারী পুরুষের। আর এখানকার শ্রমিকরা এখন শুঁটকি তৈরিতে রাত-দিন ব্যস্ত সময় পার করছেন। বরগুনার লালদিয়া, আশারচর, সোনাকাটা, জয়ালভাঙ্গা চরের, শুঁটকি পল্লীতে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত ৬ মাস ধরে চলে শুঁটকি পক্রিয়াজাতকরনের কাজ। শুঁটকিকে কেন্দ্র করে উপকূলীয় হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবীদের আনাগোনায় মূখরিত থাকে এসব চরগুলো। সরেজমিনে দেখা যায়, গভীর সাগর থেকে জেলেরা মাছ নিয়ে দেশের বৃহত্তম মৎস অবতরন কেন্দ্র পাথরঘাটা (বিএফডিসি) ঘাটে ভিড়ছেন। ব্যবসায়ীরা সেই মাছ কিনে পল্লীতে নিয়ে যাচ্ছেন। এরপর ধুয়েমুছে কাটা-বাছার পর শুঁটকির জন্য বাঁশের তৈরি মাচায় রোদে শুকাচ্ছেন। আবার কেউ বস্তায় ভরছেন শুঁটকি মাছ। প্রচলিত পদ্ধতিতে শুকানো এই শুঁটকি নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। এখানের উৎপাদিত শুঁটকি দেশের বিভিন্ন স্থানে রফতানি হচ্ছে। এ সময় প্রায় ২৫ প্রজাতির মাছের শুঁটকি দেখা যায়। আহরিত মাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লইট্যা, ছুরি, ফাইস্যা, রইস্যা, পোয়া, কোরাল, ফাত্রা, মাইট্যা, রূপচাঁদা, ইলিশ, লাক্ষা, চিংড়ি, রাঙ্গাচকি, হাঙ্গর, রিটা, ফুটকা, কাঁকড়া, লবষ্টার, সামুদ্রিক শসা, হাঙ্গরের বাচ্চা ও বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ। বর্তমানে প্রতি কেজি ছুরি শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা, রূপচান্দা ৮০০ থেকে ১ হাজার, মাইট্যা ৫০০ থেকে এক হাজার, লইট্যা ৪০০ থেকে ৮০০, কোরাল ৮০০ থেকে এক হাজার ২০০, পোপা ৪০০ থেকে ৮০০, চিংড়ি ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা এবং অন্যান্য ছোট মাছ ২০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও এখানকার শুঁটকি পল্লীর মাছের গুড়ি সারাদেশে পোল্ট্রি ফার্ম ও ফিস ফিডের জন্য সরবরাহ হয়ে থাকে।

এ শিল্পের মাধ্যমে অনেকের কর্মস্থান হলেও রয়েছে নানা সমস্যা। খোলা মাঠে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ধূলা-বালিতে শুঁটকি উৎপাদন করা। শুঁটকি সংরক্ষণে মাছের সাথে বিভিন্ন ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ মিশ্রণ। এমনকি বিষ মিশ্রিত করে শুঁটকি সংরক্ষণ করা। খাবার অনুপোযোগি পচা মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকিতে রূপান্তিত করা। পুরো এলাকা জুরে মশা মাছির উৎপাতও বৃদ্ধি। আবার অন্যদিকে শুঁটকি উৎপাদনকারীরাও নানা সমস্যায় জর্জরিত। পুঁজির অভাব, দাদনদারের শোষণ, সরকারি সুযোগ সুবিধার অভাব, মাছের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া। বর্ষার কয়েকমাস ছাড়া বছরের বাকি সময়ে এখানে শুঁটকি উৎপাদন করা হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি শুঁটকি তৈরি হয় শীতে। আর এ শুঁটকি মহালে কাজ করে জীবিকা পরিচালনা করেন এখানকার শ্রমিকরা। যদিও শ্রম ও বেতন নিয়ে রয়েছে তাদের নানা অভিযোগ। এছাড়া কিটনাশক ঔষধ ব্যবহার বন্ধ, স্বাস্থ্য সম্মত শুঁটকি তৈরি, বর্ষা মৌসুমে শুঁটকি তৈরির প্রযুক্তি সরবরাহ এবং এখাতে ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা গেলে শুঁটকি রপ্তানিতে অনায়াসে শত কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে।

উপকূলজুড়ে শুঁটকি উৎপাদনের বিরাট সম্ভাবনা থাকলেও পদে পদে রয়েছে বাধা। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব আর বাজারজাতকরণে বহুমূখী সমস্যার কথা জানালেন সংশ্লিষ্ঠরা। তারা মনে করেন, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই শিল্পে আরও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এ শিল্পে জীবিকা নির্বাহ হতে পারে বহু মানুষের। বাংলাদেশের সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকা পাথরঘাটায় রয়েছে শুঁটকি উৎপাদনে অফুরন্ত সম্ভাবনা। সমুদ্র-নদী থেকে আহরিত মৎস্য সম্পদে জীবিকা চলে এখানকার হাজারো মানুষের। সমুদ্র সৈকতের খনিজ বালু এই জনপদের আরেক সম্ভাবনা। পর্যটন খাতেও উপকূল জুড়ে রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ