বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে শঙ্কা আছে

গতকাল রোববার ডিআরইউ সাগর-রুনি মিলনায়তনে সুজন আয়োজিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮ কোন দলের কেমন ইশতেহার বিষয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন -সংগ্রাম

# পরিস্থিতি নৈরাশ্যজনক, হামলা-মামলা হচ্ছে : এম হাফিজ উদ্দিন
# আমরা একে অপরকে নিশ্চিহ্নের রাজনীতিতে লিপ্ত হয়েছি : বদিউল আলম মজুমদার
স্টাফ রিপোর্টার: ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০১৮, কোন দলের ইশতেহার কেমন?’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে শঙ্কা আছে। কারণ ‘নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওপর মানুষের আস্থার অভাব আছে। আমার নিজেরও অভাব আছে। তাদের যা কার্যকলাপ তাতে আস্থা বাড়ার কোনো কারণ হয়নি।’
গতকাল রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনার থেকে এ রকম অভিমত জানায় সুজন। সেমিনারে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সুজন সভাপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। লিখিত বক্তব্য দেন সুজনের সহযোগী সমন্বয়কারী নেছার আমিন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওপর মানুষের আস্থার অভাব আছে। আমার নিজেরও অভাব আছে। তাদের যা কার্যকলাপ তাতে আস্থা বাড়ার কোনো কারণ হয়নি।’
নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘পরিস্থিতি সম্পর্কে গণমাধ্যম থেকে আমরা যতটুকু খবর পাচ্ছি, অবশ্যই নৈরাশ্যজনক, তাতে কোনো সন্দেহ নাই। হামলা-মামলা হচ্ছে। একদল আরেক দলকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এটা তো আমরা সবাই জানি।
তিনি বলেন, এই মুহূর্তে যে পরিস্থিতি বিরাজমান তাতে দেশের জন্য যা দরকার, আমরাও তা চাই, সেটা হলো গণতন্ত্র ও সুশাসন। এটা করতে হলে শুরুতেই একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হবে।
এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘আমার মত হলো, আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহারগুলো করেছে বিগত নির্বাচনগুলোতে, তারা তা বাস্তবায়ন করেনি। আমরা আশা করব, নির্বাচনের পর তারা ইশতেহার বাস্তবায়ন করবে। গত নির্বাচনকে তো নির্বাচন বলা যায় না। আমরা আশা করছি, নির্বাচনের দিন ভোটারের উপস্থিতি হবে এবং নির্বাচনের পর দলগুলো তাদের ইশতেহার ভুলে যাবে না।’ নির্বাচনে সহিংসতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেহেতু প্রশাসন চেষ্টা করছে। আর্মিও থাকবে মাঠে। আমরা আশা করতে পারি, সহিংসতা হয়তো কমে যাবে বা হবে না।’
সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমার মনে হয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মানুষের ভোটাধিকার। ২০১৪ সালে একতরফা একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাধিকার থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়েছে। প্রতি নির্বাচনে ভোটাররা ভোটের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থী বেছে নেবে, তারাই সরকার গঠন করবে। এটা যদি নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে এটাই আমাদের দরকার সব দলের কাছ থেকে।’
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার প্রসঙ্গে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিগত নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো ভালো ভালো কথা বলে, কথার ফুলঝুড়ি, চটকদার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু পরে তারা ক্ষমতায় গেলে আর সেই ইশতেহারের কথা মনে রাখে না। নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকারগুলো পরবর্তীতে বাস্তবায়ন না হলে এগুলো মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘একে অপরের জীবন রক্ষা, জানমাল রক্ষার জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। আজকে আমরা একে অপরকে নিশ্চিহ্নের রাজনীতিতে লিপ্ত হয়েছি। আমাদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য, রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি করা জরুরি। নির্বাচনের পর একটা দল ক্ষমতায় আসবে। বাকিদের কী হবে? তাদের কি আমরা বঙ্গোপসাগরে ফেলে আসতে পারব? আমাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান, বিভক্তি বৈরিতার সম্পর্কের অবসান করতে হবে।’
এর আগে সুজনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার নিয়ে এক পর্যালোচনা তুলে ধরেন সুজনের সহযোগী সমন্বয়কারী নাসির আমিন। পর্যালোচনায় বলা হয়, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দৃশ্যত অনেক বৈরিতা ও মতপার্থক্য থাকলেও ইশতেহারে বেশ মতৈক্য দেখি। বিশেষ করে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসন, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদ দমন, জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলা করা এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সব দলই অস্বীকার করেছে।’
পর্যালোচনায় বলা হয়, তরুণ ভোটারদের মন জয় করতে সব দলকেই যতœবান হতে দেখা গেছে। তবে বাম রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দল বা জোটগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শ সম্পর্কে তেমন কোনো উল্লেখ দেখা যায় না।
ইশতেহারের পর্যালোচনায় উঠে আসে, প্রধান রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সম্পর্কে যে সমালোচনা কিছুটা গৎবাঁধা প্রবণতারই পুনরাবৃত্তি হয়েছে। দেশের উন্নয়নে পক্ষবিপক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনমূলক সমালোচনা এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের ভালো কাজের মূল্যায়ন এবারের ইশতেহারেও দেখা যায়নি। এই ক্ষেত্রে রাজনীতির মেরুকরণের লক্ষণও জোরালো।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপরে মানুষের আস্থার অভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে সহিংসতার বিষয়ে আমরা-আপনারা সবাই উদ্বিগ্ন।
আমরা চাই-নির্বাচন কমিশন আরও অ্যাক্টটিভ হোক। এ জন্য কমিশন, রাজনৈতিক দল ও সরকারের স্বদিচ্ছা থাকা প্রয়োজন। আমরা আশা করি, নির্বাচনী মাঠ সমান হয়ে যাবে। সেনাবাহিনী মোতায়েন হলে কিছু পরিবর্তন হতে পারে।’
নির্বাচন উপলক্ষে সব দলের ইশতেহারের বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে সুজন বলেছে, অতীতের মতো নির্বাচনী ইশতেহার যেন নিতান্তই কথার ফুলঝুরিতে পরিণত না হয়। আমরা আশা করেছিলাম, দলগুলো তাদের ইশতেহার বাস্তবায়নে একটি কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা দেবে।
এম হাফিজ উদ্দিন বলেন, আগেও রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহার দিয়েছে। পরে তারা মনে রাখেনি। আমরা চাই দেশে গণতন্ত্র থাকবে, সুশাসন থাকবে। কিন্তু প্রতিদিনই নির্বাচনী সহিংসতা ঘটছে। বিরোধী পক্ষের ওপর হামলা হচ্ছে। সেনাবাহিনী মাঠে নামলে হয়তো অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। আমরা আশা করব একটা ভাল নির্বাচন যেন হয়।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে শঙ্কা আছে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাহলে নির্বাচনী ইশতেহারে কথার ফুলঝুরি থাকবে না। প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। এ জন্য ভবিষ্যতে ভোট দেয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে হলি আর্টিসানের মতো বিপদগামীরা সৃষ্টি হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের আচরণে সেটা মনে হচ্ছে না। বেশি পর্যবেক্ষক থাকলে সুষ্ঠ নির্বাচনের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। নির্বাচন কমিশন পর্যবেক্ষকদের ওপর আরো বেশি কড়াকড়ি আরোপ করছে। গণমাধ্যমের ওপরও নজরদারি করছে।
সেমিনারে আওয়ামী লীগ, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়।
আওয়ামী লীগের ইশতেহারের প্রসঙ্গে বলা হয়, তারা গ্রামের নগরের সুবিধা সম্প্রসারণ, যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের কথা বলেছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের ইশতেহারে জনগণের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের কথা উল্লেখ করেছে। বিএনপি উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছে। এছাড়া প্রতিহিংসামূক্ত সহমর্মী নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। জাতীয় পার্টি দেশের সব ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, সুষ্ঠু গণতন্ত্রের বিকাশ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি শোষণ বৈষম্যহীন ইনসাফের সমাজ গড়ার কথা বলেছে। ফলে দেখা যায় আওয়ামী লীগ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপিসহ অন্য দল মূলত গণতন্ত্র ও সুশাসনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে।
সুজন মনে করে, রাজনৈতিক দলগুলো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শর কথা বলেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বলতে কোন দল কি বোঝায় তা স্পষ্ট না হলেও এ বিষয়টির স্বীকৃতি তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ ভোটারদের আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহারেই। উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত যাতে না হয়, সে বিষয়টি দুটি দলই উল্লেখ করেছে। আওয়ামী লীগ বলছে তারা নির্বাচিত হলে উন্নয়ন কাজ আরো গতি পাবে। বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট বলছে চলমান উন্নয়ন কাজগুলো চলমান থাকবে। আওয়ামী লীগ উন্নয়নের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। অন্য দলগুলো গণতন্ত্র ও সুশাসনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। দরিদ্র মানুষের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিটি ইশতেহারেই। তবে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে তাদের প্রথম একশ দিন, বছরওয়ারি উন্নয়ন কাজের পরিকল্পনা থাকলে আরো ভাল হতো। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহারেই প্রথম একশ দিন বা বছর ওয়ারি কোনো পরিকল্পনা নেই। এটা থাকলে উন্নয়ন কাজ করা অনেকটাই সহজ হয়ে যেত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ