বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জীবনেও প্রভাব রাখতে শুরু করেছে

জাফর ইকবাল : মানুষের অনেক কাজই করে দিচ্ছে প্রযুক্তি। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে করছে আরও আয়েশি আরও গতিময়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত প্রযুক্তি পণ্যে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। এক সময় যা মানুষের কল্পনায় ছিল তা আজ বাস্তব। প্রযুক্তি পণ্য এবং সেবা ক্রমবর্ধমান সক্ষম ও স্বনির্ভর হয়ে উঠছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক প্রযুক্তি এখন শুধু উচ্চবিত্তের নয়; সাধারণ
মানব বুদ্ধিমত্তার একচেটিয়া কাজগুলো প্রযুক্তির কল্যাণে বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণে আসছে। মানুষের তৈরি প্রযুক্তি মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই চলতে শুরু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে আগামী এক দশকের যে প্রযুক্তি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখবে তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যাকে ইংরেজিতে ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বলা হয়। এটি হলো কম্পিউটারের একটি সিস্টেম, যা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে নিজে নিজেই কোনো কিছুর বিশ্নেষণ করতে পারে এবং কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারে। মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশক্তিকে কৃত্রিম উপায়ে প্রযুক্তিনির্ভর করে যন্ত্রের মাধ্যমে বাস্তব রূপ দেয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। অর্থাৎ সংক্ষেপে, মেশিন দ্বারা প্রদর্শিত বুদ্ধি।
প্রযুক্তি মানুষের নির্দেশে কাজ করে। এর বাইরে এর কোনো ক্ষমতা নেই। এ ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। একটি স্বয়ংক্রিয় রোবট এর প্রকৃত উদাহরণ হতে পারে। বর্তমানে যে প্রযুক্তি আবিস্কৃত হচ্ছে তা মানুষের বক্তব্যকে প্রায় সফলভাবে বুঝতে সক্ষম হচ্ছে। উচ্চতর স্তরের কৌশলগত খেলা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ি চালানো, সামরিক সিমুলেশনসহ জটিল তথ্য-উপাত্ত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হচ্ছে এটি। এ ছাড়া স্বাস্থ্য, শহর ব্যবস্থাপনা, আবহাওয়া, সাইবার নিরাপত্তাসহ অনেক ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়েছে। যদিও স্টিফেন হকিং, এলন মাস্কসহ অনেক বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অদূর ভবিষতে আমাদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। সাধারণত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে তাদের যোগাযোগের জন্য। প্রযুক্তিবিদরা পরে পরীক্ষা করে দেখেন সেই বুদ্ধিমত্তা সফলভাবে সব কাজ করতে পারছে কি-না। বিস্তারিত যোগাযোগ ও লগ প্রক্রিয়া সব কিছুই ইংরেজি ভাষাতেই করা হয় যেন সহজে বুঝতে পারে। কিন্তু ফেসবুকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দেখে ইঞ্জিনিয়াররা হতবাক হন! তারা দেখেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাগুলো তাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য সেই ভাষার পরিবর্তে তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করছে। আর তাদের মধ্যের সেই যোগাযোগ নির্মাতারাই বুঝতে পারছেন না।
 গেল বছর জেরুজালেমে ফিলিস্তিনের এক নির্মাণকর্মী ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন। যে ছবিতে তিনি একটি বুলডোজারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই ইসরায়েলের পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। তাদের সন্দেহ, তিনি ইসরায়েলে আক্রমণের পরিকল্পনা করছেন, কারণ তার পোস্টের শিরোনাম ছিল- ‘তাদের আক্রমণ করো’। মজার বিষয় হলো, পোস্টটিতে আরবি ভাষায় তার দেওয়া আসল শিরোনামটি ছিল ‘শুভ সকাল’। কিন্তু অজানা কারণেই ফেসবুকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত অনুবাদে লেখাটি হিব্রু ভাষায় ‘শুভ সকাল’-এর পরিবর্তে ‘তাদের আক্রমণ করো’ এবং ইংরেজি ভাষায় ‘তাদের আঘাত করো’ দৃশ্যমান হয়। পরে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ফেসবুকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত ত্রুটি বুঝতে পেরে তাকে ছেড়ে দেয় এবং ফেসবুক তাদের সেই ত্রুটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে এবং তা সংশোধনে দ্রুত পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দেয়।
সিনেমার কল্পকাহিনীর মতো হলেও ব্যাপারটা ভয়ঙ্কর। আর এ রকম কিছু হওয়ার আগেই ফেসবুক তাদের সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সরিয়ে নেয়। আর সেইসঙ্গে এতদিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ভয়ঙ্কর দিকের গুঞ্জন সত্যি হয়। যদিও এই ত্রুটি পরবর্তী সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও সচেতনতার সঙ্গে প্রয়োগের ক্ষেত্র  তৈরি করতে সাহায্য করছে।
এলান টিউরিংকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৫০ সালে তিনি একটি মেশিন বুদ্ধিমান কি-না, তা পরীক্ষা করার জন্য একটি টেস্টের কথা উল্লেখ করে গিয়েছেন, যা টিউরিং টেস্ট নামে পরিচিত। ওই সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও পরবর্তী সময় তা আর আলোর মুখ দেখেনি কম্পিউটারের শক্তি কম থাকায়। পরবর্তী সময়ে শক্তি বাড়তে থাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আবার গবেষণা শুরু হয়। পরে ফেসবুক, গুগল ও আমাজন একত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর রিসার্চ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা 'ব্যাক বক্স' সমস্যা হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। ফেসবুকের অনুবাদ সিস্টেমের ব্যর্থতা অনেক ক্ষেত্রে ডিপ লার্নিংয়ের অ্যালগরিদমের অস্বচ্ছতার কারণে ঘটেছে বলে মনে করা হয়। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এখন অনেক গবেষণা চলছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স চালু করছে এটিকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করার লক্ষ্যে, যা মূলত কম্পিউটার ও সফটওয়্যারের আচরণকেন্দ্রিক। যদিও এ ডিপ লার্নিংয়ের ধারণা কয়েক দশক ধরে বিদ্যমান ছিল। তবে সা¤প্রতিক বছরগুলোতে এর জনপ্রিয়তা ও ব্যবহারিক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যদি উন্নত করা যায় তাহলে এটি দারুণ একটি পরিবর্তন বয়ে আনবে বলে মনে করা হয়। বিপরীতমুখী শঙ্কাও করেন অনেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের তিনটি ক্যাটাগরি রয়েছে।
আর্টিফিসিয়াল ন্যারো ইন্টেলিজেন্স: এটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রাথমিক ধাপ বলা হয়। এটি নির্দিষ্ট এরিয়াতে দক্ষ। যেমন যে মেশিন দাবা খেলতে পারবে সেটি লুডু খেলতে পারবে না।
আর্টিফিসিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স: এটিকে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্তর বলা হয়। যে ধাপে কম্পিউটার মানুষের মতো চিন্তা করতে পারবে, সমস্যার সমাধান করতে পারবে এমনকি আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম হবে।
আর্টিফিসিয়াল সুপার ইন্টেলিজেন্স: শেষ এই ধাপে ধারণা করা হচ্ছে কম্পিউটার মানুষের চেয়েও বুদ্ধিমান হিসেবে তৈরি হবে। গবেষকরা শেষ এই ধাপ নিয়ে চিন্তিত হলেও এখনকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একাধিক আর্টিফিসিয়াল ন্যারো ইন্টেলিজেন্সের সমন্বয়ে গঠিত হওয়ায় চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই বলেই গবেষকরা মনে করেন। আমরা যে স্মার্টফোন ব্যবহার করছি তাতে আর্টিফিসিয়াল ন্যারো ইন্টেলিজেন্স প্রোগ্রাম রয়েছে। আপনি গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টের সঙ্গে চ্যাট করলে বুঝতে পারবেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতটুকু উন্নত হয়েছে। গুগলের সেলফ ড্রাইভিং কারের সফল প্রয়োগ এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। ফেসবুক-আমাজনসহ সব বড় ওয়েবসাইটেইও এর ব্যবহার রয়েছে। নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টগুলো পরিচালিত হচ্ছে এ সিস্টেমে। অনেক কল-কারখানায় ব্যবহৃত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রযুক্তি। বিশেষ করে চীনের উদাহরণ দেওয়া যায়, সেখানে অনেক কারখানায় মানুষের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধির রোবট কাজ করছে। বিশেষ করে শ্রমসাধ্য কাজগুলো মানুষের বদলে এই বুদ্ধিমান রোবট দিয়ে করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, একটা রোবট একাই কয়েকজনের কাজ করে দিচ্ছে। দৈনন্দিন জীবনে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নানা প্রয়োজনে কৃৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সঠিকভাবে ব্যবহার করে আমরা আমাদের জীবনকে আরও সহজ করতে পারছি, আগামীতেও পারব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ভয়ঙ্কর আশঙ্কা থাকলেও প্রযুক্তির চরম উন্নতি মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে সেটাই সবার প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ