শুক্রবার ৩০ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ইউরোপীয় কূটনীতিকদের বিবৃতি

বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনরত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার এবং নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের ঢাকাস্থ মিশন প্রধানরা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করার জন্য সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। নাগরিকদের সর্বজনীন ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দেয়া প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়ে গত সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে কূটনীতিকরা আশা প্রকাশ করে বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের গণতান্ত্রিক দায়িত্বশীলতা পূরণ ও সহিংসতার ব্যাপারে সংযত থাকবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখার ক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা পালন করার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন কূটনীতিকরা।
যৌথ বিবৃতিতে তারা আরো বলেছেন, গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের নিবিড় তদন্ত বা পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে প্রয়োজন। বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য চলমান জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন একটি কার্যকর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। উল্লেখ্য, যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন ইইউ প্রতিনিধি দলের প্রধান রেন্সজে তেরিংক, ব্রিটিশ হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেক, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মেরি অ্যানিক বার্দিন, জার্মানির রাষ্ট্রদূত পিটার ফাহেরনহোলৎজ এবং সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেন হোলেনস্টেইনসহ ১২ জন গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতিক।
আমরা প্রধানত ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনরদের আলোচ্য যৌথ বিবৃতিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করি। কারণ, তারা এমন এক সময়ে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন, বাংলাদেশে যখন মনোনয়নপত্র পেশ ও প্রতীক বরাদ্দ করাসহ একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোও যখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণায় নেমে পড়েছে। সেজন্য শুধু নয়, যৌথ বিবৃতিটির বিশেষ গুরুত্বের একটি বড় কারণ হলো, এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এতদিন সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে সংশয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হলেও বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে ইউরোপের দেশগুলো গভীরভাবে লক্ষ্য রাখছে। লক্ষ্য তারা রাখবেও, যদিও পর্যবেক্ষক পাঠানোর প্রশ্নে দেশগুলো এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি।
আমরা মনে করি, এই বিবৃতির কারণে বিশেষ করে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের দায়িত্বও অনেক বেড়ে গেছে। কারণ, মূলত সর্বজনীন ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দেয়া প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রেখেই কূটনীতিকরা আশা প্রকাশ করে বলেছেন, নির্বাচন হবে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক। অন্যদিকে বাস্তব অবস্থা কিন্তু এখনো তেমন সম্ভাবনার জন্য যথেষ্ট হতে পারেনি। কারণ, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা আগের মতোই গণগ্রেফতারের শিকার হচ্ছেন। বিরোধী প্রার্থীদের পক্ষে নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালানো এবং মিছিল-সমাবেশ করা সম্ভব হচ্ছে না। হামলার মুখে পড়ছেন এমনকি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পর্যন্ত। গতকালও ঠাকুরগাঁওয়ে তার গাড়ি ভাঙচুর করেছে আওয়ামী লীগের গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা।
এ প্রসঙ্গেই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের শুধু নয়, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের প্রতিও আঙুল উঠেছে। কারণ, জনগণ বুঝতেই পারছে না যে, দেশ সত্যি নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে রয়েছে কি না। গণমাধ্যমের ব্যাপারেও কূটনীতিকদের আহ্বানের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হচ্ছে না। কারণ, গত দু’দিনে ৫০টির বেশি নিউজ পোর্টালকে নিষিদ্ধ করেছে বিটিআরসি। অথচ কূটনীতিকরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন যাতে তারা স্বাধীনভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশেষ প্রয়োজন বলেও বিবৃতিতে মতপ্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকার এগোচ্ছে নিষিদ্ধ করার ফ্যাসিবাদী পন্থায়।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এভাবে চলতে থাকলে আর যা-ই হোক, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হতে পারবে না এবং তার ফলে কূটনীতিকদের আশা ও আহ্বানও ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমরা তাই আশা করতে চাই, হামলা, ভাঙচুর ও গণগ্রেফতার বন্ধ করে এমন অবস্থা নিশ্চিত করা হবে যখন সব দলের প্রার্থীরাই নির্বাচন সংক্রান্ত সকল বিষয়ে সমান সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার ভোগ করার সুযোগ পাবেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও বাধাহীন রাখতে হবে। সরকারকে তো বটেই, নির্বাচন কমিশন এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকেও বুঝতে হবে, বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী কূটনীতিকরা ইউরোপের সেইসব দেশের পক্ষ থেকে বলেছেন, যে দেশগুলো বাংলাদেশের সকল উন্নয়ন কর্মকা-ে সহায়তা করে থাকে। সুতরাং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার এবং ওই দেশগুলোর সহায়তা পাওয়ার স্বার্থেই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উচিত লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুত করা এবং সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ