সোমবার ১০ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বিএনপি-জামায়াত জোট প্রার্থীরা সব আসনে সুবিধাজনক অবস্থানে

মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, দিনাজপুর : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুরের ৬টি আসনে ৩৪ জন প্রার্থীর চূড়ান্ত নাম ঘোষণা ও প্রতীক বরাদ্দের পর এখন শুরু হয়েছে প্রচার-প্রচারণা। আসনগুলোতে তুলনামূলকভাবে বিএনপি-জামায়াত জোট প্রার্থীরা সবগুলো আসনে রয়েছেন সুবিধাজনক অবস্থানে। বিভিন্ন সমীকরণ ও ভোটের হিসাবে তাদের এ অবস্থান স্পষ্ট হয়। প্রার্থীদের মধ্যে দিনাজপুর-১ আসনে বীরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মাওলানা মো: হানিফ, দিনাজপুর-২ আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, দিনাজপুর-৩ আসনে জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও দিনাজপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, দিনাজপুর-৪ আসনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং দিনাজপুর-৫ আসনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী এডভোকেট মোস্তাফিজার রহমান ফিজারকে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দিনাজপুর-৪ আসনে ৭ ও সবচেয়ে কম দিনাজপুর-৬ আসনে ৪ জন প্রার্থী এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
দিনাজপুর-১ (কাহারোল-বীরগঞ্জ)
দিনাজপুর-১ আসনটি জামায়াতের জন্য একটি সুবিধাজনক আসন। এ আসনের দু’টি উপজেলার একটি কাহারোল হিন্দু অধ্যুষিত হওয়া স্বত্বেও এখানে ২০০১ সালে জামায়াত প্রার্থী তৎকালীন কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদ সদস্য মরহুম অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল কাফী বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। সেই থেকে এ আসনে জোটের পক্ষ থেকে বরাবরই জামায়াত প্রার্থী মনোনীত হন। এবারও তাই জামায়াত প্রার্থী বীরগঞ্জ পৌর মেয়র মাওলানা মোঃ হানিফ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোট যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল নৌকা প্রতীক নিয়ে মাঠে আছেন। এছাড়া জাতীয় পার্টির মোঃ শাহিনুর ইসলাম (লাঙ্গল), জাগপার মোঃ আরিফুল ইসলাম (হুক্কা), ইসলামী আন্দোলনের আশরাফুল আলম (হাতপাখা), মুসলিম লীগের সৈয়দ মনজুর উল করিম (হারিকেন) তাদের অবস্থান জানান দিয়ে মাঠে আছেন। এ আসনটিতে আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপ এমপি গোপালের বিরূদ্ধে নানা অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে মাঠে আছে। পাশাপাশি ধানের শীষ প্রতীক পাওয়ায় এবার স্থানীয় জামায়াত-বিএনপি একাট্টা। তাই স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের নতুন শ্লোগান ‘প্রার্থী তোমার-মার্কা আমার-মেয়র হানিফ আমাদের সবার’। দেশ-দল ও এলাকার স্বার্থে মেয়র হানিফকে ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিজয়ী করতে হবে। তাই বলা যায়, অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন ২৩ দলীয় জোট প্রার্থী জামায়াত নেতা পর পর দু’বার বিপুল ভোটে নির্বাচিত বীরগঞ্জ পৌরসভার জননন্দিত মেয়র মাওলানা মোঃ হানিফ।
দিনাজপুর-২ আসন (বিরল-বোচাগঞ্জ)
আসনটি বিএনপি-জামায়াতের হলেও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন। এবারো তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটযুদ্ধে নেমেছেন। পাশাপাশি বিএনপি নেতা আলহাজ্ব সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তিনি নতুন প্রার্থী হলেও তাঁর পিতা মরহুম রিয়াজুল হক চৌধুরী এলাকায় সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ওই এলাকার সাবেক সংসদ সদস্যও ছিলেন। এলাকায় তাদের বংশীয় প্রভাবও রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পার্টির এড. জুলফিকার হোসেন (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের মোঃ হাবিবুর রহমান (হাতপাখা), মুসলিম লীগের মোঃ এরশাদ হোসেন (হারিকেন) প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।
দিনাজপুর-৩ (সদর)
জেলার সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আসন এটি। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনটিতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাগপা সভাপতি মরহুম শফিউল আলম প্রধানকে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী করা হয়েছিল। আর দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে ইকবালুর রহিম এমপি নির্বাচিত হন। এবারো আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম। ইতোমধ্যে নৌকা মার্কার ব্যানার-পোষ্টারে দিনাজপুর শহর ছেয়ে গেছে। পাশাপাশি এবার বিএনপি’র ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হয়েছেন পর পর দু’বার বিপুল ভোটে নির্বাচিত দিনাজপুর পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম। হাইকোর্ট থেকে প্রার্থীতা নিশ্চিত হবার পর গত সোমবার দিনাজপুরে এসে জনপ্রিয় এ মেয়র যেদিক দিয়ে হেঁটেছেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মত মানুষকে তাঁর পিছু পিছু ছুটতে দেখা গেছে। এতো জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে- স্থানীয় সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম দিনাজপুর পৌরসভায় কোন বরাদ্দ পেতে সহায়তা করেননি। কয়েকবার করে মেয়রকে বরখাস্ত এবং পরে হাইকোর্টে রিট করে বহালের বিষয়টি মানুষের আবেগে হানা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, গত ঈদ-উল-আযহার ২ দিন পূর্বে ঈদের মাঠ পরিদর্শন করার পর মাত্র দেড় কেজি চাল আত্মসাতের একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করে। ফলে মেয়রকে ঈদ করতে হয় কারাগারে। এ বিষয়টিও দারুনভাবে নাড়া দেয় শান্তিপ্রিয় দিনাজপুরবাসীকে। সর্বশেষ প্রার্থীতা নিয়ে নাটকের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসেন মেয়র জাহাঙ্গীর। এ আসনটিতে বিএনপি-আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বাইরে রয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের মোঃ খায়রুজ্জামান (হাতপাখা), বিকল্পধারার আশরাফুল ইসলাম (কুলা), কমিউনিষ্ট পার্টির মোঃ বদিউজ্জামান (কাস্তে), মুসলিম লীগের সৈয়দ মাহমুদ উল করীম (হারিকেন)।
দিনাজপুর-৪ (চিরিরবন্দর-খানসামা)
আসনটি ২০০১ সালে বিএনপির দখলে থাকলেও ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের শাসনামলে ২০০৮ সালে হাতছাড়া হয়ে যায়। সেবার এমপি নির্বাচিত হন সাবেক রাষ্ট্রদুত এলাকায় তখন একদম নতুন মুখ আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। আচমকাই এমপি নির্বাচিত হয়ে যান। পুরস্কার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে প্রথমে ত্রাণ ও পূর্ণবাসন ও পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা করেন। এবারো তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার বিপক্ষে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাবেক এমপি মোঃ আখতারুজ্জামান মিয়া। তুলনামূলক জনপ্রিয় আখতার মিয়া এলাকায় প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। জনসম্পৃক্ততাই আখতারো মূল পুঁজি বলে মনে করেন এলাকাবাসী। আর স্থানীয়ভাবে জামায়াতে ইসলামীও বেশ শক্তিশালী। তাই তাদের ব্যাংক ভোটও আখতার মিয়ার জন্য সুবিধা এনে দেবে বলে ভোটারদের অভিমত। এ আসনে অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় পার্টির মোঃ মোনাজাত চৌধুরী (লাঙ্গল) ইসলামী আন্দোলনের মিজানুর রহমান (হাতপাখা), মুসলিম লীগের মোঃ মোজাফ্ফর হোসেন (হারিকেন), কমিউনিস্ট পার্টির রেয়াজুল ইসলাম (কাস্তে), বিপ্লবী ওর্য়াকাস পার্টির মো. সাজেদুল আলম চৌধুরী (কোদাল)।
দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর-ফুলবাড়ী)
এ আসনটি আওয়ামী লীগের আসন হিসেবে জেলায় পরিচিত। কেননা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী এড. মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার অনেকটা বিনয়ী ও মিষ্টিভাষী। তাই তাকে কেউ কখনও হারাতে পারেননি। এবারো তিনি আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হয়েছে। বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির আহবায়ক বিএনপির জন্য নিবেদিত ব্যক্তি এজেডএম রেজওয়ানুল হক। এবারের নির্বাচনের হিসাবটা একটু ভিন্ন। কেননা, এখানে এবার মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারের একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ তৈরী হয়েছে আওয়ামী লীগের মধ্যেই। সেজন্য বিষয়টি আওয়ামী লীগের জন্য সুখকর হবে না। পাশাপাশি মহাজোট গঠন হলেও এখানে জাতীয় পার্টিরও নিজস্ব প্রার্থী রয়েছে। আর এর বিপক্ষে বিএনপি প্রার্থী হক সাহেব বার বার দাঁড়িয়েও জিততে পারেননি বলে এলাকাবাসীর সিমপ্যাথী ভোট তার জন্য প্লাস পয়েন্ট হবে। আর সারাদেশে ধানের শীষের জোয়ারে এজেডএম রেজওয়ানুল হক এবার এমপি নির্বাচিত হলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না। আসনটিতে জাতীয় পার্টির মোঃ সোলায়মান সামী (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের মো. মতিউর রহমান (হাতপাখা), ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মোঃ শওকত আলী (আম) ও মুসলিম লীগের মোঃ শরিফুল ইসলাম (হারিকেন) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
দিনাজপুর-৬ (বিরামপুর, হাকিমপুর, নবাবগঞ্জ ও ঘোড়াঘাট)
তুলনামূলক বড় নির্বাচনী এলাকা দিনাজপুর-৬ আসনটি ৪টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। আসনটিতে ২০০১ ও ১৯৯১ সালে জামায়াত নেতা মরহুম অধ্যক্ষ আজিজুর রহমান চৌধুরী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হন। তাই এ আসনটি জামায়াত-বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এতে মাত্র ২৫৯ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন জামায়াত প্রার্থী জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম। জামায়াত নেতা আনোয়ারুল ইসলাম ব্যক্তি হিসেবে এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়। সদালাপী ও সজ্জন ব্যাক্তি হিসেবে তিনি এক নামে পরিচিত। এবারো তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে অবতীর্ণ হয়েছেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য মোঃ সিবলী সাদিক। এলাকাবাসী বলছে- এবার লড়াই হচ্ছে ‘বিনা ভোটের এমপি বনাম অল্প ভোটে হেরে যাওয়া এমপি’। এবার ধানের শীষের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। বিশেষ করে মহাজোটের জাতীয় পার্টি ও ন্যাপ আসনটি চাইলেও শেষ পর্যন্ত তারা পাননি। তাই দুঃখ ক্ষোভে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিলেও ভোটে এর একটা প্রভাব দেখা যেতেই পারে। এছাড়া আওয়ামী লীগ প্রার্থী শিবলী সাদিক একেবারে তরুণ এবং দলের কাছেও তিনি নিজেকে সেভাবে মেশাতে পারেননি। আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে তিনি এমপি নির্বাচিত হননি। তিনি ২০১৪ সালের ভোটার বিহীন নির্বাচনের সংসদ সদস্য। সব মিলিয়ে ধানের শীষ মার্কার প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলামের জন্যই ওই এলাকার মানুষ উন্মুখ হয়ে আছে। বিএনপির নেতা-কর্মীরাও তাঁর পক্ষে মাঠে নেমেছেন। কেননা, তাদের মার্কা ধানের শীষ পাওয়াটা এবার তাদের কাছে বড় প্রাপ্তি। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, বর্তমান যুগ্ম-আহবায়ক, নবাবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং ওই এলাকার বিএনপির পক্ষ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী আলহাজ্ব লুৎফর রহমান মিন্টু বলেন, আনোয়ারুল ইসলামকে আমাদের দল ও জোট থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। বিএনপির সকল নেতা-কর্মী তার পক্ষে মাঠে নামবে। কেননা, এ নির্বাচন ধানের শীষকে বিজয়ী করার নির্বাচন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার নির্বাচন। এখানে কে প্রার্থী বড় কথা নয়, মার্কা ধানের শীষ এটাই চুড়ান্ত। এ আসনটিতে আরও প্রার্থী রয়েছেন একমাত্র মহিলা প্রার্থী ন্যাশনাল পিপলস পার্টির শাহিদা খাতুন (আম) ও ইসলামী আন্দোলনের মোঃ নুর আলম সিদ্দিক (হাতপাখা)।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ