রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

গ্রেফতার আতংকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীরা

রেজাউল করিম রাসেল, কুমিল্লা অফিস : আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ৩০ ডিসেম্বর। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিএনপি-জামায়াত তথা ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের উপর পুলিশ,ছাত্রলীগ যুবলীগ কতৃক হামলা,মামলা, গ্রেপ্তার,বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভাংচুর,হুমকী দমকী দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ করেছেন ডা.তাহের এর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আবদুস সাত্তার। বিগত ১০ বছরে চৌদ্দগ্রামে ১৫১টি রাজনৈতিক মামলা,৮ হাজার সাধারণ মানুষকে আসামী,খুন হয়েছে ১৩জন, পুঙ্গত্ব বরণ করেছে প্রায় ৬০ জন,এলাকা ছাড়া ১০ হাজার পরিবার,আহত হয়েছে ২ হাজার নেতাকর্মী ।
অপরদিকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মন্ত্রিত্বের প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনী মিছিল, মিটিং, সভা-সমাবেশ করছে আওয়ামীলীগ মনোনিত প্রার্থী রেল মন্ত্রী মজিবুল হক মজিব।
দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ভোটাদিকার প্রয়োগ করতে পারছেন না চৌদ্দগ্রামের জনগণ। চৌদ্দগ্রামবাসী অধীর অপেক্ষায় রয়েছে ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে মনোনীত করার। এই আসনে চুড়ান্ত ভোটযুদ্ধে মাঠে নেমেছেন ৪ প্রার্থী। প্রার্থীরা হলো; নৌকা প্রতিকে আওয়ামীলীগ মনোনীত বর্তমান রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক, ২০ দলীয় জোট মনোনীত ধানের শীষে জামায়াত নেতা ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো: তাহের, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা কামালউদ্দিন ভূঁইয়া, বিকল্পধারার শামছুদ্দিন জেহাদী। ১৯৯১ সাল থেকে এই ২০০৮ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ও জামায়াত নেতা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
সারাদেশের ১৫০ আসনের ন্যায় বিগত ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বর্তমান রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়। যার ফলে চৌদ্দগ্রামবাসী অন্তত ১০ বছর পর আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদানের আশায় বুক বেঁধেছে। কিন্তু জনগণের সে আশা আকাংখার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পর পরই সমগ্র চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় নৌকা মার্কার সমর্থনে আ’লীগের নেতাকর্মীরা মিছিল-সমাবেশ আর উঠান বৈঠকের মাধ্যমে রাজপথ দখলে রেখেছেন। অপরদিকে ধানের শীষের প্রার্থী ডা: তাহেরের পক্ষে মাঠে নামাতো দুরের কথা, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা তফসিল ঘোষণার পরও এখনো গ্রেফতার আতংকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রায় প্রতিদিন পুলিশ ছাত্রলীগ-যুবলীগের ক্যাডার কতৃক বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও বাড়ি ঘরে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ঐক্যফ্রন্টের কোন নেতাকর্মী ভোট চাওয়াতো দূরের কথা তারা ঠিক মত বাড়ি-ঘরেও যেতে পারছেনা। যারা জামায়াতের বিগত নির্বাচন ও আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ছিল গ্রাম ও কেন্দ্র ভিত্তিক তালিকা তৈরী করে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশ রাতের আধাঁরে অব্যাহত হুমকির মধ্যে রেখেছে,তাদেরকে না পেয়ে বাড়ি-ঘর ভাংচুর,লাটপাট করছে এবং একের পর এক সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হচ্ছে। উচ্ছ আদালত থেকে জামিন মুক্তী পাওয়ার পরও জেল গেট থেকে অন্যায় ভাবে গ্রেপ্তার করছে।
জামায়াত নেতাদের অভিযোগ গ্রেপ্তার হুমকি ধমকীর মূল নায়েক হচ্ছে চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহফুজ।
এদিকে, সোমবার প্রতীক পাওয়ার পর পরই চৌদ্দগ্রাম হাইস্কুল মাঠে নির্বাচনী সমাবেশ করেছে রেলমন্ত্রী মজিবুল হক। বিভিন্ন স্থানে উঠানও বৈঠক করেছে।
অপর দিকে ২০দলীয় জোটের প্রার্থী ডা.তাহের পক্ষে মিছিলে হামলা করেছে ছাত্রলীগ যুবলীগ ক্যাডারা। উপজেলায় ধানের শীষ প্রতীকের ১৫ নেতাকর্মীর বাড়িতে তল্লাশীর নামে পুলিশ ও যুবলীগ কর্মীরা তান্ডব চালিয়েছে।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা জামায়াতের আমীর ও ২০ দরীয় জোটের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য মাহফুজুর রহমান দৈনিক সংগ্রামকে জানান, প্রতীক বরাদ্দের পরই সোমবার বিকেল থেকে ধানের শীষের পক্ষে উপজেলার কাশিনগর ইউনিয়নের যাত্রাপুর, জয়মঙ্গলপুর, দাতামা, কনকাপৈত ইউনিয়নের করপাটি, মাসকরা, তারাশাইল, জঙ্গলপুর, পন্নারা, লাউলাইশ, চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার ফালগুনকরা, চাটিতলা, চান্দিশকরা, মুন্সিরহাট ইউনিয়নের ডাকরা, বৈলপুর, বাতিসা ইউনিয়নের বসন্তপুর, সোনাপুর, চিওড়া ইউনিয়নের হান্ডায় নেতাকর্মীরা মিছিল বের করে। খবর পেয়ে চৌদ্দগ্রাম থানা ও কনকাপৈত পুলিশ ফাঁড়ির পৃথক টিম আলহাজ্ব নূর মিয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক কনকাপৈত ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের মোহাম্মদ আলী, বুদ্দিন গ্রামে মাওলানা ইয়াছিন, তারাশাইল গ্রামে শিক্ষক মাওলানা তৈয়ব উল্যাহ, মফিজুর রহমান স্বপন, মুন্সিরহাট ইউনিয়নের ছাতিয়ানী গ্রামে কফিল উদ্দিন মোল্লা, সোমবার রাতে চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার চান্দিশকরা গ্রামে কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন বাদশা, জোট কর্মী হেলাল উদ্দিন, চাটিতলা গ্রামে মাওলানা শাহ আলমের বাড়িতে পুলিশ তল্লাশীর নামে তান্ডব চালায়। এছাড়া সোমবার সন্ধ্যায় কনকাপৈত ইউনিয়নের জঙ্গলপুর গ্রামে যুবলীগ কর্মীরা মিছিল করে ওই গ্রামের নজরুল ইসলামের দোকান ভাংচুর করে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন,
চৌদ্দগ্রামে নির্বাচনী কোন পরিবেশ দেখা যাচ্ছে না। পুলিশ ছাত্রলীগ,যুবলীগের ক্যাডার বিভিন্ন স্থানে হামলা করছে, পোষ্টার চিড়ে পেলছে। এভাবে চলতে থাকলে নির্বাচনী পরিবেশে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে না। তিনি অবিলম্বে চৌদ্দগ্রামে নির্বাচনী শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করার আহবান জানান।
জানা যায়,বিগত ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে চৌদ্দগ্রামের দক্ষিণ অঞ্চলসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের জামায়াত সমর্থিত অসংখ্য নেতাকর্মীরা বাড়ি-ঘর ছেয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। একের পর এক মামলার হুলিয়া মাথায় নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থকরা দেশের বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে অনেক নেতাকর্মী। অনেকে পরিবার ও নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে জীবিকার তাগিদে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন। আওয়ামীলীগ সরকারের ২ মেয়াদের বিগত ১০ বছরে চৌদ্দগ্রামে জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১৫১টি রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে রয়েছে কথিত ১৫টি গায়েবি মামলাও। এ সকল মামলায় আসামী করা হয়েছে প্রায় ৮০০০হাজার নেতাকর্মীকে। বিভিন্ন সময়ে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে জেল খেটেছেন চৌদ্দগ্রামের হাজার-হাজার নেতাকর্মী। বিরোধীদের হাতে এবং পুলিশের গুলীতে খুন হয়েছে জামায়াতের ১৩জন নেতাকর্মী। বিভিন্ন সময়ে হামলার শিকার পুঙ্গত্ব বরণ করেছে প্রায় ৬০ জন নেতাকর্মী। বর্তমানে জেলে রয়েছে অন্তত ৬০জন নেতাকর্মী। জুলম নির্যাতনের পরেও বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীসহ সমর্থকদের মাঝে একটু হতাশার চাপ ছিল না। তারা দীর্ঘ নির্যাতন ও হামলা-মামলার পরও একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের অপেক্ষায় ছিল। তাই এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের ভাবনার শেষ নেই। এরই মাঝে নির্বাচনের বহুল কাক্সিক্ষত সেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই এবং প্রতিক বরাদ্দ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু সত্যিকারের সেই নির্বাচনের আমেজ এখনো জমে উঠেনি। সব দলের অংশগ্রহণের পরও এবারের নির্বাচনটিই শুধু ব্যতিক্রম মনে হচ্ছে। কেননা এর আগে কখনো একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাঠে এতটা ভীতকর পরিস্থিতি ছিলনা। ছিলনা এমন নিরবতা-নিস্তবদ্ধতা। এবারের বহুল কাক্সিক্ষত সেই নির্বাচনে চৌদ্দগ্রামে আওয়ামীলীগ তথা মহাজোটের একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছে রেলপথ মন্ত্রী মোঃ মুজিবুল হক মুজিব। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই গ্রাম ও বাড়ি পর্যায়ে উঠান বৈঠক করে আসছে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট চাচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা। ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী ডা. তাহেরের গোপনে প্রস্তুতি এবং ভোটের মাঠে অংশগ্রহণকে কোনভাবেই হালকা করে দেখছেনা মহাজোট সমর্থিত প্রার্থী রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক মুজিব। ইতিমধ্যেই তার নির্দেশে চৌদ্দগ্রামের প্রায় সবকটি কেন্দ্র কমিটি করা হয়েছে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যাপক শোডাউন করে সাধারণ জনগণকে জানান দেওয়া হচ্ছে ভোটের মাঠে শুধু তারাই রয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধী জোট ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ব্যাপক আলোচনায় রয়েছেন সাবেক সাংসদ বাংলাদেশ জামায়াতের ইসলামী কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। প্রতিক বরাদ্দের পরপরই রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক নৌকা মার্কার সমর্থনে জনসভা ও উঠান বৈঠকে নেতাকর্মীদের নিয়ে অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি সমর্থিক প্রার্থী ডা: তাহের আওয়ামীলীগ সরকারের ২ মেয়াদে নিজ নির্বাচনী এলাকা চৌদ্দগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক মামলার গ্লানি নিয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। মামলার এবং গ্রেফতার আতংক কাটিয়ে ভোটের মাঠে অংশ নিতে পারবেন কিনা দেখার বিষয়।
বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী ডা. তাহের মুঠোফোনে জানান, চৌদ্দগ্রামের মানুষ ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য অধীর অপেক্ষায় রয়েছেন। চৌদ্দগ্রামে বিগত ১০ বছরে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের অব্যাহত খুন, সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজিতে অতিষ্ট চৌদ্দগ্রামের মানুষ। কিন্তু তফসিল ঘোষণার পরও চৌদ্দগ্রামে পুলিশের হামলা-মামলা ও গ্রেফতার থেকে রক্ষা পাচ্ছে না নেতাকর্মীরা। নির্বাচন কমিশন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ঘোষনা দিলেও চৌদ্দগ্রামে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড গঠনে কোন সম্ভাবনাই দেখাচ্ছে না প্রশাসন। আমরা এখনো প্রত্যাশা করি নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বাস্তবায়নে চৌদ্দগ্রামের প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিবেন। এসময় তিনি আরও বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হলে এবং জনগণ ভোট দিতে পারলে বিগত ১০ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনের জবাব দিবে চৌদ্দগ্রামের জনগণ।
এ বিষয়ে চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজকে সোমবার (১০ ডিসেম্বর) রাতে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননাই। মঙ্গলবার দুপুরে প্রতিবেদক ফোনে নিউজের শিরোনামের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে উনি মিটিংএ আছেন বলে ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) শুভরঞ্জন চাকমাকে ফোন করলে তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে বলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ