সোমবার ১০ আগস্ট ২০২০
Online Edition

আওয়ামী লীগের বাবুর পক্ষে প্রচারণায় নেই সিনিয়র নেতারা ২০ দলের মাওলানা আজাদের সমর্থকরা গ্রেফতার আতংকে

খুলনা অফিস : খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনে প্রতীক পেয়ে প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণা শুরু করলেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট-২০ দল মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা আবুল কালাম আজাদ কারাগারে থাকায় তিনি প্রচারণা শুরুই করতে পারেননি। তবে, তার পক্ষে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চলছে। এ আসনের বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা গ্রেফতার আতংকে রয়েছেন। এ ছাড়া এ আসনটিতে স্থানীয় কোনো নেতাকে মনোনয়ন না দেয়ায় আওয়ামী লীগের তৃণমুলে রয়েছে প্রচণ্ড ক্ষোভ। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মো. আক্তারুজ্জামান বাবুর পক্ষে এখনও পর্যন্ত সিনিয়র কোন নেতাদেরকে ভোট চাইতে দেখা যায়নি। এমনকি বর্তমান আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এডভোকেট নুরুল হক এখনও পর্যন্ত আক্তারুজ্জামান বাবুর পক্ষে ভোট চাইতে নামেননি। ৯০ দশকের সাবেক সাবেক ছাত্র নেতারা এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একটি অংশ বাবুর পক্ষে ভোট চাইছেন। অপরদিকে এ আসনটিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী খুলনা জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শফিকুল ইসলাম মধু প্রতিদ্বন্দিতা করায় জাপার সমর্থন পচ্ছেন না। ফলে আসনটিতে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া এই মুহূর্তে বাবুর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমুল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলেছেন দলের সিনিয়রদের মাঠে নামাতে পরামর্শ দিয়েছেন। অপরদিকে এ আসনটিতে জামায়াতের বড় ঘাঁটি হিসেবে দাবি করে থাকে দলটি। আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ১৯৯১ ও ২০০১ সালে দুইবার জয়লাভ করে। দলীয় নেতাকর্মীরা কাজ করতে পারলে এবারও বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে বলে নেতাকর্মীদের দাবি। 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীক প্রার্থী খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আক্তারুজ্জামান বাবু ও ধানের শীষ প্রতীক প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর খুলনা মহানগরী আমীর মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মধ্যে।

আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মো. আক্তারুজ্জামান বাবু বসবাস করেন রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে। আর পৈত্রিক বাড়ি বাগেরহাটের কচুয়ায়। বাবু বার্ষিক আয়ে এগিয়ে থাকলেও মামলায় এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি-জামায়াত জোট মনোনীত প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। 

আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. আক্তারুজ্জামান বাবু হলফনামায় পেশা হিসেবে ঠিকাদারী ও কৃষি কাজ দেখিয়েছেন। কৃষি খাত থেকে বাৎসরিক আয় ৩২ হাজার টাকা এবং ব্যবসা থেকে ৬৫ লাখ ২৮ হাজার ৮৪৭ টাকা। তার স্ত্রীর চাকুরী থেকে বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৬৪৭ টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে তার কাছে নগদ টাকা রয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার ৮০০ টাকা, ব্যাংকে জমা ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৯৮৮ টাকা, উপহার হিসেবে স্বর্ণ পেয়েছেন ৩০ তোলা। ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী রয়েছে ১ লাখ টাকার, আসবাবপত্র ১ লাখ টাকার। তার স্ত্রীর কাছে নগদ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা, ৭০ হাজার টাকা মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার ও অন্যান্য খাতে ৭ লাখ ২২ হাজার ৬৭৫ টাকা রয়েছে। স্থাবর সম্পদের মধ্যে কৃষি জমির পরিমাণ ও অর্জনকালীন আর্থিক মূল্য ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও ২ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের অকৃষি জমি উল্লেখ করেছেন তিনি। দায়ের ঘরে ঠিকাদারী কার্যাদেশের বিপরীতে প্রাইম ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া আছে ১ কোটি ২ লাখ ২৭ হাজার ১৪৩ টাকা। তার স্ত্রীর কোন স্থাবর সম্পদ উল্লেখ করেননি তিনি। 

হলফনামায় পেশা হিসেবে তামিম এন্টারপ্রাইজ, মালামাল সরবরাহকারী ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা দেখিয়েছেন ধানের শীষ প্রতীক পাওয়া ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। ব্যবসা থেকে তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৪ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ১৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ টাকা, ব্যাংকে জমা ১১ হাজার টাকা, শেয়ার ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার, ৪২ হাজার টাকা মূল্যের ইলেকট্র্রনিক্স সামগ্রী ও আসবাবপত্র রয়েছে তার। স্ত্রীর ১২ ভরি স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে। স্থাবর সম্পদের মধ্যে ৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা মূল্যের ৭ কাঠা অকৃষি জমি রয়েছে তার। যৌথ মালিকানায় ৫ বিঘা কৃষি জমি এবং ১ বিঘা অকৃষি জমি রয়েছে। তার স্ত্রীর নামে অকৃষি জমি রয়েছে ৪ কাঠা। একটি সেমিপাকা ঘর এবং ও পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত একটি বাড়ি রয়েছে তার। প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ইসলামী ব্যাংক দৌলতপুর শাখা থেকে বিনিয়োগ সুবিধা বা ঋণগ্রহণ করেছেন ১২ লাখ টাকার। তার বিরুদ্ধে ২০টি মামলা রয়েছে। আর পূর্বের ৩টি মামলায় অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি। মামলার কারণে বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছেন এই প্রার্থী।

আক্তারুজ্জামান বাবু ৯০ দশকের তুখোর ছাত্র নেতা ছিলেন। জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে যুবলীগসহ মুলদল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। 

অপরদিকে আশির দশকে ছাত্রশিবিরের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরী আমীর। এ আসনটিতে ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন জামায়াত নেতা অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস। এরপর ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪৬.৩% ভোট পেয়েও এ আসনে সামান্য ব্যবধানে হেরে যান জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সোহরাব আলী সানা ৫২.৩% ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বিগত কয়েকটি নির্বাচনে এ আসনে মূলত আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে আসছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর বিতর্কিত নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন বর্তমান সংসদ সদস্য এডভোকেট শেখ মো. নুরুল হক।

পাইকগাছার কপিলপুনি এলকার প্রবীণ ব্যবসায়ী সরদার আনিসুর রহমান বলেন, এই এলাকায় অনেকগুণী মানুষের জন্ম। সাধু বিনদ বিহারী রায় সাধু, বিজ্ঞানী পিসি সরকার, সাবেক স্পীকার এডভোকেট রাজ্জাক আলীর মতো মানুষরা এলাকার সুনাম বয়ে এনেছে। আমাদের আশাছিলো ক্ষমতাসীন দল স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মূল্যায়ন করবেন। কিন্তু আমরা আশাহত।

কয়রা সদরের রাজনৈতিক কর্মী হারুন-অর-রশীদ বলেন, সবার চাওয়া ছিলো এলাকার গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেবে। যাকে দেয়া হয়েছে তিনি এলাকার কেউ নন। বিপদে-আপদে তাকে কোথায় পাবো। তাকে পেতে ফোন করে ডেকে আনতে হবে। 

তবে, প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, আমার জীবনের একটি বড় সময় আমার নানা বাড়ী পাইকগাছায় বেড়ে ওঠা। এ অঞ্চলের মাটি-মানুষের সাথে আমার নিবিড় সর্ম্পক। রাজনীতিতে তৃণমুল পর্যায় থেকে উঠে এসেছি। নির্বাচিত হলে এলাকার মানুষকে বেশী সময় দেব। কাজেই যারা এসব কথা বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন তাদের কথা সঠিক নয়।

এদিকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর তৃণমূল কর্মীরা বলছেন, এ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে বর্তমান খুলনা মহানগরী আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ জেলে থাকলেও তার প্রচারণা চলছে। তবে তাদের মধ্যে গ্রেফতার আতংক বিরাজ করছে। ফলে অনেক নেতা-কর্মী প্রকাশ্যে প্রচারণায় না নামলেও গোপনে ভোট চাচ্ছেন। 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও খুলনা-৫ আসনের ধানের শীষ প্রার্থী অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মাওলানা আবুল কালাম আজাদকে সকল মামলায় জামিনে থাকার পরেও গত ২৭ অক্টোবর ব্যক্তিগত কাজে ঢাকা যাওয়ার পথে গ্রেফতার করে ডিবি। আমরা আশা করছি আদালতে জামিন পেয়ে দ্রুতই নির্বাচনী মাঠে ফিরবেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ