মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

দলীয় মনোনয়নের সবুজ সংকেত না পেয়ে ঋণ পরিশোধ করেননি খেলাপিরা

 

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের সবুজ সংকেত না পেয়ে ঋণের টাকা পরিশোধ করেননি খেলাপিরা। এতে ঋণখেলাপিদের টাকা পরিশোধে শুরুতে তোড়জোড় শুরু হলেও শেষে এসে হতাশ হতে হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। ব্যাংকগুলোতে যেসব খেলাপীরা তাদের খেলাপী ঋণ পরিশোধের জন্য যোগাযোগ করেছিল তার খুব কম সংখ্যকই তাদের খেলাপির টাকা দিয়েছে। শুধুমাত্র যারা মনোনয়ন পাওয়ার সবুজ সংকেত পেয়েছে তারাই ঋণ পুন:তফসিল করেছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে যেভাবে খেলাপি ঋণ পরিশোধের জন্য তোড়জোড় শুরু হয় পরে তা আর দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। 

সূত্র জানায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ১২ হাজার মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে বড় দু’দলের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ৯ হাজার প্রার্থী। বাকিরা কিনেছেন অন্য মাঝারি ও ছোট দল থেকে। তাদের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি প্রার্থী বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি। আর কোনো ব্যক্তি এক টাকা ঋণ খেলাপি থাকলেও নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। এর মধ্যে বড় দুই দল বা জোট থেকে মনোনয়ন পাবেন ৬০০ প্রার্থী। নির্বাচন উপলক্ষে প্রথম দিকে টাকা পরিশোধে আগ্রহী হয়ে ওঠেন ঋণখেলাপিরা। অনেকটা জোয়ারও উঠেছিল। এক প্রকার হিড়িক লেগে যায় দরকষাকষির। সাধারণত মোট খেলাপি ঋণের ৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করতে হয়। এ ক্ষেত্রে প্রভাবশালীরা সর্বনি¤œ ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়েও ঋণ পুনঃতফসিল করার নজির রয়েছে। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক আংশিক টাকা পাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত এর পরিমাণ খুবই কম। 

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের প্রায় অর্ধশত ঋণখেলাপি প্রথমে খেলাপিমুক্ত হওয়ার জন্য যোগাযোগ করেন। এমনকি কেউ কেউ দরকষাকষি পর্যন্ত করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ২০-২৫ জন খেলাপি ধরা দিয়েছেন। বাকিরা কেটে পড়েছেন। সোনালী ব্যাংকে সামান্য ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের তালিকায় জাতীয় সংসদের হুইপ, চিফ হুইপ, এমপি-মন্ত্রীও রয়েছেন। 

জানা গেছে, সর্বনিম্ন ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে খেলাপিমুক্ত হয়েছেন আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতার বড় ভাই। তিনি জমা দিয়েছেন ২২ লাখ টাকা। যদিও প্রথমে মাত্র ১ লাখ টাকা দেয়ার প্রস্তাব দেন। ব্যাংক তাতে রাজি হয়নি। এরপর ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেখে নেয়ার হুমকি দেন তিনি। সর্বশেষ ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট বা ২২ লাখ টাকার বিষয়ে বিশেষ বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে তাকে খেলাপিমুক্ত করা হয়। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংক থেকে যুবলীগের সাবেক নেতা ও মন্ত্রী মির্জা আজমও ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন। এর বাইরে ক্ষমতাসীন দলের অনেক প্রভাবশালী নেতার আত্মীয়স্বজনও খেলাপিমুক্ত হওয়ার তালিকায় রয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকে দেড় লাখ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের বিপরীতে খেলাপি হয়ে পড়েছে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এ প্রসঙ্গে একজন ব্যাংকার বলেন, ঋণখেলাপির ব্যাপারে রাষ্ট্রীয়ভাবে জিরো টলারেন্স না হওয়া পর্যন্ত এর থেকে পরিত্রাণ মিলবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জোর করে খেলাপি ঋণ আদায় করা যাবে না। খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও সদিচ্ছা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সবার যৌথ চেষ্টা ছাড়া খেলাপি টাকা আদায় করা সম্ভব নয়। কয়েকদিন আগে সোনালী ব্যাংকের একজন গ্রাহকের মাত্রাতিরিক্ত পুনঃতফসিল আটকে দিয়েছেন আদালত। এতে আদালতের বক্তব্য ছিল- বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী একটি খেলাপি ঋণ তিনবার পুনঃতফসিল করা যায়। কিন্তু এখানে কেন ১৩ বার পুনঃতফসিল করা হবে। আদালত বুদ্ধিমানের পরিচয় দিয়েছেন। এভাবে সব খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে আমি আদালতের সহায়তা প্রত্যাশা করবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ