শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

সুষ্ঠু ভোটের ভয় দূর করতে বাধা কোথায়?

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখার বিরোধের বিষয়টি সুরাহা না হওয়ার আগেই নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। সে মোতাবেক আগামী ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জাতির ক্লান্তিলগ্নে যেখানে সুষ্ঠু ভোটের উদ্বেগ-উৎকন্ঠা দূর করা প্রয়োজন সেখানে তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা দুরভিসন্ধি কিনা তা বোধগম্য নয়। তবে নির্বাচন কমিশন ইচ্ছে করলে সুষ্ঠু ভোটের সংশয় দূর করতে পারে। আমাদের সংবিধান সে অধিকার নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছে। একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক লেভেল পেøিয়ং ফিল্ডের নির্বাচন প্রত্যাশা করলেও কোথাও লেভেল প্লেয়িং এর নমুনা দেখা যাচ্ছে না। ক্ষমতাসীনরা উন্নয়নের ফিরিস্তি জনগণের সামনে বাধাহীনভাবে তুলে ধরছে। অথচ বিরোধী জোটের নেতা নেত্রীরা গায়েবী মামলার হাজিরা দিতে আদালতেই সময় পার করছে। বিরোধী জোটের উপর কোন সরকারই গোলাপের পাঁপড়ি ছিটিয়ে দেয়নি এটা যেমন সত্য তেমনি এটাও সত্য জুলুম নিপীড়ন করে কেউ বেশি দিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। যেমনটি পারেনি হিটলার, মুসোলিনি ও রবার্ট মুগাবে। জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে ক্ষমতায় যাওয়ার ইতিহাস নতুন নয়! ভূ-ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ক্ষমতাসীনরা সবসময় চেয়েছে বিনা ভোটে ক্ষমতার সিংহাসনে আজীবন টিকে থাকতে, কিন্তু পারেনি। 

বৃটিশরা যখন বিশ্ব শাসন করতো তখন তারা এমন একটা নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু করেছিল,সেখানে সর্বজনীন ভোটাধিকার ছিল না। যারা কর প্রদান করতো এবং শিক্ষিত ছিল তারাই কেবল ভোট দিতে পারতো। বৃটিশদের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু তীব্র গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার জন্যে জনগণ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল সে ভোটাধিকার আজ উধাও। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারে আমলে আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব স্লোগানটি বেশ জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু এখন আর সেই মুখরিত স্লোগানটি শোনা যায়নি। কারণ এই স্লোগানটি ক্ষমতাসীরা পছন্দ করে না। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন থেকে শুরু করে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন,ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচন,পরিবহন সমিতির নির্বাচনেও ভোট উধাও। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নির্বাচনের যতগুলো সংগঠন রয়েছে তার সিংহভাগ থেকে যেখানে ভোট উধাও সেখানে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ভোটের আশা করা বোকামি। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা সরকারি ও দলীয় অনুষ্ঠানে সরকারি প্রচারযন্ত্রকে ব্যবহার করে ইচ্ছেমতো নির্বাচনী প্রচার চালালেও বিরোধী দল রাস্তায় নামলেই গ্রেপ্তার হয়রানির শিকার হচ্ছে। অথচ ঐক্যফন্টের সাথে সংলাপের সময় সরকারপক্ষ আশ্বস্ত করেছিল আর কোন গ্রেপ্ততার ও রাজনৈতিক গায়েবী মামলা দায়ের হবে না। কিন্তু উল্টো আগের চেয়ে বেশী বিরোধীমতালম্বীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বিএনপির ভাষ্যমতে গত কয়েকদিনে দুই হাজারের ওপর নেতা কর্মীকে আটক করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করা হলেও গ্রেপ্তার নির্যাতন বন্ধ হয়নি। সরকারের এই দ্বিমুখী আচরণ শুধু নির্বাচনী পরিবেশের অন্তরায় নয় তা কিন্তু নয়, গণতান্ত্রিক রীতির পরিপন্থী। আওয়ামী সরকারের পক্ষে সুষ্ঠু ভোট জাতিকে উপহার দেয়া সম্ভব না। কারন তারা যেভাবে আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী ও আমলাদেরকে দলীয়করন করেছে স্বাধীনতার ৪৭ বছরের ইতিহাসে তা কেউ করেনি। এই আজ্ঞাবহ প্রশাসন দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচন জাতিকে উপহার দেয়া সম্ভব না। 

একটি অনুকূল পরিবেশের মধ্যে সুষ্ঠু ভোট হওয়ার যে আকাংখা  ছিল তা আবারও তড়িঘড়ি করে তফসিল ঘোষণা করে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সত্যিকার অর্থে যদি স্বাধীন হতো তাহলে জনগণ একটু হলেও স্বস্তিবোধ করতে পারতো। তবে এমন একটা অবস্থায় কেউই স্বস্তিবোধ করতে পারে না। বিগত ৫ বছর পর নির্বাচন হতে চলেছে। অথচ জনমনে উৎসাহের পরির্বতে উদ্বেগের হাতছানি সর্বত্র বিরাজ করছে। জাতীয় ঐক্যফন্ট যখন গঠিত হয়েছিল তখন আওয়ামীগের নেতা নেত্রীরা স্বাগত জানিয়েছিল। তারা বলেছিল আওয়ামী লীগবিরোধী মানুষের ভোট দেয়ার একটা জায়গা থাকা দরকার। কিন্তু যখন ঐক্যফন্টের নেতা কর্মীরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণের অধিকার  আদায়ের আন্দোলনকে জনসমুদ্রে পরিণত করছে তখনই সরকারের মন্ত্রীরা বিষোদগার করতে শুরু করল। জনগণের আশা ছিল সংলাপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি অবাধ,সুষ্ঠু নির্বাচনের ইতিহাস গড়বে। কিন্তু সবকিছুই যেন গুড়েবালি। বাংলাদেশে একটি সংসদ রেখে আরেকটি সংসদ নির্বাচনের ব্যতিক্রমী ঘটনা ২০১৪ সালে ঘটেছিল। এবারও সংসদ বহাল রেখে আরেকটি ৫ জানুয়ারীর প্রহসনের নির্বাচনের স্পষ্ট আভাস দেখা দিয়েছে। অথচ স্বাধীনতার পর যতগুলি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সব নির্বাচন সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর অনুষ্ঠিত হয়েছে,তাহলে এখন সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন দিতে আপত্তি কোথায়?

গত কয়েক দশক ধরে আমরা দেখছি,যখনই নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসে,তখনই সরকার ফন্দি-ফিকির করতে থাকে এবং তাদের তৎপরতা দেশকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। দেশের সন্তানতুল্য নাগরিকদের জনমনে উদ্বেগ ও আশংকা  আছে,২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসীন বর্তমান সরকারের অধীনে আদৌ কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। বিগত কয়েক মাসে সরকার স্বাধীন চিন্তা এবং ভিন্নমত প্রকাশের কারনে ঢালাওভাবে নাগরিকদের দমন-পীড়ন করছে। নিপীড়নের ফল ভালো হয় না এটা ক্ষমতাসীনরা অনুধাবন করতে পারছে না বলেই বিরোধী জোটের উপর নির্যাতনের স্টিম রোলার প্রয়োগ করছে। আওয়ামী সরকারের মন্ত্রী এমপি থেকে শুরু করে দলীয় দলকানা বুদ্ধিজীবীরা যখন বলেন দেশ উন্নয়নের মহাসোপানে বিদ্যুৎ গতিতে সামনের দিকে যাচ্ছে । অথচ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এই সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ,সামরিক-বেসামরিক আমলা, নীতিনির্ধারকরা দলকানা বুদ্ধিজীবীরা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বার্থে সব প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মনীতিকে গুড়িয়ে দিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক থেকে শুরু করে কোটা সংষ্কার,নিরাপদ সড়ক আন্দোলন,মানববন্ধন করার জন্য যারাই মাঠে নেমেছে তাদেরকে পুলিশের সহযোগীতায় নিপীড়ন করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ দেশে এতগুলো টিভি চ্যানেল ও পত্রপত্রিকা থাকা সত্ত্বেও নিপীড়নের বিষয়টি সেভাবে প্রচারিত হয়নি। একশ্রেণীর আজ্ঞাবহ গণমাধ্যম দেশের ভয়াবহ অবস্থাকে আড়াল করতে সরকারের উন্নয়নের বিজ্ঞাপন প্রচার চালাচ্ছে। অথচ ব্যাংকসহ অর্থনৈতিক খাতের সীমাহীন দুর্নীতি ও নৈরাজ্য,উন্নয়ন প্রকল্পে সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, শেয়ার কেলেংকারির মতো শত শত ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। এরকম স্বেচ্ছাচারিতা জুলুম,নিপীড়ন অব্যাহত থাকলে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। দুর্নীতিতে যারা শীর্ষে তারাই আজ সুষ্ঠু ভোটের ব্যাপারে সর্বাধিক শংকিত। সরকারের সুবিধাবাদীরা যারা দুর্নীতির সাথে জড়িত তারা সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের বড় বাধা। গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত হচ্ছে অবাধ,সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান। বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র চলতে পারে না। বিরোধী দলহীন শাসনকে আর যা-ই বলা হোক না কেন,গণতন্ত্র বলা যায় না। এই উপলব্ধি আওয়ামী সরকার অনুধান করতে পারছে না। বিরোধী দলের কাজ সরকারকে পাহারা দিয়ে রাখা। সরকারের সমালোচনা করা। ছায়া-সরকারের ভূমিকা পালন করা। শক্তিশালী বিরোধী দল গণতন্ত্রকে যেমন সুরক্ষা দেয় তেমনি গৃহপালিত বিরোধীদল জনগণের দুর্ভোগ ঢেকে আনে। একটি গ্রহণযোগ্য ভোটের দাবি শুধু দেশের জনগণ, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সুশীলসমাজের তা কিন্তু নয়! আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র,চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায়,যেখানে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে।  নির্বাচন কমিশন জনগণের মনের দ্রোহটা অনুধাবন করে সুষ্ঠু ভোটের ভয় দূর করবে এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ