শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

ফুটবল ও দাবা প্রেমিক নজরুল

মো. জোবায়ের আলী জুয়েল  : ব্রিটিশ আমলে আমাদের দেশে অসম্ভব জনপ্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। সে আমলে অবিভক্ত

ভারতবর্ষে আমরা ফুটবলের যে বিখ্যাত ক্লাবগুলির নাম পাই তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, কলকাতার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, মহীশুর রোভার্স, মার্স ইউনিয়ন (বেঙ্গালর), ওয়েলেসে রেজিমেন্ট, মোহনবাগান, ইস্ট বেঙ্গল, স্যান্ডিমেনিয়ানস, তিলক মাটি (মাদ্রাজ), ফ্রান্টিয়ার হিলাল ক্লাব, সী ফোর্থ হাইল্যান্ড, মূলতান এফ.সি, গর্ভমেন্ট কলেজ (লাহাের), কে. ও. এস. বি. পুলিশ, এরিয়ান্স, রেঞ্জার্স, ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে ও ক্যালকাটা ক্লাব, তখনকার দিনে সবচেয়ে বিখ্যাত কাপ ছিল আই.এফ.এ (ইন্ডিয়ান ফুটবল এসোসিয়েশন) শীন্ড কাপ।

ব্রিটিশ আমলে আমাদের দেশে অনেক ভাল ভাল খেলোয়াড়ের উত্থান ঘটেছিল- গোষ্ঠ পাল, শিশির ঘোষ, শৈলেন মান্না, ফুটবল জাদুকর সামাদ, আব্বাস মিজা, মোস্তফা, নূর মোহাম্মদ, তাজ মোহাম্মদ, হাফেজ রশীদ, মোহিনী ব্যানার্জী, জুম্মাখান, তসলীম সেকালের বিশ্ববিখ্যাত ফুটবলার ছিলেন। নজরুল যখন রানীগঞ্জের সিয়ার শোল হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন তিনি পড়াশোনায়, বির্তক সভায়, রচনা প্রতিযোগিতায়, ফুটবল খেলায় তিনি তখন সমগ্র তল্লাটের সেরা ও নামকরা ছাত্র। ১৯১৬ সালে এক রচনা প্রতিযোগিতায় নজরুল সে সময় ৪ টাকা “এজলী পুরস্কার পেয়েছিলেন। নজরুলের সে সময় ছিল চারটি নেশা আমপাড়া, নদীতে সাঁতার কাটা, ফুটবল খেলা ও মাছ ধরা। পরবর্তীতে তিনি কখনও কখনও দাবা খেলায়ও মেতে উঠতেন।

নজরুল ফুটবল খেলতে খুব ভালোবাসতেন। নজরুলের এমন ফুটবল খেলার ঝোঁক ছিল যে ম্যাচ খেলায় নেমে ইংরেজদের ছেলেদের পেলে তিন কিল, চড়, ঘুষি মারতে দ্বিধা বােধ করতেন না। ইংরেজদের সম্পকে তাঁর ছিল এমনি বিতৃষ্ণা, কারণ তারা তাঁর দেশের স্বাধীনতা হরণ করেছিল। 

কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। সারা জীবন তিনি অনেক খ্যাতি অর্জন করেন। আর এ খ্যাতির পেছনে রয়েছে তার বহুমুখী প্রতিভা। প্রতিভাধর নজরুলকে আমরা একজন কবি, ঔপন্যাসিক, চলচ্চিত্রকার, নাট্যকার, প্রবন্ধকার, শিশু সাহিত্যিক, ছোট গল্পকার, অভিনেতা, গীতিকার, সুরকার, সাংবাদিক, সম্পাদক, হাদ-নাত রচয়িতা, বংশীবাদক, সৈনিক, প্রেমিক সর্বোপরি খেলা প্রেমিক হিসেবে জানি। 

কবিরা তো মানুষের বাইরে নন। সাধারণ মানুষের মতো তাদের জীবনে ও থাকে নানান স্বপ্ন, নানান শখ। অনেক ক্ষেত্রে সে স্বপ্ন, সে শখ তাঁদের লেখালেখির উপাদান হিসেবে কাজ করে। শুধু উপাদান নয়। কখনো। কখনো সে সব মহৎ সৃষ্টিতে অনুপ্রেরণা যোগায়। হৃদয়ের সব স্বপ্ন, সব শখকে ঘিরে কবিরা সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে ওঠেন। 

নজরুলের প্রিয় খেলার ভেতর একটা হলো ফুটবল। ফুটবল উপভােগ করার নেশা নজরুলের কম নয়। এমন কি নজরুলের দল প্রীতির কথাও জানা যায়। নজরুল মোহামেডান স্পোর্টিংকে সমর্থন করে তার লীগ চ্যাম্পিয়নশীপ প্রাপ্তিতে খুশী হতেন। এক পর্যায়ে তিনি তা নিয়ে একটা কবিতা ও লেখেন।

এই ভারতের অবনত শিরে তোমরা পরালে তাজ,

সুযোগ পাইলে শক্তিতে মোরা আজও দেখালে আজ।

ফুটবলে মেতে ওঠা কবি একবার আনন্দ উল্লাসে বিভোর হয়ে কলকাতা থেকে কল্লোল দলের চার-পাচ জনের সাথে প্রথমে খেলার মাঠ থেকে শেয়াল দা স্টেশনে আসেন। পরে সেখান থেকে সরাসরি আসেন ঢাকায়। তারপর উঠেন বর্ধমান রাজবাড়ীতে। কতটা উত্তেজনা থাকলে এমনটা সম্ভব হয়? শুধু সুদূর কলকাতা থেকে ঢাকা আসার দুঃসাহসিকতা নয়, একবার তিনি খেলার মাঠে সরাসরি রেফারির সাথে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। খেলা চলতে থাকে মোহন বাগান এবং এরিয়ানস এর ভেতর। এরিয়ানসদের জোর প্রচেষ্টা গোল পরিশোধ করার টান টান উত্তেজনা সমগ্র মাঠ জুড়ে। গোল করার প্রবল প্রচেষ্টা। কিন্তু রেফারী সি. আর. ফ্লেটন হয়ে পড়েন খেলার মাঠে পক্ষপাতদুষ্ট। এরিয়ানসদের প্রচেষ্টায় বার বার তিনি বাঁশিতে ফুটক দেন। হঠাৎ এক চরম উত্তেজনাকর মুহুর্তে তিনি বাঁশিতে ফুক দিলে ইংরেজ রেফারি সি. আর ফ্লেটনের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে নজরুল মাঠে নেমে পড়েন। রেফারির শার্ট টেনে ধরে তাকে ঘুষি মারেন। সাথে সাথে রেফারিও নজরুলের ঝাকড়া চুল মুঠোয় ভেতর পুড়ে ফেলেন। নজরুলের সাথে আরো কিছু দর্শক মাঠের ভেতরে ঢুকে পড়েন। তবে পুলিশের হস্তক্ষেপে অল্প সময়ে খেলার মাঠের পরিবেশ শান্ত হয়ে আসে। 

কবির কাছে ফুটবল এতো প্রিয় হয়ে ওঠে যে, তিনি ফুটবলকে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে লেখেন অপূর্ব কবিতা। কবি এ কবিতায় স্বাধীনতাকে নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কঠিন ব্যাঙ্গে মেতে ওঠেন। “জোর জমিয়েছে খেলা” নামের এ কবিতা সে সময়কার বিখ্যাত পত্রিকা “  দৈনিক নবযুগ” (১৯৪১ সালের ১৭ নভেম্বর সংখ্যা) তে ছাপা হয়। কবিতাটির কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-

ক্যালকাটা মাঠে সহসা বিকাল বেলা।

ময়দানে জোর ভিড় জমিয়াছে বড় ছোট মাঝারির

স্বদেশী বিদেশী লোভী নিলোভ হেটো, মেঠো বাজারীর।

এই দিকে “রাজী” ও দিকে “নারাজী” দল

সেন্টারে পড়ে আছে “ভারতের স্বাধীনতা” ফুটবল।

শুধু খেলা দেখা নয়, খেলার প্রতি ভালবাসা নয়, খেলার অভিজ্ঞতাকেও লেখায় ফুটিয়ে তোলেন তিনি। 

ফুটবলের পাশাপাশি নজরুল ছিলেন দাবার প্রতি আসক্ত। প্রচন্ড ঝোঁক ছিল বলেই তিনি দাবা প্রতিযোগিতায় নামেন। ডক্টর কাজী মোতাহার  হোসেনের কথায় জানা যায় যে, নজরুল ইসলাম দাবা খেলতেন, দাবা খেলা জানতেন, দাবা খেলার নেশা ছিল তার, কিন্তু তিনি প্রথম শ্রেণীর দাবা খেলোয়াড় ছিলেন না। তিনি আরো বলেন নজরুল ছিলেন কল্পনা শক্তি সম্পন্ন আক্রমণ প্রিয় দাবাড়–। দারুণ রকম কুশলী খেলোয়াড় যদিও তিনি ছিলেন না তবুও মধ্যম শ্রেণীর খেলোয়াড় হিসেবে তিনি মাঝে মাঝে বিস্ময়ের সৃষ্টি করতেন। ১৯২৫ সালের কথা, কলকাতায় ভারতব্যাপী প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কবি নজরুল তাতে অংশ নেন। জানা যায় নির্ধারিত একজন খেলোয়াড় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর জায়গায় নজরুলের নাম লেখানো হয়। এতে অনেকে অবাক হন। তার কারণ তাঁদের ধারণা ছিল নজরুল কতই বা আর ভাল খেলবেন। কিন্তু তিনি খুব একটা ভাল না খেললেও বিজয়ীদের তালিকায় তাঁর নাম দেখা যায়। তিন শেষ বিজয়ী হন। 

জানা যায় বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন দাবা প্রিয় মানুষ। দাবা ছিল তাঁর খুব পছন্দের খেলা। তিনি তাঁর বাড়িতে কলকতার চ্যাম্পিয়ান এস.সি. আড্ডি, কাজী মোতাহার  হোসেন এবং নজরুল ইসলাম কে দাবা খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানান। আমন্ত্রণ পেয়ে তিনজনই সময় মতো তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হন। রাত ১টা পর্যন্ত দাবা খেলা চলে। নজরুল ও শরৎচন্দ্র দু’জন মিলে খেলা উপভোগ করেন। দাবা খেলার অভিজ্ঞতাকে নজরুল তাঁর সাহিত্য রচনার কাজে লাগান, এ খেলাকে কেন্দ্র করে তিনি তাঁর বিখ্যাত প্রেমের গল্প “শিউলী মালা”র প্লট তৈরি করেন। সত্যিকার অর্থে এ থেকে নজরুলের দাবার জ্ঞান সম্পর্কে জানতে পারা যায়। এ গল্পে নজরুল গল্পের নায়ক আজহারের মুখ দিয়ে দাবার কথা বলান। দাবার জ্ঞান থাকায় নজরুল পরবর্তীতে সুন্দরভাবে “রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম” অনুবাদ করতে পেরেছিলেন। নজরুলের ফুটবল ও দাবা প্রীতি ও সাহিত্য প্রতিভার মতোই সে সময় সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছিল। কাজী নজরুল ইসলামের আরেকটি বিশেষ গুণ ছিল তিনি অন্ধকারে দেখতে পেতেন। এটার মানে হলো উনাকে যে ঘরে রাখা হয়েছিল সেটা অন্ধকার থাকতো। সেই অন্ধকারে বসেই তিনি জেলে অনেক কবিতা ও জ্বালাময়ী গান লিখেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ