শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

অরণ্যের আহ্বান

আশরাফ পিন্টু : মাজেদ সাহেব অরণ্যের ভিতর ঢুকে হারিয়ে যান। ভুল হলোÑঅরণ্যের ভিতর ঢুকে মাজেদ সাহেবের আর বের হতে  মন চায় না। কী মনোরম দৃশ্য! চারদিকে সবুজ আর সবুজ! গাছে গাছে পাখিদের কল-কাকলী। ডালে ডালে রঙ-বেরঙের ফুল। মাজেদ সাহেব যতই ভিতরে ঢোকেন ততই মুগ্ধ হন। কোথায় এসেছেন তিনি। ভুল করে স্বর্গরাজ্যে আসেন নি তো? নাকি স্বপ্ন দেখছেন? নিজের গায়ে চিমটি কাটেন। না, স্বপ্ন নয়। তিনি বাস্তবেই কোনো অরণ্যে ঢুকে পড়েছেন। তবে অরণ্যটি অন্য কোনো অরণ্যের মতো মনে হচ্ছে না। বোটানিক্যাল গার্ডেনের মতো মনে হচ্ছে।  কোনো প্রাণী-ট্রানী চোখে পড়ছে না। 

মাজেদ সাহেবের মনে হয় সারা দেশটাই যদি অরণ্য হতো; তাহলে বেশ হতো। শহরের এই দুঃসহ পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে যেত। যানজট থাকত না। হানাহানি-মারামারি থাকত না। ছিনতাই-রাহাজানি, খুন-খারাবি থাকত না। এই তো সেদিনÑ তার চোখের সামনেই একজন নিরীহ মানুষ খুন হয়ে গেল। মৃত্যু নিশ্চিত করতে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে ওর পায়ের রগ কাটল। উহ্ কী মর্মস্পর্শী দৃশ্য! আশে-পাশে অনেক লোকই ছিল, কেউ টু-শব্দটি পর্যন্ত করল না। খুনী খুন করে নির্বিঘেœ পালিয়ে গেল। মানুষ কি আসলে সভ্য হচ্ছে? নাকি অসভ্য যুগে ফিরে যাচ্ছে ক্রমশ?

মাজেদ সাহেব হাঁটতে থাকেন। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় গহীন অরণ্যের মধ্যে ঢুকে পড়েন। কিন্তু তার মনে কোনো ভয় বা সংকোচ কাজ করে না। কোথায় যাচ্ছেন-কেন যাচ্ছেন এ চিন্তা তার মাথায় নেই। তিনি তো আজ উদ্দেশ্যবিহীন বেড়াতে এসেছেন। আজ কোনো কাজ নেই। শুধু আজ কেন বলাচলে আজ থেকে তিনি পূর্ণ অবসর। অফিসের কোনো ঝামেলা নেই, লোকজনের কোনো কোলাহল নেই। অন্যায়ের সঙ্গেও কোনো লড়াই নেই। আজ তিনি পূর্ণ স্বাধীন। মুক্ত। আজকের দিনটিতে তিনি সম্পূর্ণ একা। একাকী কাটাতে চান তিনি। সংসারের সব অভাব-অভিযোগ পার্থিব জগতের সব মায়া-মমতা ভুলে এক অপার্থিব অনুভূতি পেতে চান। এ কারণে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়েছেন।

ঢাকা শহরে কি আসলে অরণ্য আছে? কই কোনোদিন শোনেন নি তো। অতীতে থাকলেও থাকতে পারে। অতীতে সারা দেশটাই তো অরণ্য ছিল। অরণ্য কেটে শাহরিক সভ্যতা গড়ে উঠেছে। বাপ-দাদার মুখে শুনেছে বনজঙ্গলের কত বিচিত্র কাহিনী। অতীতে লোকে বনবাসে যেত। কাউকে শাস্তি স্বরূপ পাঠানো হতো। কেউবা যেত স্বেচ্ছায়। বনে শাস্তির কী আছে? তাদের ভালোই তো হতো। মাজেদ সাহেব মনে মনে হাসেন। শুনেছে সন্ন্যাসীরা গভীর অরণ্য ধ্যান করতেন। এখনও কি তারা ধ্যান করেন? খুঁজে দেখা দরকার। সন্ন্যাসীদের কথা মনে হতেই এক অলৌকিক প্রশান্তি চলে আসে মাজেদ সাহেবের মনে। তিনি আবার হাঁটতে থাকেন। সন্ন্যাসীদের খোঁজে না অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বোঝা যায় না।

অনেকক্ষণ পর মাজেদ সাহেবের খেয়াল হয় বাড়ি ফেরা দরকার। চারিদিকে আঁধার নেমে আসছে। তিনি বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু পথ খুঁজে পান না। চারিদিকে ঘনায়মান বৃক্ষরাজি। কোথাও ফাঁক-ফোকর নেই। নিবিড় অরণ্য। বেরুতে চাইলেও বেরোনোর উপায় নেই। চারপাশের সবুজ বৃক্ষরাজি যেন তাকে বন্দী করে ফেলেছে। 

মাজেদ সাহেব অরণ্য থেকে বেরোনোর আশা পরিত্যাগ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ