শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস  উপমহাদেশ একটি পর্যালোচনা

 

হোসেন মাহমুদ: (গত সংখ্যার পর) কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে হাজির হয় ভৈরবের গার্লস্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী এক যুবতী সীমা ও তার তরুণী বোন নন্দিনী। সীমার ব্যবসায়ী স্বামী ২২ মার্চ ঢাকা গিয়ে আর ফিরে আসেনি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তারা বড় অসহায়। তাদের আকুতি তাদেরও নিতে হবে। নৌকার কর্তৃত্ব যার হাতে সে আনিস তাদের নিতে কোনোভাবেই রাজি না হলেও হাদী মীরের সনির্বন্ধ অনুরোধে শেষে তাদের নিতে রাজি হয়। কিছু পরেই জানা যায় কলেজ ছাত্রী নন্দিনী কবি হাদী মীরকে না দেখলেও তার নাম জানে, তার কবিতার ভক্ত ও তার প্রকাশিত কবিতার বই কিনে পড়ে।  হাদী মীর ও আনিস ছাড়া ত্রিশজন হিন্দু যাত্রী নিয়ে নৌকা ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের। গন্তব্যের কাছে গিয়ে তারা প্রথমে পড়ে সিরাজ শিকদারের বাহিনির হাতে। তখনি সীমা ও নন্দিনীর প্রকৃত বিপদ ও সম্ভ্রমের অবমাননা শুরু হয়।  হাদী মীর জিজ্ঞাসার মুখে নন্দিনীকে স্ত্রী ও সীমাকে স্ত্রীর বড়বোন বলে পরিচয় দেয়।  শেষে তাদের কাছ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু কিছু সময় পরই সীমান্ত সন্নিকটে এসে পুরো দলটি রাজাকারদের ফাঁদে পড়ে। অসহায় মানুষগুলোর যার কাছে যা ছিল তা লুটে নেয় তারা। তারপর আর সবাইকে কুকুরের মত তাড়া করে সীমান্তের দিকে পাঠালেও রাজাকার সুবেদারের লালসার দৃষ্টি আছড়ে পড়ে সীমা ও নন্দিনীর উপর। একটি জনশূন্য বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় দু’জনকে, তার সাথে হাদী মীরকেও। সেখানে সুবেদারের হাতে মারাত্মক আহত হাদী মীরকে এক ঘরে বেঁধে ফেলে রাখা হয়। অন্যঘরে দু’বোনের সম্ভ্রম হানির নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটে। সকালে আনিস ও সহযোদ্ধারা হামলা চালিয়ে সব রাজাকারকে হত্যা এবং গণধর্ষিতা নগ্ন দু’বোন ও হাদী মীরকে উদ্ধার করে। এরপর মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ লিডার আনিস রাজাকার দিলার আটক মেয়ের সাথেও একই ঘটনা ঘটাতে গেলে হাদী মীর তার প্রতিবাদ করে প্রাণহানির হুমকির সম্মুখীন হন। এ অবস্থায় সীমা ও নন্দিনীকে নিয়ে কারো সাহায্য ছাড়াই অচেনা কিন্তু কাছাকাছি ভারত সীমান্তে চলা শুরু করেন। কিছুদূর এগিয়েই তারা আনিস গ্রুপ ও অগ্রসরমান পাকিস্তানী সৈন্যদের মধ্যে লড়াইয়ের বিষয়টি বুঝতে পারেন। এ সময় একটি গুলী এসে সীমার দেহে লাগলে তার মৃত্যু হয়। বাংলাদেশের মাটিতে কাহিনী এ পর্যায়ে এখানেই শেষ। এরপরের ঘটনায় বোন ও ভগ্নিপতির সাথে লেখক কলকাতা পৌঁছার পথে গৌহাটি  থেকে বিমানে নাটকীয়ভাবে একটি ব্যাগ আসে নন্দিনীর হাতে। কলকাতায় গিয়ে দেখা যায়, তাতে ৩ লাখ টাকা ও  এক নাসরিনের নাম ও ঠিকানায় একটি চিঠি আছে। ঐ টাকার প্রাপক বাংলাদেশের দর্শনা এলাকায় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় একটি চীনপন্থী গোপন সশস্ত্র দল। এরপর কাহিনি একের পর এক মোচড় নিতে থাকে। নন্দিনীর সাথে হাদী মীরের শারীরিক সম্পর্কহীন ভালেবাসা সীমিত পর্যায়েই থাকে। এদিকে হাদী মীরের স্ত্রী হামিদা ভারতে এসে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। তিনি ইমামের কথা জানতে পেরে তার বাসস্থানে আসেন।  স্বামীর সাথে রাতটুকু থেকে ভোরেই তিনি চলে যান মুক্তিযুদ্ধে। জানিয়ে যান যে তিনি ঢাকা যাচ্ছেন। এর মধ্যে স্বামী ও নন্দিনীর বিষয়টি তার জানা হয়ে গেছে। তা নিয়ে হাদী মীরের সাথে তার বহু কথাও হয়। তবে নন্দিনী তখন তার আত্মীয় বাড়িতে থাকায় উভয়ের মধ্যে দেখা বা পরিচয় হয়নি। নন্দিনী আত্মীয় বাড়ি থেকে পরদিন এসে  হামিদার আগমন ও চলে যাওয়ার কথা জানতে পারে। এরপর বিবেক ও দায়িত্ববোধের তাড়নায় হাদী মীর ও নন্দিনী ৩ লাখ টাকা ফেরত দিতে ইমামের সাহায্যে দর্শনা পৌঁছেন। নাসরিনের কাছে টাকা পৌঁছে দিতে গিয়ে গোপন পার্টির (কমরেড তোহার নেতৃত্বাধীন) নেতা আলী রেজার সাথে পরিচয় হয় তাদের। হাদী মীর ও নন্দিনী দু’জনেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার সংকল্প প্রকাশ করেন। রাজনৈতিক বিশ^াস আলাদা হলেও আলী রেজা তাদের পৃথক স্থানে অবস্থান ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তবে প্রশিক্ষণ নেয়ার আগেই হাদী মীর অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সম্মুখীন। 

পাকিস্তানী সৈন্যরা নাসরিনকে ধরে আনে ও তাকে একটি স্কুলে আটকে রেখে তথ্যের জন্য নির্মম নির্যাতন ও গণধর্ষণ করে। তাকে উদ্ধারের লড়াইয়ে আলী রেজার সাথী হন হাদী মীর। এটাই তার লড়াইয়ের প্রথম ও শেষ অভিজ্ঞতা। এর মধ্যে জ্ঞানহীনা মুর্মর্ষ নাসরিনকে সম্পূর্ণ বস্ত্রহীন পাওয়া যায় মাঠে। আলী রেজা চিকিৎসার জন্য লোকজন দিয়ে হাদী মীরের সাথে নাসরিনকে কলকাতা পাঠান। ইমামের সহায়তায় তার ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়। এদিকে নন্দিনীও নাসরিনের খবর পেয়ে প্রশিক্ষণ ছেড়ে কলকাতায় চলে আসে। আলী রেজাও আসেন। তার সাথে ইমামের পরিচয় করিয়ে দেন হাদী মীর। এদিকে খবর পাওয়া যায় যে হামিদা ঢাকায় এক অপারেশনে গুরুতর আহত হয়েছেন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও শেষ পর্যায়ে চলে আসে। ইমামের সাথে পরামর্শ করে হাদী মীর, নন্দিনী ও আলী রেজা ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। উপন্যাসের ভারত পর্যায়ের এখানেই ইতি। বহু পথ ঘুরে, বহু সময় কাটিয়ে ১৮ ডিসেম্বরে তারা নৌকাযোগে গভীর রাতে ঢাকার সদর ঘাটে পৌঁছেন। তারপর পায়ে হেঁটে হাদী মীরের খিলগাঁও বাগিচার বাসায় উপস্থিত হন তারা। দেখা মেলে লুটপাট হয়ে যাওয়া বাসায় নিঃস্ব, উরুতে গুলী লেগে পঙ্গু হয়ে পড়ে থাকা নিঃসঙ্গ হামিদার। হাদী মীরের সাথে নন্দিনী ও আলী রেজা। হামিদা স্বামীর কাছে নন্দিনীর কথা জানতে চান দেখতে পান যে সে এসেছে। হিংসা ও ক্রোধ প্রকাশ নয়,  অন্তরের ভালোবাসায়ই নন্দিনীকে গ্রহণ করলেন অচল শরীরের হামিদা। আর নন্দিনীও শ্রদ্ধা ভালোবাসায় তার পায়ে নিবেদন করে নিজেকে। 

৪.

‘উপমহাদেশ’ উপন্যাসের কাহিনী ও চরিত্র বিন্যাস সংক্ষেপে এই। মুক্তিযুদ্ধের অন্য সব উপন্যাসের চেয়ে কাহিনি চরিত্রে বক্তব্যে এ উপন্যাস একেবারেই পৃথক। সত্যি বলতে কি, এ উপন্যাসেও মুক্তিযুদ্ধ তার সামগ্রিকতা নিয়ে উপস্থিত নয়। কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে এ উপন্যাসের নায়ক করা হয়নি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো লড়াইয়ের কথাও এতে নেই। মুক্তিযুদ্ধের কোনো ঘটনাই যদি না থাকে তাহলে তা মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হয়কি? হানাদারদের বিতাড়িত করে দেশকে স্বাধীন করতে, দেশের মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যার প্রতিশোধ নিতে দৃঢ়প্রত্যয়ী দুঃসাহসী কোনো মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতি উপন্যাসে দেখা যায় না। লক্ষণীয় যে উপন্যাস শুরু হয়েছে একদল উদ্বাস্তুর ভারত অভিমুখে যাত্রা দিয়ে। আর এর মধ্য দিয়ে সে সময়ে অসহায় মানুষের সমস্যা, বিপদ, দুঃসহ পরিস্থিতির অনেকটাই ফুটে উঠেছে। তবে লেখক যেভাবে পথে সিরাজ শিকদার বাহিনীর বাধা, সীমান্তে রাজাকারদের অত্যাচার, নির্যাতন সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি বর্ণনা করেছেন তা কতটা বাস্তবোচিত তা শুধু তার পক্ষেই বলা সম্ভব।  পাঠকরা লেখকের বর্ণনা বিশ^াস করবেন কিনা বা কতটুকু করবেন,  সেটা তাদের বিবেচনা। অন্যদিকে নাসরিনকে উদ্ধারের জন্য দর্শনার একটি স্কুলে ক্যাম্প করে থাকা পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের একটি বর্ণনা আছে যা তেমন জীবন্ত মনে হয় না। যেমন, আলী রেজার দলের কাছে একটা ব্যাটারি থাকার কথা তিনি বলেছেন যা লড়াইয়ে ব্যবহৃতও হয়েছে। কিন্তু এ ব্যটারি কি কোনো ধরনের কামান বা মর্টার তা বোঝা যায় না। চীনপন্থী গ্রুপের লোকদের কাছে এ ধরনের অস্ত্র থাকা সম্ভব ছিল না। আবার তিনি একাধিকবার রিকয়েললেস রাইফেলের কথাও বলেছেন যা সামরিক বাহিনী ছাড়া সাধারণ গেরিলা বা কোনো সশস্ত্র গ্রুপের কাছে থাকার কথা নয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তিনি তার স্ত্রী হামিদার সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধের জন্য ঢাকায় যাওয়ার কথা এবং অপারেশনে গিয়ে তার গুরুতর আহত হওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের নারীদের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও তাদের বাংলাদেশে প্রেরণের কোনো ঘটনা বাস্তবে ঘটেনি। তবে বেশ কিছু নারী আগরতলার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হাসপাতালে কাজ করেছেন তা আমরা  জেনেছি। অন্যদিকে কতিপয় নারী সঙ্গীত শিল্পী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে দেশাত্মবোধক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সঙ্গীত পরিবেশন করে মনোবল চাঙ্গা রাখতে কাজ করেছেন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে সমর্থন সৃষ্টির জন্য ভারতের কোনো স্থানে গিয়েও গান গেয়েছেন।  আর দেশের অভ্যন্তরে তারামন বিবির মত স্থানীয় পর্যায়ে দু’একজন নারী মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধে অংশ নেয়ার কথাও আমরা  জেনেছি।  সে বিবেচনায় লেখকের সৃষ্ট নারী মুক্তিযোদ্ধা হামিদার একান্তই কল্পনার, বাস্তব সম্মত চরিত্র নয়। তবে লেখক স্বয়ং যেহেতু এ উপন্যাস শুধু কল্পনা নয়, প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতাও আছে বলেছেন তাই এ নিয়ে আর কথা বলা নিষ্প্রয়োজন। শেষ বিচারে ‘উপমহাদেশ’ যতটা মুক্তিযুদ্ধ-প্রাসঙ্গিক উপন্যাস, ততটা এটাকে মুক্তিযুদ্ধের বহু রূপ-বৈচিত্র্য মন্ডিত, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযুদ্ধ, অতুলনীয় সাহস, বীরত্ব, আত্মত্যাগ, দেশপ্রেমের মহিমা বিজড়িত কোনো উপন্যাস বলা কঠিন।  

(চলবে

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ