শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

ইজাব উদ্দীন আহমদের জীবন ও কর্ম

আবদুল হালীম খাঁ : বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক, নাট্যকার এবং সমাজকর্মী ইজাব উদ্দীন আহমদের কথা প্রায় সবাই এখন ভুলে গেছেন। এখন তাঁকে কেউ কোনো সময়ই স্মরণ করছেন না। অথচ তিনি কত সাহিত্যিক, সাংবাদিকের কথা, কত শত সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক কর্মীর কথা পত্র-পত্রিকায় লিখেছেন তার হিসাব নেই। অনেক সাংবাদিক তাঁর কাছে সাংবাদিকতার ছবক নিয়েছেন। অনেক কবি তাঁর সংস্পর্শে এসে খ্যাতি লাভ করেছেন এবং জীবন ধন্য করেছেন তার ইয়ত্ত্বা নেই।

সু-সাহিত্যিক নজিবর রহমান ‘গরীবের মেয়ে’ উপন্যাস লিখে যেমন খ্যাতি লাভ করেছিলেন, ইজাব উদ্দীন আহমদ ‘গরীবের ছেলে’ উপন্যাস লিখে তেমনি খ্যাতি লাভ করেছিলেন তৎকালে। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার এবং সাংস্কৃতিককর্মী। ইজাব উদ্দীন আহমদ ছিলেন মহাকবি ও মহাবাগ্মী ইসমাইল হোসেন শিরাজীর জামাতা। শিরাজীর জীবনাদর্শ গ্রহণ করে আজীবন তিনি নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও স্বীয় আদর্শের দীপশিখাকে প্রজ্জ¦লিত রেখেছেন।

ইজাব উদ্দীন আহমদ ১৯১৮ সালের  ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জ জিলার মেজরা ইউনিয়নের বেতুয়া গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ জাহা বকস এবং মাতার নাম জোহরা খাতুন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ঘুড়কা গ্রামের অধিবাসী ছিলেন, ঘুড়কা তার পিতৃ গ্রাম ছিল। সিরাজগঞ্জ কালীবাড়ি বাজারের দুই মাইল উত্তরে যমুনা নদীর তীরে ঘুড়কা গ্রাম অবস্থিত ছিল। ইজাব উদ্দীন আহমদ বাল্যকালে গ্রামের পাঠশালায় পড়াশোনা করেন। গ্রামের পাঠ সমাপ্ত করে তিনি সিরাজগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক বিএল হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৩৪ সালে ম্যাট্টিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করেন। পরীক্ষায় পাশ করে গ্রামে পিতার নামানুসারে ‘জাহা বকস পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন এই পাঠাগারের প্রধান কর্মকর্তা। গ্রামের যুবকদের নিয়ে তিনি এই মহত কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এ সময়ে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। এখন ‘বাঙ্গালী’ শিরোনামে একটি কবিতা বিএল হাইস্কুলের ম্যাগাজিনে প্রকাশত হয়। কবিতাটি তাঁর শিক্ষক মন্ডলী খুব প্রশংসা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারটি কর্মতৎপরতায় এতোটুকু খ্যাতি লাভ করে যে, তৎকালের মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট ঘুড়কা গমন করে পাঠাগারটি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

ইজাব উদ্দীন আহমদ ম্যাট্টিক পাশ করে আইএর পড়ার জন্য করটিয়ার সা’দত কলেজে গিয়ে ভর্তি হন। এ সময় ঘুড়কা গ্রাম যমুনা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় আর্থিক সংকটে পতিত হন এবং তিনি আর লেখাপড়ায় মনোযোগী হতে পারেন নি। এ ছাড়া এ সময়ে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ডামাডোল চারদিক মুখর হয়ে ওঠে। বহু যুবক লেখাপড়া বাদ দিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য তৈরি হয়। ইজাব উদ্দীনের তরুণ মন নেচে ওঠে এবং তিনিও সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

এ সময়ে কবি ইসমাঈল হোসেন শিরাজীর জ্যেষ্ঠপুত্র আসাদউদ্দৌলা সিরাজীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন ইজাবউদ্দীন। তিনি আসাদ শিরাজীর সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হন এবং এক পর্যায়ে তাঁরা উভয়ে গান্ধীজীর স্বদেশী আন্দোলন এবং নেতাজী সুবাস চন্দ্র বসুর ফরোয়ার্ড ব্লকের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে মাতামাতিতে ইজাবউদ্দীনের লেখাপড়া একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। উল্লেখ্য পরবর্তী কালে ইজাব উদ্দীন মুসলিম লীগে যোগদান করেন এবং হোমগার্ডের সালারে জেলা এবং আনসার বাহিনীর কমান্ডার হিসাবে কাজ করেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে ছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই ফররুখ শিয়রের ‘ব্লাক মার্কেট’ নাটক সর্ব প্রথম সিরাজগঞ্জে সফল মঞ্চস্থ হয়। তিনি এই নাটকটি পরিচালনা করেছিলেন। এই নাট্যাভিয়ন সে সময় সিরাজগঞ্জে ভয়ানক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

সিরাগঞ্জ বিএল হাইস্কুলে পড়ার সময় ইজাবউদ্দীন জননেতা ও মহাকবি ইসমাঈল হোসেন শিরাজীর সঙ্গে পরিচিত হন। শিরাজী সাহেব তখন বাংলা তথা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান করেন। তিনি মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার কারণে দেশে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। তাঁর ছিল ঐন্দ্রজালিক শক্তি। শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাঁর ভাষণ শুনতো। তাঁর বক্তৃতার প্রচ-তায় শ্রোতাদের মধ্যে নতুন প্রাণ সঞ্চার হতো। শিরাজী শোনাতেন আশার বাণী, জীবনের বাণী, উৎসাহ উদ্দীপনার কথা, সাহসের কথা। তিনি পরাধীন দেশবাসীকে পথনির্দেশ দিতেন। ইজাব উদ্দীন আহমদ শিরাজী সাহেবের এই কথা শুনে দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ হন। 

তিনি মনে মনে সংকল্প করলেন, পরাধীন দেশে চাকরি করবেন না। মানবসেবাকেই জীবনের ব্রত করবেন।

বাণীকুঞ্জ ছিল ইসমাঈল হোসেন শিরাজীর জন্মস্থান এবং সাধনার ক্ষেত্র। সেদিনের বাণীকুঞ্জে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাহিত্য রসিকদের সমাগম হতো। শিরাজী সাহেবের যোগ্য পরিচালনায় সিরাজগঞ্জের সাহিত্যগোষ্ঠীর নামকরণ করা হয়েছিল ‘শিরাজী চক্র’। 

এই সাহিত্যচক্রে ইজাবউদ্দীন যোগদান করেন এবং তিনি সংকল্প গ্রহণ করেন যে, তিনি জীবন উৎসর্গ করবেন সমাজ ও সাহিত্য সেবায়, সাংবাদিকতায় এবং মানুষের কল্যাণে।

১৯৩২ সালের ৫ ও ৬ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ শহরে বঙ্গীয় মুসলিম তরুণ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এই সম্মেলনে যোগদানের জন্য কলকাতায় কাজী নজরুল ইসলামকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন আসাদ উদ্দৌলা শিরাজী এবং সম্পাদক ছিলেন এম. সেরাজুল হক। অনুষ্ঠানকে সাফল্যম-িত করার জন্য এক বিরাট সেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন একজন কমান্ডার ও একজন ডেপুটি কমান্ডার। এই ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন বিএল হাইস্কুলের তরুণ ইজাবউদ্দীন আহমদ। এই সম্মেলনের মাধ্যমে ইজাবউদ্দীন আহমদ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এবং বাংলার বুলবুল আব্বাস উদ্দীন আহমদের সঙ্গে পরিচিত হন এবং তাদের সঙ্গে গড়ে ওঠে আন্তরিকতা।

করটিয়া সা’দত কলেজে থাকলেও তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কাজে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে, তার আর কলেজে ফেরা সম্ভব হয়নি। কিছুদিন কলকাতা, কিছুদিন ঢাকা আর কিছুদিন সিরাজগঞ্জ এবং সংসারের অভাব-অনটনের কারণে রুজি- রোজদারের প্রয়োজনে ভীষণ অস্থিরতার মধ্যে কাটতে থাকে তার জীবন। এ সময়ে তিনি ঢাকার ইসলামপুরে শিরাজী মেমোরিয়াল হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে কিছুকাল চাকরি করেন। এরপর তিনি নবপ্রতিষ্ঠিত ‘শিরাজী আশ্রম’ এর সুপারিনটেনডেন্টের পদে যোগদান করেন। এক বছর পর শিরাজী আশ্রমের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি কয়েকটি পত্রিকা-সাপ্তাহিক পল্লীপ্রদীপ, মাসিক মোহাম্মদী, দৈনিক আজাদ, ছোলতান এর সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি আসাদউদ্দৌলা শিরাজীর সঙ্গে ‘নয়া জামানা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকাও প্রকাশ করেন। কিন্তু কয়েক মাস পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। তিনি কিছুকাল ‘‘চাষী’, ‘দৈনিক কৃষক’ ও নবযুগ পত্রিকায়ও কাজ করেন। তিনি এক সময় মাসিক দিলরুপা-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নিযুক্ত হন। এরপর ইজাবউদ্দীন আহমদ নিজেই ‘দরবার’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। কর্মজীবনের শুরু থেকে তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, রাজনৈতিক সংগঠন, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সভা-সমিতি ও সম্মেলন সমাবেশে ব্যস্ত এবং সেই সাথে স্বাধীনতা সংগ্রামে এতটাই জড়িয়ে থাকেন যে, নিজ পরিবারের দিকে নজর দিতে পারেননি। সমাজ ও দেশের কাজে সময় দিয়েছেন, জীবনের মূল্যবান সময়ই ব্যয় করেছেন। কিন্তু স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের দিকে নজর দিতে পারেননি।

১৯৫৫ সালের গোড়ার দিকে তিনি পাকিস্তান সরকারের প্রকাশনা বিভাগের সাপ্তাহিক পত্রিকা পাকজমহুরিয়াত ও মাসিক মাহেনও পত্রিকায় যোগদান করেন। ১৯৬৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অবধি তিনি এই দুই সাময়িকীতে কর্মরত থাকেন। পরদিন ১০ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের চাকরিতে নিযুক্ত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড, বাংলা একাডেমীর সঙ্গে একীভূত হওয়ার কারণে বোর্ডের পৃথক অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয় এবং ইজাবউদ্দীন আহমদকে বাংলা একাডেমীর সহঅফিসার পদে উন্নত করা হয় এবং তিনি মত্যুকাল অবধি ৭ ডিসেম্বর ’৭৭ বাংলা একাডেমীর চাকরিতে নিযুক্ত থাকেন। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার বাংলা সাহিত্যে ইজাবউদ্দীন আহমদের অবদানের জন্য মাসিক ২০০/- (দুইশত) টাকা হারে সাহিত্যিক ভাতা প্রদান করতেন। মৃত্যুর পূর্বে শেষ দুই তিন বছর তিনি ভীষণ অর্থ কষ্টে পতিত হন। সারা জীবন তিনি মানুষের উপকার করেছেন, বিপদ-আপদে সবার খোঁজ-খবর নিয়েছেন এবং সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু তিনি যখন শেষ জীবনে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে অসুস্থ হয়ে কষ্টে পড়েছিলেন তখন কোনোদিক থেকে কেউ তাকে সাহায্য সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেননি।

ইজাবউদ্দীন আহমদের নানামুখী কর্মদক্ষতার গুণে দেশের সকল মহলের কাছে কর্মজীবনে সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। নানা রকম কর্মব্যস্থতার মধ্যে থেকেও তিনি অনেকগুলো মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: ১. কৃসক প্রজার মর্মবাণী (প্রবন্ধ) ২. সিরাজুদ্দৌলা (নাটক) ৩. গরীবের ছেলে (উপন্যাস) ৪. কেদার রায় (নাটক) ৫. ইসমাঈল হোসেন শিরাজী ৬. লাইলী মজনু (নাটক) ৭. অনল প্রবাহের উৎসকেন্দ্রে (প্রবন্ধ সংকলন) ৮. সচিত্র আরব্য উপন্যাস (উপকথা) ৯. পল্লীগীতি (গানের সংকলন) ১০. স্বর্ণময়ী (নাটক) ১১. আলোর দিশারী (প্রবন্ধ), ১২. চাঁদ সুলতানা (ঐতিহাসিক নাটক) ১৩. বাঁশের কেল্লা (নাটক), ১৪. গাজী সালাহউদ্দীন (নাটক) ১৫. ইনসাফ (নাটক) ১৬. জীবনের সঞ্চয় (কবিতা), ১৭. দেখে এলাম কবীর মাহমুদ (ভ্রমণ কাহিনী)।

উল্লেখ্য, ইজাবউদ্দীন আহমদ ‘আহমদ খসরু’ ছদ্মনামে কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং কখনো কখনো ঐ ছদ্মনামে কলমও লিখতেন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ