সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

সাহিত্যে কবি সুফিয়া কামাল

রহিমা আক্তার মৌ : ভাষা আন্দোলনের পর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয়। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে ছাত্র সমাজ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়। এ সময় এই আন্দোলনে নেমে পড়ে ছাত্র সমাজ। আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থনের ঘোষণা দেন অনেকে। মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলনের সময় ঢাকায় অনুষ্ঠিত মহিলাদের সমাবেশে ও মিছিলে নেতৃত্ব দেন যিনি। পাকিস্তানের পক্ষে স্বাক্ষর দান প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন যিনি, তিনিই হলেন কবি সুফিয়া কামাল। যার মানসিক সাহস ও স্বদেশপ্রেমের সর্বোচ্চ পরিচয় পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দুদিন আগে তিনি প্রেসিডেন্ট হাউসে ইয়াহিয়া খানের সাথে বৈঠকে যে যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য রেখেছিলেন। তাঁর  মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন তা স্বয়ং ইয়াহিয়া খানকে পর্যন্ত বিস্মিত করেছিল।
সাহিত্য ক্ষেত্রে রবীন্দ্র-নজরুলের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে উজ্জীবিত হয়ে, তাঁদের প্রশংসায় ধন্য হয়ে, নারী মুক্তি আন্দোলনে বেগম রোকেয়ার সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতার গৌরব নিয়ে এবং দেশবাসীর মুক্তি সংগ্রামের প্রতিটি পদক্ষেপে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে যিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে উঠেছেন, তিনিই আমাদের অগ্রজ সুফিয়া কামাল।
 বাংলা ১৩১৮ সালের ১০ই আষাঢ়, ২০শে জুন ১৯১১ সোমবার বেলা ৩টায়  বরিশালের শায়েস্তাবাদের এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কবি, বুদ্ধিজীবী, সমাজনেত্রী সুফিয়া কামাল। তাঁর মায়ের নাম সৈয়দা সাবেরা খাতুন, আর বাবা সৈয়দ আবদুল বারী বিএল। বাবা সৈয়দ আবদুল বারী পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবী। সেকালের সামন্ত জমিদার পরিবারে পূণ্যাহ বলে একটা উৎসব অনুষ্ঠিত হতো। বেগম সুফিয়া কামালের জন্মও হয়েছিল তেমন একটি উৎসবের দিনে, বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদে নানার বাড়িতে। কবির পৈতৃক নিবাস ছিল ত্রিপুরা জেলার শিলাউর গ্রামে। কিন্তু কবির জন্মের আগেই তাঁর বাবা সংসার ত্যাগ করে দরবেশ হয়ে আল্লাহর পথে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। (কারো কারো মতে কবির বয়স যখন সাত মাস, তখন তাঁর বাবা নিরুদ্দেশ হন)। কবির ছিল এক ভাই এবং এক বোন। তার বড় ভাই সৈয়দ আবদুল ওয়ালি ছিলেন কবির চেয়ে তিন বছরের বড়। সুফিয়া কামালের ডাক নাম ছিল হাসনা বানু। এ সম্পর্কে তিনি তার স্মৃতিচারণে লিখেছেন, “আমি  জন্ম নেবার আগেই মায়ের মুখে হাতেম তাইয়ের কেচ্ছা শুনে আমার নানিআম্মা আমার নাম রেখেছিলেন হাসনা বানু। আমার নানা প্রথম বয়সে সদর থানার থেকে জজগিরি পর্যন্ত পড়া করে শেষ বয়সে সঠিক দরবেশ নাম অর্জন করেছিলেন। শুনেছি যেদিন আমি হলাম, নিজের হাতে আমার মুখে মধু দিয়ে তিনি আমার নাম রেখেছিলেন সুফিয়া খাতুন। কিন্তু আমার ডাক নাম হাসনা বানুটাই আমাদের পরিবারে প্রচলিত।”
 সৈয়দ আবদুল বারীর নিরুদ্দেশ যাত্রা, শ্বশুরবাড়িতে সাবেরা খাতুনের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, অনেকের বিরূপ মনোভাব সব মিলিয়ে সৈয়দা সাবেরা খাতুন অনেকটা বাধ্য হয়ে বাবার বাড়িতে এসে আশ্রয় নেন। সুফিয়া বড় হয়েছেন তাঁর নানার বাড়িতে ফলে তাঁর শৈশবস্মৃতি পুরোটাই মাতৃকেন্দ্রিক। ১৯১৮ সালে সুফিয়া মায়ের সঙ্গে  কলকাতা যান। সেখানে তাঁর সাক্ষাৎ হয়  রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন  এর সঙ্গে। প্রথম সাক্ষাতেই বেগম রোকেয়া সুফিয়াকে তাঁর স্কুলে ভর্তি করে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তব সমস্যার কারণে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের একেবারে প্রথম যুগের ছাত্রী হবার দুর্লভ সুযোগ হাতের মুঠোয় এসেও পিছলে গিয়েছিল সুফিয়ার। অনেকের ধারণা, পরিবারের রক্ষণশীলতার কারণেই সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে তাঁর ভর্তির সুযোগ হয়নি।
কিছুদিন পরে তিনি শায়েস্তাবাদ ফিরে আসেন বটে, কিন্তু তাঁর শিশুমনে রোকেয়া-দর্শনের সেই স্মৃতি অম্লান হয়ে থাকে; রোকেয়ার ব্যক্তিত্ব তাঁকে অবিরাম অনুপ্রাণিত করতে থাকে। মায়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মেয়ে সুফিয়াকে রীতিমত অভিভূত করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সুফিয়া কামাল তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘কেয়ার কাঁটা’ উৎসর্গ করেছেন তাঁর মাকে। সে সময় সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারগুলোতে মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার কোনো রীতি ছিল না। কিন্তু ব্যতিক্রম শিশু সুফিয়া বায়না ধরলো যে স্কুলে যাবেই। অগত্যা শিশুর ইচ্ছা পূরণের জন্যে পায়জামা আচকান পরিয়ে মাথায় টুপি দিয়ে রীতিমত ছেলে সাজিয়ে অভিভাবকরা স্কুলে পাঠালেন সুফিয়াকে। বাস্তবে স্কুলে যাওয়া আর কোনদিন সম্ভব না হলেও, স্কুলে পড়ার ঐকান্তিক বাসনা মন থেকে মুছতে পারেননি। অবদমিত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে বাড়িতে স্কুল-স্কুল খেলায়। মজার ব্যাপার, এই স্কুল-স্কুল খেলায় শিশু সুফিয়া বাংলা থেকে ইংরেজিতেই কৃতিত্বের পরিচয় দিতেন বেশি এবং ইংরেজিতে কৃতিত্বের কারণেই ‘সন্দেশ’ পত্রিকার গ্রাহক হবার অপূর্ব সুযোগ লাভ করেছিলেন। কিন্তু মেয়ের নামে পত্রিকা এসেছে, এটা কাউকে দেখানো যাবে না, এমনকি এ কথা ঘরে-বাইরে কাউকেও জানানো যাবে না। এই বৈরী পরিবেশের সমস্যার সমাধান করলেন জুবিলী স্কুলের পন্ডিত প্যারীলাল বাবু। স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্থানীয় পোস্টঅফিসে পোস্টমাস্টারের দায়িত্বও পালন করতেন। নবাব বাড়ির মেয়ের কাছে ডাকযোগে বই আসছে, এটা সকলের মধ্যে জানাজানি হলে লজ্জার কথা, উপরন্তু নিন্দা-সমালোচনার আশঙ্কা, তাই পোস্ট অফিসে সুফিয়ার নামে ‘সন্দেশ’ আসার সাথে সাথেই তিনি তা নিজ তত্ত্বাবধানে রেখে দিতেন। পরে সময় সুযোগ করে সুফিয়ার হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতেন। শিশু সুফিয়া বাংলা শিখছে শুনে প্যারীলাল বাবু খুশি হয়ে তাঁকে উৎসাহ দিতেন। এ সময় সুফিয়ার বড় ভাই সৈয়দ আবদুল ওয়ালী বরিশালে বেল ইসলামিয়া হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করতেন। বাংলার প্রতি আগ্রহের কথা শুনে ঐ হোস্টেলের পন্ডিত বাদশা মিয়া শিশু সুফিয়াকে উৎসাহ দেয়ার পাশাপাশি বাংলা বইও সংগ্রহ করে দিতেন। সাধারণভাবে প্রচলিত পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও এ ভাবে অনেকের স্নেহছায়ায় ধীরে ধীরে শিশু সুফিয়া বাংলা রপ্ত করতে থাকেন।
১৯২৪ সনে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মামাত ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাথে সুফিয়ার বিয়ে হয়। পরে তিনি ‘সুফিয়া এন হোসেন’ নামে পরিচিত হন। সৈয়দ নেহাল হোসেন ছিলেন প্রগতিবাদী ও নারী শিক্ষার সমর্থক। তিনি সুফিয়াকে সমাজসেবা ও সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ দেন। সাহিত্য ও সাময়িক পত্রিকার সঙ্গে সুফিয়ার যোগাযোগও ঘটিয়ে দেন তিনি। ফলে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। স্বামীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় বালিকাবধূ সুফিয়ার লেখার গতি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। নেহাল হোসেনের ঐকান্তিক সহযোগিতায় সুফিয়ার লেখা পত্রিকায় প্রকাশের সুযোগ ঘটে, যা নববধূ সুফিয়ার জন্যে ছিল সত্যিই অকল্পনীয়। ১৯২৩ সালে তিনি রচনা করেন তাঁর প্রথম গল্প ‘সৈনিক বধূ’, যা বরিশালের তরুণ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সুফিয়ার পরম সৌভাগ্য, এই বিবাহই তাঁর সুপ্ত-প্রায় প্রতিভাকে সযতেœ লালন করে বিকাশের ধারায় প্রবাহিত করেছিল। শুধু তাই নয়, সুফিয়ার লেখা প্রকাশের দায়িত্ব নেয়ায় সৈয়দ নেহাল হোসেনকে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রচুর গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছিল। সময়ের বিচারে নেহাল হোসেনের এই পদক্ষেপ সত্যিই যুগান্তকারী ছিল।
১৯২৫ সালে বরিশালে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সুফিয়ার সাক্ষাৎ হয়। এরপূর্বে গান্ধীর স্বাধীনতা সংগ্রামের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি কিছুদিন চরকায় সুতা কাটেন। তিনি এ সময় নারীকল্যাণমূলক সংগঠন ‘মাতৃমঙ্গল’-এ যোগ দেন। সুফিয়া তাঁর স্বামীর সঙ্গে কলকাতায় গেলে সেখানে বিশেষ বিশেষ বাঙালি ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তাঁদের একজন হলেন  কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি সুফিয়ার কবিতা পড়ে মুগ্ধ হন এবং সেগুলি পত্রিকায় প্রকাশের জন্য তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেন।
সম্পাদক  মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন তাঁর সওগাত পত্রিকায়  সুফিয়ার প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ প্রকাশ করেন। সওগাতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। এভাবে ‘সওগাত’ এ সুফিয়া এন. হোসেনের বেশ কিছু কবিতা প্রকাশের পর ১৩৩৪ সালের কার্তিক মাসে হায়দার ওরফে কানু নামে সুফিয়া এন. হোসেনের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সওগাত অফিসে এসে নাসিরউদ্দীন সাহেবের সাথে দেখা করে জানান যে, সুফিয়া তাঁর নিজের কবিতা পত্রিকা অফিসে পাঠাতে সংকোচ করেন, তাই তিনিই (কানু) সওগাত অফিসে কবিতাগুলো পাঠিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, নাসিরউদ্দীন সাহেবের অনুরোধে কানু পরের দিনই সুফিয়ার কবিতার খাতাটি ‘সওগাত’ অফিসে নিয়ে আসেন। নাসিরউদ্দীন সাহেব উৎসাহের সাথে সুফিয়ার কবিতার খাতাটি ‘সওগাত’ মজলিশে পেশ করে বলেন, ‘আমাদের নাকি মহিলা কবি নেই, এই দেখুন, নতুন কবির সন্ধান পেয়েছি। ইনি বয়সের দিক থেকে এখনও নবীন, উৎসাহ পেলে ক্রমে আরো ভালো লিখবেন।
১৯২৯ সালে সুফিয়া কামাল বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত মুসলিম মহিলা সংগঠন ‘আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলাম’-এ যোগ দেন। এখানে নারীশিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারসহ নারীদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হতো। বেগম রোকেয়ার সামাজিক আদর্শ সুফিয়াকে আজীবন প্রভাবিত করেছে। তিনি রোকেয়ার ওপর অনেক কবিতা রচনা করেন এবং তাঁর নামে মৃত্তিকার ঘ্রাণ (১৯৭০) শীর্ষক একটি সঙ্কলন উৎসর্গ করেন। তিনি ‘রোকেয়া সাখাওয়াত স্মৃতি কমিটি’ গঠনে সহায়তা করেন, যার প্রস্তাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হল ‘রোকেয়া হল’ তাঁর নামে করা হয়। ১৯৩১ সালে সুফিয়া মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম ‘ভারতীয় মহিলা ফেডারেশন’-এর সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে সুফিয়ার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার ছায়া। স্বামী নেহাল হোসেন  দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হলেন। স্বামীর সেবা শুশ্রƒষায় সুফিয়া রাতদিন অতিবাহিত করতে লাগলেন। বোম্বে, মাদ্রাজ, নৈনিতাল ঘুরে ফিরে হাওয়া পরিবর্তন করেও রোগের উন্নতি না দেখে শেষে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে চলে এলেন শায়েস্তাবাদের বাড়িতে। শত চেষ্টায়ও নেহাল হোসেনের জীবন রক্ষা করা গেলো না। মাত্র ২৬ বছর বয়সে ১৯৩২ সালের ১৯শে ডিসেম্বর  নেহাল হোসেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তখন সুফিয়ার কোলে ৬ বছরের কন্যা সন্তান আমেনা খাতুন দুলু। স্বামীর অকাল মৃত্যুতে সুফিয়ার জীবনে নেমে আসে চরম দুর্যোগ ও দুর্ভোগ। এই সময়ে সবকিছু বিবেচনা করে সুফিয়া নিজেই উপার্জনের সিদ্ধান্ত নেন। মূলত এখান থেকেই তাঁর ব্যক্তিজীবন ও সাংগঠনিক কর্মকান্ডে দুর্যোগ মুহূর্তে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সূত্রপাত।
কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় উপার্জনের উপায়ের প্রশ্নে। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সার্টিফিকেট তাঁর ছিল না। এরকম দুর্যোগময় দিনে তাঁকে দারুণভাবে সহায়তা করেন কলকাতা কর্পোরেশনের তৎকালীন এডুকেশন অফিসার শ্রীযুক্ত ক্ষিতীশ প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। তিনি নিজ উদ্যোগে কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে সুফিয়াকে শিক্ষকতার চাকুরির ব্যবস্থা করে দেন। পঞ্চাশ টাকা মাইনের এই শিক্ষকতার চাকরি তখন সুফিয়ার জন্যে ছিল পরম পাওয়া। তিন মাসের মধ্যে সুফিয়া নিজ যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে শিক্ষয়িত্রী পদে স্থায়ীভাবে বহাল হন। ১৯৩৩-৪১ পর্যন্ত তিনি কলকাতা কর্পোরেশন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এই স্কুলেই তাঁর পরিচয় হয় প্রাবন্ধিক আবদুল কাদির এবং কবি জসীমউদ্দীন এর সঙ্গে।
সুফিয়ার ছোট মামা ফজলে রাব্বী সাহেব কাজী নজরুল ইসলামের সাথে দেখা করে ভাগিনী সুফিয়ার কবিতা লেখার কথা কবিকে অবহিত করেন এবং কিছু কবিতা তাঁকে পড়তে দেন। তাঁর কবিতা পড়ে নজরুল অত্যন্ত মুগ্ধ হয়ে ঢাকার ‘অভিযান’ পত্রিকায় কয়েকটি কবিতা ছাপার ব্যবস্থা করেন। তখন ‘অভিযান’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সুসাহিত্যিক মোহাম্মদ কাসেম। এভাবে কবিতার সূত্র ধরেই নজরুলের সাথে সুফিয়ার প্রথম পরিচয়।
স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপশি সুফিয়ার সাহিত্যচর্চাও চলতে থাকে। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সাঁঝের মায়া কাব্যগ্রন্থটি। এর ভূমিকা লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এটি পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। এর মাধ্যমেই সুফিয়ার কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। পরের বছর আপনজন ও শুভানুধ্যায়ীদের ইচ্ছায় তিনি চট্টগ্রামের লেখক ও অনুবাদক কামালউদ্দীন আহমদের সঙ্গে পুনরায় পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। সেই থেকে তিনি ‘সুফিয়া কামাল’ নামে পরিচিত হন। এ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ছেলে শাহেদ কামাল (শামীম), আহমদ কামাল (শোয়েব), সাজেদ কামাল (শাব্বীর) এবং মেয়ে সুলতানা কামাল (লুলু) ও সাঈদা কামাল (টুলু)। শোয়েব ১৯৬৩ সালে ১৩ মে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৭৭ সালের ৩রা অক্টোবরে আকস্মিকভাবে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে সুফিয়া কামালের দ্বিতীয় স্বামী কামালউদ্দীন খানও মারা যান।
মাত্র চার বছর বেগম রোকেয়ার সংস্পর্শে থাকলেও সুফিয়া কামালের মানস-গঠনে, বিশেষ করে নারী মুক্তি আন্দোলনে, সর্বোপরি অনগ্রসর মহিলাদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্যে কাজ করার যে শিক্ষা বেগম রোকেয়া থেকে তিনি পেয়েছিলেন, পরবর্তী জীবনে তাঁর সাংগঠনিক কর্মকান্ডে এর প্রত্যক্ষ প্রতিফলন দেখা যায়। দেশ বিভাগের পর সুফিয়া কামাল চলে আসেন ঢাকায়। সে সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাকল্পে গঠিত হয়েছিল ‘শান্তিকমিটি’। প্রখ্যাত নারীনেত্রী লীলা রায়ের অনুরোধে তিনি ‘শান্তিকমিটি’-র কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং সভানেত্রী মনোনীত হন। ১৯৪৮-এর আগস্টে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলার প্রগতিশীল মহিলা নেত্রী ও কর্মীদের উদ্যোগে গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি’। এই সংগঠনের সভানেত্রী নির্বাচিত হন সুফিয়া কামাল, যুগ্ম সম্পাদিকা যুঁই ফুল রায় ও নিবেদিতা নাগ। ১৯৫১ সালের শেষ দিকে সমাজ-সচেতন মহিলাদের এক সমাবেশে গঠিত হয় ‘ঢাকা শহর শিশু রক্ষা সমিতি’, সভানেত্রী নির্বাচিত হন সুফিয়া কামাল।
১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর জীবনের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘কেয়ার কাঁটা’ ও ১৯৩৮ সালে কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’। কবি বেনজীর আহমদ নিজ খরচায় ‘কেয়ার কাঁটা’ ও ‘সাঁঝের মায়া’ প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং লেখক-সম্মানীর ব্যবস্থাও করেছিলেন। এভাবেই সাহিত্য সমাজে নতুন পরিচয়ে আবির্ভাব ঘটে সুফিয়ার। কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ তিনি তাঁর ‘মন ও জীবন’ কাব্যগ্রন্থটি বেনজীর আহমদকে উৎসর্গ করেন।
সুফিয়া কামাল জীবনব্যাপী কাজের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষের কাছে মাতৃস্বরূপা হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর বিবেক, তাঁর সাহস, তাঁর দেশপ্রেম কিংবদন্তিসম। তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন দেশামাতৃকারই এক প্রতিচ্ছবি। কবি সুফিয়া কামাল আজীবন কাব্যসাধনা করলেও শুধু এর মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধতা রাখেননি। দেশ ও দেশের মানুষের কল্যানই ছিল তাঁর আজীবনের সাধনা। নারীর মুক্তি ও মানবধিকার প্রতিষ্ঠায় আমৃত্যু ভূমিকা পালন করে গেছেন। পরম ধার্মিক এই মানুষটি ছিলেন দৃঢ়ভাবে অসাম্প্রদায়িক । নীতির প্রশ্নে কখনো আপস করেননি।
সুফিয়া কামালের কবিতার বিষয় প্রেম, প্রকৃতি, ব্যক্তিগত অনুভূতি, বেদনাময় স্মৃতি, জাতীয় উৎসবাদি, স্বদেশানুরাগ,  মুক্তিযুদ্ধ এবং ধর্মানুভূতি। অন্তরঙ্গ আবেগের বিশিষ্ট পরিচর্যায় এবং ভাষাভঙ্গির সহজ আবেদনঘন স্পর্শে তাঁর কবিতা সুন্দর ও আকর্ষণীয়। তিনি ভ্রমণ ও ডায়রি জাতীয় গদ্য ও শিশুতোষ গ্রন্থও রচনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০টিরও বেশি।
সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশিষ্ট অবদানের জন্য সুফিয়া কামাল অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। ১৯৬১ সালে তিনি  পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ‘তঘমা-ই-ইমতিয়াজ’ নামক জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন; কিন্তু ১৯৬৯ সালে বাঙালিদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি তা বর্জন করেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পুরস্কার: বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২), একুশে পদক (১৯৭৬), নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৭৭), মুক্তধারা পুরস্কার (১৯৮২), জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (১৯৯৫), Women’s Federation for World Peace Crest (১৯৯৬), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণপদক (১৯৯৬), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭) ইত্যাদি। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের Lenin Centenary Jubilee Medal (১৯৭০) এবং Czechoslovakia Medal (১৯৮৬) সহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও লাভ করেন।
১৯৯৯ সালে ২০শে নভেম্বর শনিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে এই অনন্য নারী মৃত্যুবরণ করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ২৮শে নভেম্বর তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
 শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে যাবে কিন্তু সুফিয়া কামাল থেকে যাবেন বাঙালির প্রেরণাদাত্রী হয়ে সবার মনে। সুফিয়া কামালের নিছক একটি কবিতা নয়, এর মাধ্যমে বিধৃত হয়েছে যেন তার নিজের পরিচয়টিও। এ যেন তার প্রকৃত জীবন সংগ্রামের মুলকথা। এ কথা তিনি শুধু কবিতায় বলেননি, তার ১৯৭১ সালের স্মৃতিচারণেও উল্লেখ করেছেন এই বলে, “বেঁচে আছি ঘরে বাইরে, অন্তরে বাইরে, দেহ মনে, সংসারে সমাজে নানা সংগ্রামে বিক্ষত হয়ে।”
আসলে এটাই ছিল তার জীবন। যে জীবনের একাধারে ছিল কাব্যসাধনা, নন্দনচর্চা এবং অপর প্রান্তে ছিল সমাজ সংস্কারও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম। এই সংগ্রাম সতত প্রবহমান ছিল তার জন্ম থেকে মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। এদেশের মুসলিম নারীমুক্তি আন্দোলনের যে ধারাটির সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন তারই অগ্রজ মহীয়সী রমনী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, তারই সুযোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন একালের কবি বেগম সুফিয়া কামাল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ